অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের মাস এই ফেব্রুয়ারি। অনেকে বলেন, বাংলা পৃথিবীর ৫ম ভাষা, কারো কারো মতে ষষ্ঠ ভাষা। তবু একটি আত্মজিজ্ঞাসাÑ বাংলাভাষা কার? কত দূর পর্যন্ত তার ব্যাপ্তি? নতুন প্রজন্ম কি চায় মাতৃভাষাকে? বাংলা ভাষাভাষীরা যদি বাংলা বই পড়ত তাহলে বাংলা বইয়ের বাজার অনেক উন্নত দেশকেও হার মানাত। কেউ পড়–ক বা না পড়–ক তাতে কী যায় আসে। না, অনেক কিছু এসে যায়। তথ্য-জ্ঞান পেরিয়ে যাওয়া এক বিরল প্রজ্ঞার পরিচয় তো মেলে প্রতি বছর আমাদের একুশের বইমেলায়।
স্মর্তব্য, আমাদের কৈশোর ও যৌবনে বিনোদনের একমাত্র উপকরণ ছিল বই। সেসব বই তারুণ্যের স্পর্ধায় টগবগ। সেই স্পর্ধা ভাষায় ও বিন্যাসের কৌশলে চিন্তাকে উসকে দিয়ে সাজিয়ে নেয়ার আশ্চর্য কৌশল। সেসব বইতে ঘুরে ফিরে আসত-আমাদের শৈশব-কৈশোর, নিবিড় নির্জন প্রকৃতি, কখনো পার্বত্য শহর কিংবা অরণ্য, কখনো আটপৌরে গ্রামগঞ্জ কিংবা দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের বেলাভূমি। অধরা প্রকৃতির হাতছানি প্রাণ-মনকে টেনে নিয়ে যেত ঘরের বাইরে। কেটেছে কত হতভম্ব দিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু বই ভেতরের জগৎটাকে দিত আমূল বদলে, যাকে বলে মধুরেন সমাপয়েৎ! এখনো সেসব স্বর ভেসে আনে পুরনো হাওয়ায়। সে যুগের ইতিহাস বুকে নিয়ে পড়ে আছে আমাদের চল্লিক-পঞ্চাশ-ষাট দশক। সস্নেহে বলছি, আজকের নোটসর্বস্ব শিক্ষার যুগে তা প্রায় অবিশ্বাস্য।
মগজের চর্চা তো একধরনের খেলা এবং সেই খেলাটিই জীবন। সে কারণে মনের একটা জানালা খোলা থাকবে, খোলা বাতাসে শ্বাস নেয়ার জন্য, সেই জানালাটির নাম বই।
বলাবাহুল্য, শিক্ষা বিস্তারের প্রধান মাধ্যম বই। প্রাথমিক শিক্ষার উপাদান থেকে সর্বোচ্চ জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার ফসল বইয়ের পৃষ্ঠাতেই বিধৃত। বিশ্ববিখ্যাত মনীষী লিও তলস্তয় বলেছেন, জীবনের জন্য তিনটি জিনিসের প্রয়োজনÑ ১. পড়া ২. পড়া ৩. পড়া। কেননা সঞ্জীবনী সুধা আজো যে বই-বই-বই। যারা মনের জানালা বন্ধ রেখে বইয়ের প্রতি উদাসীনতা ও অবজ্ঞা দেখান তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কী বা করা যায়।
বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থকরী বিদ্যার চর্চা প্রজন্মকে সমৃদ্ধি দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে যেন এক অন্তঃসারশূন্য সমাজের সৃষ্টি হচ্ছে। অবশ্য পাঠ্যপুস্তক পড়া বাধ্যতামূলক। এখানে কিন্তু বই পড়ার অর্থ- সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই। পত্রপত্রিকাও নয়। দরকার মানববিদ্যা নির্ভর উপযুক্ত মূল্যবোধের শিক্ষার প্রসার। অধুনা শিক্ষিত যুবসম্প্রদায় অবসর বা অবকাশ পেলে ‘স্মার্টফোন’ অথবা টিভি খুলতেই বেশি আগ্রহী, বই পড়া নয়। এখন আবার টেলিভিশনের চেয়ে স্মার্টফোনের প্রভাব অনেক বেশি। বই পড়তে চায় এমন যুবক-যুবতীর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। অবসর পেলে ঘুমাতে চায়। এটি হলো যুবসম্প্রদায়ের বাসনা বা ইচ্ছার কথা। যুবসমাজকে বইমুখী করার কী নিদান তা তো জানা নেই। বইবিমুখ, এই প্রবণতার অভিমুখ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কীÑ তাও বলতে পারি না। কেননা বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ইনটারনেট এবং বৈদ্যুতিন মাধ্যম। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোবাইল ফোনের নামও উল্লেখ করা যায়।
তবে সত্যিকারের বই পড়ার ক্ষেত্রে ছবিটা তত নৈরাশ্যজনকও নয়। কেউ কেউ সময় পেলে বইটিই পড়ে। সেটা পড়ার বই বা অন্যতর বই যাই হোক। কেউ কেউ বই পড়তে বসে মাসে একবার কী দু’বার। আবার কেউ অফিসের কাজে ফাঁকি দিয়ে বই পড়ে।
বর্তমানে কম্পিউটারের কল্যাণে টেক্সটের সাথে হাইপারটেক্সটের জড়িয়ে যাওয়া এক বিপ্লব বৈকি! সেটা হলো ই-কাগজ আর ই-কালিতে ছাপা ‘ই-বই’। কয়েক বছর হলো উন্নত দেশগুলোতে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ‘ই-বইটির’ কোনো বাস্তব কলেবর নেই। এটি একটা ডিজিটাল সত্তা। ‘ই-বই’ প্রকাশনা, ছাপা বই প্রকাশনার সমান্তরাল ক্রমেই বাড়ছে। ই-পৃষ্ঠায় যে মেমোরি থাকে তাতে অনেক বই ধরে রাখা যায়। ব্যাপারটা একটা ছোটখাটো লাইব্রেরির সাথে ঘুরে বেড়ানোর মতো। দুষ্প্রাপ্য বইও ইন্টারনেটে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
কিন্তু কম্পিউটারে বই পড়া অসম্ভব না হলেও খুব সুখকর নয়। একটানা পড়া তো বেশ কঠিন। যে প্রক্রিয়ায় কম্পিউটারে হরফ ফোটে, ছবি ফোটে তা চোখের পক্ষেও ভালো নয়। বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা বেশ কষ্টকরই বটে। অবশ্য এ প্রযুক্তি কেবল আমাদের দেশে নয়, বিদেশেও তেমন ছড়িয়ে পড়ছে না। কারণ কাগজে পড়ার অনুভূতির সাথে পাল্লা দেয়ার মতো সূক্ষ্মতায় এটি পৌঁছাতে পারেনি।
তবে যে যাই বলুক, সময় কাটানোর জন্য উপন্যাস পড়া কালের নিয়মেই যেন দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যদিও বইয়ের বাজারে উপন্যাসিকদের খাতির এখনো সর্বাধিক। কিন্তু পাঠ-অভিজ্ঞতা আমাদের বলে দেয়, বেশির ভাগ বই-ই শিল্পরসহীন একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর। ভেতরের আবেগের জায়গাটাকে মানে ‘আমি’-কে সেভাবে ছুঁতে পারে না। অন্য দিকে ছাপার ভুলের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ‘র’ ও ‘ড়’-এর কোনো তফাত থকে না। ‘বই পরা’ আর ‘জামা পড়া’-র মতো ভুল হামেশাই দেখা যায়।
ইদানীং অবশ্য বিদেশী লেখকরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। তাদের উপন্যাসে যেন গবেষক সত্তা এসে মিশে যাচ্ছে লেখক-সত্তায়। নতুন প্রজন্মের পাঠক স্বাগত জানাচ্ছেন এসব উপন্যাসকে। নতুন পাঠকদের জন্য ঝুঁকি নিতে জানা এমন নতুন সাহিত্যিকেরও আবির্ভাব ঘটছে নিয়ত। কারো কারো রচনা যেন মাটির জীবনগাথা। ভূগোল, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর উপাখ্যান; যা কেবল ভেবে ভেবে পড়তে হয়। কোথাও কোথাও কবিতার অনিশ্চিত যাত্রা যেন আয়ত্ত করছে নব্য উপন্যাস।
আসলে ভাষার উন্মেষ যেখানে হয় না, স্বচ্ছ ভাবনার উন্মেষও সেখানে অধরাই থেকে যায়। বই তো শূন্যতার বিরুদ্ধে জয়, চোখ ঝলসানো রঙিন তাৎক্ষণিকতার বিরুদ্ধে জয়।
দেশে দেশে এখনো মুদ্রিত গ্রন্থের ভবিষ্যৎ ও প্রয়োজনীয়তা যখন উচ্চ চূড়ায়, তারই মধ্যে গত শতকের শেষ দশকে হঠাৎ শোনা গেল, ছাপাখানা ও প্রকাশনা নির্ভর বইয়ের দিন শেষ হয়ে আসছে, গ্রন্থবিহীন সব রকম রচনা এখন প্রকাশের দায়িত্ব নিচ্ছে কমপিউটার। গ্রন্থের মৃত্যু সম্পর্কে এমন সতর্কবাণী এখনো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। কেননা মুদ্রিত বইয়ের সংখ্যা একটুও কমছে না।
যারা নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সে রকম অনেক মানুষের কাছে এখনো প্রিয় লেখকের বই অনেক বেশি প্রিয়। নিরালায় বসে একটি কাব্যগ্রন্থ বা উপন্যাস পাঠের যে আনন্দ, তা কখনো কমপিউটার থেকে পাওয়া যেতে পারে না। আমাদের বাংলাভাষায় অদূর ভবিষ্যতে কম্পিউটারের আগ্রাসনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, কেননা আমরা আজো গ্রন্থলোকের অনন্ত আকাশের নিচে দাঁড়াই!
লেখক : গীতিকার কবি সাংবাদিক