তোমরা রাজহাঁস বা রাজাহাঁস, পাতিহাঁসÑ এসব নামের সাথেই বেশি পরিচিত। এগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে আরো অনেক নামের হাঁস আছে। এগুলোর নাম তোমরা হয়তো খুব একটা শোনোনি। যেমন মান্দারিন হাঁস, বড় সরালি হাঁস, কালো হাঁস, শহচখা হাঁস, চখাচখি হাঁস ইত্যাদি। আজ তোমরা এসব হাঁসের মধ্য থেকে চখাচখি সম্বন্ধে জানবে। পুরুষ হাঁসটিকে চখা আর স্ত্রী হাঁসটিকে চখি নামে ডাকা হয়। এ দুটি নাম এক করে তাদের ডাকা হয় চখাচখি। অবশ্য অনেকের ধারণা, চখাচখি মানেই পুরুষ চখাচখি আর স্ত্রী চখাচখি। অর্থাৎ চখাচখি বলতে একজোড়া হাঁসকেই (পুরুষ-স্ত্রী) বুঝায়। চখাচখি বেশির ভাগ সময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে। আর খুবই শক্ত এদের জোড়ের বন্ধন বা বন্ধুতা। এ কারণেই হয়তো এদের এমন নাম দেয়া হয়েছে।
বেশ বড় আকারের হয়ে থাকে চখাচখিরা। এদের দৈর্ঘ্য পায় ৬৫ সেন্টিমিটার। ডানা প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার, লেজ ১৫ সেন্টিমিটার, পা ৭ সেন্টিমিটার, ঠোঁট বা চঞ্চু ৪.৫ সেন্টিমিটার। এদের ওজন প্রায় দেড় কেজি হয়ে থাকে। তবে এ সংক্রান্ত কিছু পার্থক্য রয়েছে চখা ও চখির মধ্যে। চখা হয়ে থাকে কমলা বাদামি থেকে দারুচিনি রঙের। হালকা বাদামি মাথা ও ঘাড়। ডানায় কিছুটা সবুজ রঙ আছে। আর পালক কিছুটা সাদা। লেজ ও পালকের শেষাংশ কালো। ডিম পাড়ার মৌসুম এলে সরু কালো বলয় বা দাগ হয় গলায়। এদিকে আকারে চখি চখার তুলনায় কিছুটা ছোট। ফিকে রঙ রয়েছে চখির মাথায়। বলয় বা দাগ হয় না গলায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চখাচখির মধ্যে মিলও রয়েছে। উভয়ের ঠোঁট ও পুরো পা কালো। চোখ বাদামি। চখিকে অনেক সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক সাধারণ হাঁসের মতো দেখা যায়।
চখাচখিরা বিচরণ করে পলিময় উপকূল, হ্রদ, ছোট-বড় নদীর চর, হাওর-বিল ইত্যাদি মনোরম পরিবেশে। তবে তেমন পছন্দ নয় ঘনঘাস, ঝোপসমৃদ্ধ জলাশয়। বিচরণ করে জোড়ায় জোড়ায়। ছোট ছোট ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায় শীতের সময়। এরা নিশাচর। তবে বেশি সক্রিয় থাকে ভোর ও সন্ধ্যায়। এরা অনেক সময় কাদামাটিতে, মাঝে মধ্যে রাজহাঁসের মতো আদ্র তৃণভূমিতে বিচরণ করে খাবারের সন্ধানে।
এরা সর্বভূক প্রাণী। অর্থাৎ যা পায় তাই খায়। বেশি পছন্দ করে শস্যদানা, অঙ্কুরিত উদ্ভিদ, কঁচি বা নরম পাতা, কাঁকড়া ও চিংড়িজাতীয় প্রাণী, জলজ পোকামাকড়, শামুক, ব্যাঙ, কেঁচো, ছোট সাপ ইত্যাদি। এদের শরীরের সামনের দিকের অংশ পানিতে ডুবিয়ে রাখে সাঁতার কাটার সময়। ডিম পাড়ার সময় থেকে প্রায় এক মাস উড়তে পারে না এরা। কারণ এ সময় তাদের পুরনো পালক পড়ে গিয়ে নতুন পালক গজায়। চখাচখিদের বাচ্চা হয় মে-জুন মাসে। বেশির ভাগ সময় বাচ্চা হয় তিব্বত ও উত্তর এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে। উঁচু মালভূমির জলাভূমিতে ঘুরে বেড়ায় ও এর আশপাশে বাসা বানায় মাটি গর্ত করে। বাসা বানায় পালক দিয়ে। ডিমগুলো ফকফকে সাদা। ডিম দেয় ৮-১০টি। ডিমে তা দেয় চখি একাই। আর বাসা পাহারা দেয় চখা। ডিম ফোটে ২৫-৩০ দিনে। ছানাদের উড়তে সময় লাগে প্রায় ৬০ দিন। আর দুই বছর হলে একাই সব করে।
চখাচখি বেশি দেখা যায় এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায়। অনেক দেশে এরা আসে পরিযায়ী হয়ে। এদের বাংলাদেশেও দেখা যায় মাঝে মধ্যে। বেশি দেখা যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের হাওর ও নদ-নদীতে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পৃথিবীতে এখন চখাচখির সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, আবাসন ধ্বংস, দূষণ, বার্ড ফ্লু ইত্যাদি কারণে। এরা আকারে বড় বলে বেশি ধরা পড়ে শিকারিদের ফাঁদে।
চখাচখির বৈজ্ঞানিক নাম টাডোরনা ফেরুগিনে। ইংরেজি নাম রাড্ডি শেলডাক। বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ মরচে রঙ চখাচখি। এরা পক্ষী শ্রেণীর হাঁস। এরা দেখতে বেশি সুন্দর বলে অনেকে এদের হাঁস না বলে পাখিই বলে। কারণ এরা বহুদূর পর্যন্ত উড়তেও পারে। সুন্দর এ প্রাণীকে অনেক স্থানে লালাহাঁস বা লালাপাখিও বলা হয়ে থাকে।