মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট মহাবিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যত মানুষ রয়েছে, কালক্রমে তাদের মধ্যে নানা গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। জন্ম হয়েছে গোষ্ঠীগত বা জাতিগত বৈশিষ্ট্য। ফলে গোষ্ঠীগত বা জাতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে একেকটি বিশেষ অংশের অনুষ্ঠান ও ধর্মেরও স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠেছে। যাকে এক এক জাতির ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য বা সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আদিকাল থেকে এ সব বিষয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব কর্মকাণ্ড বা সংস্কৃতি হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। আমাদের অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতির রূপ। রয়েছে বিশেষ বিশেষ কর্মকাণ্ড। বাংলা নববর্ষ এবং বর্ষবরণ প্রক্রিয়াও এমনি একটি বিষয়।
প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে আমাদের জীবনে আরো একবার আসছে বাংলা নতুন বছর। নতুন এই বাংলা বছরকে এবার আর ঘটা করে বরণ করা হবে না বৈশাখের প্রথম দিনটিতে। এদিন ঢাকার রমনার বটমূলে প্রত্যুশে ঐতিহ্যবাহী ছায়ানটের গানের আসরও বসবে না। গানে গানে পয়লা বৈশাখকে বরণ করা হবে না প্রতি বছরের মতো। বৈশাখের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে তৈরি পাঞ্জাবি-পাজামা, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ পরিহিত নর-নারীর প্রদর্শনীও দেখা যাবে না। করোনার কারণে এবারের নববর্ষে আনুষ্ঠানিকতা নেই। যা কিছু হবে সবই টেলিভিশন বা রেড়িওতে।
হালখাতা পয়লা বৈশাখের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই উৎসবের আয়োজক ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের লোকেরা। এদিন ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার পুরান হিসাবের খাতা নতুন করে তৈরি করেন। যেসব ক্রেতা বা খদ্দের পুরো বছর দোকান থেকে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করেন, তাদের অনেকেই পুরো টাকা পরিশোধ করতে পারেন না। ফলে তাদের পরিশোধ করতে না পারার টাকা বাকি হিসেবে খাতায় লেখা থাকে। বাকির খাতায় উঠানো এই টাকার একটা অংশ কিংবা পুরোটাই পরিশোধ করেন হালখাতা অনুষ্ঠানের দিন। এই অনুষ্ঠানে টাকা জমা দিয়ে খদ্দেররা মিষ্টিমুখ করে বাড়ি ফেরেন। ব্যবসায়ীরা হালখাতার দিন এভাবে খদ্দেরদের কাছ থেকে বাকি টাকার একটা বড় অংশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। যারা বাকি টাকার পুরোটা পরিশোধ করতে পারেন না, তাদের বাকি টাকার হিসাব নতুন খাতায় লেখা হয়। এভাবে তৈরি খাতাকে বলা হয় ‘হালখাতা।’ এবার আর সেই হাল খাতার আয়োজনও থাকবে না।
পয়লা বৈশাখের আরেক উৎসবের নাম মেলা। ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন মেলায়। ফলে এসব পণ্য ক্রয়ের জন্য নানা ধরনের ক্রেতার সমাগম ঘটে মেলায়। গ্রামের মেলাগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে সর্বস্তরের মানুষ ভিড় জমান। মেলা হয় জমজমাট। সে তুলনায় শহরের মেলাগুলোকে মনে হয় ফরমায়েশী, প্রাণহীন। মনে হয় জোর করে বসানো মেকি মেলা। এসব মেলায় লোকদের একটা বড় অংশ আসেন সময়কাটাতে। আড্ডা দিতে। আসেন সেজেগুজে। একেকজনকে দেখলে শোপিস মনে হয়। এবার অবশ্য করোনায় সেটিও ঘটতে দেখা যাবে না।
বাঙালি সম্প্রদায়ের যারা বিদেশে থাকেন, সেখানে বাংলায় কথা বলার সুযোগ কম। বাংলার সংস্কৃৃতি চর্চা থাকে না বললেই চলে। এমন সব স্থানে বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকেরা পয়লা বৈশাখ উদযাপন করারও তেমন একটা সুযোগ পান না। তবে কখনো কখনো কোথাও কোথাও এমন ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া যায়। ভারত একটি বিশাল দেশ। এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষাভাষী লোক বসবাস করেন। পশ্চিম বাংলার তথা বাংলার বাংলাভাষী মানুষ যারা ভারতের অন্য রাজ্যে বসবাস করেন, যেখানে বাংলার প্রচলন নেই সেখানে বাঙালিদের পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠান করতে দেখা গেছে। যেমন ল²ৌ। ল²ৌতে প্রাণের টানেই এক সময় বাংলার বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকেরা একত্র হয়ে দুই দিনব্যপী ‘বৈশাখী-সম্মিলনী’ নামে অনুষ্ঠান করেছিলেন। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বেশ কিছু খ্যাতিমান বাঙালি। এদের মধ্যে ছিলেন কবি ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেন, রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় (পিএইডি), ডক্টর রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক নির্মল কুমার সিদ্ধান্ত, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অমিত কুমার হালদার ও ড. নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মতো পাণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যক্তি। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক রাধাকমল মুখোপাধ্যায়। দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন শিল্পী অমিত কুমার হালদার। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, নাচ-গান, অভিনয়, প্রবন্ধ ও কবিতা প্রতিযোগিতা, কারুশিল্পের প্রদর্শনী এবং শেষে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করা হয়। অনুষ্ঠানে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ল²ৌপ্রবাসী অসংখ্য বাঙালি তরুণ-তরুণীসহ অসংখ্য শ্রোতা-দর্শক। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এ অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং অংশগ্রহণকারী সবাই মনেপ্রাণে বাংলা ভাষাকে ভালো বাসতেন। বাংলা বর্ষ বৈশাখকে সম্মান করতেন। চিত্রশিল্পী অমিত কুমার হালদার পুরোপুরি বাঙালি ছিলেন। অমিত কুমার হালদারের মা ছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নি। বাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রাচ্যধারার চিত্রের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অসিত কুমারের মামা। সুতরাং সহজেই অনুমান করা যায়, এদের প্রত্যেকেই বাংলাকে আন্তরিকভাবে ভালো বাসতেন। অমিত কুমার হালদার বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য নিয়ে ছবি এঁকেছেন। যেমনÑ ঋতু হেমন্ত, ঋতু বর্ষা। সুতরাং এমন একজন বাংলাপ্রেমী মানুষের পক্ষেই বৈশাখের অনুষ্ঠানের সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করা যে যথাযথ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, অমিত কুমার হালদারের মামা শিল্পী অবনীন্দ্র্রাথ ঠাকুর পশ্চিমা ব্রিটিশ ধারায় শিল্পশিক্ষা করলেও সেই পশ্চিমা ধারায় চিত্রচর্চা করেননি। তিনি প্রাচ্যধারা অর্থাৎ ভারতীয় চিত্রের নিজস্ব ধারায় চিত্র চর্চা করেছেন। শুধু তাই নয়, পুরোপুরি (শতভাগ) বাঙালি সংস্কৃতি অনুসরণ করার প্রয়োজনে ঘরের যাবতীয় বিদেশী আসবাবপত্র বিক্রি করে দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমগ্র জীবন বাংলাকে, বাংলার সংস্কৃতিকে সম্মান করেছেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালের আশ্বিন মাসের ৯ তারিখ লন্ডন গিয়েছিলেন। কিন্তু লন্ডনের আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশ তাকে অশান্ত করে তুলেছিল। সেখানে বসে শান্তিনিকেতনের অজস্র বৃক্ষশোভিত শিউলি ফুলের গন্ধে ভরপুর এবং কাকর বিছানো অতি পরিচিত পথের কথা ভেবেছেন। লন্ডনের কয়েক দিনেই হাঁপিয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ সন্তোষ মজুমদারকে এক পত্রে লিখেছিলেনÑ ‘আমার এ চিঠি যখন শান্তনিকেতনে পৌঁছবে তখন শিউলি ফুলের গন্ধে তোমাদের বন আমোদিত হয়ে উঠেছে এবং সূর্যোদয় সূর্যাস্ত, শারদশ্রীর সোনার পদ্মবনের আশ্চর্য শোভা ধরে দেখা দিচ্ছে।
সেই চির পরিচিত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে এখানকার আকাশের বিরুদ্ধে আমার মাথায় অত্যুক্তি জাগছে। আমার মন বলছে, এখানকার আকাশের মধ্যে রূপের খেয়াল নেই, সে মানুষের মন ভোলাতে চায় না। এখন জ্যোৎস্না রাত্রি কিন্তু সে কেবল পাঁজিতেই দেখি,... এখানকার আকাশ কালো ফ্রককোট এবং কালো চিমনিপট টুপি পরে অত্যন্ত ভব্যভাবে থাকে বলেই এখানকার লোকের কাজকর্মের কোনো ব্যাঘাত হয় না। আমাদের দেশের আকাশ আমাদের কাজ ভোলায়, শরৎকালের সোনালি আলোয় অফিস-আদালত মাটি করে দেয়Ñ আকাশ আপনার সমস্ত দরজা-জানালা এমন করে অহরাত্র খুলে রেখে দিয়েছে যে, মন সে আমন্ত্রণ একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারে না।... আমাদের আকাশ ছুটির আকাশ, এদের আকাশ অফিসের আকাশ। এদের আকাশে ঘণ্টা বাজে, আমাদের বাঁশি বাজে। ভগবানের লীলার রূপ এখানে আবৃত্ত হয়ে রয়েছে’ (প্রবাসী, পৃষ্ঠা ৮৫৭)।
উদ্ধৃত অংশটুকু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিখিত পত্রের খণ্ডাংশ। কিন্তু উল্লিখিত পত্রাংশেই স্পষ্ট যে, তিনি বাংলা এবং লন্ডনের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্যের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঋতুবৈচিত্র্যের প্রভাব এবং সেই পরিবেশ এবং প্রভাবে মানুষের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডেরও ব্যাপক পার্থক্য উপস্থাপিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উভয় স্থানের এসব বিষয়কে বর্ণিল বর্ণনা ও হৃদয়গ্রাহী শব্দ বিন্যাসের মাধ্যমে মনোমুগ্ধকর চিত্রে রূপান্তর করেছেন। ‘হৃদয় হরণ করা বাঁশির সুরে বাংলার কুলবধূর উদাস হয়ে কাজ ফেলে ঘর ছেড়ে বাইরে যাওয়া, বাঁশির সুরের মোহনমন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে ফুলের কাজ ভুলে যাওয়া, লন্ডনের মেঘে ঢাকা কিংবা আকাশকে ঢেকে রাখা কালো মেঘকে কালো ফ্রককোট এবং কালো চিমনিপট টুপির সাথে তুলনা করা, বাংলার আকাশের রূপ-বৈচিত্র্যের মাঝে মানুষের মন ভোলানো রূপের সন্ধান পাওয়া এবং লন্ডনের আকাশে সেই রূপের সন্ধান না পাওয়া সব কিছুই শিল্পের আধ্যাত্মিক প্রণোদনার কথা। শিল্পী এবং তাত্তি¡ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পত্রের বিষয়কে অপূর্ব কৌশলে শিল্পে রূপান্তর করেছেন। শিল্পে রূপান্তরিত তার এ পত্র শিল্পসচেতন সব পাঠকের জন্যই উপভোগ্য বিষয়। বিশেষ করে যারা শিল্পের কারিগর তাদের জন্য। পশ্চিম বাংলার শিল্পীরা যে বাংলা, বাংলার ষড়ঋতুকে, বাংলার আকাশ এবং বর্ষাকে জীবনের সাথে এক করে নিতে পেরেছেন তা তাদের সাহিত্য এবং শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। শিল্পী অমিত কুমার হালদারের চিত্রের কথা আগেই উল্লেখ করেছে, যেগুলো বাংলার ষড়ঋতুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ছাড়া ঋতুবসন্ত নিয়ে চিত্র এঁকেছেন শিল্পী কানুদেশাই, বর্ষানৃত্য নিয়ে চিত্র এঁকেছেন শিল্পী অজিত কৃষ্ণ গুপ্ত। এমনি অসংখ্য চিত্র রয়েছে যেগুলো বাংলা এবং বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যের প্রতি শিল্পীর আন্তরিকতা ও ভালোবাসার নিদর্শন। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পীদের যারা পয়লা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করে থাকেন তাদের শিল্পে বাংলা বা বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। এ জন্য বাংলা বর্ষবরণকে আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। আর এ জন্যই পুরান কথাগুলো নতুন করে বলা হয়। পুরান কাজগুলোই নতুন করে করা হয়। যার মাঝে হৃদয়ের ছোঁয়া তেমন একটা পাওয়া যায় না। যারা নিজেরা বাংলা এবং বাংলার সংস্কৃতিকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেন না। শিল্পের চর্চা করেন না, তাদের বৈশাখের অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং বৈশাখ সম্পর্কে বক্তব্য মেকি এবং একদিনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। হ