বনে যদি ফুটল কুসুম
নেই কেন, নেই কেন, সেই সুর
বনে বনে প্রচুর ফুল ফুটেছে। মাধবী, বকুল, চাঁপা, চামেলি, শেফালি, মালতি, পারুল, নানা বর্ণের নানা ছন্দের ফুল ফুটিয়ে কেটেছে আষাঢ় ও শ্রাবণ। ভাদ্র আশ্বিন মাস অবধি মেঘ জমেছিল অঝোর ধারায় বর্ষণ নিয়ে। এখন কার্তিকে এসেও বৃষ্টির আনাগোনা চলছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর চরে কাশবনের সাদা আকাশ দিয়ে পাখা মেলা সাদা বলাকা, তবু যেন মনে হয় বাংলার ঋতুগুলো এখন এক সাথে মিতালি করে চলছে।
এবার সবজি ও ফল প্রচুর এসেছে বাজারে। লাউ, ঝিঙা, পটোল, কুমড়া, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ডাঁটা, বরবটি, কাঁকরোল, শিম, মুলা এমন কি অসময়ের নানা ধরনের সবজিও পথ ভুলে চলে এসেছে। মাছের বাজারে আগুন লাগার উপক্রম, তবু কমতি নেই আমদানির। ইলিশ, রুই, কাতল, মৃগেল, রূপচাঁদা, পাঙ্গাস, কৈ, পুঁটি, তেলাপিয়া কত না ডিজাইনের মাছ বাজারে উপচে পড়ছে। দাম অবশ্য মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার পরোয়া করছে না। এক মুঠো ভাত আর এক হাতা ডাল যাদের নিত্যদিনের চাহিদা তারা এ সবের খবর রাখে না। মানুষে মানুষে এই যে বৈষম্য এটি মানুষেরই সৃষ্টি। স্রষ্টা একইভাবে তার শিল্পকর্ম করেন, সব মানুষ ভাই ভাই এই তার আদর্শ।
পথে বের হলেই দেখি শীর্ণ দু’টি হাত, করুণ তার আকুতি ‘আম্মা তোয়ালে নেবেন, খুব সস্তা মাত্র ২০ টাকা, যদি ছয়টি নেন ১০০ টাকায় দিয়ে দেবো’।
আরেকজন এগিয়ে আসে দুই হাত ভর্তি সাদা দোলনচাঁপার গুচ্ছ। এখানে দরাদরি শুরু হয় :
‘মাত্র দুইশ’ টাকা,
দুইশ’ কিরে, একশ’-তে দাও
না আম্মা একশ’ না আরো পঞ্চাশ টাকা দেন’
‘অত হবে না
ঠিক আছে আরো ২০ টাকা দেন তা হলেই হবে’
দরদামের শেষে দুই আঁটি দোলনচাঁপা নিয়ে আমি তার খুশবু নিই।
জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি
জোটে যতি দু’টি তবে অর্ধেকে ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী
বড় বড় অট্টালিকার কারাগারে বন্দী নাগরিক জীবনে সুকুমারবৃত্তিগুলো পথ হারিয়ে ফেলছে। যেখানে আকাশ দেখা যায় না, মুক্ত বাতাস পাওয়া যায় না, রাস্তায় নানা রকম আবর্জনা সেখানে মানুষ দমবন্ধ হয়ে পড়ছে।
এত যে সন্ত্রাস, হানাহানি, বিবাদ-বিসম্বাদ তার মূলে কাজ করে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা। রুক্ষ বিষণœ রাগান্বিত হয়ে পড়ছে অকারণে। একটু ক্ষমা, একটু ধৈর্য, একটু উদারতা একটু পরমতসহিষ্ণুতা কেন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। শ্যামল বাংলার শ্যামলিমাখা অন্তর আবার আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ছুটির দিনে সব বিষণœতা ঝেড়ে ফেলে প্রকৃতির কাছে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেয়ার ফুরসত খুঁজে বের করতে হবে। তা হলে দেখা যাবে আকাশের উদারতা, বাতাসের হিমেল হাওয়া, কাশবনের শুভ্রতা আমাদের অন্তরকে আবার ফিরিয়ে দেবে তার জন্মলগ্নের পবিত্র উদারতা। হ
বনে যদি ফুটল কুসুমনেই কেন, নেই কেন, সেই সুরবনে বনে প্রচুর ফুল ফুটেছে। মাধবী, বকুল, চাঁপা, চামেলি, শেফালি, মালতি, পারুল, নানা বর্ণের নানা ছন্দের ফুল...
