ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত তৎকপালীন চারুকলা ইনস্টিটিউট পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেখানে চারু ও কারুকলাবিষয়ক শিক্ষা দেয়া হয়। বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কলকাতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে ভারত বিভাগের পর ঢাকায় এসে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি তার পরিকল্পনা অনুসারে ছাত্রছাত্রীদের যথাযথভাবে শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে সুন্দরভাবে সাজিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীরা যাতে জীবজন্তু ও পশুপাখির ড্রইং করতে পারে, পশুপাখি নিয়ে সুন্দর চিত্রাঙ্কন করতে পারে সেজন্য সুন্দর একটি চিড়িয়াখানা নির্মাণ করেছিলেন।
চিড়িয়াখানাটি ছোট হলেও জীবজন্তু ও পশুপাখিতে সমৃদ্ধ ছিল। সুন্দর মায়াবী হরিণ, বানর, হাঁস, মুরগি, বক এ চিড়িয়াখানার আকর্ষণীয় বিষয় ছিল। চিড়িয়াখানাটি বর্তমান অনুষদের বকুল বৃক্ষের উত্তর পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিয়োমিতভাবে এসব জীবজন্তু, হাঁস-মুরগি ও পাখির ড্রইং করত। জলরঙ তেলরঙে আঁকা পেইন্টিংয়েরও বিষয় হয়েছে এসব জীবজন্তু ও পাখি। অনেকে এই চিড়িয়াখানা দেখতে আসত বাইরে থেকে। মায়াবী হরিণগুলো দেখলে মন জুড়িয়ে যেত। পুরুষ হরিণগুলোর মাথায় বৃক্ষশাখার অনুরূপ বৃহৎ আকারের শিং। এই শিংওয়ালা হরিণগুলো মাঝে মাঝে একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতো। বানরের বাঁদরামি দেখেও আনন্দ পেত সবাই। শিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কনের সুবিধার জন্য জমকালো ফুলের বাগানও ছিল অনুষদের সর্বত্র। এ ছাড়া নানা জাতের বৃক্ষ এবং সুন্দর ইমারতগুলোও অনুষদ প্রাঙ্গণকে সুন্দর করে তুলেছিল জয়নুলের পরিকল্পনা অনুযায়ী। সামনের অংশে তৈরি করা হয়েছিল একটি গোল পন্ড। যেখানে শাপলা ফুলের সমাহার দেখতে মানুষ জড়ো হতো। আর শিক্ষার্থীরা রঙতুলি ও পেনসিল নিয়ে আঁকতে বসত পুকুর বা পন্ডকে ঘিরে। এই পন্ডের পাশেই রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় বৃক্ষ, যেগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি পাহাড়ের অনুভব প্রদানকারী উঁচু ভূমিতে অবস্থিত। মনোরম দৃশ্য সংবলিত এই অংশের পেছনে রয়েছে বিশাল এক গোল পুকুর। এ পুকুরের গভীরতাও অনেক। কিন্তু বছরের প্রায় পুরো সময়ই থাকে পানিশূন্য। বর্ষাকালে সামান্য কিছু পানি জমে থাকে তলায়। তাও দিন কয়েকের ব্যবধানে শুকিয়ে যায়। বৃষ্টি হলে আবারো সামান্য পানি জমে। আবারো শুকিয়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে শিক্ষার্থীরা পুকুরের তলদেশে ব্যাডমিন্টন খেলে, বনভোজন করে, কখনো কখনো ছোটখাটো অনুষ্ঠানও করে। ফলে পুকুরটি এভাবে বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়। সব মিলিয়ে চারুকলা অনুষদ চত্বর দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত সবার কাছে। আর এ কারণে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ চারুকলা চত্বর দর্শনে এসে থাকেন। ঘোরেন ফেরেন দেখেন চলে যান। এ ছাড়া চারুকলা চত্বরের বকুলতলায় প্রায় নানা ধরনের অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। সে কারণেও চারুকলা চত্বর থাকে জমজমাট। এভাবে চারুকলা অনুষদ ঢাকার সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এহেন সুন্দর চারুকলা অনুষদ চত্বরে (তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউট) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একসময় পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। এখানে প্রবেশ করেই উর্দুভাষী খুনি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা কয়েকজন নিরীহ কর্মচারীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিরীহ শহীদ কর্মচারীদের কবর চারুকলা চত্বরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
পাকিস্তান বাহিনী চারুকলা অনুষদে কর্মরত কর্মচারীদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ধ্বংস করেছে চারুকলার শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের লক্ষ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রতিষ্ঠিত ছোট্ট চিড়িয়াখানাটিও। এখানকার সুন্দর দর্শনীয় হরিণগুলো খেয়ে সাবাড় করেছে তারা। তছনছ করেছে পুরো চিড়িয়াখানাটি। কলুষিত হৃদয়ের জানোয়াররূপী জোয়ানরা তাদের নোংরা পদচারণায় সৌন্দর্য চর্চার বিদ্যাপীঠের অঙ্গনকে করেছে অসুন্দর। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আর অপবিত্র পদচারণায় শতবৃক্ষ ঘেরা বিচিত্র বর্ণের হৃদয় দোলানো ফুলে ফুলে ভরা সুশীতল ছায়াঘেরা বিশাল অঙ্গনটিকে প্রাণহীন বিরানভূমিতে পরিণত করেছে। সর্বদা আনন্দ উৎসব ও জন কলরবে মুখরিত, চারুকলার গর্বিত শিক্ষক, অফিসার, কর্মচারী ও ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণায় প্রাণচঞ্চল প্রাঙ্গণটিকে মৃতপুরীতে রূপান্তরিত করেছে। এখানেই শেষ নয় তারা ধ্বংস করেছে গর্বিত এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসটিও। ঢাকার নিউমার্কেট সংলগ্ন পোস্ট অফিসের পাশেই অবস্থিত এই ছাত্রাবাস। বর্তমানে নাম শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস। এই ছাত্রাবাসটি জন্মলগ্ন থেকেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে এসেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানের শাসকদের বাংলাবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে সেই আন্দোলনে যুক্ত থেকেছে এই ছাত্রাবাসের ছাত্ররা। পাকিস্তান শাসকদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ভাষা আন্দোলনসহ সব আন্দোলনের পোস্টার, ব্যানার, ব্যঙ্গচিত্র তৈরি হতো এই ছাত্রাবাসে। ছাত্রাবাসের ছাত্রদের অঙ্কিত পোস্টার, ব্যানার, ব্যঙ্গচিত্র সরংক্ষণ করা হতো ছাত্রদের কক্ষগুলোতেই। এ কারণে আগে থেকেই পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল ছাত্রাবাসটির ওপর। আর এ জন্যই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ছাত্রাবাসটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। ছাত্রাবাসে প্রবেশ করে ছাত্রদের কক্ষগুলোতে রক্ষিত পোস্টার, ব্যানার ও চিত্রগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। হত্যা করে ছাত্রাবাসের ছাত্র শাহনেওয়াজকে (নজরুল গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে যায়)। ছাত্রবাসের সংলগ্ন বস্তিগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ছাত্রাবাসে নিহত নিরীহ ছাত্র শাহনেওয়াজের নামানুসারে পরে ছাত্রাবাসের নাম হয়েছে ‘শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস’। ছাত্রাবাসটি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এএফ রহমান হলের অংশ। বিজয়ের মাস ২০১৯-এর বিদায়লগ্নে স্মরণ করি প্রিয় সহপাঠী শহীদ শাহনেওয়াজ ও চারুকলা অনুষদের শহীদ কর্মচারীদের। একই সাথে স্মরণ করি দেশের অগণিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে; যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ এবং দেশের অহঙ্কার লাল-সবুজের সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ পতাকা। পেয়েছি চারুকলা অনুষদের গর্বিত ছাত্র-শিক্ষকদের সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ও ভাস্কর্য; যে চিত্র ও ভাস্কর্য যুগ যুগ ধরে স্মরণ করিয়ে দেবে পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞের কথা। স্মরণ করিয়ে দেবে চারুকলা অনুষদের শহীদদের কথা। হ
ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত তৎকপালীন চারুকলা ইনস্টিটিউট পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেখানে চারু ও কারুকলাবিষয়ক শিক্ষা দেয়া হয়। বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কলকাতা থেকে...
