শিল্প শব্দটি উচ্চারিত হলেই হৃদয়পটে এমন একটি জগতের দৃশ্য উন্মোচিত হয় যেখানে নানা বর্ণের, নানা কর্মের, নানা বিষয়ের এবং ভাবোদ্দীপক প্রমত্ত রসের সন্ধান পাওয়া যায়। যাকে সীমাহীন গভীর সমুদ্রের সাথে তুলনা করা যায়। যে সমুদ্রে অবগাহন করলে মনের সব মলিনতা দূর হয়ে যায়। মন হয় পরিচ্ছন্ন, হয় সুন্দর। শিল্পের দর্শন কিংবা ইতিহাস তাই বলে। কারণ যারা শিল্পী, যারা শিল্পের সাথে জীবনকে জড়িত করেন, শিল্পের সাধনায় যারা নিমগ্ন থাকেন তারা প্রকৃত অর্থে স্রষ্টার সৃষ্ট বিষয়ের রহস্যের উন্মোচন করেন। স্রষ্টারসৃষ্ট বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষদের সামনে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেন। এজন্য শিল্পীরা হন সুন্দর মনের মানুষ। যারা শিল্পকর্মের রূপকার, যারা শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন সেই শিল্পীরা কেমন হন সে বিষয়ে বিভিন্ন দেশের জনসাধারণের মধ্যে বিশেষ ধারণা রয়েছে। নেপালের জনসাধারণের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা বিদ্যমান আছে। তারা মনে করেন যে, শিল্পীকে অবশ্যই ভালো ও সৎ হতে হবে, কর্মঠ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে, শিল্পী রাগ অনুরাগের দ্বারা চালিত হবেন না, হতে হবে পবিত্র মনের অধিকারী, শিল্পীকে হতে হবে ধার্মিক এবং পরোপকারী, শিল্পী হবেন ধনলিপ্সাহীন এবং অতি অবশ্যই পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী।
শিল্পী সম্পর্কে নেপালের জনগণের যে ধারণা তা হুবহু না হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিল্পী সম্পর্কে উচ্চ ধারণা আছে জনসাধারণের মধ্যে। মানুষের সাধারণ ধারণা হচ্ছেÑ শিল্পী, সাহিত্যক, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে স্রষ্টার কৃপাপ্রাপ্ত। কারণ তারা স্রষ্টার অনুগৃহীত। কারণ তারা সবাই সুন্দরের সাধক। তারা কল্যাণের উপাসক। তারা দেশের নিরহংকার, নির্লোভ, নিষ্কলুস, নির্দলীয় এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈর্ষণীয় সমাজের সম্মানিত সদস্য। তারা পবিত্রতা, সরলতা, উদারতা, স্বাতন্ত্র্য ও মুক্তচিন্তায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ। সব ক্ষেত্রে সব বিষয়ে স্বাধীনসত্তাই তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা তাদের জীবনীশক্তিও বটে। যাবতীয় বিষয়ে স্রষ্টার এই কৃপাধারীরা নিজ নিজ বিচার বুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনা ও বিশ্লেষণে জাতিকে অগ্রগতির পথে, সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তির পথে পরিচালিত করেন। রাজনৈতিক সঙ্ঘাত, সন্ত্রাস, অসততা, জাতিগত ও ধর্মগত বিভেদ, বর্ণবিভেদ, বিশৃঙ্খলা তথা জাতীয় যেকোনো দুর্যোগময় মুহূর্তে স্বাধীনভাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতিকে সঠিক পথনির্দেশ করে থাকেন। সমস্যার সঠিক সমাধানে সহায়তা করেন। প্রয়োজনে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রেও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন। সৃজনশীল চিন্তা-চেতনা, মুক্তবুদ্ধি, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন চরিত্রই এদের প্রধান শক্তি। কারো রক্তচক্ষু, কোনো প্রকার লোভ-লালসা, কোনো মহলের প্ররোচনা, এমনকি কোনো দলীয় প্রলোভনই এদের আদর্শচ্যুত করতে পারে না। এদের স্বাধীনতা হরণ করতে পারে না। এসব কারণে এদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা জাতির সর্বোচ্চ শিখরে। সব শ্রেণীর নাগরিকের শীর্ষে এদের অবস্থান। সততা, বিশ্বস্ততা ও মৌলিক অবদানই তাদের এই অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মর্যাদায় তাদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করে। কারণ তারা তাদের মনোজগতের বিচিত্র ভাব ও ভাবনাগুলোকে নিজ নিজ মাধ্যমে প্রকাশ করে দেশের রতœভাণ্ডারকে কানায় কানায় পূর্ণ করে তোলেন।
এ জন্য যেকোনো দেশে তারা সোনার ছেলে, হীরের টুকরো এমনি বহু বিশেষণে বিশেষিত হয়ে সমগ্র জাতির গর্বরূপে পরিচিত হন। এই হচ্ছে প্রকৃত শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের চিরাচরিত স্বাভাবিক চিত্রের রূপ। অথচ আজকের স্বার্থপরতা আর হানাহানির যুগে চিত্রের সেই স্বাভাবিক রূপটি বদলে গেছে। বিস্ময়করভাবে চিত্রে এসেছে বিকৃতি। দারিদ্র্যপীড়িত উন্নয়নশীল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিকৃতি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে অবস্থান করছে। মানুষের সততায় ধস নেমেছে। অর্থবিত্তের লালসা মানুষকে অমানুষে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে সৎ মানুষ আদৌ আছে কি না তা গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে যারা দেশকে ভালোবাসেন, দেশের মানুষের কল্যাণ কামনা করেন তাদের কেউ কেউ কখনো কখনো দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তায় মনোকষ্টের কথা হতাশার সাথে প্রকাশ করেন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেনÑ ‘আজকাল আমাদের দেশে দেখবেন, ভালো মানুষেরা বিচ্ছিন্ন। ভালো মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ নেই; তারা একা, পরস্পরকে খুঁজে পান না। কিন্তু যারা খারাপ, তারা খুবই সঙ্ঘবদ্ধ। এক শয়তান হুক্কাহুয়া দিলে মুহূর্তে হাজার শয়তান ক্যায়া হুয়া ক্যায়া হুয়া করতে করতে এগিয়ে আসে’ (ফেসবুক, ২৭ জুলাই, ২০১৯)। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বর্ণিত খারাপের মাত্রা যে কতটা আশঙ্কাজনক, খারাপ মানুষের সংখ্যা যে কতটা বিস্তৃত তা প্রতিনিয়তই সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ পাচ্ছে। এই খারাপের অবস্থা সর্বত্র। শিল্পের জগতও এর বাইরে নয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও খারাপ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের অতি পরিচিত এবং প্রশংসিত এমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নানা বিষয়ে বেশ কয়েকটি খণ্ডে গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। সবগুলো দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু চারু ও কারুকলাবিষয়ক খণ্ডে দেখলাম অনেক অসঙ্গতি। শিল্পের কোনো কোনো বিষয় নিয়ে এমনভাবে লিখেছেন পড়লেই মনে হবে লেখক ওই বিষয়ে অনভিজ্ঞ। তিনি শিল্পবিষয়ে লিখেছেন কিন্তু সেই শিল্পের উপকরণ সম্পর্কে কিছুই লেখেননি। অথচ ওই উপকরণ সম্পর্কে না জানলে শিল্প তৈরি করাই সম্ভব হবে না! চিত্রকলা বিষয়ে কেউ কেউ লিখতে গিয়ে লেখক তার স্ত্রীকে বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে একাধিকবার প্রবন্ধে তার সম্পর্কে লিখেছেন। অথচ যিনি চিত্রকলার অসংখ্য একক প্রদর্শনী করেছেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত চিত্রকলার প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক পেয়েছেন, দেশে-বিদেশে ১৬টি পুরস্কার পেয়েছেন (যার মধ্যে সাতটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার ২টি স্বর্ণ পদকসহ) তার নাম চিত্রশিল্পী হিসেবে একবারও উচ্চারিত হয়নি! যারা এ গ্রন্থে লিখেছেন তারা প্রায় সবাই শিল্পী। জানি না প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এভাবে লিখতে বলা হয়েছিল কিনা। কিন্তু কোনো কোনো লেখক যে প্রতিষ্ঠানের সুখ্যাতির ক্ষেত্রে ধস নামিয়েছেন এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এরূপ বৈষম্য এবং খারাপের দৃষ্টান্ত এখানেই সীমাবদ্ধ নেই, চারুশিল্পের অঙ্গনে আরো খারাপ দৃষ্টান্ত সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেশ কিছু শিল্পকলাবিষয়ক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এগুলোও দলবাজি আর চামচাগিরির ঊর্ধ্বে উঠতে পারছে না। পারছে না নিরপেক্ষ উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে।
সম্প্রতি ক্যালিগ্রাফি চিত্রের চর্চা এবং প্রদর্শনী বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। কিন্তু সম্প্রতি একশ্রেণীর অজ্ঞ, অসৎ এবং ধর্মবিদ্বেষী কর্তাব্যক্তির কারণে এ শিল্প এগোতে পারছে না। প্রদর্শনী করতে চাইলে কোনো প্রতিষ্ঠান জায়গা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে থাকে। অথচ শিল্পের ইতিহাসে ক্যালিগ্রাফি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্যালিগ্রাফি খুবই জনপ্রিয় শিল্প। বিদেশের শিল্পীদের ক্যালিগ্রাফি শিল্প এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতেও প্রদর্শিত হয়, এমনকি পুরস্কৃতও হয়। অথচ বাংলাদেশে কোনো শিল্পী ক্যালিগ্রাফি শিল্পের চর্চা করলেই একশ্রেণীর শিল্পীর গাত্রদাহের কারণ হয়। এরা যে কতটা হীনম্মন্যতায় ভোগেন এবং বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব দেখান তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পী মুর্তজা বশীর। তিনি একসময় প্রচুর ক্যালিগ্রাফি চিত্রের চর্চা করতেন। প্রদর্শনীতেও দিতেন। ক্যালিগ্রাফি চিত্রের একক প্রদর্শনীও করেছেন তিনি। এই প্রদর্শনী করতে গিয়েই তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন কতটা বিরোধপূর্ণ পরিবেশের বিরুদ্ধে তাকে ক্যালিগ্রাফি করতে হচ্ছে! একসময় শিল্পী আবু তাহের, আবদুস শাকুর শাহসহ অনেকেই ক্যালিগ্রাফি চিত্রের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু বিরোধিতার কারণে তারাও এ পথ থেকে সরে গেছেন! শিল্পের প্রতি এমন বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ পৃথিবীর আর কোনো দেশে দেখা যায় বলে মনে হয় না। বরং ইসলামী ক্যালিগ্রাফির প্রতি সমগ্র বিশ্বেই রয়েছে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে ক্যালিগ্রাফি শিল্প। অথচ আমাদের দেশে এ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ অন্যায় আচরণের পেছনে কোন ধরনের যুক্তি কিংবা আদর্শ কাজ করে সে এক মহাবিস্ময়ের বিষয়। বিষয় রহস্যের। বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে এ এক কালো অধ্যায়।
এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, বিশ্বের যেকোনো দেশের শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির উন্নয়নে সে দেশের বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা রয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন যখন শিল্প চর্চা করেছেন এবং শিল্প চর্চার প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তখন দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীরা তাকে ব্যাপকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন এবং তাদের সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমেই শিল্পের জগতটি সমৃদ্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু সবাই সমভাবে ভূমিকা পালন করেন কিংবা পালন করতে পারেন এমন নয়। কারণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও বিভেদ ও দলাদলি আছে। তাছাড়া সবাই উদার মনোষ্কও নন। অনেকের মধ্যেই ধর্মবিদ্বেষ কাজ করে। যা ধর্মীয় শিল্প এবং ক্যালিগ্রাফি শিল্পের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। আর এ কারণে এ ধরনের হীনম্মন্য বুদ্ধিজীবীদের ইসলামী শিল্পের সহায়ক শক্তি বিবেচনা করা যায় না। জ্ঞান বা বুদ্ধিকৌশলে যারা কার্য সম্পাদন করেন তারাই বুদ্ধিজীবী। কিন্তু যারা হীনম্মন্যতায় ভোগেন, যারা বিদ্বেষ ছড়ান, যারা সঙ্কীর্ণমনা তারা এ কাজটি করতে ব্যর্থ হন। ফলে তারা নিজেদের বিকিয়ে দেন। মাথা বিকানো মানুষ কখনো বুদ্ধিদীপ্ত হন না। হন পরজীবী। এ জন্যই হয়তো অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘দেশের বুদ্ধিজীবীরা চামচাগিরি ও মীরজাফরি করছেন’ (ফেসবুক, ২২ জুলাই, ২০১৯)। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত এ বক্তব্যের ব্যাপ্তি বিশাল। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে বলা যায়, শিল্পকলার জগতটির সাথে যারা জড়িত তাদের যেমন সাফল্য আছে তেমনি আছে ব্যর্থতাও। এ জগতে আলো যেমন আছে তেমনি আছে অন্ধকারও। নতুন বছরের আগমনে ব্যর্থতা ও অন্ধকার দূরীভূত হয়ে সমগ্র শিল্পের জগতটাই আলোকিত হবে এ প্রত্যাশা করি। হ
শিল্প শব্দটি উচ্চারিত হলেই হৃদয়পটে এমন একটি জগতের দৃশ্য উন্মোচিত হয় যেখানে নানা বর্ণের, নানা কর্মের, নানা বিষয়ের এবং ভাবোদ্দীপক প্রমত্ত রসের সন্ধান পাওয়া যায়।...
