ভূমিকম্পে হৃদকম্প না হওয়া অস্বাভাবিক। স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে কেঁপে ওঠে। আত্মাও আক্রান্ত অসুস্থ আতঙ্কে। প্রতিটি সেকেন্ড যেন চেপে থাকে পাহাড়ের মতো।
সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূমিকম্পের পর ভূমিকম্প। অতি সম্প্রতি জাপানের ভূমিকম্পে যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলার খবর শুনছি, তাতে মনে হয় পৃথিবীর এখন গভীর, গভীরতর অসুখ। মায়াময় পৃথিবীর যেন অন্তিম অবস্থা!
অথচ কত কালের পুরনো তারাগুলো চেয়ে আছে নির্নিমেষ। দেখে যাচ্ছে কোটি কোটি জন্মমৃত্যু। দেখে যাচ্ছে আমাদের হাসি-কান্না, আনন্দ-যন্ত্রণা। কত ক্ষুদ্র আমাদের এই মানবজীবন! কত বিশাল এর ব্যাপ্তি। কী দুঃসাহস, মহাবিশ্ব আর মহাকালকে আমরা ছুঁতে চাই এই ক্ষুদ্র দুই বাহু দিয়ে!
বস্তুত পৃথিবী ও জীবজগৎ আজ কয়েকটা দিশাহীন ঘটনার পরিণতিতে ভুগছে। এ গ্রহের মানুষ তবে কি বিপন্ন! এমন কথা ভাবতে বসলে অনেকের কাছে বেঁচে থাকার মানে হারিয়ে যাবে। আশা-নিরাশার গোধূলিতে পৃথিবী আজ ভগ্নস্তূপের দশায়! আজ মাটি পানি বাতাস ও প্রাণিজগতের অসুস্থতার লক্ষণে যা প্রকাশ পাচ্ছে তা আমাদের পাপের ক্ষত ভরা, অন্তরের হিংসা কি না তা ভেবে দেখা দরকার।
অসুস্থতার এই লক্ষণগুলো বর্তমানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরিবেশ তথা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ কি না, বিজ্ঞানই চিনতে সাহায্য করে। দূষিত পানি, দূষিত বায়ু, ক্রমবর্ধমান মনুষ্য সমাজ সঞ্জাত বর্জ্যদ্রব্যের পাহাড় আজ পৃথিবীকে একটি আবর্জনার স্তূপে পরিণত করেছে। মানুষের নানা সঙ্কটের প্রকোপ প্রাণী জগতেও এসে পড়েছে। মানুষের কর্মফলে বহু প্রজাতির জীব এখন বিলুপ্তির পথে।
আজকের প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ভোগবাদ। বল্গাহীন লোভ ও ভোগের সমাজ সাধারণ মানুষ পৃথিবী ও অন্যান্য প্রাণী কারোরই মঙ্গলের সহায়ক নয়। ভোগবাদী মানুষ আজ এটা কাল সেটার পেছনে, আরো চাই আরো চাইয়ের পেছনে অন্ধভাবে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। ভোগবাদের এই অতি ব্যস্ততার ফলেই জন্ম হচ্ছে চতুষ্পার্শ্বের প্রতি একটা চরম নিঃস্পৃহ বা উদাসীন মনোভাব। তারই একটি ফল পরিবেশ সঙ্কট।
গত কয়েক বছরের ঘটনাপরম্পরা থেকে বোঝা যায় আবহাওয়া পালটে যাচ্ছে। বাড়ছে উত্তাপ এবং বদলে যাচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন। শহর জলমগ্ন, উপকূল প্লাবিত। আবার কোথাও কোথাও প্রকৃতি কৃপণ। বাংলাদেশের কোথাও কোথাও খরা। নদী, দীঘি, পুকুর, জলাধার শুকিয়ে গেছে। পানির স্তর এত নেমে গেছে যে অগভীর নলকূপও অকেজো। আবার অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি বদলে দিচ্ছে মাটির নীচের ও ওপরের পানির অনুপাত। বাড়ছে বন্যা ও খরার প্রকোপ। মাটির নিচের পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড। সেই বিষ খাদ্যশৃঙ্খল হয়ে ক্রমে প্রবেশ করছে দেহে। পরিণামে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঘটছে এবং অসংখ্য জীবপ্রজাতি বিলুপ্তির পথে। জীববৈচিত্র্যের এ রূপ সরলীকরণ হতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের অস্তিত্বও বিপন্ন হবে।
অন্যদিকে নগরায়নের হিড়িকে বন কেটে বসত হচ্ছে। জলা বুজিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে ইট-কাঠ-কংক্রিটের হাই-রাইজ। শহুরে হিসেবি জীবনগাথায় ষড়ঋতু চির অচেনাই থেকে যাচ্ছে।
আমাদের কবেকার ছোট গ্রাম, ছোট বাড়ি, ছোট সুখ-দুঃখ, আর পূর্ণিমার আলোধোয়া রাতগুলো কোথায় হারিয়ে গেল! কোথায় গেল কিছু স্বপ্ন নিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্মীপেঁচা! দুঃসহ বর্তমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঘেরাটোপে পড়ে অতীতের স্মৃতিচারণ ছাড়া আজ আর কোন পথই বা খোলা আছে!
সে যাই হোক, পরিবেশদূষণ নিয়ে সাম্প্রতিককালে গভীর উদ্বেগের সাথে বিশ্বময় আলোচনা চলছে। সারা ভূমণ্ডলে আবহাওয়ার উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে পৃথিবীর নানা স্থানে, বিশেষত দক্ষিণ মেরুতে তুষার স্তূপ গলতে শুরু করেছে। যে কারণে সমুদ্রে পানির স্তরের উচ্চতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। এমন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে পৃথিবী ক্রমে মানুষের বসবাসের পক্ষে অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
বলাবাহুল্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সমাজ-জীবনের সামঞ্জস্য স্থাপন মনুষ্যত্বের যাত্রাপথে স্থায়ী অগ্রগতির মৌল শর্ত। কিন্তু প্রকৃতিকে শুষে মানবকল্যাণের কাজ এখন এতদূর এগিয়ে চলেছে যে প্রকৃতিই বিপন্ন। পৃথিবীর আকাশ মাটি পানি সবই আজ দূষিত। এত ভয়ঙ্করভাবে দূষিত যে মানুষের অস্তিত্ব নিয়েই এখন প্রশ্ন। ‘অখিল ক্ষুধায়’ সে আজ নিজেকে খেতে বসেছে।
তবে পৃথিবীর আবহাওয়ার পরিবর্তনের জন্য মানুষ কতটুকু দায়ী, আর কতটুকু মহাজাগতিক কারণে ঘটছে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ সহজ নয়। প্রশ্নচিহ্নে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং মহাকাল। যদি মহাজাগতিক রশ্মির কমবেশি হওয়ার সাথে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকে তা হলে সূর্যের গায়ে ঝড় ওঠার সাথেও পৃথিবীর আবহাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
নক্ষত্রের যেমন জন্ম হয়, তেমনি নক্ষত্রের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে নক্ষত্র হিসেবে তার আয়ুও ফুরিয়ে যায়। মহাকর্ষের অমোঘ নিয়মেই গ্রহ-উপগ্রহদের ছন্দোবদ্ধ গানে মাঝে মধ্যে তাল কেটে যেতে পারে, এবং লয় কেটে গিয়ে পৃথিবীতে আসতে পারে প্রলয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় যেমন পড়েছিÑ ‘ধূমকেতু আর উল্কার জন্য সৃষ্টি রসাতলে যাবে’।
কিন্তু সুহৃদ, আমরা পরস্পরকে প্রাণবন্ত সজীব দেখতে চাই, যদিও আকাশে এখন অশুভ চিহ্ন, দৈব দুর্বিপাক। ক্রমাগত ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস। তবে আশার কথা এখনো ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’। পৃথিবীর শেষ তৃষ্ণা নিবারণের ওইটুকুই সম্বল। এবং সেটাই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। হ