কবেকার কথা? ২০০৫ কিংবা ২০০৬। মেয়েটিকে ডেকেছিলাম ‘বলাই’ নামে। রবীন্দ্রনাথের বলাই যতটাই কথা বলেছিল সবুজের সাথে মেয়েটিও ততটাই যেন! শহরের সবচাইতে বড় স্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে পড়া ত্রয়োদশী। অন্য সবার মতোই আকাশি রঙের জামা, ঝোলানো দুই বেণি, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে আসা মেয়ে। ওর বড় বড় চোখে শান্ত দৃষ্টি আর আকাশের গভীরতা আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। বারান্দায় হেঁটে যেতে যেতে কাঠ গোলাপের গাছটার সামনে এসে ও একটু দাঁড়াত। কথা বলত গাছের সাথে, মেঘের সাথে, রোদের সাথে।
হঠাৎ একদিন ও একটি শিউলি গাছের চারা এনে অধ্যক্ষ আর আমার অফিসের ডানপাশের বাগানটায় মালি শ্রীবাবুকে নিয়ে পরম যতেœ পুঁতে দিয়েছিল। নিজের পানির পাত্রের পানিটুকু খেয়েছে কি খায়নি রোজ গাছটায় ঢেলে দিয়ে একমনে তাকিয়ে থাকা ওর সারা বিশ্বকে দেখার মতো আনন্দের হয়ে উঠেছিল। একটু একটু করে শিউলি গাছের বেড়ে ওঠা, কুঁড়ি মেলা, রোদে ঝলমল করা দেখে যেন ঠিক বলাই হয়ে উঠেছিল মেয়েটি।
একদিন ডেকে বললামÑ ‘কি রে তুই কি বলাই হয়েছিস?’ অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল মেয়েটি। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার রাগ, শাসন কিংবা আদর কোনটা নেবে বুঝতে চেষ্টা করছিল। ‘আপা, বলাই কে ?’...‘পড়বি?’
পড়েছিল। সারা মুখে উজ্জ্বলতা নিয়ে বলাই নামটিতে টকবগিয়ে উঠেছিল।
বছর তিনেক চলে গেল। আমার বলাই মাধ্যমিকের পরে বিদেশে গেল। ওর চোখভরা কান্না, শিউলি গাছের পাতাগুলো কাঁপছিল। ‘আপা, আমার গাছটা ফিরে এসে দেখতে পাবো তো?’ অজান্তেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠেছিল।...‘আপা আপনি আর মোহসিন স্যার গাছটাকে দেখবেন তো? মালি মামাকেও বলেছি। আমি শিউলি ফুল দেখে যেতে পারলাম না! দেশে ফিরেই স্কুলে আসব, ওকে দেখতে!’
প্রতিদিন শিউলির ঝলমলে পাতাগুলো দেখি আর মনের মধ্যে আমার বলাই এর মুখটা ভেসে ভেসে ওঠে। আপন মনেই পাতাগুলোকে বলি ‘কি রে তোরা ভালো আছিস তো?’
২০০৯ শিক্ষাবর্ষ, ব্যস্ত সময়। বঙ্গাব্দে আশ্বিন এলো। হঠাৎ একদিন সকালে স্কুলে এসে দেখি শিউলি তলায় একমুঠো শিউলি পড়ে আছে। দাঁড়িয়ে পড়লাম। শ্রীবাবু আপন মনে গাছে পানি দিচ্ছে। চিৎকার করে বললাম, ‘দেখেছ বাবু, শিউলি ফুটেছে!’ শ্রীবাবু কতকটা করুণ চোখে তাকিয়ে থাকল।
সারাটা শরৎকাল টুপটাপ ঝরে পড়ল শিউলি ফুল।
শরৎ শেষ হয়ে এলো। স্কুলের প্রশাসনপ্রধান পরিবর্তন হয়ে গেছে আগেই। পরিচ্ছন্ন হচ্ছে স্কুল প্রাঙ্গণ। গাছ কেটে আলো আনা হচ্ছে। আলোর কাছে অনেক গাছেরই মূল্য নেই... ম্যাগনেলিয়া, কাঠগোলাপ, মাধবী লতা, কলাবতী, পাতাবাহার...! যে লম্বা গাছটা থেকে দোতলা আর তিনতলার মেয়েরা চুপি চুপি হাত দিয়ে আম পাড়ত সে গাছটাও কেটে সৌন্দর্য বর্ধন করা হলো।...
হঠাৎ একদিন সকালে স্কুলে এসে দেখি শিউলি গাছটা নেই! বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠল। দৌড়ে গেলাম সর্বোচ্চ প্রশাসকের কাছে।...‘ও ওই ঢ্যাঙা শিউলি গাছটা? বাগানের মধ্যিখানে অমন গাছ কেউ লাগায়? মালিকে বলেছি ওটা তোমার রুমের পেছনে দেয়ালের কাছে লাগিয়ে দিতে।’
দৌড়ে গেলাম। পাতারা আমার সাথে কথা বলল না। ওরা মাথা নিচু করে আছে। পরদিনও কথা বলল না। মাটির কাছে ঝুঁকে আছে। পরদিনও না। তারপর একদিনও নয়।
শিউলি ফুলগুলো একবারই ফুটেছিল।
ওরা কি কেঁদেছিল বলাইয়ের জন্য? আমি যেমন কাঁদি।... আমার বলাই, তুমি কোথায় আছো? ভালো আছো তো মা? আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি কথা রাখতে পারিনি। তুমি যে সত্যি সত্যিই রবীন্দ্রনাথের বলাই হয়ে যাবে এমনটাও তো আমি চাইনি।
তবে কি বলাই-এর মামির মতো আমিও কাঁদছি? হ