মুহম্মদ নূরুল হুদা
প্রমিত বাঙালি

পিতামহ উধাও ফকির,
পিতা সনাতন আরওগ্যসাধক;
সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত ভ্রমণ শেষে
তুমি নিজে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টির সাধক।

বারো বছরের কিশোর বাউল
পিতার নিবাস ছেড়ে রাজধানী ঢাকা,
তারপর কলকাতা-দিল্লি হয়ে সুদূর বিলাত;
পার হলে কতো নদী সরোবর সময়-প্রপাত।

কুড়ালে আলোকধান সোনার তরীতে,
পাড়ি দিলে দিকে দিকে ঈশানে নৈঋতে;
উৎসমুখী তুমি,
এ বাংলা পালের নৌকা,
ধরে আছো তার ধ্রুব হাল।

অনন্তর
আরাধ্য মিশন শেষে
ফকিরি সাধক বেশে
অনঙ্গের বীজ হয়ে
পুনর্বার ফিরে গেলে জন্ম-কুড়িগ্রাম;
মানুষ উড়াল পাখি,
উৎস থেকে উৎসে ফেরা
বাঙালির লোকায়ত মানব সংগ্রাম।

তুমি সেই প্রমিত বাঙালি;
তোমার মাথায় হাসে
কুমড়ো ফালির মতো
দ্বিতীয়ার চাঁদ এক ফালি।


আসাদ চৌধুরী
ফাগুন এলেই

ফাগুন এলেই পাখি ডাকে
থেকে-থেকেই ডাকে
তাকে তোমরা কোকিল বলবে? বলো।
আমি যে তার নাম রেখেছি আশা,
নাম দিয়েছি ভাষা,
কতো নামেই ‘তাকে’ ডাকি
মেটে না পিপাসা।
ফাগুন আনে ফুলের তোড়া
কখনও প্রতিবাদ
ফাগুন যেনো পাগলা ঘোড়া,
মানতে চায় না বাঁধ।
ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে
কলিরা পায় লোটে,
তাকে তোমরা শহীদ মিনার বলো।
আমি যে তার নাম রেখেছি ফেরা,
নিজের ঘরে ফেরা,
ঘর থেকে যে পথে ওড়ে
তেমন বিহঙ্গেরা।
ফাগুন যেনো ফুপুর আরশী
দেখি নিজের মুখ,
ফাগুন শেখায়, শুধরে লও হে
জীবনের ভুল-চুক।
ফাগুন এলেই একটি পাখি শাখে
থেকে থেকেই ডাকে।
কোকিল বলবে তাকে? বলো।
ফাগুন এলেই অলি এসে জোটে
কলিরা পায় লোটে
বলবে তাকে শহীদ মিনার? বলো।


সানাউল হক খান
মহাকাল

মাত্র এক মুঠো মহাকাল, শরীরে শুকনো রজনীগন্ধা
সকালে ঘাড় ফেরাতেই বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা
উত্তরে-দক্ষিণে দোলানো যমুনার উথালি-পাথালি ঢেউ
আছড়ে-পিছড়ে দিয়েছে এই ডুবুরিমন, যেন কেউ
নাভির নিচে, ঘড়িতে সাড়ে-পাঁচটায় মন খারাপ
মেস্তরি, তুমি ক্যামন ঘড়ি বানিয়েছ বাপ্
(মাত্র এক মুঠো মহাকাল রক্তে নি¤œচাপ)

যুবতীদের সবার এলানো-দোলানো-কোঁকড়ানো চুল, সাদা
ঘোড়া-যুবকেরা সবাই এখন গাধার দাদা

ফাটল-ধরানো প্রেম জোড়া লাগতেই আবার ফাটে
ফাটে আর জোড়ে... জোড়ে আর ফাটে...

মহাকাল, তোমার সময় কি আজ এভাবেই কাটে?

ফরিদ আহমদ দুলাল
একা হতে দাও

অনিবার্য হতে দিও না আমায় তোমার কৃপায়
আশ্রয়ের নামে অবহেলায় করো না অসহায়!
ঘুমাতে দিও না আমায় নিñিদ্র আদরের ওমে
পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি যায় কমে,
একাকী জাগিয়ে রাখো নিরানন্দ রাত
বরাদ্দ দিও না আমায় কখনও কৃপার ‘বরাত’।
জলোচ্ছ্বাসে যদি ভেসে যাই দরিয়ায়
বাতিঘর হয়ে দেখিও না পথ বিপন্ন আমায়,
প্রবল ঢেউয়ের সাথে লড়ে একা বাঁচার সুযোগ দাও
মাথার উপর থেকে তোমার ছায়ার আশ্রয় সরিয়ে নাও।

বর্ণিল আলোয় তোমার উৎসব আলোকিত হোক
অমানিশার আঁধার আমার রাত্রিকে নিঃসঙ্গ করুক।
একা হতে দাও নিঃস্ব হয়ে যেনো মরি
চাঁদ হয়ে আমার আকাশে হইও না কখনও রূপোর তসতরি।

মাহমুদ কামাল
আপস

ওই যে আগুন ঝরানো কথা
ওর ভেতরেই লুকিয়ে আছে পানি
ওই আগুন বয়ে যাবে
স্র্রোতের মতোই
কিন্তু মুহূর্তেই
লুকোনো পানি অত্যন্ত গোপনে
আগুন নিভিয়ে দেয়
তখন যে শব্দটি তৈরি হয়
তার নাম আপস।

সৈয়দ রফিকুল আলম
জ্বলে আগুন

অষ্টপ্রহর জ্বলে আগুন মনের ভেতর
জ্বলে আগুন বসতবাড়ির, খড়ের স্তূপে
চক্রপাকে উড়ে ধোঁয়া বৈতালিক ঝৌপে
পথহারা হই দিকের চিহ্নে নিথর।

তপ্ত শলাকা বেঘোর কুণ্ডে ঘোরে।
ঘূর্ণি চর্কি উতল হাওয়া এক সাগরের জল
স্রোতের ভাসানে উপচে উড়ানি ঢল
নিভে না তবুও অগ্নি কপাট দোরে।

কার খোঁজে যাই শীতল পরশ পেতে
বিরানভূমির কঙ্কাল দেহ আশপাশ
শূন্য তটে ডাক ফেরে শুধু দীর্ঘ হতোশ্বাস
মন-মোহনায় জ্বলে আগুন জ্বলে আগুন ভিতে।

শাহাবুদ্দীন নাগরী
বাংলা ভাষা থেকে বাংলাদেশ
[কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা শ্রদ্ধাস্পদেষু]

রক্ত গড়াতে গড়াতে যায়, গড়িয়ে গড়িয়ে যায়।
কয়েকটি পাখি বন্দুকের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে ছড়িয়ে
পড়েছিল এক দ্বিপ্রহরে, তাদের শরীর থেকে ফিন্কি
দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তে ভিজে যাচ্ছিলাম আমরা,
সেই উষ্ণ রক্তের তীব্রতা জমাট বাঁধার আগেই তৈরি
করে নিয়েছিল তার গতিপথ।
কেউ ভাবতেই পারিনি এমন হবে!

তারপর রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে যায়, বছরে বছরে আরও
মিহিস্রোত এসে মিশে যায় গতিপথে গোপনে গোপনে।
ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে পাতাঝরার মতো খসে খসে
যায় দিন-মাস-বছর। দফাগুলোর রফা হয় না, তাই
আবারও পাখির মতো গুলিতে ঝাঁঝরা হয় বুক,
আবারও রক্ত ঝরে। সেই রক্ত ইতিহাসের কাঁধে চেপে
নায়াগ্রার মতো আছড়ে পড়ে গতিপথে। ভয়াবহ প্লাবন
ওঠে চারদিকে, নূহের নৌকার মতো ভেসে ওঠে
লক্ষ লক্ষ নৌকা, দেশভাগের বিষবৃক্ষ নোঙর ফেলে
ব্যালটের ছাপে।

আমরা ভাবতেও পারিনি বাহান্নের বেপরোয়া পুলিশের
বন্দুকের গুলির সেই ফিন্কি দেয়া রক্ত এসে ঝাঁপিয়ে
পড়বে একাত্তরের বিশ্বাসঘাতক লম্পট সেনাবাহিনীর
ভারী মেশিনগানের ওপর।
নির্দিষ্ট হয়ে যাবে স্রোতের গতিপথ।

বাংলা ভাষা থেকে আমরা পৌঁছে যাই বাংলাদেশে,
স্বাধিকারের দুর্জয় শক্তি আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে আসে
স্বাধীনতার খেয়াঘাটে।


রেজাউদ্দিন স্টালিন
গুরুত্বের সংজ্ঞা

মানুষের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণকে খোঁজা
আসলে কাকে বলে গুরুত্বপূর্ণ
আজ যা গুরুত্ববহ কাল তা নিষ্প্রাণ পতঙ্গ
আজ সবুজ পত্রালি কাল আগুনের আহার
নিভন্ত লণ্ঠনের চেয়ে আলো মূল্যবান
ঠোঁটের চেয়ে চুম্বন
পথের চেয়ে গন্তব্য
স্বপ্নের চেয়ে আকাক্সা

বয়স ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেয় যৌবন
নদী হয়ে যায় বালির বন্ধু

একটা দিনের চেয়ে মুহূর্ত মূল্যবান
মন্দিরের চেয়ে প্রার্থনা
এবং অবশ্যই ইতিহাসের চেয়ে কবিতা

জাকির আবু জাফর
বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষা মধুর মুখর জিন্দা
যে মানে না তার জন্য নিন্দা
যে বোঝে না তাকেই বলি বুঝতে
প্রাণের কথা জানের কথা খুঁজতে

যে পেয়েছে বাংলা ভাষার গন্ধ
তার হৃদয়ে কলকলে আনন্দ
তার হৃদয়ে বাংলা সকাল হাসবে
ফেব্রুয়ারি একুশ উঠে আসবে

বাংলা দুপুর চিলের ডানায় নামবে
আকাশ এসে গাঁয়ের ওপার থামবে
ফুলের গালে বাংলা বুলি লিখবে
শালিক দোয়েল অ আ ক খ শিখবে

বাংলা ভাষায় জ্বলছে হুতুম দৃষ্টি
বাংলা শ্রাবণ বাংলা ভাষার বৃষ্টি
শীত কুয়াশায় বাংলা ভাষার ঠাণ্ডা
বাংলা হয়েই মুরগী পাড়ে আণ্ডা

প্রভাত ফেরির শোকের ভাষা কালচে
বাংলা ভাষার হৃদয় অকাট লালচে
হৃদয় খুলে বলে ওভাই বোনটি
বাংলা বিনে কোন ভাষা চাও কোন্টি

ব্ংালা তোমার এই কথাটি মানবে
বিশ্ব মানুষ বাংলা ভাষা জানবে

 


শাহীন আরা আনওয়ারী
কবিতা কাহিনী

কবিতা কথা বলে
বলে এই কি মানবতা?
কবিতাই বলে যায়
আছে যত শোকগাঁথা।

কবিতার চরনগুলো
ভাঙে বিবেকের পাথর দেয়াল
কবিতা মজলুমের পে
ঝরায় বেদনার জল।

কবিতা জোগায় অথৈ শক্তি
কবিতা বৃরে আগাগোড়াই মুক্তির
ছন্দে আনে জীবন নদীর জোয়ার।
মহাকালের লেখনীতে তুমি
উদীয়মান জ্বলন্ত নত্র।


হাসান আলীম
বাণীর শেরপা

কে আমাকে শেখাল মায়ের ভাষা
দীপ্ত বর্ণমালা আলোজ¦লা শশীকলা
জোসনার পায়রা উড়ানো
উঠোনের ভালোবাসা?
কে আমাকে দুধভাত মেখে খাইয়ে দিলো
মায়ের মমতা দিয়ে
বোনের সোহাগ দিয়ে
প্রিয়তম মানবীর শিহরণ ওড়নার পরশ দিয়ে!
কে আমাকে শেখাল
গণিতের জটিল সমীকরণ!
কে আমাকে বর দিয়ে শোভিত করল পুষ্পিত
পাপড়ির ছোঁয়ায়!
মেধার মাখনে কে আমাকে
আলোকিত মঞ্চের নায়ক বানিয়ে দিলো?
কে সে বর্ণমালার মঞ্জরি বিলাসে আমাকে
বাণীর শেরপা পরাল?

আবু হেনা আবদুল আউয়াল
চেতনার অবিনাশী নাম

তোমার দেখানো পথে পথ চলিÑ
দিনে রাতে চলে চলে কেবল এগোই
অন্ত্যহীন পথে, যতই এগোই ততই শান্তির
হাওয়া জুড়ায় প্রাণমন, সম্মুখে সুন্দর
আগামী দিনের স্বপ্ন আসে চোখে
অসম্ভব সম্ভবের মন্ত্রে দীক্ষা
নিয়েছি তোমার কাছে, থেমে থাকা কিংবা
পরাজয় তাই আমাদের ছুঁতে পারে না

তুমি আমাদের চেতনার এক অবিনাশী নাম

তুমি শ্রমে ঘামে রক্তে লিখে গেছ একটি
অমর কবিতাÑ ‘বাংলাদেশ’
আমরা সেই কবিতার নিশান-বর্দার

দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
জেগে উঠতে

সত্যি সত্যি জেগে উঠতে
সময়ের বেশিক্ষণ প্রয়োজন নেই।
দুই একটা অবিচল মুহূর্ত
হলেই হয়।
ডানা ভাঙা পাখির ডানা জুড়ে দিতে
কারো ঠোঁটে বিষাদ এলে
সুখের গান গুঁজে দিতে
বেশিক্ষণ প্রয়োজন নেই
বেশি সময়েরÑ
দু’একটা ফুল ফুটলেই হয়
দু’একটা সবুজ পাতা হলেই হয়।
একটা দিনÑ একটা সময়
একটা চেতনাপর্ব দেশ গঠনে
প্রচুর বেলা।

শাহাজাদা বসুনিয়া
চিঠির শিরোনাম বাংলাদেশ

একরাশ প্রীতি ও শুভেচ্ছা তোমাকে
এ যেন আজন্মের কবিরাজী ওষুধ
এভাবে কত চিঠি লিখেছি তোমাকে কতকাল
শব্দের ভেতর শব্দ জোড়া দিয়ে লেখা চিঠিগুলো
শাশ^তকালের প্রশস্ত শাখাবিশিষ্ট বৃক্ষ সমান
চিঠিতে বর্ণমালার কথা বলেছি বারবার
যার জন্য ইতিহাসবিধৃত যুদ্ধÑ
হাজারো যুদ্ধের কালজয়ী উপাখ্যান।
চিঠিগুলো কোথায়?
বেমালুম ভুলে গিয়ে আমি
বারবার সেগুলো খুঁজি, খুঁজেছি অনেকবার।
চিঠিগুলো নর্দমা-ডাস্টবিনে যদি ফেলে দিয়ে থাকো
সেগুলো আমার রক্তক্ষরণ
সেগুলো আমার বেদনাউৎসব
চিঠির বর্ণমালায় যা লিখেছিলাম
মনে নেই কারো-সব বিস্মৃত একাকার।
চিঠিগুলো বেদনার নাম
চিঠিগুলো বিজয়ের নাম
চিঠিগুলো স্বাধীনতার নাম
চিঠিগুলো একাত্তরের নাম
চিঠিগুলো একুশে ফেব্রুয়ারির নাম।
চিঠিগুলো ফেলে দিয়েছ কেন?
চিঠিগুলো আবারো পাঠাবো তোমাকে
চিঠিগুলো পড়ে নিও, এ আমার আদেশ
চিঠিগুলোর শিরোনাম হবে বাংলাদেশ।