শাহনেওয়াজ তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের ছাত্র। ১৯৭১ সালে বিএফএ ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষার দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে। সবাই প্রস্তুত হচ্ছে পরীক্ষার জন্য। ঢাকার নিউমার্কেট ও নিউমার্কেট পোস্ট অফিস সংলগ্ন ছাত্রাবাসে থাকে শাহনেওয়াজ। সেও নিজেকে প্রস্তুত করছে পরীক্ষার জন্য। সে ছাত্রাবাসের ২নং কক্ষের বারান্দা সংলগ্ন উত্তর পাশের সিটে থাকে। স্বভাবে অতি সৃষ্টিশীল ও সৌখিন। প্রতিদিন সকালে জানালার পাশে বসে মাথার চুল কাটছাঁট করে। চুলের স্টাইল ঠিক আছে কিনা আয়নায় দেখে। পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন নায়ক ওয়াহিদ মুরাদের চুলের স্টাইল তার খুব পছন্দের ছিল বলে সেভাবেই চুল আঁচড়াতো। জমা, প্যান্ট নিজের ডিজাইন অনুসারে দর্জিকে দিয়ে তৈরি করিয়ে নিয়ে পরত বলে অন্য কারো পোশাকের সাথে মিলত না। ক্লাসের সহপাঠী বন্ধুরা চেয়ে চেয়ে দেখত তার ব্যবহৃত জামা-প্যান্ট। সে সব সময় সবার চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করত নিজেকে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস, পরীক্ষার জন্য ক্লাস বন্ধ। ক’দিন পরেই পরীক্ষা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে উত্তাল ঢাকা। শাহনেওয়াজের মনে নানা প্রশ্ন। কী হবে দেশে? কী হতে যাচ্ছে সামনের দিনগুলোতে? পরীক্ষা হবে তো? তবু চলছে পরীক্ষার প্রস্তুতি।
শাহনেওয়াজ স্বভাবে সরল। সহপাঠী কিংবা অন্য কারো সাথে কখনো ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হতে দেখা যায়নি। ফুর্তিবাজ ছিল সে। এ জন্য সবাই তাকে পছন্দ করত। পুরোদমে চলছে পরীক্ষার প্রস্তুতি। হৃদয়ে এক রাশ স্বপ্ন। পরীক্ষা শেষে ডিগ্রি পাসের সনদ পেলেই পাবে একটি চাকরি। বেতনের টাকায় গড়বে নিজের জীবন। হবে সুন্দর এক সংসার। হবে সুন্দরী স্ত্রী। স্ত্রীর গর্ভের ফুটফুটে সুন্দর সন্তান আসবে ঘর আলো করে। বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন সবাই সুখের সংসার দেখে খুশি হবে। দোয়া করবে। এমনই এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নের মালা গাঁথতে গাঁথতে এগোচ্ছিল শাহনেওয়াজ। কিন্তু তার অনিন্দ সুন্দর স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ২৫ মার্চ রাতের ধ্বংসযজ্ঞের পর ২৬ মার্চ পাকবাহিনীর জোয়ানেরা ছাত্রাবাসে ঢুকে বুলেটের আঘাতে সব কিছু তছনছ করে দিলো। এ দিন সকালে একদল জোয়ান ছাত্রাবাসে ঢুকে ছাত্রাবাসের নিচ তলায় ছাত্রদের কক্ষে রক্ষিত বেনার, ফেস্টুন ও আসবাবপত্রে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এক গ্রুপ দোতলার ছাদে উঠে ছাত্রাবাসের পশ্চিম পাশের বস্তিতে গোলাগুলি শুরু করে। আর চার-পাঁচজন জোয়ান দোতলায় উঠে শাহনেওয়াজরা তিনজন যে রুমে অবস্থান করছিল সেই রুমে ঢুকে। সে সময় ওই রুমে শাহনেওয়াজ, কার্টুনিস্ট নজরুল এবং শাহনেওয়াজের একজন বন্ধু অবস্থান করছিল। জোয়ানরা তাদের তিনজনকেই পশ্চিম পাশের দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। সাথে সাথে তিনজনই বুলেটের আঘাতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত জেনে জোয়ানরা বের হয়ে যায়।
শাহনেওয়াজের যে বন্ধু গুলিবিদ্ধ হয়েছে সে থাকত এলিফেন্ট রোডের এরোপ্লেন মসজিদ সংলগ্ন একটি ভাড়া বাড়িতে। খুবই সঙ্গীতপ্রেমী মানুষ শাহনেওয়াজের বন্ধু। ঘটনার পূর্বদিন অর্থাৎ ২৫ মার্চের রাতে শাহনেওয়াজ এই বন্ধুর বাড়িতে কিছু টাকা ধার চাইতে যায়। টাকা নিয়ে ছাত্রাবাসে ফেরার সময় শাহনেওয়াজ বন্ধুকে বলেÑ তুমিও আমার সাথে ছাত্রাবাসে চলো। আমি নতুন গানের ক্যাসেট জোগাড় করেছি। তোমাকে শোনাব সেই গানের ক্যাসেট। সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধু শাহনেওয়াজের কথায় রাজি হয়ে যায় এবং ছাত্রাবাসে শাহনেওয়াজের সাথে রাতযাপন করে। কার্টুনিস্ট নজরুল শাহনেওয়াজের জুনিয়র। সে ছাত্রাবাসেই থাকে। সে দিন ছাত্রাবাসে আরো একজন ছিল। তার নাম আব্দুল জব্বার। জব্বার শাহনেওয়াজের সহপাঠী। সে ২৬ মার্চের সকালে ছাত্রবাসের সামনের রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানের জওয়ানদের বিডিআর ক্যাম্পে ঘন ঘন যাতায়াতের দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে যায়। সে তখন শাহনেওয়াজকে বলে পাক জওয়ানদের যাতায়াতের বহর দেখে ভালো লাগছে না। চলো ছাত্রাবাস থেকে চলে যাই। কারণ জওয়ানরা ছাত্রাবাসে ঢুকলে বিপদ হবে। ২৫ মার্চ রাত্রের ঘটনায় তারা কিছুটা ভয় পেলেও ভাবেনি জওয়ানরা দিনে ছাত্রাবাসে ঢুকবে। ফলে শাহনেওয়াজ জব্বারকে বলেÑ তুমি যাও। আমি যাব না। আমি সব কিছু দেখব এবং পরে সবাইকে জানাব। এ কথা শুনে জব্বার দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখতে পেল পাকিস্তানের জওয়ানদের একটি ট্রাক ছাত্রাবাসের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। জব্বার দ্রুত ক্যান্টিনের ভেতর দিয়ে ঢুকে পেছন দরজা দিয়ে বাইরে বের হয়ে যায়। কিন্তু বাউন্ডারি দেয়াল ও কাঁটাতারের বেড়ার কারণে ছাত্রাবাস ক্যাম্পাস থেকে বের হতে পারল না। ইতোমধ্যেই জওয়ানরা ছাত্রাবাসের ছাদে উঠে গোলাগুলি শুরু করেছে। ফলে জব্বার দেয়াল সংলগ্ন গভীর ড্রেনের মধ্যে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলি করে, বস্তি পুড়িয়ে জওয়ানরা চলে গেলে দুইদিন দুই রাত পরে রাতে ভয়ে ভয়ে জব্বার পুনরায় দোতলায় উঠে শাহনেওয়াজদের খোঁজ নিতে যায়। রুমে গিয়ে দেখে তিনজনই গুলিবিদ্ধ। শাহনেওয়াজ মৃত। নজরুল বুকে বুলেটের গুলি খেয়ে কাঁতরাচ্ছে। আর শাহনেওয়াজের বন্ধু গুলি খেয়েও জীবিত আছে। পরদিন সকালে কারফিউ শিথিল করলে জব্বার নজরুল ও শাহনেওয়াজের বন্ধুকে ঢাকা কলেজের সামনে নিয়ে যায় এবং রাস্তায় বের হওয়া একটি প্রাইভেট কার থামিয়ে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে গিয়ে রেখে নিজ বাড়ি ময়মনসিংহে চলে যায়।
গ্রাম ও পোস্ট-হুস্নাবাদ, ভায়া-বাউসি বাঙালি
জেলা-ময়মনসিংহ
এই ঠিকানা থেকে আব্দুল জব্বার (আমার সহপাঠী) ২/৭/৭১ তারিখে লিখিত এক পত্রে এসব কথা আমাকে জানায়। আমি তখন রাজশাহী জেলার গ্রামের বাড়ি বড়াইগ্রামে অবস্থান করছিলাম। সহপাঠী আব্দুল জব্বারের পোস্টকার্ডে লিখা পড়ে যার পর নাই মর্মাহত হয়েছি। আমার সহপাঠী শাহনেওয়াজ ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করলেও চিকিৎসা শেষে নজরুল ও শাহনেওয়াজের বন্ধু সুস্থ হয়ে ওঠে। মাস খানেক পূর্বে হঠাৎই এক ফোন পাই। ফোন ধরলে জানতে পারি শহীদ শাহনেওয়াজের আহত সেই বন্ধুর ছেলে ফোন করেছে। আমাকে জানানো হলো শাহনেওয়াজকে নিয়ে ডকুমেন্টারি ফিল্ম করতে চায়। শাহনেওয়াজকে নিয়ে আমার লেখা পড়ে তার ধারণা হয়েছে আমি শাহনেওয়াজ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে পারব। শাহনেওয়াজ সম্পর্কে আলোচনার এক পর্যায়ে সে জানতে চাইলোÑ ১. শাহনেওয়াজের লাশের কী হয়েছিল? ২. শাহনেওয়াজ তার গ্রামের এক হিন্দু মেয়েকে ভালোবাসত এবং মৃত্যুর কয়েক দিন আগে সেই মেয়েকে ঢাকায় এনে এক বন্ধুর বাসায় উঠেছিল। সেই মেয়েকে বন্ধুর বাসায় রেখেই শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসে এসেছিল। পাক জওয়ানদের ভয়ে তিনজন যখন ছাত্রাবাসের রুমে আশ্রয় নিয়েছিল তখন নাকি নজরুলকে সেই মেয়েটির কথা বলেছিল। কথাগুলো শোনার পর আমি বললাম দু’টো বিষয়েই আমার কিছু জানা নেই। শাহনেওয়াজ কোনো হিন্দু মেয়েকে ভালোবাসত এ বিষয়ে আমি কেন আমাদের ক্লাসের কেউই জানত না। উল্লেখ্য, যে, যে তিনজনের নিকট শাহনেওয়াজের লাশ সম্পর্কে জানা যেত তাদের কেউই এখন বেঁচে নেই। আমাদের দেশের বিখ্যাত শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া ছাত্রাবাসে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময় ছাত্রাবাসেই ছিলেন। তিনি শিক্ষক পরিচয় দেয়ায় এবং পাকিস্তান সরকারের দেয়া সম্মাননাপত্র দেখানোর কারণে রক্ষা পেয়েছিলেন। অন্য দিকে আব্দুল জব্বার ও নজরুল হয়তো কোনো তথ্য দিতে পারত। কিন্তু এদের কেউই এখন বেঁচে নেই। এখন যারা বেঁচে আছে এবং ছাত্রাবাসের সাথে সম্পর্ক ছিল তাদের সাথে যোগাযোগ করেও এ বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। তাছাড়া আমি নিজেও দীর্ঘদিন ছাত্রাবাসের অ্যাসিস্টেন্ট সুপার, সুপার, ওয়ার্ডেন এবং এফ রহমান হলের প্রভোস্টের দায়িত্বে ছিলাম এবং শাহনেওয়াজের মৃত্যু দিবসে আলোচনা অনুষ্ঠানও করেছি, কিন্তু তার লাশের কী হয়েছিল সে বিষয়ে কখনো কোনো আলোচনা হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। ২০২০ সালের স্বাধীনতা দিবসে বন্ধু শাহনেওয়াজকে নিয়ে এলোমেলো অনেক কথাই মনে পড়ছে। পরকালে ভালো থেকো বন্ধু। মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন তোমাকে বেহেশতের সুন্দরতম স্থানে স্থান দেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুভলগ্নের শহীদ তুমি। আল্লাহ শহীদ হিসেবে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন এ বিশ্বাস আমার আছে। হ