যে জাতি-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি যত বেশি সংস্থিত সে জাতি-গোষ্ঠী তত বেশি উন্নত। মানুষের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-সংস্কার, স্বভাব-চরিত্র, শিল্প-সাহিত্য, রুচিবোধ ইত্যাদি সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। সংস্কৃতি বহতা নদীর মতো গতিসম্পন্ন। চঞ্চলতা এর বৈশিষ্ট্য এবং স্থিরতা এর স্বভাব বিরুদ্ধ। জাতি-ভাষা, ধর্ম-সমাজ ভিন্নতার কারণে সংস্কৃতি ভিন্ন হয়। তাই পৃথিবীর সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়। একই সমাজে বসবাস করলেও বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে সংস্কৃতির ভিন্নতা দেখা যায়। আবার একই পরিবারে বসবাসকারী সব সদস্যের সংস্কৃতিও সমান নয়। শহর ও গ্রামের সংস্কৃতির মধ্যেও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ব্যক্তি ভেদেও সংস্কৃতির ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। আর স্থান-কাল-প্রকৃতির পরিবর্তনে সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়।
নৃতাত্তি¡ক ইতিহাস বিশ্লেষণে বাঙালি জাতিসত্তাকে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আলপীয় নৃগোষ্ঠীর সমন্বিত জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যাত করা যায়। আবার কিছু ঐতিহাসিকের অনুমান আর্যপূর্ব বাঙালি জাতিকেই বৈদিক ও সংস্কৃতি সাহিত্যে (হিন্দু পুরাণে) ‘অসুর’ বলে উল্লেখ করা হয়। এসব বিবেচনায় প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বাঙালির অস্তিত্ব ধারণা করা যায়। তবে এ সময়ের বাঙালি সংস্কৃতির কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। বাঙালি জাতির উদ্ভব কয়েক হাজার বছর আগে হলেও খ্রিষ্টপূর্ব মাত্র কয়েক শত বছর পূর্ব থেকে বাঙালি সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাক গুপ্ত যুগের আজীবিক সংস্কৃতি, মৌর্য-গুপ্ত যুগের আর্য-বৈদিক সংস্কৃতি, পাল যুগের বৌদ্ধ ধর্মীয় সংস্কৃতি, সেন আমলের ব্রাহ্মণ- কৌলীন্য সংস্কৃতি, মুসলিম আমলের আরব-ইরানি সংস্কৃতি, ব্রিটিশ আমলের পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এবং আধুনিক যুগের অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুুক্তির সংস্কৃতি বাঙালি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে সাম্প্রতিককালের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা হারানোর আশঙ্কাও বেড়েছে।
সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব ব্যাপক। বাঙালি সংস্কৃতিতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বাঙালি সংস্কৃতির ঊষালগ্নে জৈন ও আজীবিক ধর্মের প্রভাব পড়ে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীর ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশে আসেন এবং প্রায় একই সময়ে আজীবিক ধর্মের প্রবর্তক মখালিপুত্র গোসালও বঙ্গদেশে আসেন বলে ধারণা করা হয়। এ কারণে তৎকালীন বাঙালি সংস্কৃতিতে উভয় ধর্মের প্রভাব ছিল বলে সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বাঙালি সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে আর্য আগমনের ফলে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম-অষ্টম শতক পর্যন্ত বাঙালি সংস্কৃতিতে বৈদিক-হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বেড়ে যায়। এ সময় তারা বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে সমূলে বিনাশের চেষ্টাও চালায়। অবশ্য অষ্টম শতকের মধ্যভাগের পর থেকে পাল বংশের শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতিতে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পাল রাজত্বের পর খ্রিষ্টীয় এগারো শতকে কর্ণাটকদেশীয় সেন শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মণ-কৌলীন্য ধর্মের সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়। এরপর খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলায় আগমনের পর বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামি সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার হয়। এসব কারণে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয় দেখা যায়।
সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ সাহিত্য। বাঙালির সাহিত্যচর্চা অনেক পুরনো ধারণা করা হলেও খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের পূর্বের বাঙালি কোনো সাহিত্য এখনো পাওয়া যায়নি। পাল যুগের রচিত ‘চর্যাপদ’কেই (বৌদ্ধগান ও দোহা) সাহিত্য গবেষকেরা বাঙালি সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন বলে মনে করেন। তবে চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট, এর সাথে বাংলা ভাষার হুবহু মিল নেই। আর সেন শাসকদের অবহেলায় এবং সংস্কৃত সাহিত্যের তাণ্ডবতায় বাঙালির এ সাহিত্য ধারা (চর্যাপদ) বেশি দূর আগাতে পারেনি। অবশ্য মুসলিম শাসনামলে বাঙালা সাহিত্যচর্চার সুযোগ হয়। এ সময় বাঙালি হিন্দু সাহিত্যিকেরা দেব-দেবীর স্তুতিমূলক সাহিত্য রচনা করেছেন মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাদেরই পোষকতায় শ্রীকৃষ্ণ বিজয়, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি হিন্দু ধর্মগ্রন্থাদি বাংলায় অনূদিত হয়। আর ইংরেজ শাসনামলে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব হয়। বর্তমানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গৌরব বিশ্বময়।
বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিমূল পল্লীগ্রাম। তাই পল্লীর আচার-সংস্কার, ধর্মভীরুতা-লোকবিশ্বাস ইত্যাদি বাঙালি সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা। খনার বচন ও মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত শিলালিপিতে ধানের উল্লেখ তার প্রমাণ বহন করে। কৃষিনির্ভর সমাজ আদিতে অদৃষ্টবাদ ও আধ্যাত্মবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তৎকালে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা না থাকায় কৃষির জন্য নদীর পানি বা বর্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এজন্য হিন্দুধর্মাবলম্বীরা গিরি-কন্দর ও নদ-নদীকে দেব-দেবীরূপে পূজা করত। আর মুসলিম কৃষকরা কৃষিকাজের জন্য আল্লাহর কাছে পানি প্রার্থনা করে উন্মুক্ত মাঠে প্রখর রোদে ‘ইস্তিস্কা’ বা পানি প্রার্থনার নামাজ পড়ত। এ ছাড়া তারা ‘আল্লাহ মেঘ দে, বৃষ্টি দে, পানি দে রে তুই’ ইত্যাদি গান গেয়ে, মানত করে পানি প্রার্থনা করত। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি সংস্কৃতিতে লাঙ্গল-বলদের হাল-চাষের প্রচলন ছিল। তবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির ফলে বর্তমান যুগে হাল-চাষের প্রাচীন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাঙালি সমাজ কৃষিনির্ভর হলেও বস্ত্রশিল্পও বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়েছে। কবি বিজয় গুপ্তের ‘পদ্মপুরাণ’ ও মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে জোলা ও তাঁতীদের জীবনপ্রণালীর উল্লেখ তারই প্রমাণ বহন করে। আর মুঘল শাসনামলের বাংলার মসলিন কাপড় এখনো জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছে। প্রাচীন বাংলায় বস্ত্র পরিধানের কতগুলো সামাজিক রীতি ছিল। এ সময় পুরুষেরা ধুতি আর নারীরা শাড়ি পরত। অবশ্য মুসলিম আমলে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাবে মুসলিম সমাজে পুরুষদের জন্য পাজামা-পাঞ্জাবি এবং মুসলিম নারীদের জন্য সালোয়ার-কামিজ-বোরকা এবং ইংরেজ আমলে প্যান্ট-শার্টের প্রচলন হয়। কিন্তু বাঙালি পুরুষদের জন্য লুঙ্গি এবং নারীদের জন্য শাড়ি জাতীয় পোশাক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দীর্ঘ দিন যাবৎ এ ধারা অব্যাহত আছে। তবে পাশ্চাত্য প্রভাবে সাম্প্রতিককালের শহুরে বাঙালি নারী-পুরুষেরা শাড়ি-লুঙ্গি-পাজামা ছেড়ে প্যান্ট-শার্ট-ফতোয়ার দিকে ঝুঁকেছেন।
খ্রিষ্টীয় চৌদ্দ শতকে রচিত ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ কাব্যে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে খিচুড়ি, মাছ ও পাটশাকের উল্লেখ আছে। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ কবিতাংশে বাঙালির খাদ্যপ্রিয়তার স্বাক্ষর মেলে। ‘মাছ-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদের মধ্যেই বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির ইঙ্গিত আছে। পায়েশ-ক্ষীর বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন খাবার। এ ছাড়া ভাপা পিঠা, তেলের পিঠা, রসপিঠা, দুধের পিঠা, পাটিসাপটা, ফুলপিঠা ইত্যাদি সুস্বাদু পিঠা ও পিঠা তৈরির নৈপুণ্য বাঙালির আদি ও অকৃত্রিম সংস্কৃতির অংশ। এগুলো আবহমান বাঙালির লোকঐতিহ্য সম্পর্কিত। পরে বাঙালির ভাত-মাছের সাথে বিরানি-পোলাও-কোরমা, শিরনি-ফিরনি-জর্দা জাতীয় বিদেশী খাবারের যোগ হয়েছে। সম্প্রতি বার্গার-স্যান্ডউইচ, বাটার-ঠাণ্ডাপানীয় ইত্যাদি ফাস্টফুড জাতীয় খাবার বাঙালির রুচির পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তবে এগুলো এখনো শহুরে খাবারের মধ্যেই সীমিত আছে।
প্রাচীন বঙ্গের আবিষ্কৃত বিভিন্ন শিল্পপদ্ধতি থেকে বাঙালি জাতির শিল্প নৈপুণ্যতার পরিচয় মেলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, মন্দির, মঠ আর মসজিদগুলো ভগ্নাবস্থায় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে। কাশ-খড়ের কুটির, মাটির দেয়ালঘেরা ঘরবাড়ি, কৃষিকাজে ব্যবহৃত কাস্তে-লাঙ্গল, বাঁশ-বেতের কাজ করা কুটির শিল্প, শীতল পাটি, কাঠের খোদাই করা শিল্পকর্ম, দড়ি দিয়ে তৈরি ঝালর-শিকা, হাতের সেলাইয়ের নকশিকাঁথা, ফুলতোলা রুমাল-বালিশের ওয়ার; মাটির হাঁড়ি-পাতিল-খেলনা, শাঁখের-কাচের চুরি, পিতল-কাঁসার তৈজসপত্র ইত্যাদি আবহমান বাঙালির শিল্পমনের পরিচয় বহন করে। তবে নগর সংস্কৃতির প্রভাবে আবহমান গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবেই বাঙালিরা আমোদপ্রবণ। আসর বসিয়ে গান-গল্পের মাধ্যমে আনন্দ-বিনোদন করা বাঙালিদের স্বভাব। প্রচীন যুগের বৌদ্ধধর্মভিত্তিক দোহা গান, মধ্যযুগের হিন্দু ধর্মভিত্তিক শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন-বৈষ্ণব গান, ইসলামভিত্তিক মুর্শিদী-মারফতি, এছাড়া জারি-সারি, পালাগান-যাত্রাগান, মর্সিয়া-গম্ভীরা ইত্যাদি গানে বাঙালি জাতির জীবনবোধ-ধর্মবোধ বিধৃত হয়েছে। আধুনিক যুগের পল্লীগীতি-ভাওয়াইয়া, রবীন্দ্রসঙ্গীত-নজরুলগীতি, কাওয়ালি-লালনগীতি, আধুনিক-দেশাত্মবোধক ইত্যাদি গানে বাঙালি জাতির প্রকৃতি-প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ ইত্যাদি মনোবৃত্তি প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিশ্বায়নের সুযোগে সাম্প্রতিককালে বিদেশী-বিজাতীয় গান-বিনোদন কর্মকাণ্ড ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে।
অনেক গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি সংস্থিত হয়েছে। কালের প্রবাহে এ সংস্কৃতির বিবর্তনও ঘটছে। অধিকন্তু বিশ্বায়নের প্রভাবে বাঙালি সংস্কৃতি আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। অপসংস্কৃতির কালো থাবা থেকে আমাদের সংস্কৃতি ও জাতিকে মুক্ত রাখতে আমাদের শিকড় সন্ধানী ও সৃজনশীল হতে হবে। হ