সাধারণ অর্থে আদালত বলতে বিচারালয়কে বোঝায়। আদালতের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আদালতে বিচারকার্য পরিচালনায় আসীন ব্যক্তির ক্ষমতাই আদালতের ক্ষমতা। এ ক্ষমতা আদালতের মাধ্যমে প্রযুক্ত হয়। আদালতের এ ক্ষমতা আদালতে বিচারকার্যে আসীন ব্যক্তির পদমর্যাদা ভেদে ভিন্নতর হয়ে থাকে।
আমাদের আদালত তথা বিচার ব্যবস্থাপনা দুই ধরনের আদালতের সমন্বয়ে গঠিত। এর একটি হচ্ছে উচ্চ আদালত, যা দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান দ্বারা সৃষ্ট; আর অপরটি হচ্ছে নিম্ন আদালত, যা আইন দ্বারা সৃষ্ট। আমাদের উচ্চ আদালতকে বলা হয় সুপ্রিম কোর্ট, যা দু’টি বিভাগে বিভক্ত। এর একটি হচ্ছে আপিল বিভাগ, অন্যটি হচ্ছে হাইকোর্ট বিভাগ। আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আপিল বিভাগে প্রাথমিক আদালত হিসেবে এর অবমাননা ছাড়া অপর কোনো মামলার বিচার হয় না। এটি মূলত আপিল আদালত। হাইকোর্ট বিভাগ রিট কোম্পানি, অ্যাডমিরালটি ও আদালত অবমাননাসংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক শুনানি ছাড়াও নিম্ন আদালত প্রদত্ত ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার রায় ও আদেশের আপিল এবং রিভিশনের শুনানি গ্রহণ করে থাকে।
নিম্ন আদালত দুই ভাগে বিভক্ত যথাÑ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা সম্পূর্ণরূপে ফৌজদারি আদালত হিসেবে বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন। অন্য দিকে সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজরা শুধু দেওয়ানি মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন। যুগ্ম জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজরা দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন এবং এ কারণেই উপরি উক্ত বিচারকদেরকে যুগ্ম জেলা ও সহকারী দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা ও দায়রা জজ নামে অভিহিত করা হয়।
সমাজে বসবাসরত একজন মানুষের অধিকার ক্ষুণœ হলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করা শুরুর পর থেকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে থাকে। পরবর্তীতে আসমানি কিতাবের মাধ্যমে আবির্ভূত ধর্ম ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের অধিকার এবং মানবাধিকারকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আবির্ভাব পূর্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক সামন্ত রাজারা নিজ নিজ এলাকার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। রাজার সম্মুখে একজন বিচারপ্রার্থী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি করজোড়ে কুর্নিশ করে দণ্ডায়মান হয়ে অভিযোগ দায়ের করতেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি সমভাবে দণ্ডায়মান হয়ে রাজার কৃপা প্রার্থনা করতেন।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিচারপ্রার্থী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি উভয়কে লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থায় বিচার ও কৃপা প্রার্থনা থেকে উত্তরণের পথে যুগান্তকারী ভূমিকার অবতারণা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হতে থাকলে নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ সুগম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদ সারা বিশ্বের মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখার এক অনন্য দলিল। এ সনদের ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানসিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদের পঞ্চম অনুচ্ছেদ আমাদের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং সেখানে একইভাবে বিবৃত হয়েছেÑ যেকোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানসিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।
জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদের ১১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকাশ্য আদালতে আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে নির্দোষ দাবি করার অধিকার থাকবে এবং সেখানে নিজেকে সুরক্ষার সব ধরনের অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদের এ বিধানটি আমাদের সংবিধানের ৩৫(৩) নং অনুচ্ছেদে প্রতিফলিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছেÑ ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বা নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বা প্রকাশ্যে বিচার লাভের অধিকারী হবেন। আমাদের সংবিধানের ৩৫(৫) ও ৩৫(৩) নং দফাদ্বয়ের বিচার ও দণ্ড সম্পর্কিত রক্ষণ বিষয়ে অনুচ্ছেদ নং ৩৫(৬) দফায় বলা হয়েছেÑ প্রচলিত আইনের নির্দিষ্ট কোনো দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোনো বিধানের প্রয়োগকে এ অনুচ্ছেদের তিন বা পাঁচ দফার কোনো কিছুই প্রভাবিত করবে না।
অনুচ্ছেদ নং ৩৫ এর ছয় দফা থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত যে, দেশের প্রচলিত আইনে যে সকল দণ্ড প্রদানের বিধান রয়েছে এর বাইরে অন্য কোনোরূপ দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা কোনো আদালতের নেই। প্রচলিত আইন পর্যালোচনায় দেখা যায় দণ্ডবিধিতে অপরাধীদের পাঁচ ধরনের সাজা প্রদানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ পাঁচ ধরনের সাজা হচ্ছেÑ ১. মৃত্যুদণ্ড; ২. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; ৩. সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ড; ৪. সম্পত্তির বাজেয়াপ্তকরণ ও ৫. অর্থদণ্ড।
আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা যে মৌল নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত তা হচ্ছেÑ নির্দোষতার অনুমান (চৎবংঁসঢ়ঃরড়হ ড়ভ রহহড়পবহপব)। এ মৌল নীতিটির অর্থ হচ্ছেÑ যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত না হচ্ছে যে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী ততক্ষণ পর্যন্ত ধরে নিতে হবে যে, তিনি নির্দোষ। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক (অফাবৎংধৎরধষ)। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিচারব্যবস্থায় বিচারকের ভূমিকা অনেকটা খেলায় মধ্যস্থ ব্যক্তির (টসঢ়রৎব) অনুরূপ।
উচ্চ আদালতের বিচারকদের ক্ষমতা সংবিধান, আইন ও বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্য দিকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে সংবিধান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন ও বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ ক্ষমতার বাইরে উচ্চ আদালতের বিচারকরা সব ধরনের মামলার বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকরা শুধু দেওয়ানি মামলার বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (ওহযবৎবহঃ ঢ়ড়বিৎ) ভোগ করে থাকেন। আইনের অপব্যবহার রোধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের স্বার্থে এ ক্ষমতাটি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু যে ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিধিবিধান অথবা প্রতিষেধ রয়েছে সে ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ অনুপস্থিত।
উচ্চ আদালতের বিচারকরা শপথের অধীন। উচ্চ আদালতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ-পরবর্তী শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে একজন ব্যক্তি বিচারক পদে আসীন হন না এবং তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত বিচারক পদে বহাল থাকেন তাকে এ শপথ রক্ষা করে চলতে হয়। উচ্চ আদালতের একজন বিচারক শপথ গ্রহণের সময় অপর অন্যান্য বিষয়ের সাথে পাঠ করেন যে, তিনি সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন।
আমাদের সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সে ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এ সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর করা হয়। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে যেসব মৌলিক অধিকারের উল্লেখ রয়েছে ওই মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের এক দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়েরের অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান একই ভাগে করা হয়েছে।
আমাদের প্রচলিত আইন দণ্ডবিধিতে যেসব কার্যকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এর বাইরে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনকে সুসংহত করার জন্য কতিপয় কার্যকে সংবিধানে ৭ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহের আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধের জন্য ৭ক এর দফা ১(খ) প্রাসঙ্গিক, তাতে বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায়Ñ এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে কিংবা তা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলেÑ তার এ কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে। ওই ব্যক্তিকে অনুরূপ কার্যে সহযোগিতাকারী ব্যক্তি একই অপরাধে অপরাধী হবে।
আদালত অবমাননাসংক্রান্ত বিচারকে আধা ফৌজদারি বিচার গণ্য করা হয়। ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে সংবিধানে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারের বিষয় ব্যক্ত করা হয়েছে। যেসব আদালতে প্রকাশ্য বিচারকার্য পরিচালিত হয় সেসব আদালতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত নয়। তবে চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে জন উপস্থিতি আদালতের ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে আদালত আইনজীবী, মামলার পক্ষ, সাংবাদিক ও আগ্রহী ব্যক্তি কতজন প্রবেশ করতে পারবেন, তা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে আইনজীবী বহির্ভূত ব্যক্তিরা আদালত কক্ষে আইনজীবীদের সাথে বসে বিচারকার্য প্রত্যক্ষ করেন। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, পক্ষ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামি বিচার কক্ষে একই ধরনের আসনে উপবিষ্ট থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ স্বাক্ষর করেছে সেসব রাষ্ট্রের বেশির ভাগই মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিরা সমগ্র বিচার চলাকালীন অবস্থায় আসামি বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আসনে উপবিষ্ট থাকেন। বাংলাদেশ যদিও জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে অবমাননাকর ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড ও ব্যবহার বিষয়ে প্রতিষেধ রয়েছে কিন্তু আমাদের নিম্ন আদালতে বিচার চলাকালীন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিদের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান থেকে বিচারকার্য অবলোকন করতে হয়। ফৌজদারি মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিরা কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান থেকে বিচারকার্য প্রত্যক্ষ করবেন সে বিষয়ে আমাদের কোনো আইনে সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। বরং সংবিধানে যেটি উল্লেখ রয়েছে তা বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য এবং সে ক্ষেত্রে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা আসামিদের মামলা চলাকালে অবশ্যই আদালত কক্ষে উপবেশনের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
উচ্চ আদালতে আদালত অবমাননাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় রুল প্রদান পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কখনো কখনো দু-একটি বেঞ্চের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশিত ব্যক্তিকে দীর্ঘক্ষণ আদালত কক্ষে দণ্ডায়মান করে রাখতে দেখা যায়। দেশের নাগরিকদের প্রশ্ন, দণ্ডায়মান করার এ বিষয়টি সংবিধান দ্বারা অনুমোদিত কি না? এ প্রসঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৩৫ এর দফা ৫ এর বিধানাবলির সাথে দণ্ডবিধির ৫৩ বিধিতে বিবৃত দণ্ডের বিষয় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায় দণ্ডবিধি ও সংবিধান মামলা সংশ্লেষে একজন ব্যক্তির আদালতে দণ্ডায়মান থাকা অনুমোদন করে না। উচ্চ আদালতের একজন বিচারক শপথ গ্রহণ করাকালীন ব্যক্ত করেছেন যে, তিনি সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করবেন। তাই দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর জিজ্ঞাস্য সংবিধান যেখানে মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়েরের নিশ্চয়তা বিধান করছে সেখানে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বিচারক সংবিধানের সুস্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘনপূর্বক তার শপথের ব্যত্যয়ে আদালত কক্ষে উপবেশন করার আসন খালি থাকার পরও অবমাননাকর ও লাঞ্ছনাকরভাবে একজন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশনা দিতে পারেন কি না?
দেশের শীর্ষস্থানীয় দু’জন আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন ও বিচারপতি টি এইচ খান সম্প্রতি আদালতে বলেছেন, রিট মামলায় প্রতিপক্ষকে আদালতে দণ্ডায়মান করে রাখা সংবিধান ও আইন দ্বারা সমর্থিত নয়। উভয়ের বক্তব্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত ও প্রকাশিত হলে দেশবাসী বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের আদালতে দাঁড় করিয়ে রেখে অপমানিত করার ঘটনাবলি ইতোমধ্যে সংসদে আলোচিত হয়েছে। তাই আইনাঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, বিষয়টি সমর্থিত না হয়ে থাকলে সংবিধানে নব সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ নং ৭ক-এর দফা ১(খ) অনুযায়ী এরূপ কার্য অসাংবিধানিক কি না?
পোশাকধারী ট্রাফিক কনস্টেবল কর্তৃক একজন বিচারককে সালাম না দেয়ার কারণে তাকে কান ধরে ওঠবস করানো কিংবা বিমানে ইকোনমি শ্রেণীর যাত্রী হয়ে প্রথম শ্রেণীতে বসার দাবি পূরণ না হওয়ায় পাইলট ও বিমানবালাকে আদালতে এনে স্বীয় মর্যাদাহানির অজুহাতে দাঁড় করিয়ে রাখা কতটুকু যৌক্তিক এবং বিচারক ও বিচার বিভাগের জন্য সম্মানবহ তা নিয়ে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক ও উত্তপ্ত আলোচনা দেশবাসী ইতোমধ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে। তা ছাড়া এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী নিজেই যখন বিচারক সে ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার কতটুকু নিশ্চিত হতে পারে? এখানে প্রাসঙ্গিক যে, একজন বিচারককে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে, শুধু ন্যায়বিচার করলেই হবে না, ন্যায়বিচার যে নিশ্চিত করা হয়েছে তা স্পষ্টত দেখিয়ে দিতে হবে। শপথে পঠিত অনুরাগ ও বিরাগের বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য।
উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের শপথ ও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের দফা ৫-এর পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়, সংবিধান উচ্চ আদালতে কোনো মামলার শুনানি চলাকালীন মামলার কোনো পক্ষকে আদালত কক্ষে দণ্ডায়মান থাকা অনুমোদন করে না। সংবিধানের এ অবস্থানটিকে পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সন্নিবেশিত ৭ক এর ১(খ) এর সাথে বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয়, উচ্চ আদালতের কোনো বিচারক কর্তৃক মামলা চলাকালীন দণ্ডায়মান থাকার নির্দেশ প্রদান অনুচ্ছেদ নং ৭ক ১(খ)-এর ভাষ্য অনুযায়ী অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করার সমতুল্য, যা সংবিধানের ভাষায় রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। দেশের কোনো নাগরিক অসাংবিধানিকভাবে আদালত কর্র্তৃক নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও অপমানিত হলে তা দেখার দায়িত্ব সাংবিধানিক পদধারীদের। কিন্তু এর আগে দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ আদালতের দু-একজন বিচারক কর্তৃক অসাংবিধানিকভাবে জনগণের অংশ পোশাকধারী পুলিশ ও সমাজের বিশিষ্টজন নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও অপমানিত হলেও সংসদ ও সংসদের বাইরে সাংবিধানিক পদধারীরা সংবিধানকে সমুন্নত রাখার স্বার্থে এর কোনো ধরনের প্রতিকার বিধানে এগিয়ে আসেননি। যে মুহূর্তে দেখা গেল, সংসদের স্পিকারের প্রতি কটাক্ষপূর্ণ উক্তি করা হলো ঠিক সে মুহূর্তে সংসদ সদস্যরা তাদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হলেন। কিন্তু তাদের তো উচিত ছিল এর আগে যখন সাধারণ নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণœ হয়েছিল তা প্রতিবিধানে এগিয়ে আসা। সে দিন তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটত না। আর এখনো যদি আমরা প্রতিবিধান করতে না পারি তবে এর শেষ কোথায় তা শুধু অনাগত ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
মানুষের অধিকার ক্ষুণœ হলে মানুষ এর প্রতিবিধানের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। বিচারকরা সবসময় জনগণের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। অন্য দিকে বিচারকের প্রতি জনগণের আস্থা বিচারকের অধিকার রক্ষার রক্ষাকবচ। আদালতের যেমন সম্মান আছে ঠিক তেমন প্রতিটি মানুষেরও সম্মান আছে। আদালত কর্তৃক অন্যায় ও আইনবহির্ভূতভাবে কোনো ব্যক্তির সম্মানের হানি ঘটলে তাতে ব্যক্তির চেয়ে আদালতের মর্যাদাই অধিক ক্ষুণœ হবে, যা প্রকারান্তরে আদালতের প্রতি অনাস্থার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আদালত জনগণের শেষ ভরসাস্থল। তাই আদালতে ন্যায়বিচার পেয়ে সম্মানিত হওয়ার পরিবর্তে আদালত কর্তৃক নিগৃহীত, অপমানিত, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হলে আদালতের সম্মান কতটুকু অটুট থাকবে তা ভেবে দেখে আদালতকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা প্রত্যাশিত নয় কি। হ
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
ঊ-সধরষ : রশঃবফবৎধযসবফ@ুধযড়ড়.পড়স