মানব মনের চিরন্তন অভিপ্রায় হলোÑ অজানাকে জানা। প্রকৃতি থেকে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা বা আনন্দ-বেদনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া গেলেও পরিপূর্ণ জ্ঞানে স্নাত হওয়া যায় না। অনেকে দেশভ্রমণ করে প্রকৃতি থেকে পাঠ নেয় কিন্তু সেখানেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা; সকলের পক্ষে দেশভ্রমণ সম্ভব হয়ে ওঠে না। সে হিসেবে জ্ঞানান্বেষণের সহজ মাধ্যম হলো বইয়ের সান্নিধ্য। কেননা বই-ই ক্ষণিকের মধ্যে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে অবহিত করতে সক্ষম এবং তাতে রয়েছে পর্যাপ্ত আনন্দের বারিধারা।
অনেক মনীষীর মতে, যে জাতি যত বেশি বই পড়ে, সে জাতি তত সভ্য ও উন্নত। বই পাঠের কারণে যেমন আত্মিক উন্নতি ঘটে তেমনি পরনিন্দা, পরচর্চা, হিংসা-দ্বেষ প্রভৃতির বিলুপ্তি ঘটে। বৈদিক যুগে বই পড়াটা নাগরিকদের মধ্যে একটা ফ্যাশন ছিল। ইউরোপের সভ্য সমাজেও দেখা যায়Ñ বই পড়াটা শিক্ষিতদের ফ্যাশনের একটা অঙ্গ। সে জন্য প্যারিসের নাগরিকরা আনাতোল ফ্রাঁসের টাটকা বই পড়েননিÑ এ কথা বলতে লজ্জিত হতেন। সভ্যতা বলতে যদি উন্নত মানবসমাজের বহিরঙ্গ রূপকে বোঝানো হয় তবে সে সভ্যতার অন্যতম উপাদান হলো বই ও পত্রপত্রিকা পাঠ।
বই পাঠককে শুধু আনন্দই দান করে না, বই সভ্যতার ধারক ও বাহকও বটে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা এবং বিভিন্ন জাতির প্রাচীন ইতিহাস আমরা বই পড়েই জানতে পারি। সব সভ্য মানুষই বই পড়ে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনের দিগন্ত প্রসারিত করেছে। আমরা জাতি হিসেবে এখনো প্রাগ্রসর নই। এর পেছনে রয়েছে বইয়ের প্রতি আমাদের অনাগ্রহ। আর এ কারণেই আমাদের জ্ঞানের পরিধির বি¯ৃÍতি ঘটছে না। ফলে আমর প্রায়ই সঙ্কীর্ণতা বা কূপমণ্ডুকতার শিকার হই।
সাহিত্য জীবনেরই প্রতিবিম্ব। আর আমাদের জীবন ও জগতের গতিও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তাই জীবনকে নিয়ে রচিত সাহিত্য বা বইও যে বৈচিত্র্যময় হবে এটাই স্বাভাবিক। এ কারণেই নানামাত্রিক বইয়ের বিপুল সম্ভারে ভরে উঠেছে আমাদের পাঠাগার। সে পাঠাগারে দেখা যায় নানা রুচি-অভিরুচির পাঠকদের; যারা তাদের পছন্দমতো বই পড়ে থাকেন। একশ্রেণীর পাঠকদের যেমন সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞানবিষয়ক বই আনন্দ দিয়ে থাকে তেমনি অন্য শ্রেণীর পাঠকরা পৌরাণিক উপাখ্যান বা মিথোলজি পাঠে আনন্দ খুঁজে পান। এ কারণেই আমরা এখনো দেখি সেই প্রাচীনকালের মহাকবি হোমারের লেখা ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ পড়তে; সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ নাটক পড়ে পাঠকের মন এখনো ট্র্যাজেডিতে আচ্ছন্ন হয়। ওমর খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ এখনো পাঠকদের চিন্তাশীল করে তোলে।
এ ছাড়া বই বা পত্রপত্রিকা পাঠে আরো বিভিন্ন ধরনের পাঠক রয়েছে। এবার এদের রুচি-অভিরুচি সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।
এক ধরনের পাঠক আছেন তারা সব ধরনের বই বা পত্রপত্রিকা পড়ে থাকেন। তারা পাঠে অভিরুচি তৈরিতে সব ধরনের বই পড়ার অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে চান। এভাবেই তারা সিরিয়াস পাঠক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। কিছু পাঠক আছেন অল্প কিছু পাঠ করেন আর বেশির ভাগই নষ্ট করেন। জার্মান দার্শনিক ফেদরিক এদেরকে দস্যু প্রজাতির পাঠক বলেছেন। আবার কিছু পাঠক আছেÑ তারা শুধু মৌয়ালের মতো চাক থেকে মধু সংগ্রহ করে মজা লোটেন। এদের পড়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে শুধু আনন্দ বা মজা নেয়া। তবে এটা কোনো দোষের কিছু নয়; কেননা সব পাঠকই পড়া থেকে মজা নিতে চায়। এমন কিছু পাঠক আছে তাদের ভালো না লাগলেও পড়তে হয়। এদেরকে পেশাদার পাঠক বলা যায়। শিক্ষক, আইনজীবী, পত্রিকাওয়ালা, কম্পোজার প্রমুখ এ শ্রেণিভুক্ত। বাধ্য হয়েই তারা প্রতিদিন শত শত পৃষ্ঠা পড়েনÑ ইচ্ছে করলেও পড়া বাদ দিতে পারেন না। এরা আমাদের অপরিহার্য এবং গুরুত্বপূর্ণ পাঠক। আবার এমন কিছু পাঠক আছেন যারা বইয়ের মধ্যে তত্ত্বের অনুসন্ধান করতে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাশ হন। কারণ তারা সাহিত্যের রস আহরণ করতে জানেন না। তত্ত্বকথার মধ্য দিয়ে জ্ঞান এবং রস উভয়ই আহরণ করা যায়। আর এর বিপরীতধর্মী পাঠক অর্থাৎ বোদ্ধা পাঠকরা সাহিত্য পাঠে আনন্দ লাভের সঙ্গে নিজের চিত্তবৃত্তিরও উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকেন।
পাঠক যদি বই পড়ে আনন্দ লাভ করে সে ক্ষেত্রে লেখকের সার্থকতা। কেননা পাঠক বেশি বই পড়লে লেখক আরো লিখতে উৎসাহিত হবেন। কিন্তু পাঠক যদি কোনো বই গ্রহণ না করে তবে সে লেখক ব্যর্থ। বই মানুষকে এমন আনন্দ দান করে যে কারণে পাঠক অনেক সময় নাওয়া-খাওয়া ভুলে বই পাঠ করে থাকেন। তবে সেক্ষেত্রে বইটি যেমন মানসম্পন্ন তেমনি আকর্ষণীয় হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কবি ওমর খৈয়ামের সেই বিখ্যাত উক্তিটি উল্লেখ করা যায়Ñ ‘রুটি, মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়।’
জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচিত্র শাখা-প্রশাখা মানুষের ধ্যান-ধারণার যে প্রতিফলন ঘটেছে তা স্থান পেয়েছে বইয়ের পাতায়। জগৎ ও জীবনের সান্নিধ্যে মানুষ যে বিপুল জ্ঞানার্জন করেছে তা বিধৃত হয়েছে বইয়ের কালো অক্ষরের মাধ্যমে। মানুষ তার জীবন গঠনের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পায় বই থেকে। উৎকৃষ্ট বই মানুষকে যেমন সৎপথে পরিচালিত করে তেমনি নিম্নমানের বই মানুষকে বিপথে নিয়ে যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেনÑ ‘আজ সাহিত্যের মার্কা নিয়ে একটা জিনিস বাজারে চলছে। শুনি তার বাজারেও কাটতি কম না, বিশেষ করে যুবক মহলে। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে তরুণ-তরুণীদের একটা অপূর্ণ দুর্দান্ত ইচ্ছাকে রক্ত-মাংসের কল্পনা দিয়ে পূর্ণ করা।... হায়! অবোধ পাঠক জানে না সাইক্লোনের বাঁশির সুরের ন্যায় এই অসাহিত্য তাকে ধ্বংসের দিকে পলে পলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’
ড. শহীদুল্লাহ বাজারি সাহিত্য সম্পর্কে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা আজ ফেসবুক আসক্ত পাঠকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম বইপড়া থেকে ফেসবুক পাঠের দিকেই বেশি মনোযোগী। অনেকেই মনে করেন ফেসবুক শুধু তরুণ নয়, সব ধরনের পাঠককেই বই পড়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ১২ থেকে ১৮ বয়সী ২৪০০ কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে একটা জরিপ করা হয়েছিল। যারা দিনের ৬ ঘণ্টাই কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইলের সামনে বসে থেকে সময় কাটায়। তারা বই পড়া তো দূরের কথা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতেও সময় পায় না।
তবুও এখনো অনেক মানুষ বই ও পত্রপত্রিকা উভয়ই পড়ে। প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষ্যে প্রচুর বই প্রকাশিত হয়ে থাকে এবং এগুলো বিক্রিও হয়। একুশে বইমেলাসহ সারা বছর কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্যসহ বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশিত হয়ে থাকে এবং পাঠকরাও তাদের রুচি-অভিরুচি অনুযায়ী বই ক্রয় করে থাকে। বই পাঠে যদি একেবারেই অনীহা থাকত তবে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার বই বিক্রি হতো না। আমরা যতই ফেসবুক বা অনলাইনে বিভিন্ন সংবাদ দেখি বা পড়ি না কেন; এ সত্ত্বেও অনেকেই মুদ্রণজাত দৈনিক পত্রপত্রিকা, সাপ্তাহিক সাময়িকী পড়ে থাকি। যদি না-ই পড়তাম তবে পত্রিকার কাটতি কমে যেত এবং পত্রিকাও এক সময় বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি কোনো শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা পাঠকের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বরং পাঠকের চাহিদার কারণে নিত্যনতুন পত্রপত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটছে।
প্রমথ চৌধুরী বলেছেনÑ ‘সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্ব প্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লোকে যা তা সন্দেহ করে তার কারণ এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজার দর নেই। জ্ঞানের ভাণ্ডার যে ধনের ভাণ্ডার নয়, এ সত্য তো প্রত্যক্ষ কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও এও সমান সত্য যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য সে জাতি ধনের ভবানী।’ সুতরাং জ্ঞানের ভাণ্ডারকে উৎসাহিত করতে হলে যে বই পড়া জরুরিÑ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। অতীতকালের ইতিহাস থেকে শুরু বর্তমান জীবনের নানা রসদ এবং আগামী দিনের পথ পরিক্রমার ভবিতব্য নির্ণীত হয় বই পাঠের মাধ্যমে।
পরিশেষে বলা যায়, যুগের পরিবর্তনে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয় বা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। একসময় মানুষের বিশাল মহাকাব্য কিংবা পুঁথি পাঠের প্রতি আগ্রহ বা শোনার ধৈর্য ছিল। যুগের পরিক্রমায় এখন কেউ মহাকাব্য পাঠ করে না কিংবা পুঁথিপাঠও কেউ শোনে না। তখন মানুষের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল কিন্তু এখন ডিজিটালের এ ব্যস্ত যুগে মানুষের হাতে সময় কোথায়? তাই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ যেমন যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, তেমনি তাদের রুচি-অভিরুচিরও পরিবর্তন ঘটেছে। আর এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিরও একটা অংশ বটে। হ
মানব মনের চিরন্তন অভিপ্রায় হলোÑ অজানাকে জানা। প্রকৃতি থেকে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা বা আনন্দ-বেদনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া গেলেও পরিপূর্ণ জ্ঞানে স্নাত হওয়া যায় না। অনেকে...
