মেয়েটির নাম ছিল মাদুলি। সোঁদা মাটির গন্ধ মাখা, হাজার বছরের বিশ্বাসে ছোঁয়া একটি নাম। অবাক হয়েছিলাম ঢাকা শহরের অভিজাত একটি স্কুলের, অভিজাত পরিবারের একটি মেয়ের নাম মাদুলি! ভারি মিষ্টি মেয়ে। লম্বাটে গড়ন, গোলাপের পাপড়ি ধোঁয়া গায়ের রঙ। কালো চোখ, চোখে সারাক্ষণ যেন মেঘ ছড়িয়ে আছে।
১৯৮৪ সাল। আমি ঢাকার সেই অভিজাত স্কুলে শিক্ষকতা করি। তখনো প্রশাসনের দায়িত্ব পাইনি। নবম দশম শ্রেণীতে বাংলা পড়াই। মেয়েরা রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ পড়তে পড়তে ফটিকের মতোন আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর স্বপ্ন দেখে। ‘পল্লী সাহিত্য’ পড়ে লালন আর হাসন রাজাকে ভালোবাসতে শেখে। আর আমি শত শত মেয়ের মা হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখি।
নবম শ্রেণীর মানবিক বিভাগের শ্রেণিশিক্ষক আমি। পড়াতে পড়াতে মাদুলির দিকে প্রায়ই চোখ যায়। বাংলায় একটু কাঁচা ছিল বলে মাঝে মধ্যেই ওর গালদুটো লাল হয়ে যেত। বেশ লাগত দেখতে। সবাই রেজিস্টারে লেখা নাম ধরেই ওকে ডাকত। আমি ওর মায়ের মুখ থেকে মাদুলি নামটি শুনে ফেলেছিলাম।
বছরের দু-তিন মাস কেটে গেছে। স্বাভাবিক নিয়মেই শিক্ষা বোর্ডের আদেশ এলো, রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করতে হবে। মেয়েদের হাতে ফরম তুলে দিলাম। নির্ভুলভাবে পূরণ করার সব রকম চেষ্টা করছি। সবাই মনোযোগী। হঠাৎ ফুপিয়ে উঠল মাদুলি।
Ñ মাদুলি! কী হয়েছে মা?
Ñ আমি বাড়ি যাবো আপা।
Ñ শরীর খারাপ লাগছে?
মেয়েটি কেঁদেই চলেছে। সমস্ত ক্লাস নিস্তব্ধ, শুধু একটি মেয়ের বুক ফাটা কান্না ডুকরে ডুকরে উঠছে।
আদর করে ওকে সামলাতে চেষ্টা করলাম। জানতে চাইলাম কোথায় ওর কষ্ট!
Ñ শরীর খুব বেশি খারাপ লাগছে?
মাদুলি আঙুল দিয়ে ফরম দেখিয়ে দিলো।
Ñ আমি এই কলামটা পূরণ করতে পারব না।
দেখলাম লেখা আছে ‘পিতার নাম...’
মাদুলি আবার বললÑ
Ñ এখানে আমি আমার মায়ের নামটাই লিখতে চাই! আমি বাবাকে চিনি না। কখনো তাকে দেখিনি। আমি জানি না কে আমার বাবা। আমি জানতে চাইলে কেউ তার নাম বলতে পারেনি। বাবা কেমন হয় আমি জানি না আপা!!
কেমন একটা হাহাকার শুনলাম মাদুলির কণ্ঠে।
সে দিনের মতো ফরম তুলে রাখলাম। দৌড়ে গেলাম অধ্যক্ষের কাছে। তিনি শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আমি যা ভেবেছিলাম, তিনিও তাই ভাবছেন। জিজ্ঞেস করলেনÑ
Ñ দেখতে কেমন মেয়েটি?
Ñ বেশ সুন্দর, লম্বা, ফর্সা।
চিন্তিত হলেন তিনি। মায়ের সাথে কথা বলতে বললেন।
মা এলেন। আসামির মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। আমি বললামÑ
Ñ কেমন আছেন আপা?
চোখের পাতা কাঁপছে মাদুলির মায়ের। করুণ স্বরে বললেনÑ
Ñ ভালোই আছি!
Ñমাদুলি কেন অমন করে কাঁদছে বলতে পারেন? ওর বাবার নাম কী আপা? কোথায় আছেন তিনি?
মা নিরুত্তর। চোখের জলে শাড়ি ভিজে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেনÑ
Ñ ছোট বেলায় ও ওর মামাকে বাবা বলে ডাকত। স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় ওই নামটাই লেখা ছিল। বড় হয়ে বুঝে গেছে মামা ওর বাবা নয়।
Ñ আপনি ওর বাবার নামটা ওকে বলেননি?
মাদুলির মা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সময় এসেছে তার।
Ñ আপা আপনাদের তো শিক্ষা বোর্ডে পরিচিতি আছে, শুধু মায়ের নামে কি ও ফরম পূরণ করতে পারবে না?
উত্তরে আমি কিছুই বলতে পারিনি। ভীষণ অসহায় লাগছিল নিজেকে।
এরপরে দিব্যি দিয়ে তিনি শুধু আমাকেই কয়েকটি কথা বলেছিলেন। সে কথা আমি কোনো দিন কাউকে বলিনি। বুকের মধ্যে পুষে রেখেছি।
মাদুলির গল্পটা এখানেই শেষ হয়েছিল। ওকে এরপরে আর কেউ কোনো দিন স্কুলে দেখেনি। কোথায় গিয়েছিল মাদুলি? কোথাও গিয়ে কি বাঁক নিয়েছিল ওর জীবনের গল্পটা? অনেকবার জানতে চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।
মাদুলি আমার শিক্ষকতার জীবনে লাল দগদগে একটি স্মৃতি, বুকের ভেতর গাঢ় নীল কষ্ট, জমাট বাঁধা কান্না!!
মায়ের আদর করে রাখা নাম মাদুলি! আসলে ও কার রক্ষাকবজ ছিল?
ওর নিজের?
ওর মায়ের?
আমাদের সবার?
না কি এই দেশের স্বাধীনতার?