লোকসমাজে ত্যাগের মাহাত্ম্য ও ভোগের আনন্দ নিয়ে বিস্তর বির্তক লক্ষ করা গেছে। ত্যাগে সুখ না ভোগে সুখ, এ নিয়েও মানুষ অমীমাংসিত চিন্তা লালন করেন। প্রকৃত সুখ কোথায় লুকিয়ে আছে তা নিয়েও ব্যক্তিবিশেষে কেউ কেউ উপসংহারে পৌঁছাতে পারেন না। কেউ হয়তো টপ করেই বলে ফেলেন, ত্যাগেই সুখ। কেউ বলেনÑ না; ভোগেই সুখ। যারা একটু চিন্তাশীল তারা হয়তো কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে বলেন, সুখ হলো একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটি একেক জনের কাছে একেক রকম। তবে অর্থনীতির ভাষায়, অভাব পূরণের নামই সুখ অথবা চাহিদার জোগানই সুখ। অবশ্য অর্থনীতি এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারে না যে, জোগান যেখানে পর্যাপ্ত সুখও সেখানে অফুরন্ত। অন্য দিকে অর্থনীতিতে ত্যাগের বিষয়টি তেমন আলোচনা হতে দেখা না গেলেও ভোগ নিয়ে কিন্তু বিস্তর আলোচনা দেখা যায়। অর্থনীতির পরিভাষায় বিনা লাভে অর্থ ব্যয়কে অপচয় বলা হয়। ত্যাগে আপাতদৃষ্টে কোনো লাভও নেই, স্বার্থও নেই। ত্যাগ মানেই সামগ্রীকে বিসর্জন দেয়া যার কোনো বিনিময় নেই, দাবি নেই। সে জন্য ত্যাগ নিয়ে অর্থনীতির মাথাব্যথা নেই। অর্থনীতি শিখায় পাঁচ পয়সা থেকে কিভাবে ৮০ পয়সা করা যায়। এই ৮০ পয়সা থেকে ৩০ পয়সা এমনি এমনি ছেড়ে দেয়ার কোনো মানে হয় না। সবসময়ই অর্থনীতিতে বা পুঁজিবাদে স্বার্থ জড়িত। যেখানে স্বার্থ নেই সেখানে অর্থনীতির কোনো উপদেশও নেই। কাজেই অর্থনীতির ভাষায় ভোগই সুখ। ভোগই বলি আর ত্যাগই বলি, আসল উদ্দেশ্য হলো সুখ খোঁজা বা সুখী হওয়া। সুখের নেশায় মানুষ যেভাবে ভোগে মত্ত হয়ে উঠেছে, সে তুলনায় ত্যাগের বিষয়টি পেছনে পড়েছে। এই যে চারদিকে এত ভোগের পরিদৃশ্য, তাতে কি মানুষ সুখী হতে পেরেছে? পারেনি। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুকেই আজ অসুখী দেখাচ্ছে।
ভোগ ত্যাগের বিপরীত শব্দ। সংস্কৃত ‘ভুজ’ ধাতু থেকে ভোগ শব্দের উৎপত্তি। ভোগ শব্দের সবচেয়ে ভালো প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘আস্বাদন’ যেমনÑ আস্বাদন অর্থে কষ্ট ভোগ করাকে বলি দুর্ভোগ; নাচ, গান, কবিতা, বক্তৃতাকে ভোগ করা অর্থে বলি ‘উপভোগ’। কোনো কিছুতে সত্ত বা অংশ থাকা অর্থে বুঝি ‘ভোগ-দখল’। ভোগ হিন্দু ধর্মের দেবতাদের উদ্দেশে নৈবেদ্য প্রদানকেও বোঝায়; ভোগ দেয়া। মনে করা হয়, দেবতারাও নৈবেদ্য বা প্রসাদ আস্বাদন করে। তবে সাধারণভাবে ভোগ বলতে কোনো কিছু খাওয়াকে বোঝায়, কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় ভোগ হলো ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো দ্রব্যের উপযোগ নিঃশেষ হওয়া। অভাব পূরণের কাজে ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনোভাবে দ্রব্যের উপযোগ নিঃশেষ হলে তা ভোগ হয় না। যেমনÑ লজ্জা নিবারণের জন্য কাপড় ব্যবহার করলে তা হবে ভোগ, কিন্তু কাপড় যদি আগুনে পুড়িয়ে ফেলে নিঃশেষ করা হয়; তবে এটিকে ভোগ বলা যায় না। এটি হবে অপচয়। অধ্যাপক মেয়ার্সের ভাষায় ‘মানুষের অভাব তৃপ্ত করার জন্য সামগ্রী ও সেবাকর্মের প্রত্যক্ষ ও চূড়ান্ত ব্যবহারই ভোগ’। অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ মানেই স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। অতএব অর্থনীতি যত চাঙ্গা হবে স্বার্থও ততই স্পষ্ট হতে থাকবে। স্বার্থ যত গাঢ় হতে থাকবে, ভোগ তত বেড়ে যাবে আর সুখও ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে থাকবে। কারণ অর্থনীতিতে ত্যাগের বিষয়টি পাত্তাই পায়নি। বিনিময় বা স্বার্থ ব্যতীত ব্যয় মানেই অপচয়। যারা মনে করেন ত্যাগেই সুখ; তাদের এই বাক্যটি অর্থনীতির ভাষায় একটি অসার বাক্য।
অর্থব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যে স্বার্থ চরিতার্থের নিমিত্তে যদি ভোগের উন্মেষ ঘটে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভোগের ভেতর স্বার্থ আছে। ত্যাগেও কি স্বার্থ পাওয়া যায়? অর্থনীতির ভাষায় পাওয়া না গেলেও সূক্ষ্ম অর্থে ত্যাগের মধ্যেও স্বার্থ থাকে। যেমনÑ কেউ আমাদের ভালো না বাসলে আমরাও তাকে ভালোবাসি এমনটা সহজে হয় না। ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা যায়। ঘৃণার বিনিময়ে ভালোবাসতে পারা যায় না। তাহলে অর্থ দাঁড়ালÑ আমরা ভালোবাসা পেলে ভালোবাসি। বিনিময়ের এই ভালোবাসাটাও একটা স্বার্থ। আসা যাক সম্পদের পরিচয়ে। সম্পদ বলা হয় এমন বস্তুকে, যার বিনিময় মূল্য রয়েছে। টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, জমিজমা, ব্যবসায়-বাণিজ্য এগুলো সম্পদ। আবার আদর, স্নেহ, মায়া-মমতা, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, অনুরাগ-অুকম্পা, মান-যশ-খ্যাতি, সম্মান, মর্যাদা এগুলোও সম্পদ। এসব সম্পদও মানুষ প্রত্যাশা করে। মানুষ এসব অস্থাবর সম্পদ থেকে বঞ্চিত হলেও আহত হয়। যেমনÑ বাবা-মায়ের জমিজমা, স্থাবর সম্পত্তি থেকে পুত্র-কন্যা বঞ্চিত হলে যেমন আহত হয়, তেমন মা-বাবার আদর-স্নেহ মায়া-মমতার মতো অস্থাবর সম্পদ থেকে বঞ্চিত হলেও মানুষ আহত হয়। আবার দেখা যায়, একজন অভাবগ্রস্ত মানুষকে বিনা শর্তে বিনিময় ছাড়াই ব্যবসায় করার জন্য কিছু টাকা দিয়ে দেয়া হলো। টাকা পেয়ে অভাবী লোকটা ব্যবসায় শুরু করল এবং ভালো করল। কিন্তু যে ব্যবসায় করার টাকা দিলো তার প্রতি সে কৃতজ্ঞ হলো না বা কোনো সম্মানই প্রদর্শন করল না। এমন হলে সাহায্যকারী মানুষটি সম্মান না পেয়ে ভেতরে ভেতরে আহত হবেন এবং মন খারাপ করবেন। আসলে সাহায্যকারী লোকটি সম্মান পাওয়ার স্বার্থেই সাহায্য করেছিলেন, যদিও সেই প্রত্যাশা তার উহ্যে ছিল। তা না হলে সে আহত হতে পারত না। এবার আমরা বুঝতে পারলাম ব্যবসায় করার টাকাটা সাহার্যকারী ত্যাগ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তিনি ভোগ বা আস্বাদন করতে চেয়েছিলেন সম্মানটুকু। এবার অন্তত এটি নিশ্চিত হওয়া যায়, ত্যাগের ভেতরও ভোগ রয়েছে এবং ত্যাগের ভেতর যে ভোগ রয়েছে সেই ভোগের সুখানুভূতিটাও অত্যন্ত তীব্র। ত্যাগ যে একেবারে স্বার্থহীন তা বলা মুশকিল। ত্যাগও আস্বাদন করা হয়ে থাকে। পার্থক্য এরকম যে, ভোগাস্বাদন স্থূল এবং ত্যাগাস্বাদন সূক্ষ্ম। ভোগ স্বল্পমেয়াদে সুখ দেয়, আর ত্যাগ দীর্ঘ মেয়াদে সুখ, সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এ উদাহরণ হজরত ইবরাহিম আ:-এর জীবনেও লক্ষ করা গেছে। ঈদুল আজহা সমাগত হলে মুসলিম বিশ্ব হজরত ইবরাহিম আ: ও হজরত ইসমাইল আ:-এর জীবন থেকে ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করার চেষ্টা করে থাকেন। ইবরাহিম আ: তাঁর স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালোবাসার আধার একমাত্র প্রিয় সন্তান ইসমাইল আ:-কে উৎসর্গ করেছিলেন আর হজরত ইসমাইল আ: আত্মত্যাগ করেছিলেন। উভয়েই তা করেছিলেন আল্লাহর হুকম পালনের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ তাঁদের এই ত্যাগের উদ্দেশ্যকে গ্রহণ করেছিলেন মাত্র। আল্লাহ দেখতে চেয়েছিলেন ত্যাগের ব্যাপারে ইবরাহিমের সিদ্ধান্ত কতটা মজবুত। এ প্রসঙ্গে সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘তাদের গোশত ও আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, তাদের রক্তও না, কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ এই ত্যাগের বিনিময়ে ইবরাহিম আ: এবং ইসমাইল আ: অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন অগাধ সম্মান, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা। সুতরাং ত্যাগের সুকৃতি রয়েছে; রয়েছে ঐশ্বর্য, মহত্ত্ব, মহিমা।
ত্যাগ বিশেষ্য পদ। এর অর্থ বা প্রতিশব্দ হচ্ছে বর্জন, পরিহার, ছাড়া, বিসর্জন, বৈরাগ্য, নিরাশক্তি ঈত্যাদি। (ত্যজ্+অ) মূল থেকে ত্যাগ (দাবি ত্যাগ করা)। ঝধপৎরভরপব, মরারহম ঁঢ়. আর মহিমা শব্দের অর্থ মাহাত্ম্য, গৌরব ইত্যাদি। ইবরাহিম আ: এবং ইসমাইল আ: ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন তার মহিমা আজো ভাস্বর। শত শত বছর আগে যে ত্যাগের সূচনা তাঁরা করেছিলেন, সেই ত্যাগের মর্যাদা ও শক্তি এত পোক্ত যে, তার প্রতিদান বা সম্মান তাঁরা আজো উপভোগ করছেন। ত্যাগের এমনই যুগান্তকারী মহিমা প্রতিভাত হয়ে থাকে এবং ত্যাগের অন্তর্নিহিত রোশনিও অতি উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়ায়। তা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজ শুধু পশু কোরবানির মধ্যে ত্যাগকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ইবরাহিম আ:-এর মাধ্যমে যে পরীক্ষা আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন, পরীক্ষার সেই শিক্ষা শুধু নির্দিষ্ট দিনে পশু কোরবানির মধ্যে আবদ্ধ নয়। মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই প্রতি মুহূর্তে ত্যাগের অনুশীলন করার শিক্ষা সেই ঘটনায় দেয়া হয়েছে। অথচ সমাজে ত্যাগের সংস্কৃতি উধাও হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভোগের সংস্কৃতি। মানুষ ভোগে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছে। ভোগের সাথে যেহেতু স্বার্থের সম্মন্ধ আছে, সেহেতু মানুষ স্বার্থে অন্ধ হয়েছে এ জন্য যে, অতি অল্প সময়ে মানুষ যশ, খ্যাতি, মর্যাদা ভোগ করতে চাইছে। অবশ্য ভোগবাদের একটা আশ্চর্য রকমের সক্ষমতাও রয়েছে আর তা হলো স্বল্পসময়ের ব্যবধানে ভোগবাদীরা সবকিছু আস্বাদন করতে পারে। এমনো হতে পারে, জীবনের অর্ধেক সময়ে ভোগ নিঃশেষ করে বাকি অর্ধেক সময় সে নিঃস্বও হতে পারে। কিংবা ভোগবাদে ভোগবাদীদের মৃত্যুর পরে সম্মানের সাথে তাদের আর বেঁচে থাকার সুযোগ ঘটে না বা তার উত্তরসূরিরা কেউ সেই ভোগবাদীর থেকে সুবিধা ভোগ করতে পারে না। কিন্তু ত্যাগে এ ধরনের সুযোগগুলো অবারিত। সে জন্য সফল মানুষদের জীবনে ত্যাগের পরিমাণ অনেক বেশি। হ