সাধারণত; ‘লোক’ বলতে নিরক্ষর অমার্জিত এবং পিছিয়ে পড়া মানুষদের উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এক সময় গ্রামের কৃষি বা চাষিসমাজকে ‘লোক’ বলে চিহ্নিত করা হতো। এদের জীবনাচরণে শহর বা নগরের মার্জিত মানুষদের সঙ্গে অনেক পার্থক্য ছিল। বোধকরি এখান থেকে ‘লোক এবং ভদ্রলোক’ শব্দ দুটি কখনো কোনো কালে সমাজজীবনে চলে এসেছে। অবশ্য বর্তমানে ‘লোক’ শব্দটির আরো ব্যাপক প্রয়োগ দেখা দিচ্ছে। গ্রামে কিংবা শহর-নগরে একশ্রেণীর মানুষ যাদের একই ভাবনা-চেতনা এবং নিজেদের মধ্যেই কেবল ব্যবহারের জন্য এক ধরনের ভাষা এবং চাল-চলন রপ্ত করেছে তাদেরও ‘লোক’ নামে অভিহিত করা হয়।
যা হোক, আমাদের চিরাচরিত সমাজে এতদিন যারা ‘লোক’ বলে পরিচিত হয়ে এসেছে, তারা যে কেবল গ্রামেই বসবাস করে তা নয়, শহর-নগরেও তাদের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরা কখনো বস্তিতে বা অব্যবহৃত খালি মাঠ ইত্যাদিতে বসবাস করে। এসব ভাসমান শ্রেণীর মধ্যে ‘বেদে’ বলেও একটি শ্রেণী আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এরা ছিটিয়ে ছড়িয়ে আছে। তবে এরা সাধারণত নদ-নদী, খালে-বিলে নৌকাতে বসবাস করে। বর্তমানে ‘আদিবাসী’দের জীবনাচরণও ‘লোকজ’ ভাবনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। অনেক কথাসাহিত্যিক, বেদে, আদিবাসীদের তাদের গল্পে, উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এদের ভাষাও লোকভাষা হিসেবে গণ্য।
আমাদের কথাসাহিত্যিকরা নানাভাবে এসব উপাদান চমৎকারভাবে ব্যবহার করে আমাদের গল্প-উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা ছোটগল্প-উপন্যাসে দুই বাংলা সাহিত্যিকরা এ সবের ব্যবহার করেছেন। চমৎকার নৈপুণ্যে লোকজ ভাবনা ও ভাষা পশ্চিম বাংলায় তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাসে আদিবাসী জীবনের লোক জীবন অপূর্ব মাধুর্যে প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ করতে চাই, ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ গ্রামের মুখে মুখে ঘুরে ফেরা গল্প-কাহিনী আমাদের প্রথম লোকজ ভাবনা সংবলিত কথাসাহিত্য।
আমার এই আলোচনায় সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বিরচিত উপন্যাসসমূহের বিষয়বস্তু এবং লোকজ উপাদান অন্তর্ভুক্ত। ‘লাল সালু’ উপন্যাস এ সবের অন্যতম। ‘সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহ’র উপন্যাসের পট-চিত্র গ্রামবাংলা। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ নিতান্ত সহজ সরল। নিরক্ষতার কারণে ধর্মে অন্ধবিশ্বাস। গ্রামে চালাক চতুর স্বার্থান্বেষী এবং কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও বসবাস করে। এরা গ্রামের সাধারণ মানুষকে ধর্মের নানা কথা আউড়িয়ে তাদের বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে দিনের পর দিন। কোনো এক সময় সুফি ফকিরদের আগমন ঘটেছিল গ্রামে কিংবা সে অঞ্চলের কোনো স্থানে। সুফি ফকিরদের নানা অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডে, সত্য-মিথ্যা যাই থাকুক না কেন, লোক মুখে এখান থেকে সেখানে প্রচার হয়ে বেড়ায়। সাধারণ মানুষের ধারণা এরা আল্লাহর প্রিয় পাত্র। সুতরাং তারা অনেক ক্ষমতা রাখে। এরা আদৌ এমন সুফি কি না গ্রামের মানুষ তা জানা বোঝার অবকাশ পায় না। গ্রামবাংলায় সুফি ফকিরদের এমন অবস্থান যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। বস্তুত, নকল ফকিরের সংখ্যাই গ্রামগঞ্জে বিস্তর। এমনি পরিমণ্ডলে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লাল সালু’ উপন্যাসটি রচিত।
বলেছি, ধূর্ত এবং কূটচালবাজ মানুষের অভাব নেই। এরা সংখ্যায় অল্প হলেও তাদের কর্মকাণ্ড অন্যদের সহযোগিতায় গোটা সমাজে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এমন একজন ধূর্ত, চালবাজ যে কেবল অপরকে ধোঁকাবাজির মাধ্যমে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেছে তার নাম মজিদ। তার সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রামের আরো কয়েকজন ধূর্ত মানুষ। নিরক্ষতার কারণে গ্রামের মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন। লোকমুখে নানা কথা তারা সহজেই বিশ্বাস করে। এই সুযোগে মজিদ গ্রামের বনজঙ্গলে ঢাকা একটা পুরনো কবরকে লাল সালু দিয়ে ঢেকে পীরের মাজার হিসেবে গ্রামের মানুষের মধ্যে প্রচার করে। মজিদ চারদিকে বেড়ানো ফকিরদের জীবনের সঙ্গে পরিচিত। গ্রামে এ সবের জন্য শক্তিশালী সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। ইতোমধ্যে তার কিছু কর্মকাণ্ড অলৌকিক এমন কিছু কথা সাধারণ মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে। এই সঙ্গে যুক্ত হয় খালেক বেপারী নামে একজন জমিদার। মজিদ এ গ্রামে বহিরাগত। পীরের মাজারের ভক্তি নেয়ার জন্য নারী-পুরুষের ভিড়। মজিদ অবিবাহিত। এর মধ্যে তার চোখ পড়ে সুন্দরী এবং সহজ সরল রহিমার প্রতি। মজিদের সান্নিধ্যে আসার জন্য অনেক পরিবার উন্মুখ। যুবক মজিদের সঙ্গে রহিমার বিয়ে হয়। মজিদ এক নারীতে সন্তুষ্ট নয়। সুতরাং নানা ছলচাতুরী করে জমিলা নামে একটি কম বয়সীকে সে বিয়ে করে রহিমা বন্ধ্যা বলে।
মজিদের ধূর্তামি গ্রামের শিক্ষিত যুবকের মনে সন্দেহ আনে। মজিদ তা বুঝে গ্রামের স্কুল নির্মাণে আক্কাস আলীর উদ্যোগকে নস্যাৎ করে। খালেক ব্যাপারীর সহযোগিতা থাকায় তার এই ধর্মব্যবসা জমে ওঠে।
সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ একজন শক্তিশালী গল্প লেখক। লাল সালু উপন্যাসের পাশাপাশি ‘চাঁদের অমাবস্যা’ এবং ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ নামে আরো উপন্যাস রয়েছে। ওয়ালীউল্লাহ শিক্ষিত এবং পাশ্চাত্য সাহিত্য পড়–য়া মানুষ। তার উপন্যাসে গ্রামের জীবন শরৎচন্দ্রের মতো ফুটে ওঠেনি। শরৎচন্দ্রের কোনো নায়কের মতো মজিদ’কেও তিনি তৈরি করেননি। গল্পের জন্য গল্প বলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। অবশ্য তিনি তাঁর এই ভাবনাকে চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে তা সহজে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর উপন্যাসে লোক জীবন প্রাধান্য পেয়েছে। লোকভাষা ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়েছে কৌশলে। তিনি পেশায় এক সময় সাংবাদিক ছিলেন। দেশের বাইরে তাঁর জীবন কেটেছে। কিন্তু তাঁর স্মৃতিতে গ্রামীণ জীবন এবং গ্রামে বসবাসকারী সাধারণ সহজ সরল মানুষ কিভাবে এক শ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাতে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হচ্ছে, এটাকে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। গ্রামের মূল্যবোধের বিপর্যয়, মানসিক স্খলন-পতন এবং সর্বোপরি মজিদ এবং খালেক ব্যাপারীর মতো মানুষেরা নির্বিবাদে অসহায় মানুষের সারল্য এবং কুসংস্কারকে সম্বল করে জীবননির্বাহ করেছে তার একটি চমৎকার চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। গ্রন্থে তার বাক্য নির্মাণ এবং প্রয়োগে তার সাংবাদিকতার প্রভাবও লক্ষ করা যায়।
উপন্যাসে ওয়ালী উল্লাহ কুমিল্লা-নোয়াখালীর ভাষা ব্যবহার করেছেন। এতদঞ্চলে মুসলমান সম্প্রদায় বাল্যকাল থেকে না বুঝে কুরআন শেখে আরবি ভাষায়। নবী আরবে জন্মগ্রহণ করেছেন; তাই না বুঝে শুনে এরা আরবি ভাষায় অভ্যস্ত। এরা গ্রামেই থেকেছে। গ্রামই তাদের জীবন এবং ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। মজিদ এই গ্রামের মানুষকে ব্যবহার করেছে তার স্বার্থের জন্য। গ্রামের নারী তার স্বামীকে বিশাল মর্যাদার অধিকারী বলে জানে। তার সামনে জোরে কথা বলাও অনেকটা নিষিদ্ধ বলে মনে করে। এক সময় গ্রামের নারীদের আরবি শিক্ষা ব্যতিরেকে অন্য শিক্ষা এক প্রকার নিষিদ্ধ ছিল। পুরুষের কোনো কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করাকেও তারা পাপ বলে গণ্য করত।
ওয়ালী উল্লাহ এমন ভাবনা থেকে মজিদ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। মজিদ পীর-ফকির। তার সামনে ঘোমটা পরে চলাটাই রেওয়াজ। সুতরাং চলাচলে ধীর গতি খুব স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে মজিদ তার ধর্ম ব্যবসাকেও চতুরতার সঙ্গে নিজের স্ত্রীর মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়। মজিদ তার স্ত্রীকে বলে :
‘এমন কইরা হাঁটতে নাই বিবি, মাটি গোস্বা করে। এই মাটিতেই একদিন ফিরি যাইবা।’
মজিদ গ্রামের মানুষের কাছে নিজেকে মায়ের মতো পবিত্র বলে তুলে ধরে। মাটি, মা খাকী। সুতরাং তার কাছে মাটি তাই পবিত্র।
ওয়ালী উল্লাহ গ্রামবাংলা তথা গোটা ভারতের মানুষের ধর্মবিশ্বাসে ‘বসুমাতা’র প্রভাব সম্পর্কে জানেন। দুর্গা, কালী এই বসুমাতার প্রতীক। এ দেশের নি¤œ শ্রেণীর মানুষ দীর্ঘকাল বর্ণবাদের শিকার হয়ে অনেকটা অচ্ছুত জীবনযাপন করে আসছে। সুফি ফকিরদের মাধ্যমে তারা ধর্মান্তরিত হলেও পুরান ধর্মবিশ্বাসকে পরিত্যাগ করতে পারেনি। ফলে মাটি বসুমাতা, মা খাকী, হিসেবে তার কাছে শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র হয়েছে। মজিদের মাধ্যমে ওয়ালী উল্লাহ এই অসাধারণ নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন।
উপন্যাসের পটভুমি পূর্ববাংলা এবং বিশেষ করে নোয়াখালী-কুমিল্লা অঞ্চল। এ অঞ্চলের মানুষ অনেক আগে থেকেই সুফি সাধকের প্রতি শ্রদ্ধাভাবাপন্ন। ফলে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ এতদঞ্চলের মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও আজন্ম লালিত লৌকিক আচার-আচরণকে তার এই গ্রন্থের উপজীব্য বিষয় বলে ভেবেছেন। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ পুরুষশাসিত সমাজ হিসেবে গড়ে উঠেছে। নারীদের অবস্থান ছিল পুরুষশাসনের অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিজেদের কোনো স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল না। এ অবস্থান হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজেই একই রকম ছিল। এ সবের কারণে নারীদের প্রতি ভাষা ব্যবহারেও ভিন্নতা ছিল। এমনই বিষয়বস্তুকে নিয়েই সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর ‘লাল সালু’ ছিল এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা।
বলেছি, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং মৈমনসিংহ অঞ্চলের লোকভাষাকে তিনি তার উপন্যাসে প্রয়োগ করেছেন। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকেই জীবনকে নতুনভাবে দেখার প্রেরণা পেয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ওয়ালী উল্লাহ লোকভাষা তৈরি করেননি। সমাজে যে ভাষা নিত্য প্রচলিত তাকেই তিনি চয়ন করে উপন্যাসে স্থান দিয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
‘লাল সালু’ গল্পের মাজারের খাদেম অনেকটাই যিনি নিজেকে পীরের মর্যাদায় উন্নীত করেছেন, তার মুরিদান ও ভক্তদের সঙ্গে কথাবার্তায় আরবি বাংলা মিশ্রিত জবান ব্যবহার করেন।
‘লাল সালু’ উপন্যাসে গ্রামীণ জীবনের টানাপড়েনের ইতিহাসের পাশাপাশি তার নিত্যদিনের জীবন নির্বাহে লোক ভাষাই ছিল একটা বড় মাধ্যম। গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না, রাগ-বিরাগ এবং অনুরাগ ইত্যাদি এই ভাষাই তার ভাব প্রকাশের একমাত্র অবলম্বন। এই ভাষায় শ্লীল ও অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ আছে। গ্রামের মানুষ অশ্লীলতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। এ সব তারা বুঝেও না। সকাল থেকে রাতঅবধি খেটে খাওয়া মানুষ তারা। এই সহজ সরল জীবনকে ধূর্ত বহিরাগত মানুষেরা কিভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে তার একটা পরিচয় পাওয়া যায় ‘লাল সালু’ উপন্যাসে। গ্রামের মানুষ একসময় শুনে মুসলমান। যুগ যুগ ধরে এমনিভাবে সমাজ চলেছে। মুসলমানের ঘরে জন্মেছে বলেই সে মুসলমান। লেখাপড়া না জানার কারণে তাদের মধ্যে ধর্ম সম্বন্ধে যে অন্ধবিশ্বাস কাজ করেছে, সেখান থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি। মজিদ এবং গ্রামের খালেক বেপারী এই সাধারণ মানুষের দীনতা এবং দুর্বলতাকে মুখ্য করে দিনের পর দিন ঠকিয়ে এসেছে। শিক্ষিত আক্কাস আলী গ্রামের মানুষের উন্নয়নের জন্য যে স্কুল গড়তে চেয়েছিল, এদের অশুভ শক্তির সাথে সে পেরে উঠল না। মজিদ কামুক শ্রেণীর যুবক। এক বিয়েতে সে তৃপ্ত হয়নি। দুই বিয়ে করেছে ভণ্ড পীরের ছদ্মবেশে। এখানে নারীজীবনের অসহায়তা ফুটে উঠেছে। ওয়ালী উল্লাহর উপন্যাসের উপজীব্য নি¤œবিত্তের মানুষ। এরা চিরকাল উচ্চবিত্তের মানুষের কাছেই মার খেয়ে আসছে। এদের জীবন থেকেই তারা ‘বিত্ত’ সংগ্রহ করে। মজিদ অন্ধ ধর্মবিশ্বাসকে মাধ্যম করেছে, খালেক ব্যাপারী প্রজা নিপীড়ন। মজিদ স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশে এক পীরের কবর খুঁজে পেয়েছে। এই স্বপ্ন থেকে নানা প্রাপ্তির সংবাদও লোক মুখে প্রচারিত হয়, এখানেও তা হয়েছে। ওয়ালী উল্লাহ মজিদ এবং অন্যদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন ঠিকই কিন্তু এ সবের থেকে বেরিয়ে আসার পথকে নির্দেশিত করেননি। নিঃসন্দেহে একজন সাহিত্যিক সমাজ সংস্কারক নন। কিন্তু সাহিত্যে পথ নির্দেশনা আসে কোনো বিশেষ চরিত্রের মাধ্যমে। শেক্সপিয়রের নাটকে ‘অথেলো’ তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছে। ম্যাকবেথ অন্যায় পথে সিংহাসন দখলের পরে নানা হত্যাকাণ্ড শেষে তার বোধোদয় হয়েছে। শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমনকি রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ও ছোটগল্পে জীবনের দুঃখ-শোক থেকে বেরিয়ে আসার পথনির্দেশনা আছে।
সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ ‘লাল সালু’ উপন্যাসে যে সাফল্য লাভ করেছিলেন, চাঁদের অমাবস্যা’তে অতটা সফলতা আসেনি তার।
ওয়ালী উল্লাহ দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘নয়নচারা’ গল্পভাবনায় অসহায় দরিদ্র মানুষের জীবনের ছবি আঁকতে চেয়েছেন। আমু এই গল্পের নায়ক। দুর্ভিক্ষের কারণে ক্ষুধা নিরাময়ের উদ্দেশ্যে সে গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে। গ্রামের নাম নয়নচারা। ময়ূরাক্ষী নদীর পাশের এই গ্রামে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। তারপর দুর্ভিক্ষ এসে তার সব সুখ কেড়ে নিয়েছে। নয়নচারা গল্পে শহর এবং গ্রামের পরিবেশের পার্থক্য আছে। শহরে এসে আমুর বোধোদয় হয়। গ্রামের জীবনের সঙ্গে শহরের কোনো মিল সে খুঁজে পায় না। এক মুঠো ভাতও তার জোটে না। আমুর মধ্যে একটি প্রতিবাদী চরিত্র সৃষ্টি করেও শেষটাতে আমুকে প্রতিবাদহীন অসহায় একজন হয়ে জীবন নিঃশেষ করতে হয়। ফেলে আসা গ্রামীণ জীবন কেবল স্বপ্ন হয়েই থাকে।
সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ ‘নয়নচারা’র মতো বেশ কয়েকটি ছোটগল্প লিখেছেন। এদের মধ্যে জাহাজী, পরাজয়, খুনী, দুই তীর, একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ অন্যতম।
চাঁদের অমাবস্যা’য় বিদেশী উপন্যাসের প্রভাব রয়েছে। একটি যুবতী নারীর মৃত্যু এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেও বিত্তহীনদের অসহায়ত্ব বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। ‘ধর্ষণ’ এই উপন্যাসের বিষয়। গ্রাম ছেড়ে কাদের চাকরির আসায় শহরে এসে বিত্তবানদের দুর্নীতি এবং অশ্লীল কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখে। চোখের সামনে একটি যুবতী মেয়েকে ধর্ষণ এবং তাকে হত্যা করা দেখতে পেয়ে সে প্রতিবাদমুখর হয়েও কিছুই করতে পারে না। বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে ফেরে।
‘কাঁদো নারী কাঁদো’ উপন্যাসে ওয়ালী উল্লাহ দৈহিক প্রেমকে উপজীব্য করেছেন। এখানে বিত্তহীন নারীদের তিনি বিত্তবান পুরুষের ভোগ্যবস্তু বলে তুলে ধরেছেন। নারীদের জীবন কেবল পুরুষের ভোগের জন্য। লাল সালুতে নারীদের মূল্যহীন জীবনকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন এমনভাবে যে, নারীদের হাসিও অন্যরা শুনতে পেলে পাপ। ‘কাঁদো নারী কাঁদো’তে এই নারী কেবল পুরুষের ভোগের পাত্র হয়ে নিত্যদিন শহরের শিক্ষিত সমাজের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। আমুর এ সবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শহরের প্রশাসন এবং বিত্তবানদের চোখে পড়ে না, তা বাতাসে মিলিয়ে যায়। বর্তমান যুগে শহরে নগরে লোক সম্মুখে নারীরা প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে। প্রতিকারহীন অবস্থায় তাদের মৃত্যুও ঘটছে অহরহ।
ওয়ালী উল্লাহ তার উপন্যাসে সমাজের এই বিষবাষ্পকে সরিয়ে দেয়ার জন্য লড়াইয়ের অবতারণাও করেছেন। কিন্তু এই লড়াইয়ে বিত্তহীনেরা বিত্তবানদের ভোগ্য হয়ে কেবল গুমরিয়ে মরেছে।
তবুও আমি বলব, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, নিঃসন্দেহে সফল হয়েছেন। তিনি আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। দুঃখ এখানে যে, আমাদের জীবনে মানুষের প্রতি মানুষের মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার বড় অভাব। আমাদের পরিবারে এবং সমাজেও যেমন এই নৈতিকতাহীনের পরিচয় থেকে গেছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই নৈতিক শিক্ষা না থাকায় বিত্তবান এবং বিত্তহীনদের মধ্যে এই লড়াই কেবল লড়াই হয়ে রয়ে গেল। আমরা পরিত্রাণের পথ খুঁজে পেলাম না।
ওয়ালী উল্লাহ যেটুকু পেরেছেন, তিনি আমাদের বিবেকে ঘা মেরেছেন। হয়তো এরই ভেতরে শক্তির ঝাঁজ রয়ে গেছে। তার বিস্ফোরণ ঘটবে। সমাজ মুক্তি পাবে। প্রশ্ন থেকে যায়Ñ কবে, কখন? হ
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক
