বিশ্বাস ও সৎকর্ম শব্দ দু’টি সম্পর্কে সবাই অবহিত। ধর্মীয় বিষয়ে যারা পণ্ডিত তাদের মুখে অহরহই শোনা যায় এ দু’টি শব্দের কথা। বিশ্বাস হচ্ছে কোনো কিছু সত্য বলে বিবেচনা করা। আর সৎকর্ম হচ্ছে ভালো বা মঙ্গলজনক কাজ। এ দু’টি শব্দ ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শব্দ দু’টির রয়েছে গভীর সম্পর্ক। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর বিশ্বাস, ধর্ম বিশ্বাস এবং পরকালে বিশ্বাস মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য বাধ্যতামূলক। একজন প্রকৃত মুসলমান ধর্মীয় এ বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হন না। তবে অন্যান্য ধর্মের মানুষ কখনো কখনো তাদের ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করে থাকেন। পরিবর্তন করেন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ সমস্যার কারণে। আর এ জন্যই এক ধর্মের মানুষকে অন্য ধর্মে দীক্ষা নিতে দেখা যায়।
পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষ নানা ধরনের ধর্মে বিশ্বাসী। সেই আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত মানুষ যতগুলো ধর্ম পালন করে আসছেনম তার সংখ্যা ৪,২০০। তবে অধিকসংখ্যক মানুষ ইসলাম, হিন্দু এবং খ্রিষ্টান ধর্ম পালন করেন। সংখ্যার দিক থেকে ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের সংখ্যা ২৪%, হিন্দুধর্ম পালনকারীদের সংখ্যা ১৫% এবং খ্রিষ্টান ধর্ম পালনকারীদের সংখ্যা ৩৩%। বাকি ২৮% মানুষ অন্যান্য ধর্ম পালন করে থাকেন। হিন্দুধর্ম থেকে অনেকেই ইসলাম এবং খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন ধর্মপ্রচারকদের কারণে। এখনো ধর্ম ত্যাগের কথা জানা যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দলিত যারা তারা সমাজে অবহেলিত, নির্যাতিত এমন নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলাম এবং খ্রিষ্টান ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে দেখা যায়। তবে অনেকেই ইসলামের সাম্যের প্রতি এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি বিশ্বাস এনে ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা পাদ্রিরা দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত দরিদ্র মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের পাশে দাঁড়ান এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দানের মাধ্যমে তাদের খ্রিষ্টান ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু যারা অন্য ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন তাদের অনেকেই মন থেকে তা করেন না। করেন প্রলোভনের কারণে ও অভুক্ত থাকার কষ্ট লাঘব করার জন্য। করেন দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে পরিবারের সদস্যদের রক্ষার প্রয়োজনে। আরেক ধরনের মানুষ আছেন যারা অন্য ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম ধর্মের সাম্য, উদারতা ও শান্তির বিষয় নিয়ে ভাবেন। নিরাকার আল্লাহর প্রতি আস্থা স্থাপন করেন। কিন্তু প্রকাশ্যে তাদের ভাবনার বিষয়গুলো জানাতে পারেন না। আবার অনেকে ইসলামের আদর্শের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে পারেন না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বলেছেনÑ ‘বিশ্বাসীগণ, ইহুদিগণ, সাবেয়ী ও খ্রিষ্টানগণের মধ্যে কেহ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করিলে এবং সৎকার্য করিলে, তাহার কোনো ভয় নাই এবং সে দুঃখিতও হইবে না’ (সূরা মায়েদা)। অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সব ধর্মের মানুষদের জন্য ঘোষণা দিয়েছেন, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করবেন এবং সৎকর্ম করবেন তাদের কোনো ভয় নেই। প্রকৃত অর্থে আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস ও সৎকর্ম করা ইসলামের মৌলিক নীতি। এই নীতিতে বিশ্বাসীরা কখনোই অসৎ কর্ম করতে পারেন না। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্যায় ও অসৎকর্মের জোয়ার বইছে। মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টি দিলেও বিষয়টি স্পষ্ট হবে। হেন অন্যায় ও অপকর্ম নেই যা বাংলাদেশে ঘটছে না। অসৎকর্মের প্রতিযোগিতা চলছে বাংলাদেশে। কে কার চেয়ে অধিক অসৎ কর্ম করতে পারে তারই যেন লাগামহীন প্রতিযোগিতা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ের দুই ছাত্রলীগ নেতার অসৎ কর্ম এবং ক্যাসিনোকেন্দ্রিক জুয়ার আসরের অসৎ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পিলে চমকানো খবর বের হয়ে আসছে। যার সঙ্গে যুক্ত সব স্তরের ক্ষমতাবানরা। খাদ্যে ভেজাল, জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল, চিকিৎসায় ভেজাল, চিকিৎসকে ভেজাল, অন্যের অর্থসম্পদ লুণ্ঠন, ব্যাংক লুট, শিক্ষায় ভেজাল, গুম, খুন, হত্যা, বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার, ছাত্র রাজনৈতির নামে সর্বত্র অরাজকতাÑ সব কিছু মিলে এক ভয়াবহ অবস্থা দেশে। জাতির মেরুদণ্ড যে শিক্ষা সেই শিক্ষা ধ্বংসের প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষার মান বিনষ্টের কর্মকাণ্ড। লুটপাট, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় অস্থির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পাবলিক ভার্সিটির ১৭ ভিসির অনিয়ম তদন্তে ইউজিসি (নয়া দিগন্ত, ২০/৯ ও ২৫/৯/১৯)। ইউজিসির তদন্ত কমিটির সুপারিশে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগ। সব মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নেই শান্তির সুবাতাস। শিক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল দশার কারণে নানাজন নানাভাবে সমালোচনা করছেন। খোদ শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সম্প্রতি ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পড়িয়ে যারা তাদের শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করেন তারা অপরাধ করছেন। কোচিং না করলে ওই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় যেকোনো দেশের জন্য সম্মানজনক ও গৌরবজনক নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই পড়ার সুযোগ পান না। অত্যন্ত মেধাবী যারা তারাই কঠোর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে স্থান লাভ করেন। সুতরাং এ সব মেধাবী শিক্ষার্থীকে যারা পড়ান তারাও যে দেশের সর্বোচ্চ মেধার অধিকারীই হবেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ জাতির গৌরব এই বিশ্ববিদ্যলয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক এবং ভিসিদের নিয়ে নানা কথা উঠছে সর্বত্র। এর প্রধান কারণ রাজনীতি। জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে শিক্ষকদের জড়িয়ে পড়ার কারণেই এরূপ কথা উঠছে এবং সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। রাজনীতির কারণে মেধাহীনরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গবেষণা ও পড়ানোর পরিবর্তে শিক্ষকদের একটা বড় অংশ রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন বলে অনেকেই অভিযোগ করছেন। অভিযোগে বলা হচ্ছে, শিক্ষকরা রাজনীতি করেন ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিন, সিন্ডিকেট, সিনিটে সদস্য হওয়ার জন্য। রাজনীতি করেন প্রভোস্ট, হাউজ টিউটর হওয়ার জন্য। ইউজিসি, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান চেয়ারটি পাওয়ার আকাক্সক্ষার রাজনীতি করেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক নীল দলের সদস্য অধ্যাপক মো: সামশুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে বলেছেন, শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ কমে গেছে। তারা তাদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে যতটা সজাগ কর্তব্য সম্পর্কে ততটা সচেতন নন। গবেষণাকর্ম তো ছেড়েই দিয়েছেন। কেউ কেউ রীতিমতো ক্লাসও নেন না... পাণ্ডিত্যে যারা প্রখর নন তারাই শিক্ষক সমিতিতে ভিড় জমান এবং কর্মকর্তা সেজে নিজের উন্নতির ব্যবস্থা করেন এবং দলাদলিটা জিইয়ে রাখেন (সংবাদ-এ প্রকাশিত প্রবন্ধের অংশ, ০৭/০৩/১৯৮৮)। শিক্ষকদের রাজনীতিবিষয়ক এ ধরনের অভিযোগ ছাড়া দুর্নীতি সম্পর্কে তৎকালে কোনো অভিযোগ শোনা যেত না; কিন্তু বর্তমানে দুর্নীতির খবর আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের প্রস্তাবিত খরচের তালিকা দেখে অনুমান করা যায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দুর্নীতি কতটা বিস্তার লাভ করেছে। প্রস্তাবে একটি বালিশের মূল্য ধরা হয়েছে ২৭,৭২০ টাকা! আর এই বালিশের কভারের মূল্য ধরা হয়েছে ২৮,০০০ টাকা! ডিসপোজেবল সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্ক প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৮০,০০০ টাকা (নয়া দিগন্ত, ২ অক্টোবর ২০১৯)। এ সব লুটপাটের চিত্রের কথা জানার কারণেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমার চলতি বাজেটে ১৭৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। দুর্নীতিবাজ উইপোকারা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকালে অর্থ লুটে নিচ্ছে। দেশের উন্নয়নের জন্য জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতিটি পয়সার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য আমাদের ওই সব উইপোকাকে আটক করতে হবে (৩/১০/১৯, নয়া দিগন্ত)। বক্তব্য দেয়ার আগে ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি নিউ ইয়র্কে আওয়ামী লীগের সংবর্ধনা সভায় বলেছেন, দুর্নীতি না হলে দেশের চেহারাই পাল্টে যেত (নয়া দিগন্ত)।
দুর্নীতি যে হচ্ছে এবং কী পরিমাণ ভয়াবহভাবে সর্বস্তরে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছে তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। প্রকৃত অর্থে সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে এই দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের নেতাসহ একেবারে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে দুর্নীতি। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পাশের কিছু নেতা শেয়ারবাজার ও ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত (নয়া দিগন্ত, ৭ অক্টোবর ২০১৯)। এ প্রবন্ধ যখন লিখছি তখন মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যার নির্মম ঘটনার কথা টিভিতে প্রচার হচ্ছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার হত্যার লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা আমার কলম থামিয়ে দিলো। লেখা বন্ধ রেখে পাশের ড্রইংরুমে টিভির সামনে গিয়ে বসলাম। শুনলাম আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক আবরারকে হত্যা করার অবিশ্বাস্য অমানবিক বর্বর ঘটনার খবর। দুর্ভাগ্য আমাদের এখনও ছাত্রলীগের এ ধরনের অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের কথা শুনতে হয়। শুনতে হয় লুটতরাজের কথা। শুনতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অরাজকতার আখড়ায় পরিণত করার কথা। শোনা যায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাজমুলের সম্পদের ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা। খবরে প্রকাশ নাজমুল দেশে-বিদেশে কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তার সম্পদের উৎসইবা কী, সে বিষয়ে জানবে দুদক (নয়া দিগন্ত, ১ অক্টোবর ২০১৯)। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অপরাধের শেষ নেই। বেড়েই চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। আজ (৯/১০/১৯) যখন প্রবন্ধটি লেখা শেষ করছি তখন পত্রিকায় দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের হল থেকে অস্ত্রসহ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আটক হয়েছেন। দেখলাম সাবেক ছাত্রলীগ নেতার ধর্ষণে মহিলা লীগ নেত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন এবং এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। অর্থাৎ সাবেক আর বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অনেকেই সভা সমিতি এবং টিভির টকশোতে বলেছেন, বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের আগ্রাসী, হৃদয়হীন সন্ত্রাসী, লুটেরা ও হত্যাকারী হিসেবে গোড়ে তোলার পেছনে সাবেক ছাত্রনেতাদের হাত আছে। তারাই পরিচালনা করছেন বর্তমান ছাত্র নেতাকর্মীদের। ছাত্রলীগের এসব নেতাকর্মীর হত্যা, ধর্ষণ, লণ্ঠন ও চাঁদাবাজির কারণে উত্তাল সারা দেশ। দাবি উঠছে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গুটি কয়েকের কারণে আওয়ামী লীগের অর্জন ম্লান হতে পারে না (নয়া দিগন্ত, ৯/১০/১৯)।
ছাত্ররাজনীতি নিয়ে যারা ভাবেন, যারা গবেষণা করেন, যারা দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্ররাজনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও জানেন যে যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত, যারা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থেকে অন্যায় অপকর্মের মাধ্যমে রাতারাতি অগাধ সম্পদের অধিকারী হতে চান তাদের সংখ্যা মন্ত্রী উল্লিখিত গুটিকয়েকই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলগুলোতে হাতেগোনা কয়েকজন নেতাই থাকেন। এসব নেতাই হলের সব অরাজনৈতিক শিক্ষার্থীদের কন্ট্রোল করেন। নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মিছিল মিটিংয়ে নিয়ে যান দল ভারীর জন্য। হলে থাকার প্রয়োজনেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সভা সমিতি ও মিছিলে যোগদান করেন। যখন অন্য দল ক্ষমতায় বসে তখন আবার এ সব সাধারণ শিক্ষার্থীই নতুন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের দখলে চলে যান। এ ভাবেই চলে ছাত্র রাজনীতি। এভাবেই ব্যবহৃত হন অরাজনৈতিক সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রকৃত অর্থে তারা সরল সোজা পড়–য়া শিক্ষার্থী। এরা কখনো অন্যায় করেন না। কখনো কখনো নেতাদের দ্বারা অন্যায় কাজে ব্যবহৃত হন। রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। এরূপ অন্যায়কারী (অবিশ্বাসী) আর অন্যায় কাজে ব্যবহৃতদের বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছেÑ কেউ তার বিশ্বাস স্থাপনের পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখিলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তার জন্য আছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয় যাকে সত্য প্রত্যাখ্যানে বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত বিশ্বাসে অবিচলিত (সূরা নাহল, আয়াত ১০৬)। সূরা নাহলে আরো একটি আয়াত (৯৭) আছে, যেখানে বলা হয়েছেÑ ‘বিশ্বাসী হইয়া পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেহ সৎকর্ম করিবে তাহাকে আমি নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দান করিব এবং তাহাদিগকে তাহাদিগের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করিব।’
পবিত্র কুরআনের আয়াতে স্পষ্ট যে, যারা বিশ্বাসী অর্থাৎ আল্লাহকে এবং পরকালে বিশ্বাস করেন তারা সৎকর্ম করেন। এটাই বিশ্বাসীদের ধর্ম। ঘুরিয়ে বললে বোঝায় যারা সৎকর্ম করেন না তারা অবিশ্বাসী। এই বক্তব্যের আলোকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুসলিম নামধারী হলেও যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি, গুম, মিথ্যা মামলা, জমি দখল, খাদ্যে ভেজাল, ভেজাল ওষুধ ও জুয়াসহ নানা অসৎ কর্মে জড়িত তাদের বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ তাদের কর্ম সৎ নয়। সৎকর্ম নয় ক্যাসিনো অর্থাৎ জুয়ার কারবার ও জুয়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন।
ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা চাকরি ছাড়া ক্যাসিনোর মাধ্যমে যে অগাধ সম্পদের মালিক হওয়া যায় তা অবাক বিস্ময়ে দেশের মানুষ দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। সূত্রাপুরে আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল ও সহসম্পাদক রূপন ভ্রাতৃদ্বয়ের সম্পর্কে পত্রিকায় বলা হয়েছে যে, এরা দুই ভাই অবৈধ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বাড়ি লিখে নেয়া থেকে শুরু করে পদ-পদবিও বাগিয়ে নিতেন। এভাবেই কোটি কোটি টাকা ও ঢাকা শহরে ৫০টি ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। মালিক হয়েছেন অবিশ্বাস্য পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কারের। কোটি কোটি টাকার মালিক ক্যাসিনো সম্রাট জি কে শামীম, ইসমাঈল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াÑ এসব যুবলীগ নেতা ও কৃষক লীগের অনেক নেতার এত টাকা জনগণ দেখেছেন যে, সেগুলো দেখে মনে হয়েছে এদের ঘরবাড়ি অফিস যেন একেকটি ব্যাংকের ভোল্ট। এরা প্রত্যেকেই রাজার হালে জীবনযাপন করেছেন। এদের বিলাসী জীবনের খবর পড়ে সচিত্র প্রতিবেদন দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। এরা যে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন অবৈধ পথে তাই নয়, তারা বিদেশেও টাকা পাচার করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হলো? শাস্তি ও কারাগার বরাদ্দ হয়েছে তাদের জন্য। এটাই অবিশ্বাসী ও অসৎ কর্মে যুক্ত মানুষদের শেষ পরিণতি। যার কথা আল্লাহ ঘোষণা করেছেন সুরা নাহলেÑ বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং সৎকর্ম-অসৎ কর্মের ফল যে মানুষ ইহকাল এবং পরকালে ভোগ করবে সে কথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এভাবেই পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু আমরা বুঝি না, বুঝতে চাই না, বুঝলেও মানি না, মানতে চাই না। এটাই মানব সম্প্রদায়ের অন্ধকার দিক। অথচ সবাই চাই আলোকিত জীবন। চাইলেও কেন মিলছে না সেই আলো? তারই অনুসন্ধান প্রয়োজন সর্বাগ্রে। হ