[ষষ্ঠ কিস্তি]
ছন্দ-পরিচয়
ছন্দ সম্পর্কে লেখার শুরুতেই সহজ করে অল্পবিস্তর আলোকপাত করেছি। তার পরও বিষয়টি আরো একবার মনে করিয়ে দিই। জীবেন্দ্র সিংহরায়ের ভাষায়, কাব্যের রসঘন ও সুশৃঙ্খল ধ্বনিবিন্যাসের ফলে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে ছন্দ বলে। অর্থাৎ, কবিতার ধ্বনিগুলোকে কবি সুশৃঙ্খল করে সাজিয়ে তাতে এক বিশেষ ধ্বনিসুষমা দান করেন। ফলে, কবিতাটি পাঠের সময় একধরনের ধ্বনিমাধুর্য উপভোগ করা যায়। ধ্বনির এই সুশোভিত বিন্যাসই ছন্দ। এককথায় ছন্দ হলো কবিতার সুসমঞ্জসতার সৌন্দর্য।
আমরা বিষয়টিকে আরো সহজভাবে ভাবতে পারি। ধরি, একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে একটি বালক নিজস্ব ভঙ্গিতে দৌড়াতে থাকল। একসময় সে তার চলার পথে একটি গর্ত দেখে থমকে দাঁড়াল। এই থমকে দাঁড়ানোর ফলে তার দ্রুততালে চলার গতি হঠাৎ হোঁচট খেল। এটা তার চলার ছন্দে বিঘœ ঘটল। এটাই হলো ছন্দ পতন। আমরা কবিতা লেখার সময় অনেক সময় সঠিক রীতি থেকে বিচ্যুৎ হলে সেটাকে ছন্দপতনের কারণ ভাবতে পারি। হ্যাঁ, কবিতাকে সঠিক নিয়মেই গাঁথতে হয়। এই গাঁথার নিয়মটাকেই ছন্দবোধ বা ছন্দরীতি বলে।
ছন্দ প্রধানত তিন প্রকারÑ
১. স্বরবৃত্ত
২. মাত্রাবৃত্ত
৩. অক্ষরবৃত্ত।
এই তিন ছন্দ নিয়ে আলোকপাতের আগে ছন্দের কিছু উপাদানগুলোকে আর একবার মনে করে নিতে পারি। যেমনÑ মাত্রা, অক্ষর, যতি, পঙ্ক্তি, পর্ব, চরণ প্রভৃতি। ছন্দে অক্ষরটা আবার সাধারণ বর্ণ নয়। ধ্বনির উচ্চারণের স্থায়িত্ব কালকে ছন্দের অক্ষর (ংুষষধনষব) বলে। যেমনÑ খোকন যাবে শ্বশুরবাড়ি সংগে যাবে কে। । এখানে বর্ণমালার অক্ষর আছে ১৬টি। কিন্তু ছন্দের অক্ষর আছেÑ (খো+কন+ যা+বে+ শ্ব+শুর+ বা+ড়ি+ সং+গে+ যা+বে+ কে)= ১৩টি।
এই অক্ষর আবার দুই রকম। স্বরান্ত এবং ব্যঞ্জনান্ত। স্বরান্ত : যেসব অক্ষর স্বরধ্বনিজাত বা অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি আছে, তাকে স্বরান্ত অক্ষর বলে। স্বরান্ত অক্ষর আবার দুই রকম। যেমনÑ মৌলিক স্বরান্ত ও যৌগিক স্বরান্ত। স্বরান্ত এককভাবে উচ্চারিত হয় তাকে মৌলিক স্বরান্ত বলে। যেমনÑ অ আ কা মা না রা প্রভৃতি। উপরন্তু যৌগিক স্বরান্ত অন্য একটি ধ্বনিকে সঙ্গে নিয়ে উচ্চারিত হয়। যেমনÑ ঐ ঔ যাও নাও বউ প্রভৃতি।
স্বরান্ত অক্ষর সবসময়ই (ড়ঢ়বহ ংুষষধনষব ) উন্মুক্তভাবে উচ্চারণ হয়। এ জন্য একে মুক্তাক্ষর বলে। কারণ এগুলো উচ্চারণের শেষ অবধি মুখ খোলা থাকে।
অপর দিকে ব্যঞ্জনান্ত অক্ষরকে বদ্ধাক্ষর (পষড়ংবফ ংুষষধনষব) বলে। কারণ এরা উচ্চারণের সময় যেমন বাকপ্রত্যঙ্গ স্পর্শ তো করেই; পক্ষান্তরে, উচ্চারণের শেষে তা দুই ঠোঁটকে, কখনো তালুতে জিহ্বাকে আটকে রাখে। যেমনÑ আব যপ লাফ বল চাল প্রভৃতি।
গবশেষে কিন্তু অক্ষর তিন ধরনের হলো। ক. মৌলিক স্বরান্ত খ. যৌগিক স্বরান্ত ও গ. ব্যঞ্জনান্ত বা বদ্ধাক্ষর।
ছন্দের মুখ্য তিন রূপ।।
১.স্বরবৃত্ত : ছড়ায় বহুল ব্যবহৃত হয় বলে একে লোকছন্দ বা ছড়ার ছন্দও বলা হয়। এ-ছন্দের বিশেষত্ব হলোÑ ক. সব অক্ষর ১ মাত্রা গুনতে হয়। খ. মূল পর্ব সবসময় ৪ মাত্রার হয়। গ. এ-ছন্দ বল বা শ্বাসাঘাতপ্রধান। প্রতি পর্বে প্রথম অক্ষরে শ্বাসাঘাত পড়বে। এ জন্য একে বলপ্রধান বা শ্বাসাঘাত বা বলপ্রধান ছন্দও বলে। ঘ. এ-ছন্দ দ্রুতলয়ের। তাই পড়ার সময় দ্রুত পড়তে হয়। স্বরবৃত্ত মূলত মাত্রাবৃত্তের উল্টো চালে চলে।
২. মাত্রাবৃত্ত ছন্দ : স্বরবৃত্তের উল্টো এই ছন্দেও প্রকৃতি। বিশেষ করেÑ ক. এই ছন্দে মূলপর্ব ৪, ৫, ৬ ও ৭ মাত্রার গুনতে হয়। তবে অপেক্ষাকৃত বেশি মাত্রা হলে এই ছন্দকে রবীন্দ্রনাথ স্বরমাত্রিক ছন্দ বলে আখ্যায়িত করেছেন। খ. অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকলে ১ মাত্রা হয়। গ. অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে ২ মাত্রা গুনতে হয়। ঘ. পাঠের গতি স্বরবৃত্তের চেয়ে ধীর, কিন্তু অক্ষরবৃত্তের চেয়ে দ্রুত।
৩. অক্ষরবৃত্ত ছন্দ : এই ছন্দের বিশেষত্বÑ ক. বৈচিত্র্যধর্মী ছন্দ অক্ষরবৃত্ত। খ. মূলপর্ব ৮ বা ১০ মাত্রার হয়ে থাকে। গ. মুক্তাক্ষর ১ মাত্রায় গুনতে হয় ঘ.বদ্ধাক্ষর শব্দের শুরুতে বা মাঝে থাকলে ১ মাত্রার হয়, শেষে থাকলে ২ মাত্রার হবে। ঘ.একাক্ষরবিশিষ্ট বদ্ধাক্ষর ২ মাত্রা বিবেচিত হয়। ঙ. সমাসবদ্ধ পদের প্রারম্ভে বদ্ধাক্ষর থাকলে সেখানে ১ বা ২ মাত্রার হতে পারে। চ. বৈশিষ্ট্যগত কারণে অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে পয়ার বা যৌগিক ছন্দও বলা হয়ে থাকে। ছ. স্বরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্তের মতো এই ছন্দ মাত্রা-পর্বে সমতা রক্ষা করে চলে না। জ.অবশ্য, ত্রিপদী, চৌপদী বা পয়ার-অমিত্রাক্ষর ধাঁচের কবিতায় এ-জাতীয় ছন্দে পর্ব-মাত্রার পরিমাপের বিশেষ নিয়ম আছেন। ঝ. অক্ষরবৃত্ত ছন্দেও আবৃত্তি বা পাঠ ধীর লয়ে চলে। [চলবে]
