সাহিত্যকলা জীবনকলার অন্য নাম। জীবন নান্দনিকতার অচ্ছেদ্য অংশ। আর এ সাহিত্যকলার কোলজুড়ে রয়েছে নাট্যকলা। জীবন নান্দনিকতার আরেক পাঠ। জীবন স্পন্দন আর সাহিত্য স্পন্দন এ দুইয়ের ইতিহাস যুথবদ্ধ। সেটিই বাঞ্ছনীয়। তবে সাহিত্যকলায় প্রযুক্ত নাট্যকলার চর্চা ও ইতিহাস কিয়দ নবীন ও আধুনিক। সাহিত্যের সম্প্রসারিত সাম্র্রাজ্যে নাট্য প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি বেশ প্রাচীন। অনুমিত হলেও প্রায়োগিক সত্য এটিই যে, গ্রিসই নাটকের জন্মস্থান। এটিও স্বীকৃত যে, আরবি সাহিত্যে নাটকের আনাগোনা অপেক্ষাকৃত নবীনতর ও বিশ্বসাহিত্যের সর্বশেষ সংযোজন। আরবি সাহিত্যের সদম্ভ ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় নাটকের অস্তিত্ব ছিল না এটিকে বিনা বাক্যব্যয়ে বিনা অবলীলায় মেনে নিতে হয় সব আরবি সাহিত্যপ্রেমীকেই।
আরবি সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রায় দুই সহস্র্র অব্দের সুবিশাল পরিসরেও এতে নাটক বিযুক্তির কারণ কী? এ প্রশ্ন যতটা দুর্বোধ্য তার চেয়ে বেশি মতান্তরের। একদল সাহিত্যবোদ্ধা মনে করেনÑ আরবি সাহিত্যে নাটকের উন্মেষ ঘটতে না পারার কারণ মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, আরব গোত্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক অহিংস মনোবৃত্তির অভাব এবং সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলা। এদিক থেকে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবেশ ও সাহিত্যিক প্রতিবেশ ছিল অনেকটা অনুকূল ও বৈরীমুক্ত। সে কারণেই ইউরোপে নাটকের উন্মেষ ও মঞ্চায়ন সহজতর হয়েছে। কারণ নাট্যকলার সফলতা ও জনপ্রিয়তার পশ্চাতে থাকে মঞ্চায়ন রহস্য। কিন্তু সমসাময়িক আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে নাটক মঞ্চায়ন ও মঞ্চায়ন পূর্বপ্রস্তুতির নিরবচ্ছিন্ন সুযোগ অহর্নিশ না হওয়ার কারণে আরব সমাজ ও আরবি সাহিত্যে এর উদ্ভব, উৎপত্তি ও সম্প্রসারণে অপেক্ষা করতে হয়েছে এক সুদীর্ঘকাল।
তবে সাহিত্যবোদ্ধাদের অন্য দল এমন বক্তব্য মানতে সদাশয় নারাজ। তারা বিষয়টিকে আরব মানস, আরবের অভিজাত ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ইত্যাদি বিবেচনায় এনে ব্যাখ্যা করেন। তাদের ভাষ্য- জাতি হিসেবে আরবরা আগাগোড়া স্বাধীনচেতা ও দাম্ভিক প্রকৃতির। জীবন সংসার কিংবা সাহিত্য কোনো ক্ষেত্রেই তারা অন্যদের স্বীকৃতি দানে অনুদার হওয়াই সর্বদা তারা নিজেদের কাব্যচর্চার প্রাধান্য ও উৎকর্ষ বজায় রাখতে আগ্রহী থাকত। ফলে তারা নাট্যচর্চায় মনোনিবেশ করেনি এবং এর কোনো প্রয়োজনও বোধ করেনি। দু’টি মতামত বিবেচনায় রাখলে প্রথম অভিমত সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ উমাইয়া শাসনের সোয়া শতাব্দীকাল (৬২২-৭৫০) প্রশাসন রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বেশ আয়াসেই ছিল। কিন্তু সে সময়েও আরবি সাহিত্যে নাটক অনুপ্রবেশের কোনো ফটক উন্মোচিত হয়নি। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে আব্বাসি শাসনের প্রায় পাঁচ শতাব্দীকালেও (৭৫০-১২৫৮) আরবি সাহিত্যে নাটকের রচনা বা মঞ্চায়ন ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেনি। সুতরাং বলা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধমনস্কতা আরবি নাটকচর্চার প্রধান অন্তরায় ছিল এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। অবশিষ্ট থাকলে অপর অভিমত। যাচাই-বাছাই অন্তে আরব মানসের ঔদ্ধত্য প্রবণতার কারণে অন্য দর্শন বা সাহিত্যের অনুপ্রবেশ তাদের মধ্যে রুদ্ধ হয়েছে এ অনুযোগ যথোচিত হবে না। কারণ আব্বাসি আমলে আমরা সাহিত্যকলার অসংখ্য অনুষঙ্গের চর্চা ও প্রসার প্রত্যক্ষ করেছি। মাকামা (বিশেষ রীতির গদ) কিংবা মুয়াশশাহাতের (পঞ্চপদি কবিতা) চর্চার ব্যাপকতা আরবি সাহিত্য আস্বাদন করেছে। অনুবাদ সাহিত্য ও নবতর সাহিত্য বীক্ষণ উপ্ত করেছে। সাহিত্যের অশ্বত্থ বৃক্ষকে মহীরূহে রূপ দিতে অনায়াস সাধ্য অবদান রেখেছে। তবে আরব মানস সর্বদাই আভিজাত্য লালন প্রয়াসী হওয়ার কারণেই তাদের সাহিত্য বাতায়ন উন্মুক্ত রাখলেও কোনোভাবেই তার স্বকীয়তা ম্লøান হতে দেয়নি এক মুহূর্তের জন্যও। সে জন্যই আমরা আব্বাসি আমলে আলিফ লায়লার মতো নাট্যোপম সাহিত্যের অস্তিত্ব দেখি। যে আলিফ লায়লা শুধু আরবি সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও অমূল্য সম্পদ। বিশ্ব সাহিত্য খাজাঞ্চিতে অসামান্য সংযোজন। আলিফ লায়লা তৎপরবর্তী বিশ্বভাষার সব নাটকেই এর সাহিত্য রসনা, গল্প দ্যোতনা ও মানবিক চেতনার দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত।
সিদ্ধান্তে এসে এ কথা বলা যায়Ñ নাট্যকলার যে শাস্ত্রীয় রূপ সে অর্থে পরিবেশিত আরবি নাটকের উদ্ভব ও মঞ্চায়ন একেবারেই নতুন। এতটাই সাম্প্রতিক যেÑ হতে পারে তা চর্চা শুরুর ইতিহাসে আরবিই তার সর্বশেষ সদস্য। তবে নাট্যশাখার শিক্ষানবিশ হয়েও নাটক রচনা, মঞ্চায়ন, সৃষ্টিশীলতা ও বাজারজাতকরণে আরবি সাহিত্যের রয়েছে অলৌকিকত্ব ও চোখ ধাঁধানো কারিশমা।
নাটক বলতে আমরা যে ধরনের সাহিত্য, মঞ্চায়নযোগ্য বিশেষ সাহিত্যরূপ বুঝে থাকি আরবি সাহিত্যে তাঁর পথচলার পরিক্রমা এখনো দুইশত অব্দ পেরোয়নি। আরবি সাহিত্যে নাট্য সংযোগের ইতিহাস গ্রিস অথবা ফরাসি নাট্য সাহিত্যের হাত ধরেই। গ্রিক নাট্যগুরু এস্কিউলিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৫২৫-৪৫৬ অব্দ), ইউরিপিদিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৪ অব্দ), এরিস্টোফেন্স (খ্রিষ্টপর্ব ৪৫০ অব্দ) প্রভৃতি নাট্যকারের রচিত ও মঞ্চস্থ নাটকগুলো আজো নাটকরাজ্যের কিংবদন্তি হিসেবে সমাজে সুবিদিত। আবার নাট্যখ্যাতিতে ফরাসি সাহিত্যও কম যায় না। কর্নেই (১৬০৬-১৬৮৪), রাসিন (১৬৩৯-১৬৯৯), মুলিয়র (১৬২২-১৬৭৩), জাঁ জিরাদু, জাঁ পল সার্তে, আলবেয়ার ক্যাম্যু প্রভৃতি নাট্যকারের নাম করা যায়। এই দুই দেশের ও দুই ভাষার নাট্যকারদের কিং ইডিপাস, ডিভাইন কমেডি, মিডিয়া, দি ফ্রগস, ইলেক্ট্রা, দ্য সিড, ফেইড্রা, দ্য মাইসার, পুওর লুইক্রিস প্রভৃতি নাটক দেশ থেকে দেশান্তরে, ভাষা থেকে ভাষান্তরে কাল-পাত্র নির্বিশেষে মনোরসের খোরাক জুগিয়েছে দীর্ঘ সময়ব্যাপী। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্য প্রান্তে এসে আরবি সাহিত্যে নাটক মঞ্চায়নের মহরত হলে এ নিয়ে ব্যাপক হইচই পড়ে যায়। এটি সাহিত্য মর্যাদার সমান্তরালে দর্শকনন্দিত হতে থাকে পাল্লøা দিয়ে। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিসর আক্রমণের মধ্য দিয়ে আরবি সাহিত্যে রেনেসাঁর যে নবদিগন্ত উৎসারিত হয় সেই জাগৃতির পথ ধরেই আরবি সাহিত্য খুঁজে পায় মারুন নাক্কাশ আল-লুবনানিকে (১৮১৭-১৮৫৫)। তার হাত ধরেই আরবি নাটকের যাত্রারম্ভ। তিনিই নাটক রচনা করেন, স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত করেন, নাট্যদল গঠন করেন, নাটক মঞ্চায়নের সব ব্যবস্থাপনার আঞ্জাম দেন। দেশে-বিদেশে পড়াশোনার সুবাদে ফরাসি নাটক ও মঞ্চায়নের সাথে যে সখ্য তার ঘটে তাই পরবর্তীতে তাকে নাটক রচনায় প্রেরণা জোগায়। আমরা তার সব নাটকেই ফরাসি নাট্যমাত্রার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখি। তিনি ফরাসি নাট্যকার মুলিয়রের দ্য মাইসার নাটকের ছায়া অবলম্বনে আল-বখিল বা কান্জুস নাটক রচনা করেন। ১৮৪৭ সালে নিজগৃহে ও পরবর্তীতে ফরাসি-মিসর সৈনিক-শ্রমিক সমাবেশে এটি মঞ্চস্থ হয়। অনেকেই এটিকে অনুবাদ নাটক বললেও মূলত এটি মৌলিক রচনা। ঘটনার ঘনঘটায় কিয়দ মিল থাকলেও চৈন্তিক ও শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে এ দুইয়ের মধ্যে ব্যাপক ফারাক। জুরজি জায়দানসহ (১৮৬১-১৯১৪) সমালোচক মহলের দৃষ্টিতে এটিই আরবি সাহিত্যের প্রথম মঞ্চস্থ নাটক। এরপর আরো নাটক তিনি রচনা ও মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করেন। সে সবের মধ্যে আবুল হাসান আল-মুগাফফাল, আল-সালিত আল-হাসুদ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
মারুন নাক্কাশ আল-লুবনানির ক্ষুরধার নাট্যপ্রতিভা পরিণতি প্রাপ্তির আগেই পতিত হয়ে যায়। ১৮৫৫ সালে তার মৃত্যুর সাথে সাথে আরবি সাহিত্যের এ ধারা আবারো হোঁচট খায়।
পরবর্তীতে তার ভাতিজা সালিম নাক্কাশ (মৃ. ১৮৮৪ খ্রি.) স্বীয় পিতৃব্যকে অমর করতে প্রয়াসী হয়। অনেকটা সফলও হয়। মূলত নাটক আরবি সাহিত্যের একটি সুপ্ত ধারা। মারুন নাক্কাশের হাতেই এর ঘুম ভাঙে। তাই আরবি নাটকের তিনিই পথিকৃৎ। আরবি নাটকের জনকের আসনটি আজীবন তারই জন্য সংরক্ষিত।
মারুন নাক্কাশ আল-লুবনানির সক্রিয়তা ও সক্ষমতায় আরবি নাট্যজগতে যে সাড়া পড়েছিল তার অকস্মাৎ মৃত্যুতে সহসা তা উবে যায়। আরবি নাট্য জোয়ারে আবারো ভাটা পড়ে। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা নয়। আবু নাজ্জারাহ (১২৫৫-১৩৩০ হি.), সালিম নাক্কাশ, আদিব ইসহাক (১৮৫৬-১৮৮৫), আবু খলিল আল-কাব্বানি (১৮৩৬-১৯০২), সালামা আল-হিজাজি (১৮৫২-১৯১৭) প্রমুখ প্রতিভাবান নাট্যব্যক্তিত্বের দক্ষতায় আরবি সাহিত্যে নাটকের নবগতি সঞ্চারিত হয়। মিসর, সিরিয়া, লেবাননসহ গোটা আরব বিশ্বে আরবি নাটকের মঞ্চায়ন ও জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গে আরোহণ করাতে এসব ব্যক্তিত্বের অবদান স্বর্ণখোদিত।
মারুন নাক্কাশ আল-লুবনানি ও সমকালীন নাট্যকারদের নাটক ফরাসি বা গ্রিক প্রভাবিত হলেও তা ছিল সমাজ বার্তাবাহী। সামাজিক শিক্ষণ ও রসোদ্দীপনায় সমতালে উপজীব্য ছিল এসব নাটকের বক্তব্য।
পূর্বসূরিদের হাত ধরে আরবি নাটক রচনায় এবার এগিয়ে আসেন মিসরীয় মাহমুদ তাইমুর (১৮৯২-১৯২১) এবং ইন্দোনেশিয়ার আলি আহমদ বাকাসির (১৯১০-১৯৬৯)। নাটককে জীবনধর্মী বিষয়ের আকর ও আধার হিসেবে উন্মোচন করেন এই দুই নাট্যকার। স্পেনে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন বিষয়ে সাকার কুরাইশ নাটক রচনা করে তাইমুর খ্যাতিমান নাট্যব্যক্তিত্বে পরিণত হন। আর মিসরীয় সমাজ বাস্তবতার নিরিখে যাপিত জীবনের বৈচিত্র্যময় দৃশ্যায়ন সমেত রচনা করেন মা তারাহু আল-উয়ুন। এসব নাটকের ক্রমপক্বতা বোদ্ধা দর্শকমহল ও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সামর্থ্য হয়।
আলি আহমদ বাকাসির হাল জামানার একজন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব। তিনি আল-কুরআনুল কারিমে বর্ণিত গোবৎস পূজার ইতিহাসের আলোকে নির্মাণ করেন আল-খুরুজ নাটকের পটভূমি। অনন্য পটভূমিকায় এমন নির্মোহ নাটক নির্মাণ সত্যিই এতদিন স্বপ্নাতীত ছিল। এমনি আরো অসংখ্য ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক নাটক সৃজন করে তিনি আরবি নাটককে বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের সমকাতারে অবস্থান করে দিতে যুগোত্তীর্ণ অবদান রাখেন।
তবে আরবি নাটকের আধুনিকায়ন, সজ্জায়ন, আঙ্গিক নির্মাণ, নবতর নাট্য-বীক্ষণ, কুশীলব বিন্যাস, অসাম্য-অসঙ্গতির প্রতি চাতুর্য অঙ্গুলি নির্দেশ প্রভৃতির সফল প্রয়োগ ও পরীক্ষা চালান তাওফিক আল-হাকিম (১৮৯৮-১৯৮৭)। তাওফিক আল-হাকিমের পরিবেশিত নাটকের সংখ্যা অপ্রতুল। অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। এ ইতিহাস ও সমাজ প্রতিবেশের উচ্ছিষ্ট ও বর্জ নিরসনের শক্ত বচনে তার কলম গর্জে উঠে নাটকের ভাষ্যে। কখনো চটুল, কখনো তির্যক, কখনো গুরুগম্ভীরতায় সমাজ গঠনের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজ কাঁধে। গ্রিক বা ফরাসি নাটকের প্রভাব তার নাটকেও ছিল। তবে পূর্ণ অনুকরণ ছিল না কখনোই। বরং তার প্রতিটি নাটকই ছিল স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর। সৃষ্টিতে মৌলিক। কিং ইডিপাস কিংবা ইজিস পৌরাণিক কিংবদন্তি হলেও তিনি এসবের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ভাগ্য নির্ভরতাকে বিদায় জানিয়েছেন অনন্য বৌদ্ধিকতায়। উচ্চারণ করেছেন কর্মের জয়সুর। তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাগ্য নয়Ñ কর্মই মানবজীবনের মূল নিয়ন্তা। এভাবেই তিনি নাটককে করেছেন জীবনমুখী। মঞ্চায়নকে করেছেন বাস্তবানুগ। তার রচিত আহল আল-কাহাফ নাটকটিও হৃদয়স্পর্শী। নাটকটি ট্র্যাজিডি হলেও অনেকেই এটিকে ট্র্যাজি-কমেডি পর্যায়ভুক্ত করেন। তার সালাতু আল-মালাইকা বা ফেরেশতার প্রার্থনা নাটকটিও এই পৃথিবীর নির্মমতা ও নৃশংসতা এবং নিপীড়ক গোষ্ঠীর নিগ্রহণের সচিত্র দৃশ্যায়ন এতে রয়েছে। একইভাবে তাওফিক আল-হাকিমের মাসিরু সারসার বা তেলাপোকার ভাগ্য, আল-তাআমু লি-কুল্লিø ফামি বা সবার জন্য খাদ্য, সুলাইমান আল-হাকিম জ্ঞানী রাজা সুলাইমান নাটকসমূহ সমাজের জন্য সমান বার্তাবাহী। এসব সমাজমুখী ও জীবনমুখী নাটক রচনা করে তাওফিক আল-হাকিম সত্যিই আরবি নাটকের স্বর্ণদুয়ার উন্মুক্ত করেন। তার ও তার উত্তরসূরি ও পূর্বসূরিদের অনেক নাটক নানা সময়ে ওয়ার্ল্ড টপ টেনভুক্ত নাটকের মর্যাদায় সিক্ত হয়েছে। একই সাথে আরবি কাব্যনাট্যের প্রভুত সম্প্রসারণ লক্ষ করা যায়। খলিল আল-ইয়াজিজি, সুলায়মান আল-বুস্তানি (১৮৪৫-১৯২৫), মুস্তাফা কামিল (১৮৭৪-১৯০৮), আহমদ শাওকি (১৮৬৮-১৯৩২), আজিজ আবাজা প্রমুখের নাম করা যায়। এরপর আরবি সাহিত্য নাটক সৃষ্টিতে আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। শুধুই সামনে চলা। লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
আরবি সাহিত্যে নাটকের যে উত্তরণ তা অনেকটাই ইউরোপের অনুকরণ ও অনুবাদ দিয়ে শুরু হলেও এখন তা আপন স্বকীয়তায় সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে আরব বিশ্বের নেতৃত্ব দানকারী মিসর এ ক্ষেত্রে অন্যান্য আরব দেশ অপেক্ষা অগ্রণী স্থানে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, নাট্যকারদের রুচিবোধ, জনগণের সংস্কৃতিপ্রিয়তা মিসরকে এক পরিপক্ব নাট্যনির্মাতার দেশে পরিণত করেছে। আমরা মনে করিÑ সামগ্রিক আরবি সাহিত্যের মতোই আরবি নাটকেও মিসর আরব বিশ্বকে এবং গোটা বিশ্বকেই নেতৃত্ব দেবে। বোধ, বিশ্বাস, বিবেচনা আর মানবিকতানির্ভর নাটকই পারবে পৃথিবীকে ভালোয় ভালোয় ভরে দিতে। আরবি সাহিত্য হোক মানবিক নাটক নির্মাণের উৎসভূমি। পৃথিবী বদলে দেয়া শ্লীল নাটকের সূতিকাগার। সুন্দরতম নাটকীয় পৃথিবীর প্রত্যাশায়। হ