বাড়ির উঠোনে এসে তপু চিৎকার করতে থাকল। একটানা চিৎকার। তপুর চিৎকারে গাছগাছালির পাখিগুলো সজাগ হতে থাকল। ইতিউতি করে তপুর দিকে তাকাতে থাকল। তপুর ওদিকে একটুও খেয়াল নেই। মা মা করে ও ডেকেই চলল।
তপুর মা ভেজা হাত নিয়ে বাইরে এলো। শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বললÑ কী হইছে, এত চেঁচামেচি করস ক্যান?
: আমি গোল্ড পেয়েছি, মা।
: গোল্ড পাইছস? কোথায় পাইছস?
: স্কুলে পেয়েছি, মা।
: একদম চুপ চুপ। কাউকে বলবি না। তোরে লইয়া বড় টেনশনে আছি। সামনে তোরে কলেজে ভর্তি করাইতে অইবো। আমার দুই হাতে একটা ট্যাহাও নাই। সবাই কয় কলেজে অনেক ট্যাহা লাগে। মেলা ট্যাহা লাগে।
কী আবোল তাবোল বকছো তুমি, তপু বলে।
: আমি একটিও মিথ্যা কথা কই নাই তপু। আজ তিন দিন ধইরা আকাশ ভাঙা বৃষ্টি হইতেছে। তোর বাবা রিকশাডা বাইর করতে পারে নাই। আজ সারা দিন গ্যারেজে বইসা আকাশটার দিকে তাকাইয়া আছে। বৃষ্টি তো থামতেই চায় না বাপ।
: এক দিন সব ঠিক হয়ে যাবে, মা।
: গোল্ডটা দে, আমি লুকাইয়া রাইখা দেই।
তপু পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে। কাগজটা ও মার হাতে দেয়।
: এটা ত একটা কাগজ, গোল্ড কই?
: ওখানে গোল্ড আছে, মা।
তপুর মা কাগজটা কয়েকবার উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে, চোখের কাছাকাছি এনে দেখে, যতবারই দেখে, ততবারই হতাশ হতে থাকে।
: তুই আমার সাথে মশকরা করস, না?
: মার সাথে কেউ মশকরা করে না মা, আমিও করছি না। তবে এ কাগজের ভেতর গোল্ড আছে, এটা সত্যি, সাত সত্যি। বিশ্বাস না হলে আফাজ স্যারের কাছে যাও, আফাজ স্যার সত্যি সত্যি গোল্ড বের করে দেবে।
তপুর মা খলবলে গলায় বলল, সত্য বলছস তো?
হ্যাঁ মা, একদম সত্যি, সাত সত্যি।
আফাজ স্যার উঠোনে বসে জাল বুনছিলেন। তপুদের দেখে তিনি জালবোনা বন্ধ করলেন।
আফাজ স্যার বললেন, তোমরা মা-বেটা?
তপুর মা বলল, তপুর মাথাডা মনে হয় গুলাইয়া গেছে, আমারে কয় এই কাগজডার ভেতরে গোল্ড আছে, কাগজের ভেতরে গোল্ড থাকে আমি জনমেও শুনি নাই। তপু পাগল হইয়া যায় নাই তো কাকা?
আফাজ স্যার কাগজটা টেনে নিলেন। কাগজ দেখে তাঁর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। তিনি তপুর চোখেমুখে বারবার তাকাতে থাকলেন। তপুর মার চোখেমুখে তাকাতে থাকলেন।
আফাজ স্যার বললেন, তপু সত্যি গোল্ড পেয়েছে তপুর মা। তবে এই গোল্ড দুনিয়ার বস্তুগত গোল্ডের চেয়ে অনেক মূল্যবান। তপু এক দিন সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
: বলেন কি কাকা?
: পরীক্ষায় সবার ওপরে পাস করেছে তপু। তপু বৃত্তিও পেয়েছে। তপুর লেখাপড়ার চিন্তা এখন আর তোমাকে করতে হবে না, মাসে মাসে সরকার থেকে ও যা টাকা পাবে ওই টাকা দিয়ে তার লেখাপড়ার খরচ চলে যাবে। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছ তপুর মা?
: জে কাকা, জে জে।
রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দ হচ্ছে। তপুর মা বারবার ওদিকে কান টান টান করে রাখল।
: কার রিকশা থেকে শব্দ আসে তপুর মা?
: তপুর বাবার। তপুর বাবার টুংটাং আমি বুঝতে পারি। তপুর বাবা মনে হয় তপুর খবরটা পাইয়া গেছে। আমি যাই কাকা। কাল আবার মিষ্টি লইয়া আমু।
তপুর মা কাগজটা শক্ত করে ধরে দ্রুত হাঁটতে থাকল। পিছে পিছে তপুও।