পর্যটন এমন একটি শিল্প, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের ভ্রমণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক দ্বার উন্মোচন করে চলছে দেশী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় থেকে শুরু করে ট্র্যাভেল সংস্থাসহ আরো অনেক কিছুই এখন এই শিল্পের সাথে জড়িত। পর্যটনকে বলা হয় একটি বিস্তীর্ণ, প্রাণবন্ত, গতিশীল এবং বৃদ্ধিভিত্তিক শিল্প। এটি সরকারি এবং বেসরকারিভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে পর্যটন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুফল বয়ে নিয়ে আসছে যার মাধ্যমে একটি দেশ খুব ভালোভাবেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছে।
২০১৯ সালের প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশি^ক জিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ছিল ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ছিল গ্লোবাল জিডিপির ১০ দশমিক তিন শতাংশ। পাশাপাশি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল ৩৩০ মিলিয়ন, যা কি না ছিল প্রতি ১০টি নতুন কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি।
পর্যটন শিল্পে বিশ্বের বুকে এক অপার সম্ভাবনার নাম বাংলাদেশ। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক সব সম্পদেই সমৃদ্ধ। যুগ যুগ ধরে বিদেশী পর্যটকদের কাছে চিরসবুজ, পাহাড়-পর্বতঘেরা, নদীমাতৃক বাংলাদেশ এক স্বপ্নের দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশে রয়েছে বিশে^র সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, রয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ জালের মতো ছড়িয়ে আছে নদী। আছে সৌন্দর্যের জাদু জাদুকাটা নদী, পাহাড়ি সাঙ্গু নদী, লালাখাল। সিলেটের সবুজ অরণ্য, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, রামুর বৌদ্ধ মন্দির, হিমছড়ির ঝরনা, ইনানী সমুদ্রসৈকত, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, ভোলার চর কুকরি মুকরি, স্বচ্ছ পানির টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকনাফ সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আগামী দিনের এ রকম কয়েকটি পর্যটন স্পটের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো এখানে।
পদ্মা সেতু : পদ্মা সেতুকে ঘিরে এরই মধ্যে শিবচরের কাঁঠালবাড়ী, মাদবরেরচর, চরজানাজাত, পাঁচ্চর ইউনিয়নের নদীকেন্দ্রিক স্থানগুলো বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। এসব এলাকার সেতু, মহাসড়ক, চরাঞ্চল, নদীর পাড়, পদ্মা সেতুর জাজিরা পয়েন্টের আশপাশে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ আসছেন দেখতে; সময় কাটাতে। গত পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে দূর-দূরান্ত থেকে পদ্মা সেতু দেখতে আসা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে পদ্মা সেতুসংলগ্ন এলাকা ও চরাঞ্চল। পদ্মা সেতু ও ইলিশ মাছকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরে পর্যটনকেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা করছে জেলা প্রশাসন।
জালিয়ারদিয়া দ্বীপ : টেকনাফের জালিয়ারদিয়া দ্বীপ নাফ নদীর মাঝখানে এক খণ্ড সবুজের গালিচা। চারপাশে নীল জল। দূরে পাহাড়ের সারি। দ্বীপঘেরা কেওড়া বন। গাঙচিলের ওড়াউড়ি। বেড়ানোর জায়গা যদি এমন হয় মুগ্ধ না হয়ে কী উপায় আছে! সবুজে মোড়ানো এই সৌন্দর্য হতে পারে পর্যটন আয়ের অন্যতম মাধ্যমÑ এই চিন্তা থেকে জালিয়ারদিয়াতে আধুনিক মানের ‘টুরিজম পার্ক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া জালিয়ারদিয়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সাবরাং সৈকতের এক হাজার ১৪০ একর জমিতে বিদেশীদের জন্য হচ্ছে আরো একটি ‘বিশেষ পর্যটনপল্লী’। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশা, দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশী-বিদেশী পর্যটকরা ভিড় জমাবে টেকনাফে, যা দেশের পর্যটন আয়ের মোড় ঘোরাবে।
চর কুকরি মুকরি : ছায়াঘেরা মেঠোপথ, বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, পাকা ধানের মাঠ হয়তো দেখা যাবে এ দেশের একাধিক অঞ্চলেই। কিন্তু এ জনপদের দৃশ্যগুলো যেন একটু বেশিই সুন্দর। এ যেন আর্টপেপারে নরম তুলিতে আঁকা কোনো দক্ষ শিল্পীর ছবি। সবুজ রঙে আঁকা সেই দৃশ্যের মধ্যেই নীলাভ রঙে বয়ে চলেছে একাধিক নদী-খাল। খালগুলোই সে ছবিটিকে করে তুলেছে আরো প্রাণবন্ত। ছবির জনপদের বাস্তব বাতায়ন দেখতে চাইলে হাঁটতে হবে ছোট্ট এক দ্বীপ চর কুকরি-মুকরির পথে। চর কুকরি-মুকরির অবস্থান ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায়। যেখানে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী মিলেছে বঙ্গোপসাগরে, সেখানেই চর কুকরি-মুকরির অবস্থান। চর কুকরি-মুকরি যেতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। দৃষ্টিসীমার পুরোটা জুড়ে সবুজ আর সবুজ। ভোলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের এ অঞ্চলটি পরিচিত বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে।
চরফ্যাশন : ভোলার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা চরফ্যাশনে নির্মিত হয়েছে উপমহাদেশের সর্বোচ্চ ওয়াচ জ্যাকব টাওয়ার। ২১৫ ফুট উচ্চতার এই টাওয়ারটিতে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতার বাইনোকুলার। এই বাইনোকুলার দিয়ে ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার নানা কিছু দেখা যায় অনায়াসে। টাওয়ারের আশপাশের বনাঞ্চলে গড়ে তোলা হচ্ছে ইকোপার্ক। আঠারতলা বিশিষ্ট ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়ালেই পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদীর শান্ত জলধারা, পূর্বে মেঘনা নদীর উথাল-পাতাল ঢেউ, দক্ষিণে চর কুকরি-মুকরিসহ বঙ্গোপসাগরের বিরাট অংশ নজরে আসে।
মনপুরা : বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ ভোলা জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের সিবিচ আর হরিণের চারণভূমি খ্যাত রূপালী দ্বীপ মনপুরা। মেঘনা নদীবেষ্টিত সবুজ শ্যামল ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই মনপুরা। বিশাল নদী-নালা, চারদিকে বেড়িবাঁধ, ধানের ক্ষেত, বিশাল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের বাগানে সমৃদ্ধ মনপুরা। এখানে সকাল বেলার সূর্য যেমন হাঁসতে হাঁসতে পূর্বদিকে ডিমের লাল কুসুমের মতো উদিত হতে দেখা যায়, তেমনি বিকেল বেলায়ও আকাশের সিঁড়ি বেয়ে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে পশ্চিম আকাশে মুখ লুকায়। ভোলা জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের মনপুরা এখন নতুনভাবে গড়ে উঠেছে মনপুরা সি-বিচ। যা পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ।
হাতিয়া-নিঝুম দ্বীপ : উত্তাল সাগরের কোলে সবুজ প্রকৃতির এক মায়াবী ভূখণ্ড নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপের সৈকতে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত, চিত্রল হরিণের ছোটাছুটি আর কেওড়া, বাইন, গেওয়া বন বারবার ডাকে নিরল-নিঝুম দ্বীপটিতে ছুটে যেতে। কিন্তু ইচ্ছে করলেও থাকা-খাওয়া আর যাতায়াতের চিন্তায় অনেকেই নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ উপজেলার এই সবুজ দ্বীপে যেতে পারেন না। সব অসুবিধা দূর করে নিঝুম দ্বীপ ও হাতিয়াকে নিয়ে পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বানাতে বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশী পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটকরাও যেন ছুটে যান নিঝুম দ্বীপে, সেজন্য সরকার দ্বীপ দু’টিকে ঘিরে ইকো-ফ্রেন্ডলি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
মিঠামইন-অষ্টগ্রাম-নিকলী হাওর : বিশে^র বৃহৎ মিঠা পানির একক ‘ওয়াটারবডি’ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন-অষ্টগ্রাম-নিকলী হাওর। বলা হচ্ছে বর্ষায় অস্ট্রেলিয়া, শুকনায় নিউজিল্যান্ড। আসলে হাওর তার চেয়েও বেশি। সুন্দরে সুন্দরে পাল্লা। পানির কিনারায় বিশে^র তাবৎ পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠায় পর্যটন শিল্পের প্রাচীনতম ইকো ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি ট্যুরিজমের উত্তম তীর্থক্ষেত্র এখন হাওরাঞ্চল। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময়তার বিচারে হাওরাঞ্চল পর্যটকদের কাছে এক স্বপ্নের ঠিকানা।
টাঙ্গুয়ার হাওর : টাঙ্গুয়ার হাওর, জাদুকাটা নদী, ১০০ বিঘার শিমুল বন, হাসন রাজা মিউজিয়াম, ঐতিহ্য জাদুঘর, বারেকের টিলা, নিলাদ্রী লেক, লাউড়ের রাজবাড়ী, গৌরারংয়ের জমিদার বাড়িসহ নানা ঐতিহ্যবাহী ও দৃষ্টিনন্দন এলাকাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল পর্যটকদের কাছে দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। গত দশ বছরে প্রতি মাসেই পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে টাঙ্গুয়ার হাওর। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দল টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসছেন। মাঝে মধ্যে আসছেন বিদেশী পর্যটকরাও। বিলাসবহুল ট্রলার থাকায় পর্যটকদের অনেকেই হাওরে এখন রাতযাপনও করছেন। উপজেলা সদরে আবাসিক হোটেল থাকলেও হাওর দেখতে আসা ৯৫ শতাংশ পর্যটকই রাতযাপন করেন নৌকায়।
পঞ্চগড় : হিমালয়কন্যা হিসেবে পরিচিত দেশের সর্ব-উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যেই নয়, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জনপদের নাম পঞ্চগড়। শীতপ্রবণ এ জেলার তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যায় বিশে^র সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখের কাছে ভেসে থাকা দুর্লভ মায়াবী এ দৃশ্য যে কারোরই মন কেড়ে নেয়। বাংলাদেশ-ভারতের বুকচিরে বয়ে যাওয়া সীমান্ত নদী মহানন্দায় সূর্যাস্ত দর্শন, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, সমতল ভূমিতে গড়ে ওঠা সবুজের নৈসর্গ চা বাগানসহ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর পঞ্চগড়। এসবে যেন স্বর্গীয় অনুভূতি। মোগল আমলের স্থাপত্য মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বারো আউলিয়ার মাজার, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান বদেশ^রী মন্দির, পাথরসমৃদ্ধ রকস মিউজিয়াম, প্রাচীন ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নার, কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের আনন্দ ধারা, শিশুপার্ক, ভূগর্ভস্থ ও নদী থেকে পাথর উত্তোলন দেখলে পর্যটকদের চোখ জুড়িয়ে যাবে। হ