অপরের কল্যাণ সাধনই সকল সমাজ দর্শনের মূল ভিত্তি। ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই মহান ব্রত বাস্ত—বায়নের মাধ্যমে সকলের জন্য সুখময় জীবন যাপন নিশ্চিত হয়। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি। ব্যক্তি কল্যাণের উপরই রচিত হয় সমষ্টিগত কল্যাণের সৌধ। পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন, একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং অপরের আনন্দ-বেদনায় পরস্পরকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক সংহতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক সংহতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ যা অভিন্ন সত্তা হিসেবে কাজ করে। এই মূল্যবোধ সহসা কিংবা আরোপিত নির্দেশের বলে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ও ব্যবহারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্থিতি আকারে প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ লাভ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম এক বিরাট গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে থাকে। ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়েই মানুষের জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে। ধর্মীয় অনুশাসনমালা মানুষের আচার-আচরণ প্রবৃত্তি প্রবণতার ওপর একটা গঠনমূলক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশ করে । মূলত ধর্মীয় বিধি বিধান আচার-অনুষ্ঠান মানুষের আত্মিক উন্নতি লাভের পথ নির্দেশ করে আর এই আত্মগত উন্নতির ওপর ভিত্তি করে সমষ্টিগত তথা সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়ে থাকে।
ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ধর্মের মূল আদর্শগুলো প্রতিফলিত হয়ে থাকে। অপরের কল্যাণে নিবেদিত হতে উৎসাহিত করাই ধর্মীয় উৎসবগুলোর মূল লক্ষ্য। মানুষ মাত্রই সামাজিক জীব। সে নিজে একা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে জীবন যাপন করতে পারে না। কোনো না কোনো কারণে তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তাকে বহির্মুখী করে তোলে। অন্যের সাথে নানান লেনদেনে তাকে সম্পৃক্ত হতে হয়। এর ফলে সবার সাথে তার একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকে লক্ষ্য করে গঠনমূলক শিক্ষা, প্রত্যয় ও প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে বাস্তবায়ন হয়। উৎসব এবং অনুষ্ঠান মাত্রই একটি সম্মেলন। সমাজের সব স্তরের মানুষ বিশেষ উপলক্ষে একত্র হয়। ব্যক্তি হয় সমষ্টির অংশ। এর ফলে ভাবের আদান-প্রদান হয়। সুখ-দুঃখের কথোপকথন হয়। আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগির একটা তাগিদ অনুভুত হয়। এমন ধরনের সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যক্তির সুখ-দুঃখ, সমস্যা সবার সুখ-দুঃখ সমস্যায় রূপান্তরিত হয়ে থাকে। একের দুঃখ অন্যের সুখের সাথে, একের বেদনা অন্যের আনন্দের সাথে, একের অভাব অন্যের প্রাচুর্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সমাধানের পথ খুঁজে পায়।
ধর্মীয় উৎসবগুলো সাধারণত বছরের বিশেষ সময়ে ও উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সবার সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ আসে-বছরের জমে থাকা দঃখ-বেদনা মনোমালিন্য দূর করার একটা উপলক্ষ তাতে মিলে। ধর্মীয় উৎসবগুলো প্রায়ই কৃচ্ছ্রতা সাধন, আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রেক্ষাপটে আনন্দের ও ত্যাগের হেতু হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। আত্মকল্যাণ লাভের জন্য কঠোর ত্যাগ, সাধনা ও পরিশ্রমের পর আনন্দের সোপান হিসেবে এই উৎসবের আয়োজন। সে উৎসবে থাকে পরিতৃপ্তির আমেজ। আত্মোৎসর্গের পরিতৃপ্তিতেই অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা জাগে। সে জন্য ধর্মীয় উৎসবগুলোতে দান-খয়রাত করা অর্থাৎ বিত্তবান সমর্থরা বিত্তহীন অসমর্থদের সাহায্য করে, আনন্দে সবাই সমভাবে অংশ গ্রহণ করে। অন্যের অতৃপ্তিকে নিজের অতৃপ্তি বলে মনে করে সবাই। খোদার সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আহার্য দ্রব্য, সম্পদ- সামগ্রী এমনকি জীব জন্তু উৎসর্গ করা হয়ে থাকে এসব উৎসবগুলোতে। উৎসর্গীকৃত এ সব সম্পদ- সামগ্রী জীব জন্তুর কোনো কিছুই বিধাতার দরবারে সরাসরি পেঁৗঁছায় না। উৎসর্গকারীর পক্ষ থেকে নিবেদিত নিষ্ঠা ও সকৃতজ্ঞতা প্রকাশের ইচ্ছাটিই প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়ে থাকে।
‘No one should suppose that meat or blood is acceptable to the One True God. It was a Pagan fancy that Allah could be appeased by blood sacrifice. But Allah does accept the offering of our hearts, and as a symbol of such offer, some visible institution is necessary. ...our symbolic act finds practical expression in benevolence, and that is the virtue sought to be taught...we should proclaim the true doctrine, so that virtue and charity may increase among men..’ (আল কুরআনের ২২ সংখ্যক সুরা আল হজের ৩৭ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইউসুফ আলী)
এই ধূলি ধরায় উৎসর্গীকৃত সব কিছুই করা হয় সবার মধ্যেই, যা কিছু উৎসর্গ করা হয় তা সবই আহার্য কিংবা মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যা অন্যের ক্ষুধা ও অভাব মিটিয়ে থাকে। সুতরাং দেখা যায় ধর্মীয় উৎসবের সব কিছুই সামাজিকতার আদর্শ প্রতিফলনের মধ্যেই সার্থকতা লাভ করে থাকে।
সাম্য ও সামাজিক সংহতির ধর্ম ইসলামের ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরা, শবেবরাত, শবে কদর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব উৎসবের মূল তাৎপর্য হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মোৎসর্গের কঠোর ত্যাগ সাধনার প্রেক্ষাপটে আনন্দঘন সম্মিলন। গরিব-দুঃখীদের মধ্যে দানখয়রাত করা, ভেদাভেদ ভুলে সবার সাথে এ সম্মিলনে শরিক হওয়া, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি, কোরবানিকৃত পশুর গোশত বিলিবণ্টনের মাধ্যমে সামাজিকতার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে থাকে। মোবারক মাস রমজানের পর আসে ঈদুল ফিতর। সুদীর্ঘ একমাস কঠোর কৃচ্ছ্রতা সাধনের পর আসে আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর। ‘ঈদ’ শব্দের ব্যবহারিক অর্থ খুশি। আভিধানিক অর্থ ‘ফিরে আসা’। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যে বিশেষ নিয়ম কানুন পালিত হয় তা থেকে ‘স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসা’ হয় ঈদুল ফিতরের দিনে। ঈদের এই আনন্দ উৎসবে শরিক হওয়ার সামর্থ্য সবার সমানভাবে থাকে না। সে জন্য ইসলামে সমাজের ধনী ও বিত্তবান সদস্যদের ওপর দরিদ্র ও বিত্তহীনদের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ‘বিত্তবানদের সম্পদের ওপর বিত্তহীনদের হক আছে।’ ৫১ সংখ্যাক সূরা আর যারিয়াত, আয়াত ১৯) কুরআনের এই অমোঘ নির্দেশ ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে জাকাত ও সাদাকা প্রদানের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে থাকে। বিধান রয়েছে, ঈদের নামাজ আদায়ের আগেই জাকাত ও ফিতরা প্রদান করতে হবে। এটা ঈদুল ফিতরের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য। উন্মুক্ত ময়দানে ধনী দরিদ্র উঁচু নিচু সাদা কালোর সব ভেদাভেদ ভুলে ঈদের জামাতে শামিল হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মিলনে পাড়া-পড়শি থেকে শুরু করে সব পরিচিত অপরিচিতের সাথে একত্র হওয়ার সুযোগ ঘটে। নামাজ শেষে কোলাকুলির মাধ্যমে সবাই সব ভেদাভেদ ও মনো-মালিন্য ভুলতে চেষ্টা করে। ঈদের দিনে সবাই সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরিধান করে। পুরনো বিবাদ-বিসংবাদ দুঃখ-কষ্ট থেকে নতুনতর জীবনবোধ ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রতীকী প্রকাশ ঘটে থাকে এর মধ্যে। একে অন্যের বাসায় পালাক্রমে দাওয়াত খাওয়া যাতায়াতের মাধ্যমে সামাজিক সখ্যতার ভিত্তি আরো দৃঢ় হয়।
ঈদুল আজহা উদযাপনের মধ্যেও নিশ্চিতভাবে রয়েছে আত্মশুদ্ধির সুযোগসহ বিশেষ সামাজিক তাৎপর্য। হজরত ইব্রাহিম (আ:) কর্তৃক পুত্র ইসমাঈলকে (আ:) আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে পালিত হয় ঈদুল আজহা। ইতিহাসের ধারাবাহিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে আত্মোৎসর্গের পরিচয় দেয়া হয়। এই পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্ত উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টার প্রতীকী প্রকাশ ।
‘আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের মতো পূত বোধন
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’
(কাজী নজরুল ইসলাম, কোরবানি, অগ্নি-বীণা)
সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব চরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির গোশত গরিব আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।
হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের মুসলমানরা সমবেত হন এক মহা সম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সব ভেদাভেদ ভুলে সবার অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরিফে একই পোশাকে, একই ভাষায় একই রীতি রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয় তার চাইতে বড় ধররের কোনো সাম্য-মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথায়ও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রং ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বাচনীয় সখ্যতা সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হতে পারে।
পৃথিবীর তাবৎ ধর্ম ও সমাজে স্ব স্ব সংস্কৃতি ও অবকাঠামো অবয়বে উদযাপিত উৎসবাদিতে মানবিক মূল্যবোধের সৃজনশীল প্রেরণার , সখ্যতা সৌহার্দ্য প্রকাশের অভিষেক ঘটে থাকে। নানান উপায় উপলক্ষে সম্প্রীতি বোধের বিকাশলাভ ঘটে থাকে, অবনিবনার পরিবর্তে বন্ধন , মতপার্থকের অবসানে সমঝোতার পরিবেশ সৃজিত হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপুজা, দেওয়ালী সহ নানান পূজা পার্বণাদিতে আত্মশুদ্ধির আনন্দের, অপয়া অশুর সত্তার সংহার, সংবেদনশীলতার শুভ উদ্বোধন ঘটে থাকে। খ্রিস্টীয় বড় দিনের উৎসব সংবছরের সকল বিভ্রান্তি বিবাদ বিসংবাদ ভুলে অনাবিল আনন্দ আচার অনুষ্ঠানে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ সমুপস্থিত করে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সৎ চিন্তা সৎ ধ্যান ও অহিংস অভেদ বুদ্ধি বিবেচনার বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের পরিপালনীয় নির্বাণ অনুষ্ঠানাদিতে। সকল আয়োজন আপ্যায়নের মর্মবাণীই হল তার সৃষ্টির সেবা ও সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার ইবাদৎ। সংহার নয় সেবাই পরম ধর্ম । সকল অশান্তি কলহ বিবাদে শান্তির সম্ভাবনা শুধু সহযোগিতা -সমঝোতাতেই । হ
অপরের কল্যাণ সাধনই সকল সমাজ দর্শনের মূল ভিত্তি। ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই মহান ব্রত বাস্ত—বায়নের মাধ্যমে সকলের জন্য সুখময় জীবন...
