আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে রাসূল পাঠিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সা: বিশ্ব মানবগোষ্ঠীর জন্য সর্বশেষ রাসূল। তিনি সব জনগোষ্ঠীর জন্য প্রেরিত নবী। আরবি, অনারবি, সাদা-কালো সবার জন্য তিনি নবী ও রাসূল। তিনি সব নবী ও রাসূলেরও নেতা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ্ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়েছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদেরকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৬৪)
রাসূলের সম্মান ও মর্যাদা : মুহাম্মদ সা:-এর সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেছেন। তাই ইচ্ছা করে তার মর্যাদা কেউ বাড়াতে বা কমাতে পারবে না। যুগে যুগে মুশরিকরা নবীকে নিয়ে যতই কটূক্তি এবং অবমাননা করেছে আল্লাহ ততই তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।
আল্লাহ্ বলেন, ‘এবং আমি তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করিয়াছি।’ (সূরা আল-ইনশিরাহ : ৪)
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজানে বিশ্বব্যাপী মসজিদে মসজিদে তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে। মুয়াজ্জিন ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্’ অর্থাৎ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।’
১. উত্তম চরিত্র ও মাধুর্যপূর্ণ আচরণের অধিকারী : আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা: ছিলেন উত্তম চরিত্র ও মাধুর্যপূর্ণ আচরণের অধিকারী। এ বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই প্রশংসা করে বলেন, তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সূরা আল-কালাম : ৪)
হজরত আবু হুরায়রা রা: বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: বলেন, ‘নিশ্চয় আমি মহৎ চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা দান করার উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।’ (বায়হাকি)
২. বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ : আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা:-কে শুধু মানবমণ্ডলী নয়; সব সৃষ্টিকুলের জন্যই রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করিয়াছি। (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)
৩. তিনি শেষ নবী : নবুওতের ধারাবাহিকতার শেষপ্রান্ত তিনি হচ্ছেন নবী পরম্পরা পরিসমাপ্তকারীÑ শেষ নবী। তারপর আর কোনো নবী আসবেন না। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নহে ; বরং সে আল্লাহ্র রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (সূরা আল-আহজাব : ৪০)
৪. সব নবী-রাসূলদের ওপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে : যুগে যুগে যেসব নবী ও রাসূল আগমন করেছেন তাদের ওপর মুহাম্মদ সা:-কে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী সা: বলেছেন, ‘ছয়টি দিক থেকে সব নবীর ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। আমাকে জাওয়ামিউল কালিম তথা ব্যাপক অর্থবোধক সংক্ষিপ্ত বাক্য বলার যোগ্যতা দেয়া হয়েছে, আমাকে ভীতি (শত্রুর অন্তরে আমার ব্যাপারে ভয়ের সঞ্চার করা) দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে, গনিমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) আমার জন্য বৈধ করা হয়েছে, আমার জন্য সব ভূমিকে পবিত্র ও সিজদার উপযুক্ত করা হয়েছে, আমি সব মানুষের তরে প্রেরিত হয়েছি এবং আমার মাধ্যমে নবুওয়ত পরম্পরা শেষ করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১১৯৫)
৫. তাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসা ঈমানের দাবি : যে ব্যক্তির মধ্যে রাসূলের ভালোবাসা থাকবে না, সে কোনো দিন মুমিন হতে পারবে না। এমনকি নিজের জীবন থেকেও তার প্রতি বেশি ভালোবাসা থাকতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে, নবী মুমিনদের কাছে তাহাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর। (সূরা আল-আহজাব : ৬)
হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, পিতা ও সমগ্র মানুষ হতে প্রিয়তম হবো।’ অর্থাৎ সবার চেয়ে তাকে বেশি ভালোবাসতে হবে। (সহিহ বুখারি)
৬. কিয়ামতের দিন তার শাফাআত কবুল হবে : কিয়ামতের কঠিন মুসিবতের দিনে আল্লাহ তায়ালার অনুমতিক্রমে তিনি গুনাহগার উম্মতের জন্য শাফাআত করবেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি সব আদম সন্তানের নেতা। এতে কোনো গর্ব-অহঙ্কার নেই। সেদিন আমার হাতে প্রশংসার ঝাণ্ডা থাকবে তাতে কোনো গর্ব-অহঙ্কার নেই। আদম থেকে নিয়ে যত নবী-রাসূল আছেন সবাই আমার ঝাণ্ডার নিচে থাকবেন। আমি হচ্ছি প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম কবুল করা হবে। এতে কোনো গর্ব-অহঙ্কার নেই।’ (ইবন মাজাহ)
৭. সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি : তিনিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি হবেন। এ বিষয়ে হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূল সা: বলেন, ‘জান্নাতের দরজায় আমিই সর্বপ্রথম কড়াঘাত করব, তখন খাজেন (প্রহরী) জিজ্ঞেস করবে, কে আপনি? আমি বলব, মুহাম্মদ। সে বলবে, আপনার জন্যই খোলার ব্যাপারে নির্দেশিত হয়েছি, আপনার আগে কারো জন্য খুলব না।’ (মুসলিম)
৮. তার আদর্শই সর্বোত্তম, তার আদর্শই গ্রহণযোগ্য: যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, জান্নাতের আশা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রত্যাশা করেন তিনি তাদের সবার জন্য উত্তম আদর্শ। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহ্কে অধিক স্মরণ করে তাহাদের জন্য তো রাসূলুল্লাহর মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আল-আহজাব : ২১)
৯. সব ক্ষেত্রে তার অনুসরণ ঈমানদার হওয়ার শর্ত : তিনি যেসব বিষয়ে আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা তা ঈমানদার হওয়ার শর্ত। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রাসূল তোমাদেরকে যাহা দেয় তাহা তোমরা গ্রহণ করো এবং যাহা হইতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তাহা হইতে বিরত থাকো এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; আল্লাহ্ তো শাস্তিদানে কঠোর। (সূরা হাশর : ৭)
হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা: থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমাদের প্রবৃত্তি আমার অনুসরণ করে।’
১০. তাঁর নাম শুনলে দরূদ ও সালাম দিতে হয় : আল্লাহ তায়ালা তাঁর মর্যাদাকে সমুন্নত করার জন্য দরূদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ প্রদান করেছেন। আল্লাহপাক বলেন, আল্লাহ্ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁহার ফিরিশ্তাগণও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাহাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও। (সূরা আহজাব : ৫৬)
অনুরূপভাবে হজরত আনাস ইবনে মালিক রা: থেকে বর্ণিত, নবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তাকে দশবার দরূদ পাঠ করেন, দশটি গুনাহ মুছে দেবেন এবং দশটি মর্যাদায় ভূষিত করবেন।’ (সুনান নাসাঈ)
আল্লাহ! নবী সা:-এর ভালোবাসা দিয়ে আমাদের কলবকে ভরপুর করে দিন। তাঁর সুন্নাহকে আঁকডে ধরারও তৌফিক দিন এবং কিয়ামতের দিন কঠিন মুসিবতের সময় তাঁর সুপারিশ আমাদের নসিব করুন। আমীন।
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক,
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি.\