করোনা বিপর্যয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি কি অবস্থায় আছে? এ প্রশ্নটার উত্তর দেয়ার আগে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে প্রেক্ষাপট তা দেখার দরকার আছে। আমি যা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করে প্রত্যেক পাঁচ বছরে গড়ে মাত্রা বেড়েছে। এবং ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই তিন বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২ শতাংশ। বিশ্বের অনেক দেশের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করেছি তাতে দেখা যায় ২০১৬ থেকে ২০১৮ সমকালে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি এটা ছিল ১২টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এখন করোনার কারণে সেটাতে ধাক্কা লেগেছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আমাদের অর্থ বছর ২০১৯ থেকে ২০২০ সালে সরকারি হিসাব মতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসছে ৫.২ শতাংশে। ২০২০-২১-এ সরকারের পরিকল্পনা যা ছিল ৮.২ শতাংশ সেটা অর্জন করার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তবে সান্ত¡নার বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং সার্বিকভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৪.৪ পার্সেন্ট হবে ২০২০ সালে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৫.২ পার্সেন্ট যদি হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে এটি খুব খারাপ নয়।
এখন বর্তমান অবস্থা বা করোনাকালীন অবস্থার কথা তো সবার জানা। এখানে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে আগে আমি উল্লেখ করেছি। এখন করোনা এই মাত্রাই থাকবে নাকি আরো হ্রাসের মাত্রা আরো বাড়বে সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু ইউরোপে এবং আমেরিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে, আমেরিকার তো এর মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল করোনার সংক্রমণের। এ সমস্ত দেশগুলোর সাথে আমাদের করোনার জন্য যোগাযোগ খুব একটা সুবিধাজনক নয়। অথচ আমাদের অর্থনীতিতে রফতানি রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মুহূর্তে আমাদের করোনার সংক্রমণ যেন বেশি না হয় এটি খেয়াল রাখতে হবে। যদি করোনা না বাড়ে তবে আমাদের অর্থনীতি বৃদ্ধি পাবে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কি? এটি একটি প্রশ্ন : উত্তরণের পথটি খুব মসৃণ নয়। কেননা বিদেশে পরিস্থিতি যেভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সে তুলনায় বাংলাদেশে করোনার নিয়ন্ত্রণ নেই। তবুও চেষ্টা করতে হবে আমরা রফতানি যাতে আরো বাড়াতে পারি। আমরা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে পারি যে, বাংলাদেশের রফতানির খাতে বেশ কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে রফতানি ছিল ৫% এর নিচে। ২০১৭ সালে এটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫%-এ। ২০১৯-এ এসে ধাক্কা খেয়েছে রফতানি তবে সম্প্রতি আবার কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। সেখানে চেষ্টা থাকলে আরো উন্নতি হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা উচিৎ। যেমনÑ এক. আমাদের রফতানি খাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে যে বিষয় এটা আমি বলবো অনেকটা অনাকাক্সিক্ষত পর্যায়। এখানে কিভাবে রফতানি বাড়ানো যায় সেটা চেষ্টা করতে হবে।
দ্বিতীয় উত্তরণের পথÑ বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৩’শ পণ্য রফতানি হয় কিন্তু এর মাঝে শুধুমাত্র গার্মেন্টস শিল্পই ৮০% এর উপরে অবদান রাখে অর্থনীতিতে। কাজেই যে পণ্যগুলো রফতানি হচ্ছে এখন অল্প মাত্রায় সেগুলোর কি সমস্যা আছে এবং এগুলোর কিভাবে রফতানি বাড়ানো যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
তারপর আমাদের রফতানির বাজার বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা আছে। এখন মোটামুটিভাবে ইরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএস এ দুটিই হচ্ছে আমাদের মূল বাজার। কিছু কিছু নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু সেগুলো করোনার কারণে স্তিমিত হয়ে গেছে। যা হোক, নতুন বাজার আমাদের আরো সৃষ্টি করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি বাড়াতে হবে। এদিকে গার্মেন্টস থেকে আমরা অনেকটা লো-কোয়ালিটির পণ্য রফতানি করি যার কারণে দাম কম পাই। এখানে কোয়ালিটি ইমপ্রুভ করে আপগ্রেড করে আরো বেশি দামে বিক্রি করতে পারি সেজন্য চেষ্টা করতে হবে। এ হচ্ছে রফতানি সম্পর্কে আমার ধারণা।
প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরো একটি বড় উপাদান হচ্ছে বিনিয়োগ। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে, প্রথমত বিনিয়োগের যে মাত্রা সেটাকে আমরা বলতে পারি যে এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। দ্বিতীয়ত বিষয় হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ গত প্রায় এক দশক ধরে ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২০ অর্থবছরে সরকারি হিসাবে বোধ করা হচ্ছে বড় পতন হয়ে ১২.৭ শতাংশে নেমে আসবে। বেসরকারি বিনিয়োগ যদি আরো বাড়ানো না যায় তাহলে কিন্তু প্রবৃদ্ধি আরো হ্রাস পাবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের যে সমস্যা আছে সে সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। এর মধ্যে একটি হলো অবকাঠামো, তারপর এনার্জি, ইলেক্ট্রিসিটি, রাজনৈতিক অস্থিরতা সবসময় বিদ্যমান, শিক্ষাব্যবস্থা-কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেই। যার কারণে মানব সম্পদ উন্নয়নে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা খুব একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না। গভর্নেন্স ইনডিকেটরে বাংলাদেশের অবস্থা নি¤েœ। বিশ্বব্যাংকের গভর্নেন্স এবং ইউজার ব্যাংক বিজনেস এ ক্ষেত্রেও আমরা নি¤েœ। এসমস্ত এরিয়াতে আমরা যদি উন্নতি সাধন না করতে পারি তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে না এবং প্রবৃদ্ধি ডাউন থাকবে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত : বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য যে পদক্ষেপগুলোর কথা বলেছি সে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত। বেসরকারি পর্যায়ে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বিনিয়োগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন না অনেকেই। অনেক ক্ষেত্রে কেউ আবার বিদেশে পাচার করে। কেউ কেউ হয়তো ভাবে খুব তাড়াতাড়ি ফল পাওয়ার। এসব ব্যবসায় বেসরকারি খাতে অনুৎসাহিত করা উচিত। বিশেষ করে আরো ভালো মাত্রার মানুষ নিয়ে করা উচিত। যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়া হচ্ছে সে উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা দেখা উচিত। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায় সে পদক্ষেপও নিতে হবে।
বেকার ও বেকারত্ব বৃদ্ধি নিরসনের উপায় খোঁজা উচিত : বেকারত্ব অবশ্যই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেহেতু বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন কমে গেছে কোভিডের কারণে। লোক নিয়োগ হচ্ছে না। নতুন কর্মসংস্থান নেই। বেকারত্ব বৃদ্ধি নিরসনের প্রথম উপায় হচ্ছেÑ রফতানি এবং বিনিয়োগ এ দুটো বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছে সেগুলোর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা নিয়মিত মনিটরিং করা উচিত। এ ক্ষেত্রে অনেক অভিযোগ আছে। বিশেষ করে মাইক্রো, এসব ক্ষেত্রে অনেক অভিযোগ আছে। বিশেষ করে স্মল ও মিডিয়াম ইন্ডাস্ট্রির প্রণোদনা দেয়া উচিত। এসব দিক প্রসার হলে তখন কর্মসংস্থান বেশি বাড়ে। সরকার আরো কিছু চেষ্টা করতে পারে সেটা হচ্ছে গ্রাম অঞ্চলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে পারে। রোড অ্যান্ড পাবলিক ওয়ার্কস-এর মাধ্যমে রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট-ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণ করা যায়। এগুলোতে ব্যয় আরো বৃদ্ধি করতে পারে যাতে করে লোকের কর্মসংস্থান হয়। এবং কৃষি খাতে প্রডাকশন আরো বাড়ানো যায়। সেক্ষেত্রে জোরালো চেষ্টা করতে হবে।
এখন এই করোনাকালে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়Ñ তা হলো যখন তখন দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়।
চাহিদা এবং সরবরাহের সংমিশ্রণে মূল্য নির্ধারণ হয়। যে দেশে সরবরাহ কম সেটা আমদানি কম হওয়ার কারণে হোক বা দেশে উৎপাদন কম হওয়ার কারণে হোক তখন স্বভাবতই সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। দ্রব্যমূল নিয়ন্ত্রণের উপায় হচ্ছে সর্বত্র সরবারাহ বাড়ানো। সরকার কর্তৃক নিয়মিত যদি সরবারহ বাড়ানো যায় তবে দ্রব্যমূল্য পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমরা অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেই যে পানিশমেন্ট দেবো দোষীদের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো পানিশমেন্টের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। দেখা যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা অন্যায্য হারে দাম বাড়াচ্ছে। এটা প্রশ্রয় দিলে তখন কিন্তু আবার সরবরাহ উধাও হয়ে যেতে পারে। তাতে আরো সমস্যা হতে পারে। কাজেই সব মিলিয়ে একটা সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, সরবারাহ বাড়ানো আর এটা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি।
এখান থেকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। আইটি সেক্টর, আউটসোর্সিং তো আছেই। গ্রামাঞ্চলেও তরুণ উদ্যোক্তরা কিভাবে কি করতে পারে তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে নজর দেয়ার দরকার আছে।
নতুন সম্ভাবনার ব্যাপারে নতুন কিছু বলা মুশকিল। তার কারণ হচ্ছে আমাদের লোকজন বেশির ভাগ নি¤œ আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা এরাই বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠায়। আমাদের একটা সমস্যা হচ্ছে যে, অল্প কয়েকটি বাজার থেকে আমাদের রেমিটেন্স আসে। মূলত: মিডেলিস্ট এবং সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার কথা। মালয়েশিয়াতে এখন নানা সমম্যা হচ্ছে মূলত কোভিডের কারণে। বিদেশ থেকে যারা ফেরত আসছে তারা আবার যেতে পারছেন না। এছাড়া আরো বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশী বেশির ভাগ ওয়ার্কার হচ্ছে অদক্ষ। স্বভাতই তাদের আয় কম, বেতন কম ওভার টাইম কম যার কারণে তারা কম রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে। কিছু দিন আগে আমি একটা পরিসংখ্যান দেখেছিলামÑ এশিয়ার যে সমস্ত দেশ যেমন বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনÑ এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশে পার পার্সন পারকেপিটা রেমিট্যান্স ছিল সর্বনি¤েœর। যেহেতু এসব ওয়ার্কাররা অদক্ষ। ওয়ার্কারদের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবেÑ যাতে তারা বেশি উপার্জন করতে পারে। সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে যেসব দেশে এবং সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমাদের দেশের শ্রকিমদের চাহিদা আছে সেসব দেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারি কিনা সে প্রচেষ্ট চালাতে হবে। হ
লেখক : অর্থনীতিবিদ,
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
