কিছু সুপারিশ
বাংলাদেশের উন্নয়নের সমস্যা ও সম্ভাবনার উজ্জ্বল দিকগুলো আলোচনা করতে চাইলে কিছুটা পেছনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আশানুরূপ না হলেও সন্তোষজনক ছিল এ পথচলা। তবে আমাদের সম্ভাবনা ছিল আরো বেশি। আলোচনা-পর্যালোচনা প্রয়োজন, ঠিক কোন কারণে এর সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারিনি; দেশকে দ্রুত এগিয়ে নেয়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। যে খাতগুলো আমাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং সেবা। ব্যাংকিং খাতের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। ব্যাংকিং খাতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব কেবল এ খাতের ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য খাতে। একে বলা হয় ফিন্যান্সিয়াল কনটাজিয়ন (ঋরহধহপরধষ ঈড়হঃধমরড়হ) অর্থাৎ সংক্রামক ব্যাধির মতো সেটা উৎপাদনশীল ও অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে যায় এবং চূড়ান্তভাবে এর প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে। ব্যাংকিং খাতে যে দেশ যত উন্নত, সে তত সমৃদ্ধ।
কিছু উদাহরণ একেবারে জাজ্জ্বল্যমান। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটের সূত্রপাত ব্যাংকিং খাত থেকে। এরপর ধীরে ধীরে তা অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। বেকারত্ব বাড়তে থাকে। বিনিয়োগ-উৎপাদন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে, এখন ইউরোপে আর্থিক সঙ্কটটি ছড়িয়ে পড়েছে। সাইপ্রাস, স্পেন, গ্রিস এখনও ওই সঙ্কট থেকে বেরোতে পারেনি। এমন এক মুহূর্তে কিছু দিন আগ পর্যন্তও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে সুশৃঙ্খল খাত হিসেবে বিবেচিত ছিল। কমপ্লায়েন্স বজায় ছিল এবং মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল এগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে কতগুলো অনভিপ্রেত ঘটনায় খাতটি বড় রকমের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে সুযোগ রয়েছে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের।
দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও প্রাইভেট ব্যাংক রয়েছে। মালিকানা ভিন্ন হলেও কার্যক্রম মোটামুটি সবারই অভিন্ন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। এ ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে সরকার। পরিচালকদের নিয়োগ করা হয় মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায়। ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিতরাও দক্ষতা অনুযায়ী পদোন্নতি পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে হলমার্কের মতো বিরাট কেলেঙ্কারি ঘটে যায় রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ ব্যাংক সোনালীতে। এটা ঋণ ছিল না, অর্থ হাতিয়ে নিতে সাজানো হয়েছিল সব। বোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত অনেক কর্মকর্তার সাথেই হলমার্কের যোগসাজশ ছিল বলে জানা যাচ্ছে। বলতে হয়, পুরো ব্যবস্থায় ফাটল ধরেছে। একই ঘটনা বিসমিল্লাহর ক্ষেত্রে ঘটল। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। সম্প্রতি তাতে ছেদ পড়েছে। নানা অনিয়ম দেখা দিচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার নতুন নতুন ঘটনা। রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে এখান থেকে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় একই ঘটনা ঘটছে। অবশ্য বেসরকারি ব্যাংক সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না, করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানেও ব্যবস্থাপনার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা কম। বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ কথা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে গেছে। এটি হয় সাধারণত যখন বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা ব্যবস্থাপনায় সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার অভাব পরিলক্ষিত হয়, দুর্নীতি প্রবেশ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার সাথে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অনিয়মগুলো ঘটছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব নিয়মাবলি রয়েছে তার মধ্যে রেগুলেটরি ক্যাপিটাল নিয়ন্ত্রণ, ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট (নিয়োগসংক্রান্ত), অডিট প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এগুলো যথেষ্ট ভালো ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাসেল-১, ব্যাসেল-২ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটিও ভালো দিক। আমাদের ব্যাংক কোম্পানি আইনেও কিছু বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে পালন করলে ব্যাংকিং খাত সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন নিয়ে। ব্যাংকিং খাতে কমপ্লায়েন্স ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। কমপ্লায়েন্স দেখভালের মূল দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর। দ্বিতীয় হচ্ছে, এগুলো সঠিকভাবে নজরদারি। কমপ্লায়েন্স না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিকমতো নজরদারি বা পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সময়োচিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকতে পারে। বাইরের অন্যান্য প্রভাবের বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। যথাযথ দক্ষতারও অভাব রয়েছে অনেক কর্মকর্তার। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সমন্ব^য়ে দুর্বলতা রয়েছে। এ সমস্যা দূরীকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের ক্ষমতা, দক্ষতা ও সততা দ্রুততার সাথে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং খাতে উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে না পারলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের যে অর্থনৈতিক সূচকগুলো রয়েছে, তার মধ্যে ফরেন এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলিটি বা বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বিদ্যমান। রেমিট্যান্স আসছে। রফতানিও মোটামুটি ভালো। যদিও মধ্যে হোঁচট খেয়েছিল। উদ্বেগের বিষয়, দেশের তৈরি পোশাকশিল্প চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এখন। আশা করি, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
অভ্যন্তরীণ শিল্প-কারখানার বিকাশে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এটা দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকগুলো গতিশীল হলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্ট সংশোধন করা হল সম্প্রতি। এ সংশোধনীর বিষয়টি বহু আগেই উপলব্ধি করা হয়েছিল। আইন সব সময় সংশোধন করা যায় না। সেজন্য অনেক সময় লাগে। এটাকে সংশোধনের উদ্যোগ ভালো, তবে অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবার। এক্ষেত্রে বর্তমান সংশোধনীকে সুযোগ হিসেবে নেয়া যেত, কিন্তু সরকার এটি হাতছাড়া করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনটি এখনো সম্পূর্ণভাবে যুগোপযোগী হয়নি। আমাদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদার আলোকে আরো কয়েকটি সংশোধনী আনা উচিত ছিল। সংশোধন করা হয়েছে আংশিক। প্রথমেই কিছু ইতিবাচক দিক বলা যেতে পারে।
ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার লিমিট, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, রিটার্ন আর্নিং, প্রভিশনিং প্রভৃতি ক্ষেত্রে আনা সংশোধনী ইতিবাচক। বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যেমন- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী প্রয়োজনে সরিয়ে দিতে পারবে। এটিকে আংশিক ভালো বলা যায়। বিধান করা হয়েছে, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালক পদে নিযুক্ত থাকা অবস্থায় অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু সংশোধনী আবার ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বোর্ড অব ডিরেক্টরের সংখ্যা ২০ জনে সীমিত করা হয়েছে। এটি অনেক বেশি। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২০ জন পরিচালক থাকা মানে নানা বিষয়ে ঝগড়া, মতনৈক্য সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা বৃদ্ধি। নিজেদের মধ্যে সংহতি থাকবে না। এতে ভালো ফলও পাওয়া যায় না। আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তখন ১৩ জন পরিচালক থাকার বিধানের কথা বলা হয়েছিল। দু-একটা ব্যাংক এটি চায়নি। পরে তারা আইনের আশ্রয় নিয়েছিল। ১৩ জনের মধ্যে দুজন স্বাধীন; অর্থাৎ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালাতে ১১ জন পরিচালকই যথেষ্ট। অন্যান্য দেশেও বোর্ড অব ডিরেক্টরস এত বড় হয় না। ২০ জন পরিচালকের বিধান রাখা ঠিক হয়নি। এখানে সমঝোতা হয়েছে বলে ধারণা।
বলা হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালক পদে নিযুক্ত থাকা অবস্থায় অন্য কোথাও যুক্ত হতে পারবেন না। তবে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন। আমার সময় প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালকও হতে পারবেন না। ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য আর্থিক খাতÑ এ তিনটায় ভিন্ন ভিন্ন পরিচালক মনোনীত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার এখানে নমনীয়তা দেখিয়েছে। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে প্রধান নির্বাহী সরিয়ে দিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে বোর্ড অব ডিরেক্টরসে চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন উঠেছিল, সে ব্যাপারে সমাধান মেলেনি। প্রধান নির্বাহী কাজ করেন পরিচালনা পর্ষদের অধীনে। তার মানে হস্তক্ষেপের জন্য একটা সুযোগ রেখে দিয়েছে সরকার। তবে একটা ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয় এমন সব প্রতিষ্ঠান আমানত সংগ্রহ করলে তা তদন্ত করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখানে তদন্তই মূল বিষয় নয়। তদন্ত তো এখনো হচ্ছে। তদন্ত করে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেদিকেই দৃষ্টি রাখতে হবে। এখানে আইনের বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত ছিল। আমাদের প্রচলিত পেনাল কোড ও দুর্নীতি দমন আইনের মাধ্যমে আর্থিক খাতের দুর্নীতি রোধ করা বা দোষীদের যথাযথ শাস্তি দেয়া যায় না। তাই আলাদা আইন করা প্রয়োজন। অন্য দেশে আর্থিক খাতে সংঘটিত অনিয়ম তদন্ত ও বিচারের জন্য আলাদা এজেন্সি-বিচার ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশে আর্থিক খাতে সংঘটিত দুর্নীতির তদন্ত করছে দুদক। তাদের এ-সংক্রান্ত দক্ষ জনবল নেই বললে চলে। তার ওপর রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তারা পরিদর্শন, নিরীক্ষা প্রভৃতি করতে পারে কিন্তু আইন প্রয়োগ অর্থাৎ বিচার করতে পারে না। এজন্য আলাদা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা বিদ্যমান সংস্থাকে আলাদা ক্ষমতা দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খুব উন্নত হবে বলে ধরে নেয়া যাচ্ছে না। আগের নিয়মাবলি কিন্তু খারাপ ছিল না। আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল বটে। সেগুলো ঠিক করতে পারলেই হতো। নতুন সংশোধনী করা হয়েছে অনেকটা দায়সারা গোছের। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দক্ষতা বা ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এখন ব্যাংকিং সেবা নিয়ে অনেক অভিযোগ মিলছে। গ্রাহকরা বলছেন, ব্যাংক ঠিকমতো সেবা দেয় না। চার্জ বেশি আদায় করছে। এটি রাষ্ট্র্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ব্যাংকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হলে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর গুণগত মান অর্থাৎ সেবার মান উন্নত করতে হবে। শুধু শাখা বাড়িয়ে আর ব্যাংকের নিজস্ব জমি কিনে এটি অর্জন করা যাবে না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যয় ও অর্থ অপচয় কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সব ব্যাংককে আরো সচেষ্ট হতে হবে। ব্যাংকগুলো বলছে, তাদের মুনাফা কমে গেছে, ট্যাক্স বেড়ে গেছে। পরিচালনা ব্যয় বা অপারেটিং কস্ট কমাতে পারলে ব্যয় অনেক কমে আসত। ব্যাংকগুলো তা করছে না। আমাদের বাজার প্রতিযোগিতামূলক নয়। প্রতিটি ব্যাংক বাজারের নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের করে নিচ্ছে। একে বলা হয় সেগমেন্টেড মার্কেট। অর্থাৎ প্রতিটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকগোষ্ঠী রয়েছে। কিছু বড় ঋণগ্রহীতা রয়েছে। ওই সব বড় ক্লায়েন্টকেই কেবল ভালো সেবা দেয় তারা। কিন্তু আমানত সংগ্রহ করে জনসাধারণের কাছ থেকে। নতুন ব্যাংকগুলো আসার পর এ প্রক্রিয়া আরো জটিল হয়ে গেছে। কারণ তারাও চাইবে নিজস্ব গোষ্ঠী গড়ে তুলতে। এরই মধ্যে তারা এ প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে খবর মিলছে। অন্যান্য ব্যাংকের সঞ্চয়ে হাত দেবে তারা। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে আমানত আনার চেষ্টা করবে নতুন ব্যাংকগুলো। এতে সেবার মান বাড়বে না। আগামী দিনে এটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। একটা উদাহরণ দিই। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকে তারল্য বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংকাররা সিদ্ধান্ত নিলেন, সঞ্চয় আহরণের রাশ কিছুটা টেনে ধরবেন। তাই তারা ঋণে সুদের হার না কমালেও কমিয়েছেন আমানতের সুদের হার। এটা কোনো কাজের কথা নয়। সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার কমাতে হবে কেন? ব্যাংকগুলো গ্রুপ করে একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা সুদের হার নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অথচ বাজার হচ্ছে উন্মুক্ত। ব্যাংকগুলো নিজ থেকে সুদের হার নির্ধারণ করবে। অথচ হচ্ছে তার বিপরীত। মনোপলি, কোটারি করে এটা কেন করা হবে? স্বতন্ত্রভাবে কারো উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলে ব্যাংক তা সদ্ব্যবহার করতে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে ঋণের ওপর সুদের হার বর্তমানে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। এটা ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, অনেক সময় ঋণ পরিশোধে তাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। আমানতের সুদের হার এবং ঋণের সুদের হারের মধ্যে যে ব্যবধান অর্থাৎ ‘স্প্রেড’, সেটা বাংলাদেশে বেশি, গড় ব্যবধান ছয়ের মতো। এটাকে কমিয়ে এনে দু-তিনের মধ্যে আনতে হবে। সম্প্রতি সরকার থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে আমানতের সুদের হার ছয়ের বেশি হবে না এবং ঋণের সুদের হার ৯ এর বেশি হবে না। সুদের হারের এই ধরনের নির্দিষ্ট সীমা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। দেখতে পাচ্ছি ব্যাংকগুলো এটা করতে পারছে না। বাজার ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন নয়। তিনটি জিনিস বাস্তবায়ন করলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে অর্থাৎ ‘স্প্রেড’ কমানো যেতে পারে। প্রথমত : খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, দ্বিতীয়ত: ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে, তৃতীয়ত: ব্যাংকের মুনাফা অর্জনের যে উচ্চাকাক্সক্ষা সেটা ত্যাগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করতে চাই, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি। এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর দেয়া উচিত। সম্প্রতি তারা ঋণ পুনঃতফসিলীকরণে কিছুটা নমনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ।
সেগমেন্টেড মার্কেটে ব্যাংকাররা বিশেষ শিল্পের প্রতি নজর দেন। ওই শিল্পে আর্থিক বিনিয়োগের ব্যাপারে ভালোভাবে যাচাই বা মূল্যায়ন করেন না। অন্যান্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করেন ব্যাংকাররা। নিজেদের পছন্দের গোষ্ঠী যে শিল্প-কারখানা স্থাপন করুক বা এর উদ্যোগ নিক না কেন তাদেরই ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকারদের এমন একমুখী মনোযোগের কারণে নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি হচ্ছে না। বিদ্যমানগুলো বড় থেকে বড় হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ব্যবসা ও ঋণ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ব্যাংকের জন্য এটিও ক্ষতিকর। ব্যাংকগুলোর মধ্যে অঞ্চলপ্রীতিও কাজ করে। বাংলাদেশে সুষম উন্নয়ন হচ্ছে না; কোনো কিছুর বিকেন্দ্রীকরণও হচ্ছে না। উন্নত হয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি শহর। আর নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিই দেশের শিল্প-ব্যবসার বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে তাদের কাছে দেশের অর্থনীতি এমনকি সরকার জিম্মি হয়ে পড়ছে। এমনিতেই ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের কথা বলছে, সেটি অর্জনে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রমকে সেই উদ্যোগে পরিচালিত করতে হবে।
ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এই সঙ্কট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত হাতে, কোনো রকম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া, ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সময়োচিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। সব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী বোর্ড, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সবাইকে কমপ্লায়েন্স মানতে বাধ্য করতে হবে। যেটি কিনা হলমার্ক, বিসমিল্লাহর ক্ষেত্রে করা হয়নি। এতে অসৎ ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যান এবং সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। চূড়ান্তভাবে জনগণের ওপর এর প্রভাব পড়ে। ব্যাংকিং খাত উন্নত হলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে, উন্নয়ন হবে সুষম। জনগণের দোরগোড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে ব্যাংকিং খাতকে ভালোভাবে সাজাতে ও একে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। হ