[সপ্তম কিস্তি]

ছন্দের ধরনধারণ ও মাত্রাগণনা

০১. স্বরবৃত্ত
গত পর্বে তিন প্রধান ছন্দ নিয়ে আলোকপাত করেছি। আজ সেসব ছন্দের কিছু নমুনা এখানে দেখব। তার আগে বলব, কবিতার মাত্রা গুনতে আমরা বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষরের মাথায় মাত্রা নির্দিষ্ট দু’টি চিহ্ন ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এখানে, অর্থাৎ কম্পিউটার কম্পোজে সে চিহ্ন দু’টি আনা যায় না। চিহ্ন দু’টি হলোÑ বদ্ধাক্ষরের ক্ষেত্রে ইংরেজি (ট) ইউ অক্ষরের মতো এবং মুক্তাক্ষরের ক্ষেত্রে (Ñ) ড্যাশ চিহ্নের মতো। ওটা যখন সম্ভব নয়, আমরা চিহ্নগুলো ছাড়াই আলোচনায় বুঝে নেবো।
প্রথমত স্বরবৃত্ত ছন্দের রূপটি বিশ্লেষণ করব। আমরা স্বরবৃত্ত-ই বলি এটাকে, তবে এ-ছন্দটিকে ছন্দবেত্তাগণ বিভিন্ন নামে বিভূষিত করেছেন। যেমন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এটাÑ বাংলা প্রাকৃত ছন্দ। আবার ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এর নাম দিয়েছেন, চিত্রা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় একে মাত্রিক বলে ডেকেছেন। আবার, ছন্দাচার্য প্রবোধচন্দ্র সেন বলেছেন, দলবৃত্ত। আর অমূল্য ধন মুখোপাধ্যায় বলেছেনÑ এটা দ্রুতলয় বা শ্বাসাঘাতপ্রধান ছন্দ। আবার দলবৃত্ত নামেও এটা বেশ পরিচিত। তবে যে যা-ই বলেন, আমরা এটিকে স্বরবৃত্ত হিসেবে বেশি চিনি।

এবার স্বরবৃত্তের কিছু নমুনা নিচে তুলে ধরছিÑ
ক. মাত্রা বিন্যাস : ৪ +৪+২
আয়রে সবুজ। আয়রে আমার। কাঁচা
আধমরাদের। ঘা মেরে তুই বাঁচা।
(সবুজের অভিযান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

খ. মাত্রা বিন্যাস : ৪ + ৪ + ৩
আমাদের এই গ্রামের নামটি। খঞ্জনা,
আমাদের এই নদীর নামটি। অঞ্জনা
আমার নাম তো। জানে গাঁয়ের পাঁচজনে-
আমাদের সই। তাহার নামটি। রঞ্জনা॥
(এক গাঁয়ে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

গ. মাত্রা বিন্যাস : ৪+৪+৪+২
বিদ্যে বোঝাই। বাবু সাহেব। চড়ি সখের। বোটে,
মাঝিরে কন,। “বলতে পারিস। সূর্যি কেন। ওঠে?
চাঁদটা কেন। বাড়ে কমে?। জোয়ার কেন। আসে?”
বৃদ্ধ মাঝি। অবাক হয়ে। ফ্যালফ্যালিয়ে। হাসে।
বাবু বলেন। “সারাজীবন। মরলিরে তুই। খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর। জীবনটা যে। তোর চারি আনাই। মাটি।”
(জীবনের হিসাব : সুকুমার রায়)

ঘ. মাত্রা বিন্যাস : ১+ ৪+ ৪+৪+৩ অর্থাৎ কবিতাটিতে ১ মাত্রার অতিপর্ব এবং তিন মাত্রার অপূর্ণ পর্ব আছে।
আজ। সৃষ্টিসুখের। উল্লাসে মোর। চোখ হাসে মোর।
বুক ভাসে মোর। টগবগিয়ে খুন হাসে
(সৃষ্টিসুখের উল্লাসে : কাজী নজরুল ইসলাম)

ঙ. মাত্রা বিন্যাস : ৪ + ৪+ ৪+ ৪
থাকবো নাকো। বদ্ধ ঘরে। দেখব এবার। জগৎটাকে
কেমন করে। ঘুরছে মানুষ। যুগান্তরের। ঘূর্ণিপাকে।
(সঙ্কল্প : কাজী নজরুল ইসলাম)

চ. মাত্রা বিন্যাস : ৪+৪+৪+১/২। এখানে অতিপর্ব নেই।। প্রথম স্তবকে ১ মাত্রার এবং অন্য স্তবকগুলোতে দ্’ুটি মাত্রার অপূর্ণ পর্ব আছে।
মা কথাটি। ছোট্ট অতি। কিন্তু জেনো। ভাই
ইহার চেয়ে। নাম যে মধুর। তিন ভুবনে। নাই।
সত্য-ন্যায়ের। ধর্ম থাকুক। মাথার পরে। আজি
অন্তরে মা। থাকুক মম। ঝরুক স্নেহ। রাজি।
রোগবিছানায়। শুয়ে শুয়ে। যন্ত্রণাতে। মরি
সান্ত¡না পাই। মায়ের মধু। নামটি হৃদে। স্মরি।
কাজী কাদের নওয়াজ

স্বরবৃত্ত ছন্দের কটা নমুনা দেয়া হলো মাত্র। স্বরবৃত্তের আছে নানা ধরণ। পর্ব, অতিপর্ব, অনুপর্ব, পূর্ণ, অপূর্ণ পর্ব ইত্যাদি এবং নানা ছোটখাটো ফ্যাকরা আছে। সেগুলো সম্ভব হলে পরে আলোচনা করব।
[চলবে]