আমাদের বর্তমান বিচারব্যবস্থায় দেওয়ানি মামলার বিচার পরিচালনার ক্ষেত্রে সহকারী জজের আদালত সর্বনি¤œ আদালত। সহকারী জজ অধঃস্তন বিচার বিভাগের প্রারম্ভিক পদ। একজন সহকারী জজ পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে সিনিয়র সহকারী জজ, যুগ্ম জেলা ও সহকারী দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা ও দায়রা জজ পদে উত্তীর্ণ হন। দায়রা জজ নামে স্বতন্ত্র অস্তিত্ববিশিষ্ট কোনো পদ নেই। একজন জেলা জজ যখন দায়রা মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন তখন তিনি দায়রা জজ নামে অভিহিত হন। যুগ্ম জেলা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ অনুরূপভাবে দায়রা মামলা বিচার করাকালীন সহকারী দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ নামে অভিহিত হন। দায়রা জজের অনুরূপ ম্যাজিস্ট্রেট নামক স্বতন্ত্র অস্তিত্ববিশিষ্ট কোনো পদ নেই। সহকারী জজদের ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার্পণ করা হলে তারা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন। অনুরূপ একজন যুগ্ম জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজকে যথাক্রমে অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট এবং মুখ্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট বা মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রিয়াল ক্ষমতার্পণ করা হলে তারা স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করেন। ১ নভেম্বর, ২০০৭ সালে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব অধস্তন বিচার বিভাগের সহকারী জজ ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের ওপর অর্পণ পূর্ববর্তী প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনার ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা বিচারিক ম্যাজিস্ট্্েরটের দায়িত্ব পালন করতেন।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ উচ্চাদালত ও অধস্তন আদালত এ দুই ধরনের আদালত সমন্বয়ে গঠিত। উচ্চাদালত বলতে সুপ্রিম কোর্টকে বুঝায় এবং উচ্চাদালত আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ এ দু’টি বিভাগ সমন্বয়ে গঠিত।
আধুনিক বিশ্বের সব দেশেই বিচার বিভাগকে জনগণের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং জনগণের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, তারা অপর সব কর্তৃপক্ষ থেকে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বঞ্চিত হলেও বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হলে তাদের সে বঞ্চনার অবসান হবে।
সহকারী জজ পদে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা হলো একজন প্রার্থীকে মাধ্যমিক থেকে স্নাতকসহ এলএলবি অথবা এলএলবি (সম্মান) পর্যন্ত সব পরীক্ষায় ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীর ডিগ্রিধারী হতে হবে। অতঃপর জুডিশিয়াল সার্ভিস কর্তৃক আয়োজিত ১২০০ নম্বরের লিখিত ও ২০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় ন্যূনতম শতকরা ৫০ ভাগ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে। তবে কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় চাকরি প্রার্থীর তুলনায় পদের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতিবার নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় গড়ে শতকরা ৫৫ এর নিচে নম্বরপ্রাপ্ত হলে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে। ১৯৯৮ সাল পূর্ববর্তী সহকারী জজরা সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন এবং তখনো নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা বর্তমানের অনুরূপ ছিল। যদিও এরশাদের সামরিক শাসনামলে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে নিয়োগবিধি শিথিলকরত ১৯৮৩ সাল হতে ১৯৮৫ সাল অবধি আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রায় ৪৫০ জন সহকারী জজ নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
সংবিধানের ৯৫ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সাপেক্ষে সুপ্রিম কোর্টে অন্যূন ১০ বছর অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করে থাকলে অথবা বিচার বিভাগীয় কোনো পদে ১০ বছর কাজ করে থাকলে এবং এর অতিক্তি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা থেকে থাকলে একজন ব্যক্তি উচ্চাদালতের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা অর্জন করেন।
সংবিধানের ৯৫ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধানাবলি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় উচ্চাদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা সাপেক্ষে দু’টি শ্রেণীকে যোগ্য করায় সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের চেতনার আলোকে যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে উভয় শ্রেণী থেকে শতকরা ৫০ ভাগ হারে নিয়োগ দেয়া আবশ্যক। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের বাস্তব কারণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
উচ্চাদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা যোগ্যতা অদ্যাবধি নিরোপিত না হয়ে থাকলেও অনুমিত হয় অধস্তন বিচার বিভাগের প্রারম্ভিক পদ অর্থাৎ সহকারী জজ পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যে ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এর চেয়ে নি¤েœর যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির উচ্চাদালতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো সহকারী জজের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যে নি¤œতম যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, এর চেয়ে নি¤œতম যোগ্যতাসম্পন্ন একাধিক বিচারক উচ্চাদালতে কর্মরত রয়েছেন। এখানে আরো উল্লেখ্য, সংবিধানের ১০৯ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী উচ্চাদালতের হাইকোর্ট বিভাগকে অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয়, কর্তৃপক্ষ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করবেন সে কর্তৃপক্ষের সব বিচারকের শিক্ষাগত যোগ্যতার মান যাদের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে তাদের চেয়ে উৎকৃষ্টতর হতে হবে। একজন সহকারী জজ নিয়োগ লাভ-পরবর্তী যদি দেখতে পান তার চেয়ে নি¤œ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে তার ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ওই সহকারী জজ উৎকৃষ্টতর যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান ও আইনের কোন্ বিধানাবলির আলোকে কেন তার চেয়ে নি¤œতম যোগ্যতাসম্পন্ন দ্বারা তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন এর বিচার তিনি কার কাছে চাইবেন?
অতি সম্প্রতি সুনামগঞ্জে কর্মরত এক বছর চাকরিকাল পূর্ণ হয়েছে মহিউদ্দীন নামক একজন সহকারী জজ কুমিল্লা শহরে তার শ্বশুরালয়ে বেড়াতে এলে পুলিশ বাহিনীর সদস্য দ্বারা নির্মমভাবে প্রহৃত হন। প্রহার পরবর্তী তার পিঠের ডান দিকে ও ডান বাহুতে আঘাতের চিহ্ন সম্বলিত যে ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে প্রহারের নির্মমতার ছাপ পাওয়া যায়। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় ওই সহকারী জজ তার শ্বশুরালয়ে অভিযানে অংশগ্রহণকারী পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের তার বিচারিক পরিচয় অবহিত করলেও তাতে তারা কর্ণপাত করেননি এবং প্রহার হতেও তাকে রেহাই দেননি। তবে তাকে ভাগ্যবান বলতে হবে হয়তো বিচারিক পরিচয়ের কারণেই প্রহার-পরবর্তী তাকে তার শ্বশুরের মতো গ্রেফতার হতে হয়নি। মহিউদ্দীনের ঘটনা সমগ্র দেশবাসীর বিবেককে নাড়া দিলেও দুঃখজনকভাবে বলতে হয় প্রহার-পরবর্তী বাংলাদেশের কোনো জজশিপ থেকে প্রহারের বিপক্ষে পুলিশের অনৈতিক ও বেআইনি অবস্থান বিষয়ে কোনো রেজুলেশন গৃহীত হয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের জজশিপ কুমিল্লা জজপিশসহ দেশের অন্যান্য জজশিপ থেকে রেজুলেশন নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলে আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত উপসচিবের পদমর্যাদায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে কর্মরত কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে চাকরিতে হয়রানির সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে রেজুলেশন নেয়া সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বিচার বিভাগের প্রায় দু’শতের কাছাকাছি কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা, সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়নে শুধু দলবাজ বিবেচনায় সার্বিক বিচারে নিকৃষ্ট এহেন একজনকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের কার্যভার দেয়া হয়েছিল। দলবাজ এ কর্মকর্তাটি তার অতিমূল্যায়নের নগ্ন আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশে শুধু রেজুলেশন কেন বিচারকদের অবদমিত করে রাখার জন্য যা কিছু করার প্রয়োজন হয় তা করতে যে কোনোরূপ কুণ্ঠিতবোধ করবেন না, তা তার দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত ছিল।
উপরোক্ত ঘটনাটির আগে ঘটিত অপর এক ঘটনায় দেখা গেল নরসিংদী জেলা জজ আদালতে কর্মরত যুগ্ম জেলা জজ ও সহকারী দায়রা জজ ইমান আলী তার কার্যালয়ে যাওয়ার সময় আদালত অভ্যন্তরস্থ সড়কে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হন এবং তিনি তার পরিচয় দেয়ার পরও লাঞ্ছনা থেকে রেহাই পাননি। এ ঘটনাটিও অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় বিবেচিত হলেও দোষী পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দেশবাসীর অভিমত এ ঘটনাটির বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে প্রথমোল্লিখিত ঘটনাটি ঘটত না।
এখানে প্রাসঙ্গিক যে, ২০০৫ সালে জঙ্গি মৌলবাদীদের দ্বারা বোমা হামলায় ঝালকাঠিতে দু’জন সহকারী জজ নিহত হলে তৎকালীন সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের পূর্বক আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাছাড়া নিহত দু’সহকারী জজের স্ত্রীদের যোগ্যতানুযায়ী চাকরি দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় তৎকালীন প্রধান বিচারপতির তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে পুলিশের আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারদ্বয়কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঝালকাঠি গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় বাংলাদেশের সব জজশিপ থেকে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে রেজুলেশন নেয়া হয়েছিল এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও রেজুলেশন গ্রহণপূর্বক কার্যকর ও যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ ঘটনাটির পূর্ববর্তী উচ্চাদালতের বিচারক ও জেলা জজরা চলাফেরার সময় সার্বক্ষণিক দেহরক্ষী (গানম্যান) নিরাপত্তা পেতেন না। ঘটনা পরবর্তী প্রথমত, সরকার কর্তৃক উচ্চাদালতের বিচারকদের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে জেলা জজদের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান দেয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে সহকারী জজদের রক্তের ওপর উচ্চাদালতের বিচারক ও জেলা জজরা গানম্যানের নিরাপত্তা ভোগ করছেন, নিরাপত্তার অভাবে আজ যখন একজন সহকারী জজ প্রহৃত ও লাঞ্ছিত এবং তার জীবন বিপন্ন হওয়ার পথে তখন সুবিধাভোগীরা নিশ্চুপ কেন? অন্তত ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন অনুরূপ পদক্ষেপ কি কাম্য ছিল না? আর এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় নরসিংদী ঘটনা পরবর্তী ২০০৫ সালের মতো যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হলে নিকট অতীতে সংঘটিত কুমিল্লার ঘটনাটি ঘটত না।
অধস্তন বিচার বিভাগের প্রারম্ভিক বিচারকদের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস কোন পর্যায়ে ছিল তা খুঁজতে গিয়ে জানা যায় পাকিস্তান শাসনামলের শেষভাগে ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহ জজশিপে কর্মরত সিনিয়র মুন্সেফ মো. বদরুজ্জামানের আদালতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মুনায়েম খানের ছোট ভাই খোরশেদ খানের একটি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন ছিল। মামলার রায় প্রদান পূর্ববর্তী প্রতিদিন অফিসে যাওয়া ও অফিস থেকে ফেরার সময় বদরুজ্জামান খোরশেদ খানের বাণিজ্যিক কার্যালয়ের সম্মুখ দিয়ে যাতায়াত করতেন। প্রতিদিনই খোরশেদ খান বদরুজ্জামানকে সালাম দিতে উদগ্রীব থাকতেন কিন্তু মামলার রায় প্রদান পরবর্তী দেখা গেল রায় বিপক্ষে যাওয়ায় খোরশেদ খান ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীর ভ্রাতা হওয়া সত্ত্বেও সালাম দেয়া থেকে বারিত হওয়া ব্যতীত এমন কোনো পদক্ষেপ নেননি যা তার ভাই গভর্নরের জন্য এবং বিচার বিভাগের জন্য বিব্রতকর হয়। উল্লেখ্য, বদরুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত অপর এক সংবাদ থেকে জানা যায়, ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনরত জনৈক সহকারী জজ কয়েকশত বোতল ফেনসিডিলসহ মাইক্রোবাসে পরিভ্রমণকালে ঢাকা কলেজের সামনে পুলিশ কর্তৃক ধৃত হন। অনুসন্ধানে জানা যায় উক্ত ম্যাজিস্ট্রেট বিচারিক দায়িত্ব পালনকালে জব্দকৃত আলামত ফেনসিডিল ধ্বংসের আদেশ দিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় আসল ফেনসিডিল অপসারণপূর্বক পানিভর্তি ফেনসিডিলের বোতল দিয়ে প্রতিস্থাপনের বেআইনি ও জঘন্য কার্যে লিপ্ত ছিলেন। আরো আশ্চর্য হতে হয় যখন শোনা যায় ওই ম্যাজিস্ট্রেট মন্ত্রণালয়ের সৎ, দক্ষ, জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়নে বিশেষ উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তার আশীর্বাদপুষ্ট। বিচারক পরিচয় দেয়ার পরও পুলিশ ওই বিচারকের প্রতি কোনোরূপ অনুকম্পা না দেখিয়ে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন পুলিশ কি নিজেদের ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করতে পারছেন?
আর পারছেন না বলেই দেখা গেল ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে গোয়েন্দা পুলিশের জনৈক উপ-পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে ঢাকার গুলশানস্থ জনৈক ব্যবসায়ীর নিকট থেকে এক কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য এবং সাংবাদিকদের সাহসী পদক্ষেপের কারণে জানাজানি হয়ে গেলে পরে দেখা গেল অভিযানে অংশগ্রহণকারী নি¤œপদস্থ সাবইন্সপেক্টর ও কনস্টেবল পর্যায়ের দু’তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে গোয়েন্দা উপ-পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া দূরের কথা বিভাগীয় কার্যক্রম পর্যন্ত নেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে অপরাধীর পদমর্যাদার চেয়ে অপরাধের গুরুত্ব অনুধাবন করে অপরাধ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে বিভাগীয় শৃঙ্খলা অটুট থাকত। এ একটি ঘটনা যে খারাপ নজির হিসেবে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির ওপর কালিমা লেপন করেছে তা ভেবে পুলিশের সৎ, দক্ষ, মেধাবী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা শঙ্কিত।
বিচারকরা একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে প্রতিকার প্রদানের মাধ্যমে সমাজে তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। এ ক্ষেত্রে অধস্তন আদালতের প্রারম্ভিক পদের বিচারক হতে উচ্চাদালতের সব ন্যায়নিষ্ঠ এবং নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল বিচারকের ভূমিকা অনন্য। এ অনন্য অবদান রাখতে গিয়ে একজন বিচারক তার পদমর্যাদা যা-ই হোক না যদি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তবে রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে অপরাধী যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন তাদের বিচারের আওতায় এনে বিচারকদের নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। তাই বিচারকরা সরকারের কাছে বিচার চাওয়ার মতো অবস্থা না থাকলেও আজ এ কথা ভেবে আশ্বস্ত যে, ন্যায়বিচার করে যেতে পারলে শুধু ইহজগৎ নয় পরজগতেও পুরস্কার পাওয়া যাবে। এ বিশ্বাসে তারা মহান রাব্বুল আলামিনের কাছেই বিচার চাইবে যিনি কখনো মজলুমদের (নিপীড়িত) বিমুখ করেন না। আর তারা নিশ্চিত তিনি (মহান রাব্বুল আলামিন) তাদের পরীক্ষার জন্য সাময়িক বিপদ দিতে পারেন। তবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে তাদের উভয় জীবনই যে সার্থক এ বিশ্বাসই আজ তাদের প্রতি বঞ্চনা ও অন্যায়ের প্রতিবিধানে আত্মসন্তুষ্টির পরিচায়ক। হ