ছোটবেলা থেকে যে শিশুরা ভুল ডিসিপ্লিন ও ম্যানিপুলেশনের মধ্যে বড় হয় তারা সব কাজেই হ্যাঁ বলে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কিছুই করে না। বিপদে না পড়লে সচরাচর এদের চোখ খোলে না।
সন্তানের জীবনে মা-বাবার ভূমিকা যেমন অপার তেমনি শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষকের ভূমিকা একই রকম। তাদের সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষক অন্যতম পথপ্রদর্শক। শিক্ষকের প্রভাব শৈশব ও কৈশোরে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। অনেক শিক্ষক আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে পড়ুয়াদের জীবনে প্রতিভাত হয়ে থাকেন। যেহেতু প্রাত্যহিক জীবনে দীর্ঘ সময় পড়ুয়ারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিবাহিত করে, তাই শিক্ষকদের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর পড়ে।
অতএব, আমাদের জীবন কুশল যথার্থ শিক্ষক হয়ে উঠতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যেমন শিক্ষার্থীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে শিক্ষককে সচেতন থাকতে হবে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও জীবন কুশলতার বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রেও পূর্বপরিকল্পনা থাকা দরকার।
দায়িত্বশীল নাগরিক, প্রতিবেশী, অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধের অভাব প্রায়ই অসুস্থ পরিবেশের জন্ম দেয়। তার দায় আমরা একে অপরের ওপর চাপিয়ে দিতে অভ্যস্থ। অপরের আচরণের অস্বাভাবিকতার কারণও আমরা কখনো তলিয়ে ভাবতে চাই না। নিজের ভূমিকার বিশ্লেষণেও আমরা অপারগ। অথচ নিজেকে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এমন অনেক ত্রুটি নিজের মধ্যেই রয়েছে; যা সংশোধন করা একান্তই প্রয়োজন ও কর্তব্য। সেটি সম্ভব নিজের আচার-আচরণ, মানসিকতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। আত্মসচেতনতা ব্যক্তির সারা জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। বিশেষ করে শিক্ষার পরিবেশে নিজের সম্পর্কে ভাবনা চিন্তার প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি।
বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীর আত্মপ্রীতির সবচেয়ে বেশি যতœ নিতে। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক ভেবে দেখেন না তাদের কথা ও আচরণ সন্তানের ওপর কী প্রভাব ফেলে। আত্মপ্রীতি কোনো স্তরে রয়েছে, তা বোঝার প্রয়াস সচরাচর অভিভাবক বা শিক্ষকদের মধ্যে দেখা যায় না। শিশু বা কিশোর-কিশোরীরা বয়স্কদের দৃষ্টিতে প্রত্যাশিত আচরণ না করলে তার ওপর নানা রকম চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা প্রায়ই তার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
নবপ্রজন্মের জন্য শুধু উদাহরণ দিয়ে গেলেই চলবে না। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে দৃষ্টান্ত রেখে যেতে হবে। শিশু-কিশোররা উদাহরণের চেয়ে দৃষ্টান্তকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করে।
শিশুদের যেসব বিষয়ের ওপর আমাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছেÑ
প্রশাংসার ক্ষেত্রে উদারতা প্রয়োজন।
বিদ্রƒপাত্মক সমালোচনা পরিহার করা প্রয়োজন।
বাবা হিসেবে অন্য নারীর সন্তানের দুঃখকষ্টের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে নিজ স্ত্রী-সন্তানদের সুখ-দুঃখের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব এবং পরিবারের জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা অতীব জরুরি।
বাবা-মা উভয়কেই সন্তানের যেকোনো বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তাদের কথা বা মতের মূল্যায়ন করা উচিত।
সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন।
শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক সমস্যার চিকিৎসাও অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থী বা সন্তানের নেতিবাচক দিকগুলো ইতিবাচকভাবে শোধরানো জরুরি।
সমালোচনার মধ্যে সন্তানকে বেড়ে উঠতে দিলে সে বড় হয় শুধু অন্যের নেতিবাচক দিকগুলোই খেয়াল করবে। আর প্রশংসার মধ্যে বেড়ে উঠলে সে সন্তান অন্যের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করবে।
বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্যারান্টিং বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানকে শিক্ষিত ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তাকে সুশিক্ষিত ও মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন হতে সার্বিক সহায়তা দিতে হবে।
শিক্ষকরা ক্লাসের পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিদিন কিছু সময় যদি শিক্ষামূলক এবং নৈতিক অবক্ষয় সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টান্তগুলো শিক্ষার্থীর মগজে দিতে পারেন তা হলে এতে তারা নৈতিক ব্যাপারগুলোতে অনেক সচেতন হতে পারে।
প্রতিটি শিক্ষার্থী বা সন্তানকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিবোধ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান দিতে হবে। কারণ প্রত্যেকেই আমরা ধর্মের চাদরে ঢাকা। ধর্ম কখনো আমাদেরকে কুশিক্ষা দেয় না। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীর বা সন্তানের জন্য কাউন্সেলিং অতীব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শাসন করে যে সুফল কখনোই পাওয়া যায় না কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তা বহুলাংশে সহজতর হয়ে ওঠে।
সবসময় মনে রাখতে হবে, শিশুরা আমাদের আচরণকে অনুকরণ করছে। ভিডিও, ক্যামেরার মতো আমাদের সন্তানরাও আমাদেরকে তাদের মস্তিষ্কের ভেতর ধারণ করে রাখে। সন্তানদের ভবিষ্যত গড়ার জন্য টাকা-পয়সার পেছনে সারাক্ষণ ব্যস্ত না হয়ে সন্তানদেরকেও প্রচুর সময় দিতে হবে। তাদের সাথে সবচেয়ে মধুরতম বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। কেননা সুসন্তানই আমাদের প্রকৃত সম্পদ। টাকা-পয়সা কখনো এই সম্পদের ঊর্ধ্বে নয়।
সন্তানের সাথে আমাদের আচরণ ও বক্তব্যের সামঞ্জস্য রাখতে হবে। অনেক সময় মায়েরা শিশুদের ছোটবেলায় খাবার খাওয়ানোর সময় মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে খাওয়াতে চেষ্টা করেন, অর্থাৎ তোমাকে চাঁদ এনে দেবো, ওটা এনে দেবো, সেটি এনে দেবো ইত্যাদি। বাস্তবিক অর্থে কখনই কোনো মায়ের পক্ষে শিশুটির সেই অবাস্তব প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই মায়েদের কথার গ্রহণযোগ্যতা বা আস্থা শিশুরা হারাতে শুরু করে। এই রকম পরিস্থিতিতে শিশু বেড়ে ওঠে মায়ের ওপর অবিশ্বাস নিয়ে। একসময় মায়ের চরম সত্য কথাটির ওপরও সন্তান ভরসা করতে পারে না। এ জন্য ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে মিথ্যা প্রলোভনের মাধ্যমে গড়ে তুলতে নেই।
সন্তান পরিচালনার ক্ষেত্রে যদি যথেষ্ট ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন, তবেই সেই সন্তান অনায়াসে স্বীকার করে ‘আমার মা সব জানে’। এই স্লোগানটি শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী ও প্রয়োজনীয়।
প্রতিটি পরিবারের মা-বাবারা যদি সন্তানের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে তবেই সেই পরিবারের শিশুরা সঠিক মূল্যবোধগুলো রপ্ত করতে পারে। সন্তানের মধ্যে যখনই দায়িত্ববোধের উপস্থিতি দেখা দেবে তখন বাবা-মা সচেতনভাবে কিছু কিছু দায়িত্ব তাদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। নতুবা তারা নিজের দায়িত্ব নিতে না শিখলে ভবিষ্যতে পরিবারের দায়িত্ব নেবে কিভাবে? সন্তানের যেকোনো কাজের কুফল-সুফল সম্পর্কে তাকে সুন্দরভাবে বোঝাতে হবে এবং দিন শেষে গল্পের ছলে সন্তানের সারা দিনের ভালো-মন্দ কাজগুলো জানার চেষ্টা করতে হবে এবং সুন্দরভাবে তাকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
আমরা যখন কাউকে কিছু দান করি তা সন্তানের হাত দিয়ে দান করলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন সওয়াব পাওয়া যাবে বেশি তেমনি সন্তানও এ বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে শিখবে। কারণ ছোট বেলার এই অভ্যাসগুলো সারা জীবনের জন্য তাদের মনে গেঁথে থাকবে।
একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীদের সন্তানের মতো ভালোবেসে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মাদকাশক্তির মতো কঠিন নেশা থেকেও সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
সন্তান বা শিক্ষার্থীর সাথেও আমাদের অনেক ভুল হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে আমাদেরকে দুঃখ প্রকাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে কখনো ছোট হওয়া নয়, সন্তান বা শিক্ষার্থীদের জন্য উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
শিক্ষার্থী যখন কোনো বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে তখন তাকে প্রশংসার মাধ্যমে উৎসাহিত করে আমাদেরকে তার উত্তর দিতে চেষ্টা করার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
সন্তান বা শিক্ষার্থীর ত্রুটি নিয়ে কখনোই হাসিঠাট্টা করা সমীচীন নয় এবং অন্যের সামনে তার ভুলের জন্য লজ্জা দিয়ে সমালোচনা করা উচিত নয়। বরং তাকে নিরিবিলিতে ডেকে সেই বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দান করতে হবে। সন্তানের উপস্থিতিতে বাবা-মায়ের ঝগড়া করা মোটেও শোভনীয় নয়। এতে তার মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি হয়।
নিজের সংসার ফেলে রাত-বিরাতে অন্যের সংসারের সুখ-দুঃখ জানার মধ্যে কোনো মমত্ববোধ বা পিতৃত্ব প্রকাশ পায়না; কেবলই নীচুতা ও হীনম্মন্যতার প্রকাশ ঘটে। নিজের সংসার ভেঙে যারা অপরের সংসার পরিপূর্ণ করার কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাদের মাঝে কাপুরুষতা ভিন্ন কোনো মহানুভবতার পরিচয় বহন করে না।
প্রতিটি সন্তানেরই শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি সন্তান বা শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা একটি অপরটির পরিপূরক। হ