মানবসৃষ্টির আদিকাল থেকেই কোরবানির প্রচলন শুরু হয়েছে। তবে বিশেষভাবে মহান নবী ইবরাহিমের আ: সাথে কোরবানির আত্মত্যাগের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা যে কোরবানি করে থাকি তা মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহীম আ: এর সুন্নত হিসেবে, আল্লাহর নির্দেশে তাঁর ও তৎপুত্র ইসমাইল আ:-এর চরম আত্মোৎসর্গের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে স্মরণ করে। কোরবানির প্রকৃত অর্থ ত্যাগ, আত্মদান বা সর্বস্ব উৎসর্গ করা। এর সাথে নিয়ত বা দৃঢ় সঙ্কল্প অপরিহার্য। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বান্দা কোনো কিছু উৎসর্গ করার জন্য যখন খালেছ নিয়তে দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ হয় তখন সেটাকে কোরবানি বলা যায়। মূলত নিয়তের পবিত্রতা ও দৃঢ়তার ওপর কোরবানি কবুল হওয়া নির্ভর করে। তা ছাড়া ইসলামী পরিভাষায় যেকোনো উৎসর্গই কোরবানি নয়। ইসলামে কোরবানির তাৎপর্য, ঐতিহাসিক ভিত্তি, উপকরণ ও নিয়ম-পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। আদি মানব আদম আ:-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানিই পৃথিবীর প্রথম কোরবানি। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিল) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনাও যখন তারা উভয়ে কোরবানি করল। তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, ‘আমি তোমাকে হত্যা করবোই।’ অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।” (সূরা মায়িদা, আয়াত : ২৭)
মানবজাতির ইতিহাসে পিতা-মাতা-পুত্রের চরম আত্মোৎসর্গের এরূপ দৃষ্টান্ত আর দেখা যায় না। তাই আল্লাহ মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে এ চরম ও অত্যুজ্জ্বল আত্মোৎসর্গের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন ঈদুল আজহা ও কোরবানির মাধ্যমে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণাÑ “আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ এক, সুতরাং তারই নিকট আত্মসমর্পণ কর এবং সুসংবাদ দাও বিনয়ীগণকে যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে।” (সূরা হজ, আয়াত : ৩৪-৩৫)
এখানে স্পষ্টত বলা হয়েছে, সব যুগেই কোরবানির নিয়ম প্রচলিত ছিল এবং একমাত্র আল্লাহর নামে, একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোরবানি করে তারা যারা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পিত, আল্লাহর একান্ত অনুগত ও আল্লাহর নামে যাদের হৃদয় কম্পিত হয়। কোরবানির এ আধ্যাত্মিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আল্লাহ বলেনÑ “আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ, আয়াত : ৩৭)
এ জন্য কোরবানি করার সময় নি¤েœাক্ত আয়াতদ্বয় উচ্চারণ করা জরুরি : “বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও মরণ রাব্বুল আলামিন আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি সবার আগে তাঁর অনুগত ফরমাবরদার।” (সূরা আন’আম, আয়াত : ১৬২-১৬৩)
কোরবানি সম্পর্কে আরো কতিপয় হাদিস : “সাহাবা যায়েদ ইবনে আকরাম রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: ‘আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা:! এ কোরবানি কী? নবী করিম সা: বললেন : তোমাদের পিতা ইবরাহিম আ:-এর সুন্নাত।’ বললাম, ‘এটা করলে আমরা কী পাবো?’ ‘বললেন, প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি করে নেকি।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ সা:! পশমের ব্যাপারে কী হবে?’ বললেন, ‘প্রতিটি পশমের বদলে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।” (ইবনে মাজাহ, হাকেম, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, আল-মুনযেরী)
উন্মুল মুমিনীন মা আয়েশা রা: বর্ণিত আরেকটি হাদিস। তিনি বলেন : “রাসূল সা: বলেন, কোরবানির দিন কোনো ব্যক্তি (কোরবানির পশুর) রক্ত ঝরানোর মতো আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয় অন্য কোনো কাজই করতে পারে না। জবেহ করা জন্তু কিয়ামতের দিন তার শিং, পশম ও খুর নিয়ে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে তা সন্তুষ্টির মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা এতে মনের সুখ ও সন্তোষ নিবদ্ধ করো।” (তিরমিযী, হাকেম, ইবনে মাজাহ্)
মা আয়েশা রা: বর্ণিত অপর একটি হাদিসে মহানবী সা: তাঁর প্রিয় কন্যা মা ফাতিমাকে রা: লক্ষ্য করে বলেন : “তুমি ওঠো, তোমার কোরবানির নিকট উপস্থিত হও এবং তা দেখ। কেননা কোরবানির যে রক্ত প্রবাহিত হয় আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি বিন্দুর বিনিময়ে তোমার অতীত গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ ফাতিমা রা: বললেন : ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের-আপনার পরিবারবর্গের লোকদের জন্য এটা কি বিশেষ ব্যবস্থা, না আমাদের জন্য ও সব মুসলমানের জন্য এটা?’ নবী করিম সা: বললেন : না, বরং আমাদের ও সর্বসাধারণ মুসলমানের জন্যই এ ব্যবস্থা।” (বায্যার)
হজ উপলক্ষে যেমন একমাত্র আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পার্থিব সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে মক্কা শরিফে সমবেত হতে হয়, কোরবানিও তেমনি একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ইব্রাহীম আ: তাঁর প্রাণাধিক পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্যত হয়ে যে চরম আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন, সে মহান স্মৃতির স্মরণে প্রতি বছর পশু কোরবানি করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগের পরীক্ষা দিতে হয়। হজের মধ্যে যেমন ব্যক্তিগত তাকওয়া অর্জন ছাড়াও মুসলিম উম্মার ঐক্য-সংহতি, ভ্রাতৃত্ব, কল্যাণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও ইসলামকে বিশ্বের সর্বোত্তম বিধান ও বিজয়ী শক্তিরূপে তুলে ধরার প্রয়াস ফুটে ওঠে, ঈদুল আজহা ও কোরবানির মধ্যেও তেমনি আল্লাহর প্রতি একান্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে একাধারে ব্যক্তিগত তাকওয়া, মুসলিম সমাজের ঐক্য-সম্প্রীতি, পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও একাত্মতার এক মহিমময় উজ্জ্বল প্রাণবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে। এখানে যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনি রয়েছে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, বর্ণ-গোত্রের ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে বিশ্বস্রষ্টার কাছে আত্মনিবেদনের এক মানবিক উদার সংস্কৃতির মহত্তম প্রকাশ।
পবিত্র হজ, ঈদুল আজহা ও কোরবানি প্রতি বছর আমাদের জন্য বহন করে আনে অপরিসীম আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা। এ উপলক্ষে আমরা আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে একাধারে মহান স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ ও কল্যাণ-চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হতে পারি। বিশেষভাবে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যে, এর প্রতিটিই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই এর মূল লক্ষ্য। কোনোরূপ প্রদর্শনেচ্ছা, পার্থিব ফায়দা হাছিল বা গোশত খাওয়ার মনোভাব যেন এর মধ্যে স্থান লাভ করতে না পারে। ‘ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়া ইয়া ওয়ামামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’-আমাদের নামাজ, কোরবানি ও সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত হোক, নিছক প্রথাগতভাবে লোকদেখানোর জন্য যেন আমরা কোনো ইবাদতই না করি, লোকদেখানোর জন্য রক্তক্ষরণ ও গোশত ভক্ষণ করে কোরবানির মহান আত্মোৎসর্গের শিক্ষাও যেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত না করি, সে দিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা একান্ত কর্তব্য।
উপরে কোরবানির উৎপত্তি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করার পর বর্তমানে মুসলিম সমাজে যেভাবে কোরবানি করা হয়, প্রসঙ্গত সে সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করার প্রয়াস পাবো। বর্তমানে দেখা যায় কোরবানির সময় বিত্তবানদের অনেকেই বিশালাকার পশু ক্রয় এবং বেশিসংখ্যক পশু কোরবানি দেয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। বৃহদাকার পশু কিনে অনেকে পশুকে নানা অলঙ্কারে বিভূষিত করে, তাঁবু খাটিয়ে আলোকসজ্জা করে তা সর্বসাধারণকে প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত স্থানে রেখে দেয়। এর মধ্যে প্রদর্শনেচ্ছাটাই প্রবল, তাকওয়ার পরিচয় মোটেই লক্ষ্যযোগ্য নয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতার দ্বারা কোরবানির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়। কোরবানির গোশত অনেক বিত্তবান লোক সাধারণত সমাজের ক্ষমতাধর ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদেরকে উপঢৌকন হিসেবে দিয়ে দেন। ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের তাগিদে তারা এ ধরনের উপঢৌকন দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া কোরবানির আসল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবেহ করা পশুর গোশত নিজেরা খাওয়ার সাথে সাথে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা, যাতে ঈদের দিন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই গোশত খেয়ে পরিতৃপ্ত হতে পারে। এর দ্বারা সামাজিক সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহানুভূতির প্রকাশ ঘটে এবং ঈদের আনন্দও সবাই সমভাবে উপভোগ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, কোরবানির গোশত ফ্রিজ ভরে রেখে দেয়া হয় এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তা কোরবানিকারী আনন্দের সাথে আহার করে। অথচ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি খাওয়া উচিত নয়। এর দ্বারা গরিব এবং যারা কোরবানি দিতে অক্ষম, তাদের মধ্যে অধিক হারে গোশত বিতরণ করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। অথচ আমরা কোরবানির আসল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং তাৎপর্য উপলব্ধি না করে আমরা যেভাবে কোরবানি দিচ্ছি এবং গোশত বিতরণ করছি, তার মধ্যে তাকওয়া কতটুকু বিদ্যমান তা চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রেই সহজে উপলব্ধি করতে পারেন।
এভাবে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য উপলব্ধি না করে আমরা বর্তমানে ইবাদতকে নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করেছি। এ ধরনের ইবাদতের দ্বারা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে আল্লাহর রহমত, বরকত ও নিয়ামত থেকে আমরা যেমন বঞ্চিত হচ্ছি, তেমনি আমাদের ব্যক্তিক পরিশুদ্ধি, সামষ্টিক বা সামাজিক কল্যাণ এবং ইসলামের সুন্দর ও অনিন্দ্য রূপেরও বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তাই মহান আল্লাহর প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী মুসলিম জাতি আজ ‘উত্তম জাতি’রূপে পরিগণিত নয়। বরং তারা নানাভাবে লাঞ্ছিত, নির্যাতিত, পরনির্ভর ও হীনতাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যে জাতি সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর আনুগত্য করে এবং তার নাজিলকৃত কিতাব অনুসরণ করে এবং তাঁর প্রেরিত রাসূলকে সা: আদর্শ নেতা হিসেবে মেনে নেয়, সে জাতি কখনো লাঞ্ছিত, পদানত, পরনির্ভর ও দুর্দশাগ্রস্ত হতে পারে না। আল্লাহর ইচ্ছায় ও অবারিত রহমতের করুণাধারায় স্নাত হয়ে সে জাতি অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পৃথিবীতে আপন শক্তি ও পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে থাকে এবং অন্যান্য সব জাতির ওপর সে আধিপত্য বিস্তার করে। এটা আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্র“তি এবং অতীতে ইতিহাসের পাতায় এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর বিদ্যমান। ভবিষ্যতেও আল্লাহর প্রতিশ্র“তি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে, যদি বিশ্বের সব মুসলিম ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামের রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং আল্লাহর দ্বীনকে জমিনে সর্বাত্মকভাবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে আন্তরিকভাবে ইসলামের প্রতিটি ইবাদত-বন্দেগি যথাযথরূপে পালন করে। হ