প্রতিদিন সকালবেলা বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দেয়াই আমার অন্যতম প্রধান কাজ। বড় বাচ্চা অষ্টম শ্রেণীতে। সে এখন নিজে নিজে চলতে শিখেছে! সে একাই স্কুলে যায়। দ্বিতীয়জন ক্লাস থ্রিতে। আমার হাত ধরে মাদরাসায় যায়। মাদরাসার প্রতি অনেকের নাক সিঁটকানো ভাব থাকলেও তারা হয়তো জানেন না যে, মাদরাসার সাবজেক্ট স্কুলের চেয়েও বেশি। তাদের পড়াও বেশি। ওইটুকুন বাচ্চার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এই পালোয়ানের মতো শরীর নিয়ে আমি নিজেই হাঁপিয়ে যাই। মনে মনে ভাবি,আহা বাচ্চাটার কত কষ্ট হয়! বাচ্চাকে নিয়ে মাদরাসায় যেতে যেতে আমার ছেলেবেলার কথা মনের আকাশে উঁকি দিয়ে ওঠে। আহা, কি সোনালি ছিল সেই দিনগুলো। পড়ালেখা ছাড়া কোন দায়িত্ব ছিল না। রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতাম সারাক্ষণ।
আমাদের সময় পড়ালেখার এমন জবরদস্তি ছিল না। সকালে এক ঘণ্টা পড়ে খেলতে বের হতাম। ডাংগুলি, কানামাছি, হাডুডু , ফুটবল, ঘুড়ি ওড়ানো আরো কত কি! বাড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে স্কুলে যেতাম। দুপুর ১২টায় ক্লাস শুরু হতো আর ৪টায় ছুটি। আমরা স্কুলে যেতাম দল বেঁধে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে একদল ছেলেমেয়ে একত্রে যেতাম স্কুলে। স্কুলে যাওয়ার সময় পথের ধারের তেঁতুল, আম কিংবা জাম গাছে ঢিল ছুড়ে তা পারতাম। কখনো বা পাখির বাসায় হানা দিতাম। দুরন্তপনার যেন কোন শেষ ছিল না। এক একটা দিন ছিল যেন এক একটা ইতিহাস।
আমাদের স্কুলের ফজলাল স্যার অঙ্ক করাতেন। স্কুলের সব ছাত্রছাত্রী যমের মতো ভয় পেত স্যারকে। অঙ্ক না পারলে বেঞ্চে নীল ডাউন করাতো। চুলের চিপ ধরে উল্টা দিকে টান দিত। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, অঙ্ক স্যারের ভয়ে আমরা অনেকবার স্কুল পালিয়েছি। এক দিন মায়ের হাতে ধরা খেয়েছিলাম! তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। স্কুলে যেতে যেতে ছয় বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম। স্কুলে গেলে নিশ্চিত স্যারের হাতে মাইর খেতে হবে। গায় গতরে লম্বা হওয়ায় আমি ছিলাম দলপতি।
অর্ডার দিলাম, আজ কেউ স্কুলে যাব না । তাই সবাই মিলে পাকা রাস্তার পাশে বটগাছের তলায় বসে ছিলাম। আমার চাচাতো বোন ফেরদৌসি বলে উঠলো, আমার অঙ্ক শেখা হয়েছে আমি স্কুলে যাবো। অর্ডার না মানায় ওকে কষে একটা চড় মারলাম। কাঁদতে কাঁদতে ফেরদৌসি বলেছিল, তুই একটা খাটাশ। তোর হাত যেন লুলা হয়ে যায়। অনেক সময় বট গাছের নিচে বসে কাটালাম। তার পর বললাম, এই গাছের ছায়া যখন এ পর্যন্ত আসবে তখন আমরা বাড়ি ফিরব। কথামতো নির্দিষ্ট জায়গায় দাগ দিলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের পেছন দিয়ে ল্যাংড়া লুতুভাই হেঁটে যাচ্ছে। আমাদেরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। বিকেলে দাগ পর্যন্ত গাছের ছায়া পৌঁছুলে আমরা বাড়িতে রওনা দিলাম। চাচাতো বোনকে শাসালাম, মাকে বলে দিলে তোর খবর আছে। হইচই করে বাড়ি ফিরে মাকে ডেকে তাড়াতাড়ি খেতে দিতে বললাম। মা খাবার না দিয়েই বললেন, গাছের ছায়া কি ঠিক দাগের উপর গিয়েছিল? বিশাল একটা ধরা খেয়ে গেলাম। মাথা নিচু করে মনে মনে বললাম, মা জানল কিভাবে? তারপর লুতু ভাইয়ের কথা মনে পড়লো । শালা ল্যাংড়া।
বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলা। সন্ধ্যায় হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসা। দিনগুলো খুব সুন্দর ছিল। খুব আনন্দের ছিল।এখন আমাদের বাচ্চারা এমন আনন্দ উপভোগ করতে পারে না। ক্লাসের পড়া, প্রাইভেট পড়া, হোম ওয়ার্ক করতে করতে ওরা হাঁপিয়ে যায়। শহরের ইটের তৈরি ছোট ছোট রুমের খাঁচায় বন্দী ওদের জীবন। ভিডিও গেমস আর টিভির স্ক্রিনে ওদের বিনোদন। ওদের শরীর দুর্বল। কম বয়সে চশমা পড়তে হয়। অথচ আমরা এখনো কত সবল! সত্যিই বাচ্চাদের ছেলেবেরার এ করুণ দশার জন্য খুব মায়া হয়।
সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় প্রিয়জন
প্রতিদিন সকালবেলা বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দেয়াই আমার অন্যতম প্রধান কাজ। বড় বাচ্চা অষ্টম শ্রেণীতে। সে এখন নিজে নিজে চলতে শিখেছে! সে একাই স্কুলে যায়। দ্বিতীয়জন...
