জগৎ এবং জীবন সম্পর্কে মানুষের যে অলঙ্গনীয় প্রশ্ন তার সন্তোষজনক উত্তরদানের চেষ্টার নাম হলো দর্শন। এই চেষ্টা পৃথিবীর শুরু থেকে শুরু হয়েছে এবং পৃথিবীর ধ্বংস পর্যন্ত চলতে থাকবে। মানুষের জগতে আবির্ভাব ঘটেছে পরম বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে। সৃষ্টি জগতে স্রষ্টার পরই মর্যাদা পেয়েছে মানুষ। সে যত জ্ঞান অর্জন করতে থাকে ততই তার কাছে অজানা বিষয় এসে হাজির হয়। নিজের মূর্খতা সম্পর্কে যে যত জ্ঞানী সে তত প্রজ্ঞার অধিকারী। মানুষের কল্পনা শক্তির বিশালতা তাকে নিয়ে গেছে অদৃশ্য জগতে। যে জগতে তার যাওয়ার অধিকার নেই। মানব প্রবৃত্তির এ ধরনের প্রবণতাকে দার্শনিক কান্ট বিশুদ্ধ প্রজ্ঞার দ্বন্দ্ব বলে উল্লেখ করেছেন।
মানুষের জীবন দর্শনের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মত পথ ও মতাদর্শ। যে যে জীবন দর্শনের অধিকারী সে সেটাকে সত্য ও গ্রহণযোগ্য মনে করে। মানুষের প্রবৃত্তির কারণে যে যেমন শ্রেষ্ঠ তেমন নিকৃষ্ট। প্রবৃত্তির কারণে সে জ্ঞান বিলি করে আনন্দ পায় এবং মানবতার কল্যাণকারী চিন্তা ও কর্মতৎপরতার দ্বারা দেহমন ও চিত্তকে আনন্দিত করে তোলে। আবার এই প্রবৃত্তির কারণে সে জগতে শোরগোল করে এবং মানুষের ভেতর অরাজকতার সৃষ্টি হয়।
জগতে আসার পর মানুষ জগতের এই অপরূপ কলা কৌশল দেখে বিস্মিত হয়েছে। জগতের উৎস সম্বন্ধে সে প্রশ্ন করে, এ জগতের উৎস কিভাবে হলো? এটি কি এমনিতেই বিবর্তনের মাধ্যমে হয়েছে তা এর পেছনে কোনো পরম বুদ্ধিমান সত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। দর্শনে এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টায় শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে কিন্তু মানুষ আজো এক মতে আসতে পারিনি। যারা জগতের আদি সত্তাকে চেতনা হিসেবে শনাক্ত করেন তাদের বলা হয় ভাববাদী। তারা স্র্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসী শ্রেণীর মানুষের সংস্কৃতি প্রথা, সাহিত্য, জীবন ভাবনা এক ধরনের হয়। তাই ভাবুক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় এ সম্পর্কে বলেনÑ
‘ সীমার মাঝে অসীম তুমি
বাঁজাও আপন সুর
আমার মাঝে তোমার প্রকাশ
তাই তো এত মধুর ॥’
যারা বস্তুবাদী তারা জগতকে অন্যভাবে ভাবেন। তারা বলেন যে, জগতের আদি সত্তা হলো বস্তু। আর এই বস্তু থেকেই সব কিছুর উদ্ভব এবং বিকাশ। তারা খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়। তারা বলে যে জগৎ যন্ত্রের মতো চলছে এবং সব কিছু বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থায় এসে হাজির হয়েছে। এখানে পরম বুদ্ধিমান সত্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই শ্রেণীর চিন্তাবিদদের সাহিত্য ও সেইভাবে গড়ে উঠেছে। এপিক্যুরাসের বস্তুবাদী দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবি লুক্রেশয়াস কবিতার ভাষায় বলেন Ñ
আমাদের জীবনকে
শত আঘাতে বিদীর্ন করত
কিন্তু সেই মানুষটি
মুক্ত করেছে মানুষকে
এই হিংস্র প্রকৃতির আঘাত থেকে
কোন শাণিত কৃপাণ দিয়ে নয়
প্রজ্ঞার শক্তিতে
আর তাই
আসন যদি উচ্চ হয় দেবতার
উচ্চ হবে মানুষের মুক্তিদাতা এই মানুষটি আসন
দেবতাদের সেই সুউচ্চ সারিতে ॥
লুক্রেসিয়াস তার কবিতায় একটা প্রমাণ করেন যে মানুষ জগতে স্বাধীন এবং উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ সবার ওপরে মানুষ সত্য।
জগতে ভাববাদ এবং বস্তুবাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। যারা ভাববাদী তাদের জীবন দর্শন এক ধরনের। আবার যারা বস্তুবাসী তাদের জীবন দর্শন ও সাহিত্য অন্য ধরনের। তবে উগ্র ভাবাদ এবং উগ্র বস্তুবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত লক্ষ্য করা যায়। এই দ্বন্দ্বমুখর চিন্তাচেতনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দার্শনিক সমাজে সমন্বয়বাদী চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। তাই তো দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেব এ সম্পর্কে “চড়ঃধঃড় চযরষড়ংড়ঢ়যু” প্রচার করেছিলেন। তিনি বস্তুবাদ-ভাববাদ, পার্থিব-অপার্থিব, ধর্মনিরপেক্ষ-ধর্মীয় প্রভৃতি বিষয়ের ভেতর সমন্বয় করতে চেয়েছেন।
যে কাব্য সাহিত্যে দর্শন নেই তাকে আমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য কর্ম বলতে পারি না। দার্শনিকরা যুক্তির মাধ্যমে ভাব খোঁজেন এবং কবিরা ভাবের মাধ্যমে যুক্তি খোঁজেন। আর যুক্তি এবং ভাবের মিশ্রণ ছাড়া মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। তাই তো ইংরেজ কবি কোলরিজ এর ভাষায়Ñ
“ঘড় সধহ ধিং বাবৎ ুবঃ ধ মৎবধঃ ঢ়ড়বঃ রিঃযড়ঁঃ নবরহম ধঃ যব ংধসব ঃরসব ধ ঢ়ৎড়ভড়ঁহফ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যবৎ.”
নর নারীর প্রেমাসক্ত এবং প্রেম লীলা এবং তার প্রভাব আমরা কাব্য সাহিত্য লক্ষ্য করি। প্রাচীন শাস্ত্রের আদি রস হলো কাম। আধুনিক সাহিত্য ও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। নারী পুরুষের এই কাম আকর্ষণ স্র্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি। এই প্রেম শুধুমাত্র নারী পুুরুষের মধ্যেই নয়। বরং সৃষ্টির প্রতি ভলোবাসা, স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসা লক্ষ্য করা যায়। যেদিন ভালোবাসা থাকবে না। সেদিন জগৎ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এই ভালোবাসার কথা বলতে যেয়ে মরমি কবি জালালউদ্দীন রুমি বলেনÑ
“ইশকে আওয়াল ইশকে আখের ইশকে ফুল
ইশকে শাখ ্ শিকে লাখলো ইশকে গুল। ”
“প্রেম আদি প্রেম অন্ত প্রেমই মূল
প্রেম শাখা, প্রেম কাণ্ড, প্রেমই ফুল। ”
মানুষের জীবনে শুধু প্রেমই প্রধান ব্যাপার নয়।
মানুষের জীবনে আছে বিরহের কাতরতা। বিরহের কষ্ট, দুঃখ, শোক, বেদনা, তাকে ব্যথিত করে। তার জীবন হয়ে ওঠে যন্ত্রণাময়। কেন এত বেদনা কেন এত যন্ত্রণা তা স্র্রষ্টারই জানার কথা। এ থেকে মুক্তি নেই। কবিরাও এ দুঃখ যন্ত্রণার কথা কাব্য সাহিত্যে ব্যক্ত করে গেছেন।
কবি জামাল উদ্দীন রুমি এ ব্যাপারে বলেনÑ
“শোন বাঁশরী তার ( বেদনায়) কী গান গায়
যে বেনুবন থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে
সেই বনের বিরহে সে কাঁদে
আর তারই সমবেদনায় কাঁদে সকল নর-নারী ॥
বিচ্ছেদের দুঃখ মানুষের জীবন যাত্রাকে করে তোলে দুর্বিষহ। যারা জীবন সম্বন্ধে গভীর চিন্তা করেন এবং সাহিত্য সৃষ্টি করে তারা বিচ্ছেদের দুঃখের কথা এড়িয়ে যেতে পারেন না। যা প্রত্যেক ক্রান্ত দর্শী কবি সাহিত্যেকদের ভাবিয়ে তোলে। মানুষের পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী। এখানে জগতের রঙ্গ মঞ্চে তার জন্ম। ফু বিলাতে বিলাতে তার জীবন শুরু এবং রঙ বিলাতে বিলাতে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এই ক্ষণস্থায়ী রঙ্গ মঞ্চে সে যে অভিনয় করে তার ছাপ দুনিয়ায় বুকে রেখে যেতে চায়। এই অভিনয়ের পালা শেষ হলে তাঁর বিদায় হয়। এই ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের কথা স্মরণ করতে যেয়ে কবি বায়রন বলেনÑ
“যে আনন্দ নিয়ে যায় কাল কভু নাহি দেয় তাহা ফিরে
যৌবনের বাবের গরিয়া ডুবে যায় কাল সিন্ধু নীরে। ”
মানুষের জীবন এক দিনেই পূর্ণতা লাভ করে না। সে ধরা তলে জন্মগ্রহণ করে শিশু হিসেবে। পরবর্তীতে কিশোর, তরুণ, যুবক এবং বৃদ্ধ রূপ লাভ করে। যৌবনে সে যত চাকচিক্য সৌন্দর্য, রূপময়, গন্ধ উপভোগ করতে পারে। অন্য বয়সে তা সম্ভব হয় না। মানুষের বয়সের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাহ্য জগতের অনুভূতির ও পরিবর্তন ঘটে। এই বয়স নিয়ে এক ভাবুক দার্শনিক কবিতার ভাষায় বলেন Ñ
“বালস্তাবৎ ক্রীড়াসক্ত ঃতরুণ স্তাবৎ তরণী রক্ত
বৃদ্ধ স্তাববিচস্তা মগ্ন ঃ
পরমে ব্রহ্মণি কোহপি ন লগ্ন। ”
বাল্যকালে ক্রীড়াতেই আমাদের আসক্তি। যৌবনে তরুণ-তরুণীর ভাব বিনিময়ে আমরা বুদ্ধিহারা। আর বার্ধক্যে নৈরাশ্যজনক দুশ্চিন্তায় আমরা মগ্ন। ”
মানুষ হিসেবে দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেই জীবন স্বার্থক হয় না। বরং জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য অনেক বিশাল। বিশাল কর্মক্ষেত্র দুনিয়া এক রহস্যপুরী। এখানে মানুষ বিচিত্র ক্ষেত্র এবং বিচিত্র চিন্তা চেতনার অধিকারী। মানুষের চিত্তকে প্রশস্ত ও সৌন্দর্যময় করার জন্য দরকার সত্য জ্ঞান। মিথ্যার ছড়াছড়ির কারণে জগতে মানুষের শান্তির পথকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সত্য সুন্দর, সত্যই মুক্তি, মিথ্যার আয়োজন বেশি। বক্রতা ও কর্কশতা বেশি। কিন্তু সত্য সরল সহজ যেখানে সকল সৌন্দর্য ও মুক্তির নিশ্চয়তা মিশে আছে। দার্শনিক সাহিত্যেকরা যখন একই সত্যে এতে হাজির হবে তখন জগত শান্তিতে ভরে যাবে। পুরনো জরাজীর্ণ অতীতকে ভুলে সুন্দর চিন্তা উপহার দেয়ার মাধ্যমে জগতে মানবের পদ চারণায় মুখরিত হবে। আমরা বিশ্বের মানুষ এক মহনায় মিলিত হয়ে শান্তির বাঁশি বাঁজাতে চাই।
তাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই Ñ
“আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পচা অতীত
গিরি গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত
সৃজিব জগৎ বিচিত্র বীর্যপান।
তাজা জীবন্ত সে সব সৃষ্টি শ্রমÑমহান।” হ