মেঘনাপাড়ের জেলে লাল মিয়া প্রতিদিনের মতো বাজারে বিক্রয়ের জন্য আজো অন্যান্য মাছের সাথে কয়েক কেজি জাটকা নিয়ে আসে। এতে বাদ সাধে একজন জাটকা বিপণনবিরোধী নিরাপত্তাকর্মী। সরকার ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস সারা দেশে জাটকা (৩০ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশের পোনা) আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে। লালমিয়া এটি জেনেও পেটের দায়ে এ অনৈতিক কাজ করে থাকে। এতে মাঝে মধ্যেই নিরাপত্তাকর্মীর রোষানলে পড়তে হয় তাকে। লাঠিপেটা খাওয়ার পাশাপাশি জরিমানাও গুনতে হয় কালেভদ্রে। প্রায়ই মা-বাবাকে তুলে অশ্রাব্য ভাষার গালি হজম করতে হয় লাল মিয়াকে। মা-বাবাকে তুলে গালি দিলে লালমিয়ার মনটা খুবই ছোট হয়ে যায়। এমন গালি খেয়ে বিষণœ মনে বাড়িতে গেলে তার বউ তাকে প্রশ্ন করে, ‘আজ আফনের মনডা খারাপ দেহাইছে ক্যান?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে লালমিয়ার সহজ-সরল জবাব, ‘সবই কফালের ফের গো বউ, কফালের ফের।’ কিছু একটা ঘটেছে, বুঝতে পারে তার বউ। জেলে হতে পারে লালমিয়া, হতে পারে ভালো ঘরবাড়ির মালিক নয় সে। তার বউ তাই কথা না বাড়িয়ে দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা করে। আদরের ভাষায় তার বউ বলতে থাকে, ‘আমি আফনের সুখদুহের সাথি, তাই চিন্তা কইরেন না।’ চার সন্তানসহ ছয় সদস্যবিশিষ্ট টানাপড়েনের সংসারে লালমিয়া কোনো ঈদেই নতুন পোশাক এনে সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে না। প্রতিবারের মতো এবারের শীতেও মোটা কাপড়ের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বড় লোকদের কাছে হাত পাততে হচ্ছে তাকে। শীতের জামা চাওয়ায় গত বছর একজন ধনী প্রতিবেশী তাকে বলেছিলেন, ‘লালমিয়া, মাছ বিক্রি করে টাকা দিয়ে কী করো? প্রতিবারই ভিক্ষা করে জামাকাপড় কিনতে হয়?’ রসহীন এমন কঠিন বাক্য শোনা তার গা-সহা হয়ে গেছে। আগে খারাপ লাগত, এখন আর লাগে না। ধনী লোকের অপ্রিয় সে কথার জবাবে সেদিন লালমিয়া মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলেছিল, ‘ভাইজান, আফনের সমস্যা হলে আমারে শীতের কাপড় দেয়া লাগবে না নে।’ এ কথা বলে লালমিয়া দ্রুত বেগে স্থান ত্যাগ করেছিল। বংশপরম্পরায় লালমিয়া আজ জেলে। বিকল্প কোনো উপায় বের করতেও পারে না সে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত লালমিয়া মনে মনে ভাবে,
‘আমি মেঘনাপাড়ের জেলে
মাছ ধরি জাল ফেলে
সুখ আসে মাছ পেলে।’ হ
