যে সমাজে আমরা বসত করি একে অপরিচিত মনে হয় এখন। মনে হয় এটি আমাদের সমাজ নয়। মনে হয় অন্য কোনো সমাজে এসে পড়েছি আমরা। কোত্থেকে এসেছি সে কথা তো জানি না। কিন্তু জানি আমরা এসে পড়েছি এখানে। এই নৈরাজ্যের এক ভূমিতে। যেখানে কারো প্রতি কারো কোনো দায়ভার নেই। কারো প্রতি কারো কর্তব্য নেই। কেউ কারো সুখ কামনা করে না। করছে না। বরং অসুখ কামনায় যেন ব্যস্ত।
যে যার মতো স্বার্থবশে চলছে পথ। যে যেমন পারে তেমন করেই করছে কাজ। কাজের ক্ষেত্রে ভালো খারাপের ব্যবধান নেই। থাকছে না। ভাবছে না এই নিয়ে। কারো ভাবনায় এটি জাগছে না। সাদা কালোর ব্যবধানও নেই এখানে। কোনোটি বৈধ। কোনোটি অবৈধ। কোনোটি করা যায়। কোনোটি যায় নাÑ এমন বিবেচনাও নেই আজ। যেমন করেই হোক অধিকার চায় মানুষ। অধিকার চাওয়া খারাপ কিছু নয়। যার অধিকার আছে যে তো চাইতেই পারে। চাইবে। কিন্তু অধিকারের নামে অনধিকার চর্চার মহাযজ্ঞ চলছে। এই যজ্ঞের শেষ কোথায়? কোথায় পৌঁছাবে এর গন্তব্য। কিভাবে পৌঁছাবে এ কথা কেউ জানে না। জানছে না। জানার চেষ্টাও কী আছে! না নেই। কোনো চেষ্টা নেই। বরং সবকিছু শক্তির হাতে বন্দী হয়ে উঠেছে। সবকিছুই শক্তির কাছে নুয়ে আছে মাথা। যার শক্তির জোর আছে তাকেই নেতা মানছে সবাই। যার জোর নেই সে আর বিবেচ্য বিষয় নয়। সে কোথাও থাকছে না। কোনো ঘটনায় কোনো আয়োজনে কোনো আসরে তার মুখ নেই। তার নাম নেই। তার উপস্থিতি নেই। পেশিশক্তি ছাড়া এ সমাজ যেন আর কিছু পাত্তা দিতে শেখেনি। আর কিছুকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখেনি। এ পরিস্থিতির শেষ কোথায়? কিভাবে শেষ হবে। কোথায় গিয়ে শেষ হবে! কেউ কি জানে এর শেষ গন্তব্য! সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচার ব্যভিচার এবং বিবেকহীনতা বিস্তৃত। বড় ছোটর ব্যবধান নেই। আপন পরের পার্থক্য নেই। শিক্ষিত অশিক্ষিতের তফাৎ নেই। গরু গাধা প্রায় এক সমান। ছাগল গরু যেন একাকার। এভাবে নিয়মহীন নিয়মের যাঁতাকলে বন্দী আমাদের সমাজ। আমাদের পারিপার্শ্বিক। আমরা যেন বুঝেও বুঝি না। শুনেও শুনি না। দেখেও দেখি না। এই না বোঝা না শোনা এবং না দেখার কীর্তি যদি হরহামেশা চলতেই থাকে তবে তো সমাজের কিছুই থাকবে না। না পরিবার থাকবে। না পারিবারিক বন্ধন থাকবে। না কোনো সুস্থ নিয়ম থাকবে!
একটি সমাজে যদি নিয়ম না থাকে। যদি কোনো সুস্থতা এবং শৃঙ্খলা না থাকে সমাজটি চলে কী করে? চলবে কেমন করে? কেমন করে এই সমাজ তার বুকে রাখা মানুষগুলোকে মানুষ করবে? তবে কি সমাজ এভাবে নৈরাজ্যের শিকার হতেই থাকবে! চলতেই থাকবে জোর যার মুল্লুক তার নীতি! যদি এমনি চলে তো এখানে সত্যিকার মানুষ বাস করবে কী করে। কী করে বেড়ে উঠবে মানুষের সন্তান। যারা আগামীর নাগরিক হয়ে বেড়ে উঠছেন, উঠবেন তাদের পরিণতি কী হবে?
অসহিষ্ণু এ সমাজে মানুষ কেউ কারো বিষয়ে ধৈর্য ধরতে রাজি নয়। কেউ কারো দিকে ফিরতে রাজি নয়। কেউ কারো কল্যাণ কামনা করতে সম্মত নয়। প্রত্যেকে কেবল তার স্বার্থ দেখে। তার স্বার্থটাই সবচেয়ে বড়। নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখার এই প্রবণতা প্রতিটি মানুষকে স্বার্থপর করে তুলছে। প্রতিটি মানুষকে করে তুলছে লোভী। লোভের শেষ কোথায়? কেউ কি জানে? লোভের আসলে কোনো শেষ নেই। শেষ থাকে না। লোভ মানেই ভয়ঙ্কর বিষয়। লোভী মানুষ নিজেরটা তো অধিকার করেই, অন্যেরটাও দখল করে অনায়াসে। সেটি হোক সম্পদ। হোক ক্ষমতা। হোক জমি জায়গা। আমাদের নদীগুলোর কী দুর্দশা। কী নাজেহাল পরিণতি! নদী দখল করার লোভ ধ্বংস করে দিচ্ছে সব নদী। নদী খাওয়ার দুরন্ত প্রতিযোগিতা এখানে। লোভ থেকেই এসব চিন্তা মানুষের মাথায় ঢোকে। কাজ করে বিস্ময়করভাবে। মানুষ লোভী হলে হায়নাকে হার মানায়। হাঙ্গরও তার কাছে ছোট হয়ে ওঠে। পশুর চেয়ে হিংস্র হয়ে যায়। অন্যের অধিকার লুটেপুটে খাওয়ার ইচ্ছা প্রবল হয়। অন্যকে অস্বীকার করার অথবা অন্যকে খাটো করার প্রবণতাও এখান থেকে তৈরি হয়।
সমাজের যারা হর্তাকর্তা যারা সমাজের নেতৃত্বে আসীন এরা প্রায় সবাই লোভী। সবাই লুট করার মানসিকতায় সোচ্চার। যেনতেন প্রকারে সম্পদ আহরণ করার মানসিকতা ভয়ঙ্কর। এমন সব ভয়ঙ্কর মানুষেরাই আজ সমাজের পরিচালক। সমাজের রক্ষক। কী হবে এসব রক্ষক দিয়ে? যারা নিজেদের স্বার্থই কেবল রক্ষা করে। নিজেদের ছাড়া আর কারো স্বার্থের প্রতি সামান্যতম দায়িত্ববোধও নেই, তাদের দিয়ে সমাজের কী উপকার হবে? কিভাবে হবে? কেনই বা হবে? হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সুযোগও নেই। যে কারণে আমাদের সমাজ আজ প্রায় রসাতলে। এখানে মানবিক কোনো আচরণ নেই। মানুষের পক্ষে কোনো পরিকল্পনা নেই। জীবনের পক্ষে কোনো উচ্চারণ নেই। সুযোগ ও শক্তি যার সবকিছুই তার হয়ে উঠবে। এই তো এখন সমাজের রীতি। এখন কোনো নৈতিক দিক অবশিষ্ট নেই। না ব্যক্তিতে। না পরিবারে। না সমাজে। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হতে হতে বন্ধনই থাকছে না আর। পিতা-পুত্রে দূরত্ব। মায়ে ঝিয়ে পার্থক্য। সন্তান-অভিভাবকে অমিল এই তো আমাদের সময়। আমাদের সমাজ। এই সমাজেই বসবাস করি আমরা। করছি তো বটে। করব আরো। করতেই হবে। কারণ দেশ ছেড়ে তো আর যাওয়া যায় না। কোথায় যাবো? কিভাবে যাবো? এখানেই যদি থাকতে হয় তবে আমাদের এই দুরবস্থার প্রতি অবশ্যই নজর দিতে হবে। নইলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ থেকে ১৫-২০ বছর পরের জেনারেশনের কথা ভাবুন একবার। কী মনে হয়? ভয় ধরে না মনে? নিশ্চয়ই ধরে। এরা যখন সমাজের নেতৃত্বে আসবে। যখন সমাজ চালাবে, কী দশা হবে তখন। এই প্রজন্ম তো কোনোভাবে কাটিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্ম তো আরো খারাপ অবস্থার ভেতর দিয়ে আসবে। শাসন করবে। চালাবে সমাজ। সেই সমাজের অবস্থা কী দাঁড়াবে। ভাবলে খুব খারাপ হয়ে যায় মন। খুব।
যাদের এসব দেখার কথা, তারা দেখে না। যাদের ভাবার, তারা ভাবে না। যাদের এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার, তারা রাখে না। রাখবে কী করে? যারা রাখবে তারা তো কোনোভাবেই মানুষ থাকার চেষ্টা করছে না। মানুষ থাকছে না। তারা কেউ লুটেরা। কেউ ক্যাসিনোর পরিচালক। কেউ অবৈধ সম্পদের মালিক। কেউ আবার সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক। যিনি সন্ত্রাস লালন করার আয়োজন করেন তিনি সন্ত্রাসী ধরবেন কেন। পালবেন বরং। এবং পালেন। যে কারণে সমাজে নীতিনৈতিকতা তলানিতে।
কী যে অঘটন ঘটছে সর্বত্র ভাবা যায় না। নৃশংসতা সবখানে বিস্তারিত। বর্বরতা এখন সহজেই ঘটছে। হত্যা, খুন আর গুমের ঘটনা তো নিত্যতায় দাঁড়িয়েছে। যেকোনো উসিলায় যেকোনো ব্যক্তিকে খুন করে দেয়া এখন কোনো ব্যাপারই নয়। রাজনৈতিক খুন তো আরো সহজ। কেবল ইচ্ছের ব্যাপার। ইচ্ছে করলেই দু’চারজন একসাথে মেতে উঠে হাসতে হাসতে খুন করা যায়। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। রাতভর নির্যাতন করে মানুষ খুনের ঘটনা এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। যারা খুনি তাদের বয়সও খুব একটা বেশি নয়। তবু তারা ভয়ঙ্কর বর্বর খুনি হলো কী করে বুঝি না। মানুষ খুন চলে সাথে ডিনার পর্ব, চা পর্ব এমনকি খেলা দেখার মহরতও। কী আশ্চর্য কাহিনী। কল্পনাকেও হার মানায় যেন। সিনেমায় ভিলেন যারা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কী করে সম্ভব? কিভাবে সম্ভব? বিবেক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। কোনোভাবে হৃদয় ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না। এদের বুকের ভেতর এমন মন কিভাবে প্রস্তুত হলো! কিভাবে তৈরি হলো। এমন মন নিয়ে এরা সমাজে পরিবারে কিভাবে বসত করছে। কে বলবে এ কথা। এর জবাবই বা কে দেবে! আছেন কেউ জবাব দেয়ার? হে সমাজপতি, হে রাষ্ট্র প্রধান, হে রাষ্ট্রপতি! পারেন কি জবাব দিতে এর? কেন আমাদের সমাজে তরুণ প্রজন্ম এতটা নৃশংসতা লালন করছে। কেন? কেন? কার অপরাধ এখানে বেশি! কার অপরাধের শাপে আমাদের তারুণ্য এতটা বিভ্রান্তির বেড়াজালে জড়িয়ে পড়েছে। এদের উদ্ধার করার কেউ কি নেই! কেউ কি এদের সরল পথ দেখাতে পারে না? যাদের ক্ষমতা আছে দেখানোর তারা কেন দেখাচ্ছে না। কেন তারা এদের প্রতি সুবিচার না করে অবিচার চাপিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করা না গেলে এদেশ কি বাঁচবে? এ জাতি কি টিকে থাকবে? এই ইতিহাস কি মূল্য পাবে? নিশ্চয় পাবে না। এ জাতিও টিকে থাকতে পারবে না। জাতি টিকে থাকতে না পারলে দেশও টেকে না, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব থাকে না।
স্বাধীনতা না থাকলে অন্য জাতির গোলাম হয়ে যেতে হয়। গোলাম তো কোনো ভালো কাজের স্রষ্টা হতে পারে না। হয়তো অনেক সম্পদের মালিক হতে পারে কেউ কেউ। সম্পদ কি অক্ষত রাখা যায় যদি সম্মান না থাকে। যদি ইজ্জত না থাকে? সুতরাং নিজেদের প্রয়োজনে আগামী প্রজন্মকে মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
এমন একজন দরকার আমাদের যে এ জাতিটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবে। যে ভাববে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। আগামী প্রজন্ম নিয়ে এবং আগামী দিন নিয়ে। আমাদের স্বপ্নের বাহক হবেন যিনি। যিনি গোটা জাতির বুকে পুরে দেবেন স্বপ্নের লেলিহান। তবেই হয়তো একদিন নতুন করে জাগবে আমাদের তরুণ তরুণীরা। সেদিন সমাজ হবে মানুষের আনন্দের। নিরাপদ থাকবে সব মুখ এবং স্বপ্ন হয়ে উঠবে আরো বড়। আরো দীর্ঘতরো। হ
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক
