একটি দেশের সরকারি-বেসরকারি নথিপত্র এবং দলিল দস্তাবেজ সে দেশের ইতিহাসের অন্যতম উপাত্ত। বেশ কয়েক শতাব্দী আগে মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপলব্ধি করে আর তখন থেকেই এগুলো সাবধানতার সাথে সংরক্ষণ করার কাজ শুরু হয়। আর এ থেকেই জন্ম লাভ করে সংরক্ষণাগার যার নাম হয় ভিন্ন দেশে ভিন্ন রকমের। তবে আরকাইভস (অৎপযরাবং) নামটিই আধুনিককালে এই ‘সংরক্ষণাগার’-এর জন্য সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়েছে। এই নামের উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘আরকিয়ন’ (অৎপযবরড়হ) থেকে যার অর্থ ‘অফিস’।
দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থাৎ ভারত উপমহাদেশে মধ্যযুগে মুসলমান শাসনামলে দলিলপত্রের সংরক্ষণাগারকে ‘মোহাফেজখানা’ বলা হতো। মোহাফেজখানা ফার্সি শব্দ। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনযুগে ‘মোহাফেজখানা’ নামটি বিদ্যমান থাকে তবে ধীরে ধীরে ‘রেকর্ডস’ নামকরণ প্রাধান্য পায়। এর প্রধান কারণ ব্রিটিশরা পুরনো নথিপত্রকে রেকর্ডস বলত আর তাই স্বাভাবিকভাবেই এই রেকর্ডগুলো যেখানে রাখা হতো সে জায়গাকে রেকর্ডরুম (জবপড়ৎফ জড়ড়স) নামকরণ করা হয়। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর উপমহাদেশের দলিলপত্রের মূল সংরক্ষণাগারকে আরকাইভস বলা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজের সংরক্ষণাগারকে আরকাইভস নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ধারণা করা হয় আজকে যে ভূখণ্ড বাংলাদেশ নামে পরিচিত এখানেও বহু প্রাচীনকাল থেকেই রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে পুরনো দলিলপত্র, জমি-জমার কাগজপত্র ইত্যাদি সংরক্ষণ করার একটি ঐতিহ্য ছিল। দীর্ঘকাল ধরে এগুলোকে সংরক্ষিত করার কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় নীতিমালা না থাকায় এই প্রাচীন দলিলপত্রের সংরক্ষণ দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। সময়ের সাথে সাথে এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু এখনো সংরক্ষিত আছে আরকাইভসে, দেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে।
ব্রিটিশ সময়কাল
সরকারি বা আধা সরকারি নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সৃষ্টি এবং সংরক্ষণ করার কাজটি আমাদের দেশে একটি নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল রূপ ধারণ করে ঔপনিবেশিককালে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭)। ঔপনিবেশিক শাসকবর্গ তাদের নিজেদের স্বার্থে বিশেষ করে রাজস্ব আদায় এবং সার্বিক শাসনব্যবস্থা সুসংহত করার জন্য বিভিন্ন স্তরে সৃষ্ট নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সংগ্রহ, পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। এর কিছু কাল পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণীত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রগুলো তারা একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় স্থানে সংরক্ষণ করতে থাকে আর এভাবেই ১৮৯১ সালে কলকাতার ইম্পেরিয়াল রেকর্ডস ডিপার্টমেন্টটিকেই এক সময় দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়। পরিশেষে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা উত্তরকালে এটিকে ভারতবর্ষের জাতীয় আরকাইভস (ঘধঃরড়হধষ অৎপযরাবং ড়ভ ওহফরধ) নামে অভিহিত করা হয়।
রেকর্ডস ম্যানুয়াল
নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করার সাথে সাথে ব্রিটিশরা ১৮৬৬ সালে নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সৃষ্টি থেকে শুরু করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ পর্যন্ত এদের একটি জীবন চক্র (খরভব ঈুপষব ড়ভ জবপড়ৎফং) সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করে যা রেকর্ডস ম্যানুয়াল নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে এটিকে বিভিন্ন সময়ে নানা রকম সংশোধন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করা হয়। এটির সর্বশেষ সংরক্ষণ প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে ঞযব ইবহমধষ জবপড়ৎফং গধহঁধষ ১৯৪৩ নামে। এই ম্যানুয়ালের অধীনে রেকর্ডপত্র সৃষ্টি এবং বিনষ্ট করার একটি নীতিমালা গ্রহণ করা হয়, যা আইনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা পালন করার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়। আর এভাবেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রের বিন্যাস এবং সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে বর্তমানে এই আইনটি সার্বিকভাবে প্রচলিত আছে।
সচিবালয় ব্যবস্থাপনা
উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ধারাবাহিকতায় এ ভূখণ্ডে আমলাতন্ত্র জোরদার হয়ে ওঠে। আমলাতন্ত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সরকারি কাগজপত্রের যথাযথ প্রণয়ন ও সংরক্ষণ। এ কারণে ব্রিটিশ সরকারকে কাগজে সরকারও (চধঢ়বৎ এড়াবৎহসবহঃধষ) বলা হয়। আমলাতন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় সচিবালয় পর্যায়ে যেখান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন।
ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে কলকাতায় এই সচিবালয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে রাইটার্স বিল্ডিংকে (ডৎরঃবৎং ইঁরষফরহম) কেন্দ্র করে। সেই সাথে দেশ শাসনের জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র এবং প্রশাসনিক বিভাগের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় বহু ধরনের সরকারি অফিস, পদ ও কর্মকর্তা।
এভাবেই রাইটার্স বিল্ডিংকে কেন্দ্র করে সারা ভারতবর্ষের এক বিশাল সচিবালয় গড়ে উঠে যেখানে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারের দলিলপত্র সংগৃহীত হতে থাকে। একপর্যায়ে এসব নথিপত্র এত বিপুল হয়ে ওঠে যে এগুলোর একটি বিহিত করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রগুলোকে অন্যত্র একটি কেন্দ্রীয় অফিসে সংরক্ষণ করা হবে আর যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয় সেগুলো ধ্বংস করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ইম্পেরিয়াল রেকর্ডস ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়, যার কথা আমরা আগেই বলেছি। ইম্পেরিয়াল রেকর্ডস ডিপার্টমেন্টে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রগুলো ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক কালের ইতিহাসের আকর উপাত্ত হয়ে ওঠে। আর এ কারণেই এই ডিপার্টমেন্টকে অচিরেই আরকাইভস নামকরণ করা হয়। ইম্পেরিয়াল রেকর্ডস ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রের সুরক্ষণের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে যা বিভিন্ন জাতীয় আরকাইভস প্রতিষ্ঠানের পরেও অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশেও এভাবেই জাতীয় আরকাইভস (ঘধঃরড়হধষ অৎপযরাবং) গড়ে ওঠে এবং জাতীয় দলিলপত্র সংরক্ষিত হওয়ার ব্যবস্থাও শুরু হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও জেলা রেকর্ডরুম
ঔপনিবেশিক আমলে প্রশাসনের নিম্নস্তরে জেলা প্রশাসন দেশের শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। পুরো দেশকে কতগুলো জেলাতে বিভক্ত করা হয় আর এই জেলাতেই ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ প্রকাশিত হয়। জেলার প্রধান কর্মকর্তা কালেক্টরকে ঘিরেই ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। প্রতিটি জেলায় কালেক্টরের অফিসের সাথেই একটি রেকর্ডরুম সংযুক্ত ছিল যেখানে স্থানীয় শাসনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সংরক্ষণ করা হতো। এ ছাড়াও সরকার যেসব গেজেট, আইন, প্রতিবেদন, রিপোর্ট ইত্যাদি প্রকাশ করত সেগুলোর কপিও এখানে সংরক্ষিত থাকত। ঔপনিবেশিক আমলের শুরুতে যেভাবে জেলা রেকর্ডরুমে নথিপত্র সংরক্ষণের জন্য নীতিমালা গৃহীত হয় পুরো ঔপনিবেশিককালে সেভাবেই চলতে থাকে। আর এভাবেই রেকর্ডগুলো প্রতিটি জেলার ইতিহাসের তথ্য-ভাণ্ডারে রূপান্তরিত হয়।
বিভাগীয় প্রশাসন ও বিভাগীয় রেকর্ডরুম
ঔপনিবেশিককালে ১৮২৯ সালে প্রশাসনের একটি মধ্যস্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ধাপের নামকরণ করা হয় বিভাগ। কয়েকটি জেলা নিয়ে একটি বিভাগ গঠিত হয় আর ওই বিভাগের প্রধানের পদবি হয় ডিভিশনাল কমিশনার অব রেভেনিউ (উরারংরড়হধষ ঈড়সসরংংরড়হবৎ ড়ভ জবাবহঁব), যা পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় কমিশনার নামে বহুল পরিচিতি লাভ করে। প্রতিটি বিভাগীয় কমিশনারের অফিসের সাথেও একটি রেকর্ডরুম সংযুক্ত করা হয়। আঞ্চলিকভাবে এ রেকর্ডগুলো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দলিল দস্তাবেজের ভাণ্ডার হয়ে ওঠে। নিম্নস্তরের জেলা প্রশাসকদের এবং কলকাতার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সব চিঠিপত্র, প্রতিবেদন ইত্যাদি এই কমিশনারের অফিসের মাধ্যমে আদান-প্রদান হতো। আর এসব কাগজপত্রের কপি জমা রাখা হতো বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে। প্রকৃতপক্ষে বিভাগীয় রেকর্ডরুম একটি ছোটখাটো সেক্রেটারিয়েট রেকর্ডরুমে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে এসব বিভাগীয় রেকর্ডকেই বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ হিসেবে সংরক্ষণ শুরু করে।
জমিদারি কাছারি ও নথিপত্র
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককালে বাংলায় বড় বড় জমিদারের উদ্ভব এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই উত্থান জমিদারি প্রথা বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফসল। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব জমিদার এতই বড় হয়ে ওঠে যে তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনই পুরো বাংলার ফসলি জমির মালিক বনে যায়। যা হোক, জমিদারি প্রথা আস্তে আস্তে পাকাপোক্ত হয়ে পড়ে এবং জমিদারেরা বাংলার জনগণের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়ে ওঠে। জমিদারদের প্রধান দায়িত্ব ছিল কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা। এই খাজনা আদায়সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে জমিদারদের এক বিপুল পরিমাণের নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সৃষ্টি হয় যা একটি সংগ্রহশালায় জমা রাখা হতো যা সাধারণভাবে কাছারি নামে অভিহিত হয়। এক সময় এই কাছারি জমিদারি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কাছারিতে জমাকৃত কাগজ যেমন জমিজমার হিসাব, জোতদার, তালুকদার ও কৃষকদের নাম, খাজনার পরিমাণ, জমিদারির সীমানা, জমিদারির অন্তর্ভুক্ত নদী নালা খাল বিল, অরণ্য ইত্যাদির বর্ণনা, সরকারের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করার রেকর্ডসহ বহু তথ্যসংবলিত থাকত। মোটকথা এ সব কাগজপত্রই বাংলার গ্রাম-অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক জীবনের প্রধান দলিলপত্র অর্থাৎ ইতিহাসের উপাত্ত হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ হয় এবং তখন থেকে কাছারি বাড়ির কাগজপত্র অবহেলিত হয়ে পড়ে।
শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান
ঔপনিবেশিককালে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিধিও বৃদ্ধি পায়। ফলে বহু ধরনের শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। একই সময় নানাবিধ অর্থ ও ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে। ঔপনিবেশিককালের সংস্কৃতির ধারায় এসব প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র রেকর্ডরুম বা আরকাইভসে সংরক্ষিত করা হতো। একইভাবে নব্যপ্রতিষ্ঠিত আধুনিক ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক (ফাইন্যান্সিয়াল) প্রতিষ্ঠানও তাদের কাগজপত্র সংরক্ষণ করত। দুর্ভাগ্যক্রমে এসব প্রতিষ্ঠানের দলিলপত্রের বেশির ভাগই সাম্প্রতিককালেই বিনষ্ট হয়েছে মূলত এগুলোর মূল্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারার কারণে। তবুও এখনো যা আছে তা সংরক্ষণ করতে পারলে এগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে।
ঔপনিবেশিক পরবর্তী সময় ও বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস প্রতিষ্ঠা
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক যুগের অবসান ঘটে। দুর্ভাগ্যক্রমে ঔপনিবেশিক কালের পরে বাংলাদেশে নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ ব্যবস্থপনা ও সংরক্ষণ দুটোই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এটি হয় মূলত অভিজ্ঞ প্রশাসক এবং যথাযথ সরকারি অবকাঠামোর অভাবে। সে সময় বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল এবং পরিচিতি ছিল পূর্ব-বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান নামে। পূর্ব বাংলার আয়তন ছিল প্রায় ৫৫,০০০ বর্গমাইল। এই আয়তনের মধ্যে ছিল ১৬টি জেলা এবং তিনটি বিভাগ। প্রতিটি জেলা ও বিভাগের ছিল একটি করে নিজস্ব রেকর্ডরুম। দেশ বিভাগের শর্ত অনুযায়ী তদানীন্তন প্রাদেশিক পূর্ব বাংলা সরকার ভারত থেকে বাংলাদেশ সংক্রান্ত ঔপনিবেশিককালের বহু দলিলপত্র পায় যা কিনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভসে স্থানান্তর করা হয়। এ সব দলিলপত্র বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভসের প্রধান সংগ্রহ।
পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলায় কোনো আরকাইভস প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ফলে পূর্ব বাংলায় দলিলপত্র ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ উভয়ই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে ও উৎসাহে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকে নথিপত্র সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ বিষয়টি বাংলাদেশে গুরুত্ব পেতে থাকে। তবে শুরুটা বেশি ভালো হয়নি। নানারকম অবকাঠামোগত দুর্বলতাই এর অন্যতম কারণ ছিল। তবে প্রধান কারণ ছিল দেশে আরকাইভস আইনের অনুপস্থিতি। ১৯৮০-এর দশকে এসব সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়। ঢাকার আগারগাঁওয়ে জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনে জাতীয় আরকাইভস স্থান পায় (১৯৮৫) এবং ১৯৮৩ সালে জাতীয় আরকাইভস অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী জাতীয় আরকাইভস তার কর্মকাণ্ড এখনো পর্যন্ত পরিচালনা করছে।
যা হোক, ১৯৭০ এর দশক থেকেই জাতীয় আরকাইভস তার সংগ্রহের কাজ শুরু করে এবং দেশে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ যথাযথভাবে পরিচর্যা এবং চূড়ান্ত সময়ে বা সম্পূর্ণরূপে অপ্রচলিত (ঘড়হ-ঈঁৎৎবহঃ) হওয়ার পরে তা জাতীয় আরকাইভসে স্থানান্তর করার বিষয়টি প্রচার করতে থাকে। একই সময়ে দেশের সব প্রান্তের সরকারি-বেসরকারি অফিস থেকে পুরনো নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য জাতীয় আরকাইভসে নিয়ে আসতে থাকে। এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় আরকাইভস এক বিশাল সংগ্রহ গড়ে তোলে।
২০০৬ সালে ঢাকা আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস তার নিজস্ব ভবন পেয়ে ঐতিহাসিক গুণসম্পন্ন নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ সংগ্রহে আরো উদ্যোগী হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক দলিলপত্র সংগ্রহ ছাড়াও জাতীয় আরকাইভস তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা আধুনিক করেছে।
একটি দেশকে তার জাতীয় আরকাইভস গৌরবান্বিত করতে পারে সে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দালিলিক ভাণ্ডার হিসেবে। কিন্তু আরকাইভসের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর এই সমৃদ্ধি নির্ভর করে উৎস থেকে একে নিয়মিতভাবে দলিলপত্র সরবরাহ করার উপরে। এই কাজটি বর্তমানে বাংলাদেশে অত্যন্ত অসন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে সৃষ্টি করা নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ যে দেশের ইতিহাসের আকর উপাদান তা জোরালোভাবেই বলা হচ্ছে কিন্তু এগুলো যে বর্তমান সময়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের সফলতা ও জবাবদিহি সরকার প্রতিষ্ঠার জন্যও অত্যাবশ্যকীয় তা এখনো পর্যন্ত তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু তা পাওয়া উচিত বিশেষ করে যে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ সালে প্রণীত হয়েছে তার স্বার্থে। দেশে রেকর্ডস ব্যবস্থাপনা যদি উন্নতমানের না হয় তাহলে তথ্য অধিকার আইন সফল হতে পারবে না।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতীয় আরকাইভস তথা আরকাইভস সংক্রান্ত আইন আজো বাংলাদেশে প্রণীত হয়নি। এই আইন অনতি বিলম্বে প্রণয়ন করা দরকার দেশের বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে।
আমরা আশা করব দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এবং দেশে সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণে সরকার আরকাইভস আইন প্রণয়নে সচেষ্ট হবে। হ
একটি দেশের সরকারি-বেসরকারি নথিপত্র এবং দলিল দস্তাবেজ সে দেশের ইতিহাসের অন্যতম উপাত্ত। বেশ কয়েক শতাব্দী আগে মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপলব্ধি করে আর তখন থেকেই...
