আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, বরগুনার রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা, ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারাসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ অন্ধকার গহ্বরের দিকে এগিয়ে গেছে। দেশকে যে শক্তি অন্ধকার গহ্বরে টেনে নিয়ে গেছে, সেটা বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যারা আবরার ফাহাদকে হত্যা করেছিল, তারা চেয়েছিল ফেনী নদীর পানি এবং সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অনুমতি ভারতকে বিনা শর্তে যে দিয়ে দেয়া হয়েছে সে কথা যেন দেশের সর্বত্র আলোচিত হতে না পারে। সে জন্য ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাস আবরার ফাহাদের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। আবরার হত্যাকাণ্ড গোটা বাংলাদেশকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এ হত্যাকাণ্ড তুলে এনেছে অতীতের সব অন্যায়-অত্যাচারের দীর্ঘ ফর্দ। সেই ফর্দে স্থান পাওয়া সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বত্র সঙ্ঘবদ্ধ ক্ষোভ প্রদর্শিত হচ্ছে, মন্তব্য ও আত্মোপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং মানুষ অবগত হয়েছে ‘দেশ আজ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। মানুষ এও বুঝতে পারছে যে, এ দেশে এখন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনো মানুষই নিরাপদ নয়। এমনকি ক্ষমতাসীনদের জন্যও দেশ নিরাপদ নয়। ক্ষমতাসীনদের জন্যও এই দেশ অনিরাপদ এই কারণে যে, তাদের মধ্যে কে কার থেকে বেশি শক্তিশালী, কে কার থেকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করে দলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারছে, তার একটা সহিংস প্রতিযোগিতা দলের সদস্যদের ভেতরেই দেখা গেছে। সে জন্য ক্যাসিনোর মহানায়ক ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের স্ত্রী বলেছে, সম্রাট ক্যাসিনোর টাকা দিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের যুবলীগকে পরিচালনা করত। তিনি এ কথাও বলেছেন, আজকাল টাকা ছাড়া ছেলেরা মিছিল-মিটিং করতে চায় না। সে জন্য টাকা রোজগারের পথটাকে সবাই যে যার মতো করে ব্যবহার করছে। যে টাকা ছিটাবে, তার মিছিল-মিটিংয়ে লোক বেশি হবে; সে বড় নেতা হবে। নেতা বড় হলে আয়-রোজগারও বেশি হবে। এই সরল হিসাবটা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিজেরা নিজেদের মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট করে খোনাখুনিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে, নিজেদের বাইরেও কোনো প্রতিপক্ষকে তারা সামনে দাঁড়াতে দিতে চাইছে না। চাইছে না এ জন্য যে, সরকারি-বেসরকারি সব সুযোগ-সুবিধা তারা একাই ভোগ করতে চায়। এভাবে টাকা রোজগারের একটা কালো সংস্কৃতি এ দেশে চালু থেকেছে। সেই সংস্কৃতির নাম ক্যাসিনো, ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার লুট, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, খুন, হত্যা, ত্রাস, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ইত্যাদি।
অবাক হতে হয়, ছাত্র সংগঠনের নেতাদের চাঁদাবাজি করা টাকার পরিমাণ দেখে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দকৃত মাত্র একটা কাজ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছে ৮৬ কোটি টাকা। এ ধরনের চাঁদাকে আজকাল ‘শেয়ারমানি’ বলা হচ্ছে। যে সময়ে ছাত্রদের পকেটে খাতা-কলম ও এক কাপ চা-এর মূল্য থেকে বেশি টাকা থাকার কথা নয়, সে সময় কোটি কোটি টাকা নাড়াচাড়া করে আসছে ছাত্র নেতারা। কিভাবে আসে এত টাকা? বাস্তবতা হচ্ছে ছাত্র রাজনীতিও টাকা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এই কারখানা টিকে রাখতে হলে একচ্ছত্র আধিপত্য দরকার। সেই আধিপত্য বিস্তারের কৌশল হলো র্যা গিং, টর্চারসেল, পুলিশি হয়রানি ও মামলা-মোকদ্দমা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আবাসিক শিক্ষক থাকেন, সিকিউরিটি গার্ড থাকেন, অফিস কর্মচারী থাকেন, প্রভোস্ট থাকেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ থাকে, প্রক্টর থাকেন, উপ-উপাচার্য থাকেনÑ সর্বোপরি উপাচার্য। তারপরও র্যা গিংয়ের নামে হলে হলে সাধারণ ছাত্রদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়, টর্চার সেলে ছাত্রদের ধরে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। এই নৃশংসতা চালায় রাজনীতির সাথে জড়িত ছাত্ররা। সবার চোখের সামনেই ঘটে এসব ঘটনা, সবাই অবগত হয়ে থাকেন, কিন্তু কেউ প্রতিরোধ করতে আসেন না।
কারণ ছাত্রদের এই আধিপত্যের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ-পদবি নিয়ে টিকে থাকেন প্রক্টর, টিকে থাকেন প্রোভিসি ও ভিসি, টিকে থাকে সরকার। এ সবই একসূত্রে গাথা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া ছাত্রদের অভিভাবকরাও এই সত্য অবগত রয়েছেন, কিন্তু কেউই এই আধিপত্যকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসেন না। না আসার কারণ হলোÑ যিনি প্রতিরোধ করতে গেছেন, তাকেই রাতের অন্ধকারে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হতে হয়েছে। প্রতিরোধ-প্রতিবাদের মিছিল থেকে দিনের আলোতে কাউকে গ্রেফতার করা হলে সাথে সাথে প্রতিরোধের ঝড় আরো তীব্র হতে পারে, এ কথা মাথায় রেখে রাতের অন্ধকারে প্রতিবাদীদের কাউকে কাউকে ঘুমের বিছানা থেকে টেনে তুলে গ্রেফতার করে জেলখানায় রাখা হয়েছে। বিনা অপরাধে জেলের ঘানি টানা, এটা অবলোকন করে অন্যরা প্রতিবাদের সাহস হারিয়ে ফেলেছে। গ্রেফতারের এই প্রক্রিয়া অন্ধকারের সংস্কৃতি। রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এভাবেই আধিপত্য ধরে রাখা হয়েছে।
ছাত্ররাজনীতি থাকা উচিত কি-না তা নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য থাকলেও ছাত্র রাজনীতি বলতে আলাদা কিছু নেই বলেই মনে হতে পারে। রাজনীতি একটাই। এই একটা রাজনীতিই বুদ্ধিজীবীরা চর্চা করেন, এমপি-মন্ত্রীরা লালন পালন করেন এবং সেই একই রাজনীতি শিক্ষকরা করেন, ছাত্ররা করেন, শ্রমিকরা করেন, তাঁতি-কামার-কুমার, জেলে, কৃষক সবাই করেন। কারো কোনো আলাদা রাজনীতি নেই। ছাত্রদেরও কোনো আলাদা রাজনীতি নেই। একটাই রাজনীতি ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে করা হয়। সেই রাজনীতির দর্শন হলো ত্রাস, হত্যা, খুন, জুলুম, নির্যাতনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার মাধ্যমে দাম্ভিকতার সাথে পথ চলা। বাংলাদেশে রাজনীতি করা ব্যক্তিদের আরো একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে, তা হলোÑ তারা বাংলাদেশের আইন-আদালত, সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকতে চান না, কিন্তু তারা প্রতিপক্ষকে আইন-আদালত ও সংবিধানকে মেনে চলতে বাধ্য করাতে চান। এই সংস্কৃতি পাতি নেতা থেকে শুরু করে সমাজের ক্ষমতাশালী প্রত্যেককে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।
একজন মন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো বহু হত্যাকাণ্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত ঘটে থাকে। মন্ত্রীর এ কথার সরল অর্থ হচ্ছেÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি সভ্য উন্নত রাষ্ট্রে যদি এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে কী এমন দোষের হতে পারে? অর্থাৎ মন্ত্রী আবরার হত্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে মোটেই রাজি নন। মন্ত্রীদের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তায় নাগরিকরা নিজেদের হতভাগ্য না ভেবে পারেন না। হত্যা, খুন অমার্জনীয় অপরাধ সেটা এ দেশের মন্ত্রীরা উপলব্ধি করতে না পারলেও সাধারণ মানুষ ঠিকই অনুধাবন করতে পারেন; কোনো হত্যাকাণ্ডই সাধারণ বিষয় নয়, আবরার হত্যা আরো নয়। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। এর একটি হলো, মাত্র কিছুদিন আগেই ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সদস্য প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশবিরোধী অভিযোগ তুলেছিলেন। সে সময় সরকারের উচ্চ মহল পর্যন্ত প্রিয়া সাহার সেই কর্মকাণ্ডে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু পরে কোনো এক অদৃশ্য অঙ্গুলির নির্দেশে প্রিয়া সাহাকে গ্রেফতার হতে হলো না। অথচ রাষ্ট্রের স্বার্থে কথা বলেছিল আবরার ফাহাদ, কিন্তু নির্মমভাবে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে অনুমান ভুল হয় না যে, দেশে দেশদ্রোহীদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে আর দেশপ্রেমিকদের কপালে জুটছে তিরস্কার ও অপবাদ। এভাবে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের অজুহাতে এখন বাংলাদেশে একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে। আর সে কারণেই গঠিত হতে পেরেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। এ দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানই শুধু নাগরিক নয়, মুসলমানও এ দেশের নাগরিক। তারাও অসাম্প্রদায়িকতা লালন করেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে গেলে এই পরিষদের নামের আগে মুসলিম শব্দকে যুক্ত করে ‘মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ’ করা জরুরি হতে পারত। কিন্তু সেটা হলো না। এখন দেখা যাচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচেতনার আড়ালে বিশুদ্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চেতনা বিস্তার লাভ করছে এবং সেই চেতনার প্রতি সরকারকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করতেও দেখা যাচ্ছে। এরকমভাবেই একটি চেতনা সংগঠিত হয়েছিল বসনিয়ার সার্বদের মধ্যে। সেখানে রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠ সার্বরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলতে পেরেছে। বাংলাদেশেও অসাম্প্রদায়িকতার নেপথ্যে সেই রকম কোনো এক শক্তির পুনরুত্থান হচ্ছে কি না কে জানে। হ