যুদ্ধে যখন ছিলাম তখন এবং তার আগের সময়টি ছিল অগ্নিগর্ভ। অগ্নিময় সেই সময় থেকে বেরিয়ে এসে একটি শান্তির দেশ, সার্বভৌম স্বাধীন দেশই সে সময়ের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আরাধ্য। সুতরাং যুদ্ধটা ছিল মূলত অন্যায় যুদ্ধ এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তিকামী মানুষের ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। আর এই অন্যায় যুদ্ধটি নির্মমভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ন্যায়কামী এ দেশের বেশির ভাগ মজলুম জনতার ওপর।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সহস্র উত্তোলিত হাতে দৃঢ়তার উদ্ধত কৃপাণ। মুষ্টিবদ্ধ হাতে বারবার একটিই দৃঢ় উচ্চারণÑ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। এই স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছিল নগর-শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। সে স্লোগান ভীষণভাবে উদ্বেলিত করেছিল আমাকেও। উত্তাল মার্চ। অসহযোগ আন্দোলনে ভেঙে পড়েছে সারা দেশের প্রশাসনিক কাঠামো। এক ধরনের মন্ত্রমুগ্ধতা সবার চোখে মুখে। সেই সাথে আমারও। বাবা ছিলেন মওলানা ভাসানীর শিষ্য। প্রগতিশীল বাবার কাছ থেকে সাম্য-স্বাধীনতার পাঠ নিতে আমারও কোনো বাধা পার হতে হয়নি।
তখন আমি মাত্র দশম শ্রেণীর ছাত্র। আমাদের সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলের চারজন তরুণ শিক্ষক রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদেরও কমিউনিস্ট পার্টির পিচ্চি ক্যাডার তৈরির মহান ব্রতে রত। আমরা ক্লাসের কয়েকজন বন্ধু তখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি একটি সমাজতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিকভাবে বিশে^র দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক চীনের পথে দৃঢ়তার সাথে হাঁটতে শুরু করেছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ সাম্রাজ্যবাদ আক্রান্ত দেশ। এর হাওয়া এসে লেগেছে পাক-বাংলা-ভারত উপমহাদেশেও। সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার দুই মুরুব্বি চীন আর সোভিয়েত রাশিয়া। ৬০ এর দশক থেকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার তাত্ত্বিক লড়াইটায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন দু’ভাগে বিভক্ত। সেই বিভাজনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট আন্দোলনও দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সেই বিভক্তিতে চীনপন্থী ও রুশপন্থী বলে দু’টি ধারা আত্মপ্রকাশ করে।
আমাদের স্কুলের শিক্ষক বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা মোফাজ্জেল স্যার (যিনি ৯ অক্টোবর ’৭১ খানদের হাতে শহীদ হন) ১৯৭১ এর এপ্রিলে একদিন তার অনুসারীদের ডেকে একটি মিটিং করলেন। বললেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এলাকার কিছু উৎসাহী যুবক তার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ স্বাধীনের স্বপ্নে ইপিসিপির (এমএল) নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুললেন। কিন্তু বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যই নিরক্ষর এবং রাজনৈতিক জ্ঞান বলতে তাদের কিছুই ছিল না। তার ওপর বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যই জনবিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় মে মাসের দিকে মোফাজ্জেল স্যার তার অনুসারীদের ডেকে বললেন, এই যুদ্ধে শোষিত জনগণের মুক্তি নেই। এটি ‘দুই কুকুরের লড়াই’। আমরা বিস্ময়ের সাথে তার এই কথাগুলো শুনলাম। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তখন আমার মধ্যে। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খবর আসছে পাকবাহিনী ও তার দোসরদের হাতে নিরীহ বাঙালি হত্যার কথা। আসছে প্রতিরোধের খবর। খুলনার চুকনগর গণহত্যা, সাতক্ষীরার পারকুমিরা গণহত্যা, হরিণখোলা গণহত্যা, জালালপুর গণহত্যা, কলারোয়ার ঝাউডাঙ্গা গণহত্যার মধ্য দিয়ে অসংখ্য হিন্দু-মুসলমানকে হত্যার এক তাণ্ডব মহড়া চলছে চার দিকে। সেই সাথে চলছে ভারত অভিমুখে শরণার্থীদের কাফেলা। এর সব কিছুকে উপেক্ষা করে ইপিসিপির (এমএল) ‘দুই কুকুরের লড়াই’-এর তাত্ত্বিকতা সাধারণ জনগণের অগ্রসর অংশ একেবারেই মেনে নিতে পারেনি।
সুতরাং, অনেকের সাথে আমারও গন্তব্য ভারত। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের খবর আর দেশত্ববোধক গানে উজ্জীবিত আমরা। একদিন বাবাকে না বলেই ভোরে আমরা কয়েকজন বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম ১৯৭১ এর জুলাই এর প্রথম সপ্তাহে। ভোরে সম্ভবত না খেয়েই হাঁটা দিয়েছিলাম। সাগরদাঁড়ির কপোতাক্ষ তীর থেকে বর্ডারের দূরত্ব সে সময়ের ২০ মাইলের মতো। ঘণ্টায় এক নাগাড়ে হাঁটলেও ৭ ঘণ্টার পথ। পথে পথে বিপদ। সোজা পথে চলা দায়। সুতরাং বাঁকাপথে আরো সময় বেশি লাগার কথা। অবশেষে বিকেলের দিকে বর্ডারের ওপারে আমুদিয়া বাজারে গিয়ে উঠলাম আমরা সতীর্থ সাতজন। বাজারে এক ব্যবসায়ীর গোডাউনে রাত জেগে মশার কামড় খাওয়া। পরদিন সোনাই নদী হয়ে বশিরহাট। বশিরহাট শহরের মেইন রোডের ওপর বেতার ভবন বলে একটি দোকান ছিল। তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং অফিস। রিক্রুটিং এর দায়িত্বে ছিলেন বাগেরহাটের ছাত্রনেতা আমিরুজ্জামান বাচ্চু। বৃহত্তর খুলনার মুজিব বাহিনী প্রধান বর্তমানে বাগেরহাট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান টুকুর কনিষ্ঠ ভাই ছিলেন তিনি। সেখান থেকে অন্যদের সাথে আমিও দক্ষিণ ২৪ পরগনার তকিপুর ক্যাম্পে চলে যাই সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য। সেখানে আমি ১০ দিনের প্রশিক্ষণ নেয়ার পর তালার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আলাউদ্দিন আমাকে ক্যাম্প থেকে ফিরিয়ে নিয়ে বশিরহাট হরিমোহন দালাল গার্লস হাইস্কুলের সামনে একটি বাড়িতে রাখেন। ওই বাড়িতে থাকতেন খুলনার কামরুজ্জামান টুকু, স ম আলাউদ্দিন এমপি, ছাত্রনেতা আবদুস সালাম মোড়ল, মোস্তাফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর, জাহিদুর রহমান কুটু, বাগেরহাটের এমপি আবদার রহমান প্রমুখ। মাঝে মধ্যে আসতেন শাজাহান সিরাজও।
পরিকল্পনা চলছিল কিভাবে খুলনা মুজিববাহিনী নিয়ে ঢোকা যায়। মনে আছে সবাই বৃহত্তর খুলনা জেলার একটি বড় মানচিত্রের ওপর ঝুঁকে আছেন, আর কুটুু চাচা কাগজ কলম নিয়ে মানচিত্র থেকে সাতক্ষীরাসহ খুলনার রাস্তাঘাটগুলো ম্যাপের ভেতর থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
এখান থেকে কয়েক দিন পর হঠাৎ আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ইপিআর মতিয়ার রহমানসহ আমি আমুদিয়া বর্ডার পার হয়ে ঝাউডাঙার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরা মহকুমার তালায় প্রবেশের চেষ্টা করি। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে পাকবাহিনী ও তার সহযোগীদের প্রবল উপস্থিতির কারণে আমরা আবার বশিরহাটে ফিরে আসতে বাধ্য হই। সন্ধ্যার দিকে বশিরহাট শহরে প্রবেশ করতেই দেখি সারা শহরে ব্লাক আউট আর সাইরেন বাজছে। বাসার গেটে পৌঁছাতেই ইঞ্জিনিয়ার চাচা লোহার গেট খুলে দিলেন। বললেন, নকশালরা থানা আক্রমণ করেছে, তাই এই সাইরেনের শব্দ। বলা বাহুল্য, ইতোপূর্বেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) নেতা চারু মজুমদারের তুলে ধরা ‘শ্রেণিশত্রু’ খতমের তত্ত্বটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে বৃহত্তর খুলনা ও যশোরের ইপিসিপি (এমএল) কমিউনিস্ট সমন্বয় কমিটি। আর এ প্রেক্ষিতে বৃহত্তর খুলনার ডুমুরিয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, বৃহত্তর যশোরের কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর, নড়াইল অঞ্চলে পুুরোদমে চলছে ‘শ্রেণিশত্রু খতম’। সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টি অধ্যুষিত এলাকা মুক্তিযোদ্ধা ও কমিউনিস্ট পার্টির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য খুব বেশি সহায়ক ছিল, তা বলা যাবে না।
পথ বন্ধুর। যেতে হবে অনেক দূর। আমাদের দু’জনের ওপর দায়িত্ব ছিল তালা থানার মাগুরার শেখ শামসুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে মুজিববাহিনীর থাকার জায়গা বা ক্যাম্প এলাকায় পৌঁছানোর পথটি নির্দিষ্ট করা। আমরা আবার যথারীতি দুই দিন পর বেরিয়ে পড়লাম। যোগাযোগ করলাম শেখ শামসুর রহমান চাচার সাথে। তিনি একটি খাম ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। সেটি আমি পৌঁছে দিলাম একই থানার কাশীপুর গ্রামের আবু আলম ভাইয়ের কাছে। সেখান থেকে হাতবদল হয়ে বশিরহাটের হরিমোহন দালাল গার্লস হাইস্কুলের সামনের সেই আস্তানায়।
সেইমতো টুকু চাচা ও মুজিবুর চাচারা ১৭ আগস্ট হাকিমপুুর বর্ডার পার হয়ে কুমিরার সুখদের প্রদর্শিত পথে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাদের জন্য নির্দিষ্ট মাগুরা ও মাদরা ক্যাম্পে এসে আস্তানা গাড়লেন। প্রসঙ্গত, ২৯ জনের মুজিববাহিনী ওই গ্রুপটিকে বশিরহাট থেকে বিদায় জানান বিশিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ ও নূরে আলম জিকু।
আমার আব্বা ও আমি যথারীতি তাদের সাথে যুক্ত হলাম। আগস্ট মাস থেকে শুরু হলো মুজিববাহিনীর স্থানীয়ভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির। ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ইউনুস আলী ইনুর নেতৃত্বে তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বেশ কিছু প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে ওঠে।
আগস্টের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো অনেক গ্রুপ তালা অঞ্চলে প্রবেশ করে। আমার মূল দায়িত্ব ছিল এলাকার কমান্ডিং গ্রুপের সাথে অন্য গ্রুপগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ ও সংবাদ আদান-প্রদানে বার্তাবাহকের ভূমিকা পালন করা। সেই হিসেবে তালা থানার গোটা এলাকা চষে বেড়ানোটাই ছিল আমার কাজ। তালা বা সাতক্ষীরা অঞ্চলে যে সময় মূল যুদ্ধ শুরু হলো, সেটা অক্টোবর মাসের দিক থেকে। তালা অঞ্চলে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি প্রথম গেরিলা যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আরেকটি গেরিলা যুদ্ধ হয় তালার ঘোষনগরে। প্রতিপক্ষ পাইকগাছার কপিলমুণি থেকে আসা রাজাকার বাহিনী। সেই যুদ্ধের সময় টেলিফোনের তার বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে আমি আহত হই। এরপর তালা পাইকগাছা অঞ্চলে আরো কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হলেও আহত থাকার কারণে সে সব যুদ্ধে অংশ নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
দেশ যখন স্বাধীন হলো তখনো আমার ডান হাত গলায় বাঁধা। বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম ১০ ডিসেম্বরের দিকে। আমাদের বাড়িতে তখন শুধু পোড়া কাঠ-কয়লা, ছাই আর ছাই। জমিতে শুধুই ঘাস। ঘরের চারটি দেয়াল শুধু দাঁড়িয়ে আছে। আবার শুরু হলো বাড়ি ঠিকঠাক করার পালা। এর মধ্যে এলো ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয়ের সেই ক্ষণটি। যার জন্য প্রাণ দিয়েছে ৩০ লাখ শহীদ। আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। বিজয়ের পর শুরু হলো অনাবাদি জমিতে আবার চাষাবাদ। শুরু হলো নতুন জীবন। হ
যুদ্ধে যখন ছিলাম তখন এবং তার আগের সময়টি ছিল অগ্নিগর্ভ। অগ্নিময় সেই সময় থেকে বেরিয়ে এসে একটি শান্তির দেশ, সার্বভৌম স্বাধীন দেশই সে সময়ের সাড়ে...
