সাধারণভাবে স্বীকৃত শিক্ষা ক্ষেত্রে যে তিনটি স্তর রয়েছেÑ প্রাথমিক মাধ্যমিক ও উচ্চঃ তার প্রতিটি স্তর নির্বিশেষে রয়েছে মাতৃভাষার সবিশেষ প্রয়োজন। এটা অনেকের জানা অথচ স্বীকার করতে বা ব্যবহারে অনীহার কারণে বিষয়টি প্রতিপাদ্য করতে আজ কলম ধরতে হলো।
প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার বিশ্বস্বীকৃত। শুধু ভাষার অক্ষর, ধ্বনি ও শব্দ বা মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তি গত ক্রমাগতিতে এর অন্য কোনো সুষ্ঠু বিকল্প নেই। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মাতৃভাষার বাইরে অন্য ভাষায় কবিকে শিক্ষিত করে তোলা যায়, কিন্তু তাতে যে ঘাটতি থেকে যাবে তা অনস্বীকার্য। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের দেশে সে চেষ্টা ঔপনিবেশিক আমল থেকে আজ অবধি অব্যাহত রয়েছে। তা বন্ধ করার কোনো প্রয়াস চালানো হয়নি। বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমাদের অতিধনী ও অভিজাত শ্রেণী তাদের পুত্র-কন্যাকে বিদেশী ভাষার স্কুলে ভর্তি করিয়ে উচ্চাকাক্সাপ্রসূত তাদের মনের বাসনা পূরণ করে থাকেন।
মাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষার চর্চা শিক্ষার্থীর জীবনে আরেকটু ঘনিষ্ঠ ও ব্যাপক হওয়া প্রয়োজন। কেননা এতে তাদের শিক্ষনীয় উত্তাল-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের অন্তরঙ্গ পরিচয় লাভ সহজতর হয়ে পড়ে। মাতৃভাষার ওপর কিছু দখল অর্জিত হলে শিক্ষার্থী সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও মৌলিক চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। মানবসমাজে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বাস্তবতা এসব কথা প্রমাণ করতে সক্ষম।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি একটু ভিন্নতর। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আমাদের দেশে আমদানিকৃত বিদেশী সাহিত্য-দর্শন কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অন্যান্য প্রযুক্তিবিদ্যার পঠন-পাঠন মূলত ইংরেজির মাধ্যমে প্রচলিত হতে থাকে। মোক্ষম যুক্তি বাংলায় পরিভাষা নেই, পাঠ্যপুস্তক নেই ইত্যাদি। সুতরাং এসব শাস্ত্র বাংলায় পড়ানো যাবে না। এভাবেই কেটে যাচ্ছে আমাদের উচ্চশিক্ষা মহলের দিনকাল। কোনো কোনো বিষয়ে হয়তো অবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তেমন কিছু হয়নি। যথা পূর্বং তথা পরং। একই ঐতিহ্য বিদ্যমান থাকছে। এটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, আমরা আমাদের মেধাশক্তির উপযুক্ত ব্যবহার করতে পারছি না। সৃজনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।
উদ্ভূত সমস্যা সম্পর্কে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যারা নিয়োজিত তারা খুব চিন্তাভাবনা করছেন বলে মনে হয় না। আমাদের এমন অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ সেগুলোতে মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে কিংবা বাংলার মাধ্যমে উচ্চতর শিক্ষা লাভের সুযোগ খুবই কম। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৯৮ সালে যখন সাভারস্থ গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার উদ্যোক্তারা সচেতন ছিলেন মাতৃভাষার মূল্যায়নে। শুধু মাতৃভাষা কেন, আসলে তারা ভাষা শিক্ষা তথা ভাষার সাথে জ্ঞানার্জনের বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করতে চেয়েছিলেন। তাই তারা সব বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাংলা ও ইংরেজির কোর্স বাধ্যতামূলক করেছিলেন। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিবিএস ফিজিও থেরাপি, ফার্মেসি, মাইক্রোবায়োলজি, মেডিক্যাল ফিজিক্স ও বায়োমেডিক্যাল ইনজিনিয়ারিংয়ের ছাত্রদেরও আইন, রাজনীতি ও প্রশাসন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ফলিত গণিত, বাংলা অনার্স ও ইংরেজি অনার্সের শিক্ষার্থীদের মতো বাংলা ও ইংরেজির বিশেষ ভাষা কোর্সে প্রশিক্ষিত হতে হয়। অনেকের ধারণা, উচ্চশিক্ষার বইপত্র অধ্যায়নের জন্য শুধু ইংরেজি ভাষা শিক্ষাই যথেষ্ট। কিন্তু না প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থী বাংলা ভাষা সম্পর্কে যা শিখে এসেছে বা অনুশীলন করেছে তার পুনঃপরীক্ষা ও উন্নয়ন অবশ্য প্রয়োজনীয়। তার ভাবনা-চিন্তার অনুষঙ্গী মাতৃভাষায় তাকে পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশী ভাষায় যদি সে দক্ষতা লাভ করতে পারে সেও ভালো কিন্তু মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। জীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হতে যেমন শারীরিক সুস্থতা ও নৈতিক স্বচ্ছতা আবশ্যক, শিক্ষা ক্ষেত্রে মাতৃভাষার পারদর্শিতা ও পারিপাঠ্য তেমনি প্রয়োজন। হ