বিশ্বের মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণের জাতিসত্তার বিজয়ের দিন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের আমজনতার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও সাধ বাঁচার মতো অধিকার লাভের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত সুদীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন, আত্ম পরিচয় ঘোষণার, জগতসভায় আপনার পরিচয়ে পরিচিতি লাভের দিন। এই দিনেই প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতিলাভ করে তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অনন্য ঐক্য গঠনের মাধ্যমে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজের পায়ে নিগে দাঁড়ানোর স্বাধীন আশায় পথচলা এবং আপন বুদ্ধিমতে চলার ক্ষমতা। বাংলাদেশী জাতিসত্তার চূড়ান্ত বিজয়ের দিন তাই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু এই অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, কিংবা ছেলের হাতের মোয়ার মতো তা নয় সহজপ্রাপ্যও, তাকে অর্জন করতে হয়, আদায় করে নিতে হয়। আবার অর্জন করার মতো সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করাও কঠিন। কেননা, স্বাধীনতার শত্র“র অভাব নেই। একদিকে স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায় না কেউ, আবার সুযোগ পেলে অন্যকে নিজের অধীনে রাখতে চায়ও সবাই। মানব প্রকৃতির এই দুই ভিন্নধর্মী প্রবণতার দ্বন্দ্ব অহরহ চলে আসছে সেই সুদূর অতীত থেকে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, ইতিহাসের বহু পট পরিবর্তনে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পরিপূর্ণভাবে অর্জন করে তাদের আজন্ম লালিত সেই স্বপ্নসাধ।
আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিধি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সেই ভয়াবহ ৯ মাস বলে মনে হলেও কিংবা দৃষ্টিকে একটু প্রসারিত করে পাকিস্তান শাসনামলের ২৪ বছর বলে মনে হলেও মূলত তা নয়। এর পরিধি আরো ব্যাপক। এই ব্যাপকতার বিচারে বিজয় দিবস বাংলাদেশের জনগণের জীবনেতিহাসে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ও ইতিহাসের স্মারক, চিরস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল তার যথার্থ উদয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সহসা কোনো ঘটনা ঘটে নাÑ তার পেছনে কার্যকারণ থাকে, আয়োজন থাকে, অনুষঙ্গের একীভবন হওয়ার মতো পর্ব থাকে। ঘটনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পর্যবসিত হওয়ার আগেও অনেক পট পরিবর্তিত হয়। বলা যেতে পারে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের ভারত বিভাগের মাধ্যমে ক্ষমতাবদলের ঘটনা এই জাতীয় ইতিহাসে একটি পটপরিবর্তন মাত্র। উৎকর্ষ-পূর্ব পরিবেশ হলো পাকিস্তান আমলের ২৪টি বছর এবং ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ হলো উৎকর্ষকাল যার সফল পরিণতি ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় দিবসে।
ব্যবসায়-বাণিজ্যে এদেশে আগমন ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্র ছায়ায় সাত সমুদ্র তের নদী পার থেকে ইংরেজদের। তাদের আগে মগ ও পর্তুগিজরা অবশ্য এসেছিল এদেশে। প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনায় এরা পরস্পরের শত্র“ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। অত্যাচারী মগ ও পর্তুগিজদের দমনে ব্যর্থপ্রায় সমকালীন শাসকদের সাহায্যে এগিয়ে আসে নৌযুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ইংরাজ বণিক। ক্রমে তারা অনুগ্রহ ভাজন হয়ে ওঠে সমকালীন বিলাসপ্রিয় উদাসীন শাসকদের, আর সেই উদাসীনতার সুযোগেই রাজ্য-পরিষদ-অভ্যন্তরে কূটনৈতিক প্রবেশলাভ ঘটে ইংরেজদের। প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁকে হাত করে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে নবাব সিরাজউদদৌলাকে। পরবর্তীতে তারা কুক্ষিগত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শাসনভার এবং ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষের প্রায় গোটা অঞ্চলের। মীর কাসিম খাঁন, টিপু সুলতান প্রমুখ সমকালীন স্বাধীনচেতা রাজন্যরা তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চাঙা করেও ব্যর্থ হন। বলা বাহুল্য, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু সেখান থেকেই। বিদেশবিভুঁই ভারতবর্ষে সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য হিন্দুদের বিশেষ আনুকূল্য প্রদর্শনার্থে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এ নীতির ফলে এদেশীয় স্বাধীনতাকামী জনগণের মধ্যে পৃথক পৃথক অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হয় এবং ব্রিটিশ শাসকের ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে হিন্দু-মুসলমান দু’টি সম্প্রদায়। জমিদার হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজদের আনুগত্য পেতে থাকে পক্ষান্তরে রাজ্য হারিয়ে মনমরা মুসলমান সম্প্রদায় (যারা বেশির ভাগ ছিল কৃষক) দিনদিন বিস্মৃৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহেও ইংরেজদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল বেশ কাজ করে। দ্বিধাবিভক্তিতে আচ্ছন্ন হয় উভয় সম্প্রদায়।
এরপর স্যার সৈয়দ আহমদের সমাজসংস্কারবাদী কর্মপ্রচেষ্টার ফলে মুসলমান সম্প্রদায় ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার আলোক পেয়ে ক্রমান্বয়ে চাক্ষুস্মান হতে থাকে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম হিসেবে হিন্দুরা কর্তৃক পরিচালিত ও ভাবাদর্শ নির্মাণকারী এই প্লাটফর্ম মুসলিম সম্প্রদায়ের সত্যই কোনো কল্যাণে আসবে না দেখে ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম লিগ’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠন। বৃহৎ ভারতবর্ষের ব্যাপারে না গিয়ে শুধু এই বাংলাদেশ বিষয়ে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে প্রধান ঘটনা স্থপতি হিসেবে কাজ করেছে তা হলোÑ ১৯০৫ সালে আসাম ও পূর্ব বাংলা নিয়ে প্রথক প্রদেশ গঠন। বাংলা ভাগ হওয়ার অজুহাতে সূচিত হয় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫-১১)।
এ পেক্ষাপটে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দ্বিধাবিভক্তি হতে হতে দু’টি সম্প্রদায় চূড়ান্তভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং মাঝে মাঝে তারা বিবদমান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপনীত হতে থাকে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পূর্ববাংলার নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২) ‘উপমহাদেশের মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের প্রস্তাব করেন। মুসলমান প্রধান পূর্ব বাংলাবাসীরা ওই প্রস্তাব অনুসারে একটি পৃথক রাষ্ট্রে গঠনের দাবিদার।
প্রসঙ্গত, ১৯৩০ সালে চৌধুরী রহমত আলী যে ‘পাকিস্তান’ শব্দটির উদ্ভাবন ঘটান এবং সেখানে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার যে কথা প্রথম প্রকাশ করেন তাতে বাংলা নামের কোনো শব্দ বা বর্ণ ছিল না, এমনকি ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের দার্শনি ভাবÑ নির্মাতা স্যার মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কল্পনা ব্যক্ত করেন তাতে বাংলা অন্তর্র্ভূক্তির কোনো কথা ছিল না। এতদ সত্ত্বেও এবং ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রসমূহ গঠনের প্রস্তাবকে’ উপচিয়েও কেমন করে যেন পূর্ব বঙ্গবাসীদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সহস্রাধিক মাইল ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে একীভূত হয় এবং পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
এটা যে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা প্রাপ্তি ছিল না বরং উপনিবেশবাদের হস্তান্তর মাত্র তা পূর্ব বঙ্গবাসীরা ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করতে পারেন। তারা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি বিষয়টিকে আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে শেখে যে তাদের সংস্কৃতির ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত আসছে, যা তাদের আত্মপরিচয়কে নিশ্চিহ্ন করে দেবে এবং ফলে জাতি হিসেবে তাদের হবে মৃত্যু। তারা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং বিভ্রান্তি তাদের কেটে যায়। তারা বুঝতে পারল তাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হয়নি। এ ব্যাপারে তারা তাদের জাগৃতির জানান দেয়, সচেতনতার পরিচয় দেয় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে। এত দিনে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী চক্রের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয় পূবর্ পাকিস্তানকে তারা ব্যবহার করতে চায় তাদের স্বার্থে। কেননা ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য আন্দোলনের অন্যতম উদগাতা ছিল পূর্ব পাকিস্তানিরা। একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সৃষ্ট বৈষম্য ও বিরোধ তেমনি তাদেরকে প্রথমে স্বাধিকার এবং পরে স্বাধীনতার আন্দোলনে উজ্জীবিত করে। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’-এর পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয় চূড়ান্ত পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ। সুদীর্ঘ ৯ মাসের রক্ষক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৬ ডিসেম্বর তার বিজয় সুনিশ্চিত হয়। তাই এই বিজয় দিবস ৯ মাসের কিংবা ২৫ বছরের সংগ্রামের বিজয় নয়, পূর্ব বঙ্গবাসীর স্বাধীনতা লাভের সুদীর্ঘকালের আকাক্সক্ষার বিজয়। ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনের ঘোষণা বাস্তবায়ন এবং সুদীর্ঘকালের ‘বিশ্বাসঘাতকা ও বিভ্রান্তির’ অবসানের পর বিজয়।
প্রখ্যাত লেখক হুমায়ন কবীর (১৯০৬-১৯৬৯) তার ‘বাংলার কাব্যে’ লিখেছেন, ‘বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্নধর্মী। পূর্ব বাংলার নিসর্গ হৃদয় তাদেরকে ভাবুক করেছে বটে কিন্তু উদাসী করেনি। দিগন্তপ্রসারী প্রান্তরের অভাব সেখানেও নেই। কিন্তু সে প্রান্তরেও রয়েছে অহরহ বিস্ময়ের চঞ্চল লীলা। পদ্মা যমুনা মেঘনার অবিরাম স্রোতধারার নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরাতনে ধ্বংস।’ নিসর্গ নন্দনকাননেই শুধু পরিণত করেনি, তাদের (বাংলাদেশের জনগণকে) করেছে পরিশ্রমী, সাহসী শান্ত সুজন, আত্মবিশ্বাসী, ভাবুক, চিন্তাশীল, আবেগময় ও ঔৎসুক্যপ্রবণ। তাদের রয়েছে নিজস্ব নামে দেশ সৃষ্টির ইতিহাস, ঐতিহ্য, চলন বলন শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি। দৈহিক গড়ন গঠনে আবেগ অনুভূতিতে, রগে বক্তে তারা পৃথিবীর অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায় হতে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেও তারা পৃথক ভিন্ন প্রকৃতির। জাতিগত ভাবাদর্শে, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশে জাতীয়তাবোধে তারা অন্যান্য রাষ্ট্র ও অঞ্চলে বসবাসকারী স্বধর্মী ও স্বভাষীদের থেকেও তারা স্বতন্ত্র প্রকৃতির। বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয়। তারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিজেরাই অর্জন করতে জানে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় জনগণের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সচেতনতা জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয়ে সমুন্নত করেছেন এ বিজয় দিবসে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাই বাংলাদেশবাসীদের জীবনেতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এটি শুধু একটি তারিখই নয়, তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার বলিষ্ঠ বিকাশের ধারক ও বাহক।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশীরা যে পরিচয়ে পরিচিত হয়েছে তার আনুপর্বিক ইতিহাস এবং এর অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা সবাইকে আরো মহিয়ান করে তুলেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ আত্মত্যাগ অনন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে নজির স্থাপিত হয়েছে ১৬ ডিসেম্বরের যা বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিভাত হয়েছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের তাৎপর্য়ে তাই জগৎ জাতিসভায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে স্বাধীনচেতা মনোভাবকে বাংলাদেশীদের জাতিসত্তার বিকাশকে আরো অর্থবহ ও মহিমান্বিত করেছে।
নিঃসন্দেহে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস বাংলাদেশীদের জাতীয় জীবনে এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে। সীমাহীন শোষণ ও সুদীর্ঘকালের অবজ্ঞায় নিষ্পেষিত ঔপনিবেশিক জীবনযাত্রা থেকে মুক্তি পেয়ে তারা তাদের নিয়মে তাদের চলার, নিজের পায়ে নিজের দাঁড়ানোর, বাঁচার অধিকার পেয়েছে। বাংলাদেশীদের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায়, সংস্কৃতিক জীবনযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মেচিত হয়েছে। নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করার নিজেরাই নিজেদের প্রশাসনের সুযোগ লাভ করেছে তারা। বাংলাদেশীদের নিয়মে নিজেদের চলার পথে মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে রইল মহান বিজয় দিবস। তারাই এখন তাদের উন্নতি ও অবনতির, সফলতা ও ব্যর্থতার দাবিদার।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণ কিভাবে নিজের পায়ে নিজেরা দাঁড়াবে, বাঁচার মতো বাঁচার লড়াইয়ে টিকে থাকবে, দীর্ঘ দিনের অবহেলা আর অবজ্ঞার ফলে ধ্বংসপ্রায় অর্থনৈতিক জীবনকে কিভাবে চাঙ্গা করে তুলবে, কিভাবে সমাজজীবন থেকে বন্ধ্যানীতি কুসংস্কার আর অপয়া ভাবধারাকে অপসারিত করে নিজেদের জাতিসত্তার বিকাশ ঘটিয়ে জাগ্রত জাতিসভায় বাংলাদেশের অবস্থান ও গৌরবকে আরো ঐশ^র্যমণ্ডিত করে তুলবে সে চেতনাও তারা পেতে পারে বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে সৃজিত মূল্যবোধগুলোয়। বিজয় দিবসের ইতিহাস ও ঘটনাপরিক্রমা এসব মূল্যবোধই সৃজন করেছে যে বাংলাদেশীরা গণতান্ত্রিকমনা, তারা তাদের স্বাধীনতা রক্ষায় একাগ্র, কর্তব্য পালনে নিরলস এবং অনন্য ঐক্যে বিশ্বাসী ও ধাতস্থ। সুতরাং বিজয় দিবসকালীন মূল্যবোধগুলো, মুক্তিযুদ্ধকালীন একাগ্রতা, আত্মত্যাগের সুমহান নিশ্চয়ই একই ভূমিকা পালন করবে, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে সহায়তা করবে। কোনোক্রমেই এসব মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়ে বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়ার, দায়িত্বহীনতা অলসতা আর কূপমণ্ডূকতার অবয়বে নিজেদের বিলীন করে দেয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে না।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বাংলাদেশীরা এই একাগ্রতার পরিচয় দিতে পিছপা যে হয়নি, তারা যে সত্যই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়নি তার কিছু প্রমাণস্বরূপ অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ আর্থসামাজিক খাতে সাফল্যের দাবিদার হতে পেরেছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সুমহান বিজয় দিন দিন প্রবৃদ্ধি লাভ করছে। তবে এগুলো যেমন আনন্দের কথা, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে চারিত্রিক বলের অধঃপতন ও অন্যান্য মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণ থেকে উৎসারিত দুর্নীতি এ দেশের অর্থনৈতিক জীবনকে বিষময় করে তোলার প্রয়াস পাচ্ছে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় হতাশায় কখনো সখনো অগ্রযাত্রার বিঘœ ও বিভ্রাট সৃষ্টি করে চলছে। এগুলোতে যথাসচেতনতায় সজাগ দৃষ্টি দেয়ার অবকাশও রয়েছে।
অতীতকে আঁকড়ে ধরে থেকে নয় বরং অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বিজয়কে জীবনের সর্বস্তরে উদ্ভাসিত করে তোলার জাগ্রত চেতনায়, সমাজকে পরিছন্ন করে তোলার ব্রত নিয়ে ভৌগোলিক সীমানায় আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের আলোকে আমাদের আশা আকাক্সক্ষার ভিত্তিতেই এ দেশ গড়ে তোলার মহান অনুপ্রেরণার সঞ্চারী হোক এবারের বিজয় দিবস এ শুভ কামনা সবার।
লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
