ঈদ আসছে। কোরবানির ঈদ। প্রতিবারের মতোই স্বাভাবিক গতি এবং গাম্ভীর্য নিয়েই আসছে। কিন্তু মানুষের মনে ঈদকে নিয়ে প্রতিবারের মতো স্বাভাবিক আনন্দ নেই। কারণ মশা। বিশেষ করে ডেঙ্গু মশা, এ মশা খুবই বুদ্ধিমান এবং দুর্ধর্ষ। নাম এডিস। সবাই এডিস মশা বলে জানে। এই মশা খুবই বনেদি। এরা নোংরা জায়গায় থাকে না। শিক্ষিত, ভদ্র, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে এমন পরিবারেই এডিসরা বেড়ে ওঠে। এসব পরিবারের লোকেরা সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দৃষ্টিনন্দন যেসব ফুল ফুলদানিতে রাখেন সেসব ফুলদানির স্বচ্ছ পানিতে এডিসরা অবস্থান নেয় এবং বংশ বৃদ্ধি করে। কিংবা বাড়ির আঙ্গিনায় এবং ছাদে ফুলের টবে এবং অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে থাকে। সেখানে বংশবৃদ্ধিও করে। এই এডিসের সাথে ধূর্ত ব্রিটিশদের বেশ মিল রয়েছে। ব্রিটিশরা যখন বাণিজ্যের অজুহাতে অখণ্ড ভারতে এসেছিলেন তখন তাদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। তবে এ কয়েকজনই সুকৌশলে বেশ কিছু অনুগত পা-চাটা লোভী মানুষ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিল। এডিস সাহেবরা যখন বাংলাদেশে আগমন করে তখন ব্রিটিশদের মতোই সংখ্যায় ছিল কম। এরা প্রথমে ঢাকার কিছু কিছু বনেদি এলাকাতেই আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্ত তখন তারা খুব বেশি আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করত না। বংশবৃদ্ধির পরে যখন তারা দলে-বলে শক্তিশালী হয়, তখন মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করে। তাদের আক্রমণের প্রথমপর্যায়ে তেমন একটা জ্বরের খবর কিংবা জ্বরের কারণে রোগীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত না। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এডিস অর্থাৎ ডেঙ্গু মশার আক্রমণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এখন এ জ্বর মহামারী রূপ ধারণ করেছে এবং এবার জ্বরের ধরনও নাকি বদলে গেছে। ডেঙ্গু জ্বরকে নাকি এবার সহজে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। রোগীও মারা যাচ্ছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এটাই হচ্ছে এ সময়ের সব চেয়ে ভয়াবহ বিষয়। এ ভয়াবহ পরিস্থির মধ্যেই আসছে ঈদ। এ জন্য মানুষের মনে আনন্দ নেই। আমি যখন প্রবন্ধ লিখছি তখন থেকে আরো ক’দিন পরে আসবে ঈদ। এই দশ দিন পরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কিরূপ ধারণ করবে তার ওপরেই নির্ভর করবে ঈদ কতটা আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে। তবে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে শিগগিরই ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এবারের ঈদ আনন্দের বাধা হয়েছে বর্ষা এবং বন্যা। কারণ দেশের বর্ষা এবং বন্যা পরিস্থিতিও স্বাভাবিকভাবে ঈদ উদযাপনে বাধা সৃষ্টিকারী ডেঙ্গুর সহায়ক শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। কারণ বর্ষার জমে থাকা স্বচ্ছ পানি মশা বিশেষ করে এডিস মশার প্রজনন ও বংশবিস্তারের উৎকৃষ্ট ক্ষেত্র। বর্ষা-বন্যা-গরু-ছাগল লালন পালন ও সংরক্ষণে প্রধান অন্তরায়। ত্রিমুখী আক্রমণে মানুষ বড়ই অসহায় হয়ে পড়েছে। এই অসহায় পরিস্থিতিতে আনন্দের ঈদ মানুষকে কতটা আনন্দ দিতে পারবেÑ বলা খুবই মুশকিল।
ডেঙ্গু নতুন কোনো শব্দ নয়। এ শব্দ অভিধানগুলোতে স্পষ্টভাবে লিখিত আছে। বলা হয়েছে ডেঙ্গু হচ্ছেÑ সমস্ত শরীরে বেদনাযুক্ত একধরনের জ্বরবিশেষ। অভিধানের এ ব্যাখ্যা ভীতি কিংবা উদ্বেগের সৃষ্টি করে না। কিন্ত সাম্প্রতিক ডেঙ্গুবিষয়ক খবর এবং বাস্তবতা মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি করেছে। মশা এখন এক আতঙ্কের নাম। মানুষ মশাকে মৃত্যুদূত মনে করছে। কারণ এবার ডেঙ্গু জ্বরে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক হারে মানুষ মারা যাচ্ছে। এহেন ভীতিকর বাস্তবতায় ঈদ পালনে আগের মতো আনন্দ কিংবা স্বস্তিবোধ করছেন না মানুষ।
স্মরণকালের কোনো ঈদকে নিয়ে মানুষ এতটা দুশ্চিন্তায় পড়েনি কখনো। কিন্তু এবার ইচ্ছা করলেও দুশ্চিন্তাকে এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীতে পূর্ণ। কোথাও জায়গা নেই। বহু রোগী স্থানাভাবে ভর্তি হতে পারছেন না। ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। প্রয়োজনীয় ওষুধেরও অভাব দেখা দিয়েছে। টাকা দিয়েও ওষুধ মিলছে না কোথাও। সরকারের মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই ডেঙ্গু রিপোর্ট দিচ্ছে বলে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। মেয়ররা সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। মশা মারা যাচ্ছে না। কারণ মশার ওষুধের কার্যকারিতা নেই। মশার ওষুধ ছিটানো একজন ডেঙ্গু রোগীকে বলতে শুনলামÑ তিনি যে ওষুধ ছিটান তাতে এক ফোঁটাও ওষুধ থাকে না। কি ভয়াবহ খবর সর্বত্র। এই ভয়াবহ পরিবেশে মানুষ কিভাবে ঈদ পালন করবে? ছোট্ট যে ছেলেটি নতুন পোশাক পরে বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যাবে সেই ছেলিটি যদি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত থাকে, হাসপাতালে কাতরাতে থাকে কিংবা পিতাই আক্রান্ত থাকে তাহলে সেই পরিবারে ঈদ কিভাবে পালিত হবে! বর্তমান সময়ে এমন পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে ডেঙ্গু ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। এখন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু ভীতি। সুতরাং গ্রামের মানুষও যে আনন্দের সাথে ঈদ পালন করতে পারবে এ কথা বলা যাচ্ছে না।
এডিস কামড়ানো যারা ঢাকা থেকে গ্রামে যাচ্ছেন তারাও যদি আক্রান্ত হন তাহলে মহাবিপদের কারণ হবে। গ্রামে চিকিৎসা নেই সুতরাং ঢাকায় ফিরতে তারা মরিয়া হয়ে উঠবেন। কিন্তু তখন বাস পাবেন না। থাকাও যাবে না, আবার ঢাকায় ফেরাও যাবে না। এমন পরিস্থিতি ঈদের জন্যই শুধু নয়, পরিবারের সদস্যদের জন্যও ঈদের আনন্দ মাটি করার কারণ হবে। এমন পরিস্থিতির উদ্ভব না হলেই ভালো। কিন্তু আশঙ্কা তো থেকেই যাচ্ছে। আর এই আশঙ্কা মানুষের মনে কাজ করায় মন অশান্ত অনেকেরই। এই আশান্ত মন নিয়ে কারো পক্ষেই এবার ঈদের আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু সবাই চাইবেন যেন ঈদকে সুন্দরভাবে পালন করা যায়। গরু-ছাগল কোরবানিও দেবেন যার যার সাধ্যমতো। মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিÑ যেন ঈদের আনন্দ সবাই সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারেন। যেন আল্লাহ ডেঙ্গুভীতি ও দুশ্চিন্তামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে সবাইকে কার্যকর ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করেন।
যখন এ প্রবন্ধ লিখছি তখন মাইকের প্রচণ্ড শব্দে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। আমার বাড়ির পাশেই এক স্কুলে ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান চলছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ অনুষ্ঠানের প্রচারণার কথাগুলো শুনে শুনে মনে হচ্ছিল এটা ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা নয়, ডেঙ্গু উপলক্ষে ক্ষমতাসীনদের আত্মপ্রচারণা। ক্ষমতাসীন দলের কোন কোন নেতানেত্রী কোন কোন জায়গা থেকে এসেছেন, কি তার পদ-পদবি, অঙ্গসংগঠনের কে কোথাকার, কোন পদে আছেন ইত্যাকার বিষয়ের ফিরিস্তি এবং প্রত্যেককে দিয়ে একই কথা বলানো আত্মপ্রচারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
আমি অনুষ্ঠানের শুরুতে ভেবেছিলাম অনুষ্ঠানে মশাবিষয়ে মূল কথাগুলো বলে অনুষ্ঠানে সবাই হয়তো এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবেশের বাস্তব অবস্থা পরিদর্শন করবেন এবং কোনো অসঙ্গতি দেখলে সে বিষয়ে বাড়ির লোকদের সচেতন করবেন। কিন্তু না, তাহলো না। আত্মপ্রচারণার মধ্যদিয়েই দীর্ঘ অনুষ্ঠান শেষ হলো। অন্যদিকে, দেশবাসীসহ বিশ্ববাসী দেখছে মেয়র এবং মন্ত্রী মহোদয়দের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সুন্দর সুন্দর পোশাকে সজ্জিত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে পরিষ্কার রাস্তা ঝাড়– দেয়ার অভিনয়ের দৃশ্য! দেশের মানুষ ডেঙ্গু মশা এবং মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। অথচ এ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে পুঁজি করে এভাবেই জনগণের সাথে তামাশা করা হচ্ছে! শুধু তাই নয়, ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষকে বলা হচ্ছে অন্যান্য কোনো দেশে কত মানুষ মারা গেছে। তাদের তুলনায় আমাদের মৃত্যুহার নগণ্য! সুতরাং মশা এবং মৃত্যু নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছেনÑ সুতরাং আনন্দ করুন, বাহবা দিন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে, কারণ আপনারা সবাই মরেননি এখনো! প্রিয়জন হারিয়ে, স্বজন হারিয়ে, সন্তান হারিয়ে মানুষ কাঁদছে হাসপাতালে, আর তারা তামাশা করছেন।
দেশের এ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষই এবার গ্রামে না যাওয়ার বিষয় ভাবতে শুরু করেছে। কারণ গ্রামে গিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বিপদ বাড়বে। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ফিরতে হবে। তার চেয়ে না যাওয়াই শ্রেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেনÑ ‘ভয় পাবার কিছু নেই, একটা মহল আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, যাতে ঈদে মানুষ গ্রামের বাড়ি না যায়। কেন যাবেন না? অবশ্যই যাবেন’ (নয়া দিগন্ত, ৪/৮/১৯)। ওবায়দুল কাদেরের জোরালো এ বক্তব্য মানুষকে আশ্বস্ত করার কথা, কিন্তু প্রচার মাধ্যমগুলোর সচিত্র প্রতিবেদন ও প্রচারণা মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনাÑ আল্লাহ দেশকে, দেশের মানুষকে ডেঙ্গুমুক্ত করুন। ওবায়দুল কাদেরের অভয় বাণীকে সত্যে পরিণত করুন। আমিন। হ