এক নেতার নির্দেশে একদলীয় সরকারব্যবস্থা কাক্সিক্ষত নয়। ধর্ম-বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও পরিবার পরিকল্পনায় মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য তা যথাযোগ্য নয়। তাছাড়া প্রগতিশীল সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় সমতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের জন্যও অত্যন্ত অপ্রতুল। এটি শুধু এ দেশে নয়, বিদেশেও প্রমাণিত। তাই বাংলাদেশে সুশাসনের জন্য কাম্য সরকারব্যবস্থা হলো গণতান্ত্রিক সরকার। একমাত্র গণতন্ত্রের আকাশেই থাকে না একক চন্দ্র। গণতন্ত্রের আকাশ হলো অসংখ্য তারকায় পরিপূর্ণ। গণতন্ত্র যেন মিটিমিটি আলোয় ভরা তারার মেলা। গণতন্ত্রেও নেতা থাকেন, থাকে নেতৃত্ব, কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেতা রাজনৈতিক আকাশ আলো করা একক চন্দ্রের মতো মহাপরাক্রশালী নন, সব ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারকারীও নন, সব সমস্যাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী এক দেশ-এক নেতার মতোও নন। তিনি অনেকটা সরকার ব্যবস্থা বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়কারী, বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী, সর্বমহলে ঐক্যবদ্ধ সুদৃঢ়কারী, তথ্যসমৃদ্ধ সেতুবন্ধনের মতো। গণতন্ত্রের নেতৃত্বে স্বরূপ এমনি। চার দিক আলো করা চন্দ্রে গ্রহণ লাগতে পারে। তা পর্যায়ক্রমেই হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে, অমাবস্যায় অন্ধকার পরিবেষ্টিতও হতে পারে। কিন্তু তারকাভরা গণতন্ত্রের আকাশে নেই কোনো অনিশ্চয়তা, একদলীয় সরকারব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে জনগণের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সৃজনশীল নেতৃত্বের চিন্তাভাবনার রূপরেখা এই রকম। গত বছর যেভাবে আমরা অতিক্রম করেছি নতুন বছরে আমরা আশা করি নেতৃত্বের রূপ এই রকম হোক।
আমাদের দেশের মতো এগিয়ে চলা ব্যবস্থায় প্রয়োজন হলো আইনানুগ সমাজ গঠনের নেতৃত্বের একাগ্রতার, দুর্নীতির প্রতি তার তীব্র ঘৃণার, সুশাসনের প্রতি গভীর আকর্ষণের, সুশাসনের প্রতি তা সহজাত দুর্বলতার এবং সমাজব্যাপী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রচনায় তার বলিষ্ঠ পদক্ষেপের। বিশ্বায়নের একালে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মননশীলতার, সৃজনশীল চিন্তাভাবনার এবং বিশ্বময় প্রতিযোগিতার বৃহত্তর ক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য প্রশিক্ষণের। উন্নত মানবসম্পদরূপে জনগণকে গড়ে তোলায় সমগ্র সমাজটাকে জ্ঞানভিত্তিক (কহড়ষিবফমব নধংবফ) সমাজে রূপান্তরিত করার। সামাজিক শক্তিগুলোকে সব অনৈক্য ও বিভেদ জয় করে বৃহত্তর ঐক্যের উপত্যকায় উপনীত করা। মেধা চর্চার মাধ্যমে সৃষ্টিশীল প্রত্যয়ের দিগন্ত বিস্তৃত করা। সমাজটাকে মুক্ত সমাজের আদলে তুলে ধরা। এ সবই তো এখনকার প্রয়োজন। এই নিরিখেই জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের আরেকটা দিকও রয়েছে এবং তা হলো এক ধরনের নৈতিকতা। পরিশীলিত এক কর্মপ্রবাহ। রুচিকর এক যৌথ উদ্যোগ। পরিচ্ছন্ন এবং সচেতন এক দৃষ্টিভঙ্গি। গোপনীয়তার জমাট বাঁধার অঙ্গীকার ছাপিয়ে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের সূচনা হয় সর্বসাধারণের সম্মুখে, মুক্ত আলোয়। ষড়যন্ত্রের অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে আসে সামগ্রিক কর্মকাণ্ড। বেরিয়ে আসে প্রকাশ্যে দিবালোকে। সবাইকে সাথে নিয়ে চলতে হয় বলে সবার মানসিকতা প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে। অন্যের দিকে তাকিয়ে সবাই নির্ধারণ করে নিজের পদক্ষেপ, সংযত করে নিজের রচনা এবং নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের আচার আচরণ। আমার জন্য যা পীড়াদায়ক অন্যের কাছে তা সুখকর হতে পারে না। আমি যা পেয়ে খুশি হই, অন্যেরও তা প্রাপ্য। যে কথা শুনে আমি কষ্ট পাই, অন্যের কাছে তা কষ্টকর হবে। গণতন্ত্রের কৌশল রুচিসম্মত। তার চর্চা হয় অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে। নীরবে নয়, তার স্বরে। নির্জনে নয় জনারণ্যে, মিটিংয়ে, মিছিলে, আগামী দিনগুলোতে আমাদের আশা আকাক্সক্ষার কিছুটা প্রতিফলন ঘটুক। এটাই তো আমাদের চাওয়া। বেশি কিছু নয়। হ
