সত্তর দশকের মাঝামাঝি, স্বাধীনতার পাঁচ কি ছয় বছর পর, তার জীবদ্দশাতেই প্রকাশিত হয়েছিল আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) এর প্রবন্ধসঙ্কলন ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা স্বাধীনতা’। সময়ের প্রেক্ষাপটে নানান অবয়ব অবকাঠামোয় কষ্টার্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা আর্থসামাজিক রাজনৈতিক নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুদীর্ঘ দিনের আন্দোলন সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে রক্তক্ষয়ী শত সহস্র আত্মত্যাগ এর বিনিময়ে অর্জিত হয়। কঠিন দামে কেনা সেই স্বাধীনতাকে সংহত করতে, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রান্তরে স্বাভাবিক বাধা-বিপত্তি, সংশয় ষড়যন্ত্র সন্দেহে আবুল মনসুর আহমদ বিস্ময় বোধ করছিলেন, বর্ষিয়ান রাজনীতিক ও ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারিক সমকালীন পত্রপত্রিকায় ও তার নিয়মিত লেখা কলামে তার অভিমত ও পরামর্শ রেখেছিলেন। সেসব লেখার সঙ্কলন এই গ্রন্থ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এসে আমরা অবশ্য দেখছি, সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে সক্ষম হয়ে উঠছে। আর ১০টা উদীয়মান অর্থনীতির মতো বাংলাদেশেরও জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের, স্বনির্ভর-স্বয়ম্ভর হতে নিরন্তর সংগ্রামে তাকে থাকতেই হচ্ছে। কেননা সামাজিক, মানব উন্নয়ন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সবল এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক সমস্যা সামলানোয় সক্ষমতা অর্জন ব্যতিরেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থবহ, নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়ন অভিমুখী করা যায় না।
২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। স্বাধীনতা যেকোনো জাতির পরম আকাক্সিক্ষত বিষয়। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ, গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ গঠন, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, জানমালের নিরাপত্তা বিধান, ধর্ম পালন, নিজস্ব সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-বিশ্বাসের অবারিত চর্চা নিশ্চিত করা ইত্যাদি সাধারণ জাতীয় আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিটি জাতির জন্য অপরিহার্য। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয় এবং বিশ্ব মানচিত্রে অস্তিত্বময় হয় বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শুধু স্মৃতিচারণ নয়, জাতির জীবনে স্বাধীনতাকে অর্থবহ, তাৎপর্যময় করে তোলার প্রয়াস প্রচেষ্টা ও প্রত্যয় গ্রহণের প্রসঙ্গটিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা অর্জন যত কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করা তার চেয়ে বেশি কঠিন। চলমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট, করোনায় বিধ্বস্ত বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি নানাভাবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ সমুপস্থিত।
বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্জন একেবারে কম না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল, ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে আমাদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, বাস্তবতার আলোকে তা বলার সময় এখনো আসেনি। বৈষম্যবিহীন আচরণ, দল, মত বিশ^াস নির্বিশেষে সবার প্রতি সহনশীলতা, ধৈর্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ মেলে। সন্ত্রাশ, সংঘাত-সহিংসতার পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় নিতে বা দিতে হচ্ছে। রাজনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সেবাধর্মী মনোভাব মনোভঙ্গির সংস্কার এখনো উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশের পর্যায়ে।
স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য বেশি প্রয়োজন সংগ্রাম ও শক্তির। প্রয়োজন প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য ও ন্যায়বোধ। স্বাধীনতাকে নির্মল করতে জ্ঞান, বুদ্ধি, শিক্ষা ও সৎ বিবেচনাকে কাজে লাগানো একান্ত অপরিহার্য। মূলত যথেষ্ট সচেতন ও সঙ্ঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হয় এবং সদা সতর্ক থাকতে হয়। তাই স্বাধীনতার মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য মনে করা উচিত।
বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো পেতে চেয়েছিল, যা কতগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করবে। নাগরিকদের মধ্যে সেগুলো নির্বিঘœ চর্চার পরিসর তৈরি করবে। সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে যেসব আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না বলেনই সে রাষ্ট্র টেকেনি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠী তার ইতিহাসে একটি অনন্য ও অভিনব বাস্তবতা তৈরি করে। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য এক দিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে অভিষিক্ত করে, অন্য দিকে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে পাওয়া সেসব আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার এক কঠোর দায় আরোপ করে এবং অবারিত সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ তাই একাধারে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা। স্বর্ণজয়ন্তীতে এসে সময় হয়েছে, মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাওয়া সেসব আদর্শ ও স্বপ্নের দিকে আরেকবার ফিরে তাকানোর এবং সে আলোকে ভবিষ্যতের দিকে এগোনোর প্রত্যয় গ্রহণের। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের দুই দশকের আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে, যুদ্ধ দিনে আত্মোৎসর্গের পেছনের মধ্যে নিহিত হয়ে আছে সেসব আদর্শ, মূল্যবোধ আর স্বপ্ন যা সবাই পরম মমতায় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে অনুভব করে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র মধ্যে সেসব আদর্শ, মূল্যবোধ আর স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে যত পর্যালোচনা হবে সেটি ততই সবার কাছে স্পষ্টতর হয়ে উঠতে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে আদর্শগুলো ধারণ করে আছে, তার শুরুর দিকেই আসে মুক্তি, বাঙালিত্ব, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য বিলোপ বা সাম্য ও মানবাধিকার।
প্রথমত মুক্তি। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার কিছু দিন যেতে না যেতেই বাঙালির মোহভঙ্গ হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল শক্তি ছিল পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানের জনসমর্থন। নব্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে শুরু থেকেই তারা অপরিসীম বঞ্চনার শিকার হলো। এই বঞ্চনাবোধের প্রথম প্রকাশ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। সেই যে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলো সাধারণ মানুষ, তা আর ছিন্ন হলো না। ১৯৫০-এর দশক থেকে ৬০-এর দশক পর্যন্ত মুহুর্মুহু আন্দোলনে এক মুক্তির আকাক্সক্ষা গেড়ে বসতে লাগল মানুষের মনে। শুরুতে উঠল স্বাধিকারের দাবি। অচিরেই সেটি ধাবিত হলো স্বাধীনতার দাবির দিকে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রও। মুক্তিযুদ্ধের সেটি মহত্তম অর্জন। কিন্তু ১৯৭১ সালের সর্বজনযুদ্ধকে নাম েিদয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ। কেননা সে জনযুদ্ধে স্বাধীনতার দাবির পরিসর আরো বেড়ে গিয়েছিল। ধারণা হিসেবে ‘মুক্তি’ শব্দটির ভাব আরো ব্যাপক। মুক্তি মানে মানুষের সার্বিক বিকাশের মুক্তি। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোতে নবতর আকাক্সক্ষা ও অভাবের জীবনে অধিকাংশ মানুষ হয়ে ওঠে এমন নুড়িপাথর, যার কাছে শ্যাওলা ও শেকড়ের গন্ধময় হারানো জীবনটি বর্জ্য বৈ কিছুই নয়। লোভ ও ভোগের আবর্তে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার অনুসন্ধানের স্পৃহা, নিজের অজান্তে সে হয়ে ওঠে ক্ষমতাবানদের ক্রীড়নক এবং ভোগবাদী সমাজের পণ্য। যে আত্মজিজ্ঞাসা আদিম দর্শনের উদ্ভব ঘটিয়ে থাকে তা হয়ে ওঠে দূর চিন্তার বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর সব হারিয়ে মানুষগুলো একাকী বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ববাদী চিন্তায় যেমন মগ্ন হয়েছিল, তেমন চিন্তায় আধা সামন্তবাদী এ দেশের মানুষ আবিষ্ট না হলেও জীবনের প্রয়োজনে, স্বার্থের অনুপ্রেরণায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী হয়ে ওঠে। বিবাদের সময় যেসব মানুষ ইতিবাচক চিন্তা ও বিশ্বাসের মাঝে মুক্তি খুঁজেছিল, তাদের কেউ কেউ বিকৃত ও অসুস্থ চিন্তা এবং ততোধিক বিকৃত নাস্তিক চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ে। সর্বোপরি প্রাধান্য পায় স্বার্থচিন্তা ও ভোগবাদ। অধিকাংশ মানুষ ভোগবাদী সমাজের ক্রীড়নক ও খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। অদূরদর্শী চিন্তার কারণে গভীর চিন্তাগুলো ও আত্মার মৌলিক জিজ্ঞাসাগুলো গৌণ হয়ে ওঠে।
বাঙালিত্ব। দেশ ভাগের আগ পর্যন্ত নানা কূট রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ‘বাঙালি’ ধারণাটির সঙ্গে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের যোগসূত্র স্থাপিত হতে পারেনি। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর পূর্ব বাংলার সেই জনগোষ্ঠীই তার রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে বাঙালিত্বের ধারণাটিকে আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। রক্ত দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল বাংলা ভাষার দাবি। ১৯৬০-এর দশকজুড়ে রাজনীতির পাশাপাশি যেসব সাংস্কৃতিক সংগ্রাম চলে, তাতে অনেক কঠিন পথে বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা পায়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বাঙালিত্বের সেই জাতিগত স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা সম্পূর্ণতা পায়। কিন্তু স্বাধীন দেশের মাটিতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উপাদানের সঙ্গে এ ধারণার স্বাস্থ্যকর সমীকরণ হতে সময় লেগেছে। এ নিয়ে আরো কিছুটা পথ যেতে বাকি।
এরপর গণতন্ত্র। পাকিস্তানের প্রায় পুরোটা সময়জুড়ে আমাদের সব সংগ্রামের পেছনে ছিল মূলত গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়ার তৃষ্ণা। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাতে এসেছিল সেই ঘোষণা। বিশেষ করে উল্লেখ্য ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথা। নির্বাচনে ভূমিধস জয় পাওয়া সত্ত্বেও নানা ছলে আওয়ামী লীগকে সরকার পরিচালনার প্রাপ্য গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। সেই গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে হলো। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য এ নির্বাচনী বিজয়ই দিয়েছিল এক অনন্য নৈতিক ভিত্তি।
এবার অসাম্প্রদায়িকতা। উপমহাদেশ ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল ধর্মরাজনীতিতে সঙ্কীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত ইসলাম। পাকিস্তান রাষ্ট্রধারণার সে ব্যহারের বিপরীতে ধর্মীয় সীমারেখার বাইরে পূর্ব বাংলায় ভাষানির্ভর একটি অসাম্প্রদায়িক জনঐক্য গড়ে ওঠে। ১৯৬০-এর দশকের ব্যাপক সাংস্কৃতিক আন্দোলন অসাম্প্রদায়িকতাকে সে চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তবে স্বাধীনতার পর অসাম্প্রদায়িকতার বচন বহুধায় বাহুল্যতায় সনাতন ধ্রুপদী বৈশিষ্ট্য বলকেই বিতর্র্কিত করে তোলে। অসাম্প্রদায়িকতার ভাবাদর্শেই অনুপ্রবেশ ঘটে সাম্প্রদায়িক আচার আচরণ। বৃহত্তর চাওয়ার মাঝে যে ক্ষুদ্র চাওয়া এবং সঙ্কীর্ণ চিন্তাগুলো চাপা পড়েছিল সেটাই স্বাধীনতার পর মুখ্য হয়ে ওঠে। এতে গৌণ হয়ে ওঠে সর্বজনীন স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিসত্তার মর্যাদা। শক্তি ও ঔদ্ধত্যের কাছে পরাভূত হয় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা; গৌণ হয়ে ওঠে শান্তির অন্বেষণ। যে আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে দর্শনের চিন্তাগুলো আবর্তিত হয় তা ক্ষতবিক্ষত হওয়ার কারণে গঠনমূলক দর্শন তৈরি অসম্ভব হয়ে ওঠে। এটি ঠিক, শূন্যতার মাঝে, নাস্তির মাঝে দর্শনের বিকাশ ঘটতে পারে, যেটা হয়েছিল ইউরোপে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। সেটি না হয়ে স্বাধীনতা-উত্তর সমাজে শূন্যতা, হতাশা, নৈরাজ্য ও ক্ষমতার ঔদ্ধত্য বা সঙ্ঘাত-সহিংসতার নেতিবাচক দর্শনের চর্চা শুরু হয়। পশ্চাৎপদ চিন্তা ও মনের শূন্যতা মৌলবাদী কর্মের পথকে সুগম করে দেয়। বিচারের প্রতি, জীবনের প্রতি এবং সামগ্রিক জীবনের ইতিবাচক প্রবাহের প্রতি আস্থা হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত জাতি কেবল আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে নয়, অস্তিত্ব সঙ্কটেও নিমজ্জিত হয়। জীবনের সংগ্রাম এবং অসম প্রতিযোগিতায় নি¤œবর্গের মানুষ সব হারিয়ে শেকড়ছাড়া, গৃহছাড়া অনিকেত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
বৈষম্যবিলোপ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর পশ্চিম ও পূর্ব অংশের মধ্যে নানা বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। এই দুই অংশে খুব স্পষ্টভাবে দুই বিপরীতমুখী অর্থনৈতিক কর্মসূচি অনুসরণ করা হয়। রপ্তানিতে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও দেশের পূর্ব অংশে বিনিয়োগ হয়া কম। বড় ও ভারী শিল্পকারখানা প্রায় সবই গড়ে তোলা হয় পশ্চিম অংশে। পূর্ব অংশের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অর্থনীতির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে পশ্চিমের অল্প কয়েকটি ধনাঢ্য পরিবার। সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে দেখা দেয় কোটার ব্যাপক বৈষম্য। এই পরিস্থিতির প্রকাশ ঘটে দুই অর্থনীতির তত্ত্বে।
বাঙালিদের স্বপ্নভঙ্গ এর রাজনৈতিক প্রতিফলন দেখা যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের দেয়া ছয় দফায়। ছাত্রদের ১১ দফা দাবিতে এই বৈষম্য ঘোচানোর দাবি আরো স্পষ্ট রূপ পেল। স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে মিলেমিশে গেল বৈষম্যবিলোপের আকাক্সক্ষা। সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে এখন দেখা যাচ্ছে বৈষম্য বেড়েছে ব্যাপকভাবে সমাজে সর্বত্র। উদ্ভাবিত লুটেরা অর্থনীতি বদলে দেয় সমাজ চিন্তা এবং রাষ্ট্রের দর্শন। যাপিত জীবন, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়, জীবনের নানা আকাক্সক্ষাসহ সাধারণের অর্থবিত্ত ও সম্পদের যে কাঠামো মানুষের দর্শন ও মূল্যবোধ নির্মাণ করে, সেই স্থানটি একটি চূড়ান্ত স্খলনের মুখে পড়ে। প্রতিটি যুদ্ধই মানুষের স্মৃতি, অনুভব ও বোধকে এমনভাবে নাড়া দেয় যাতে তার চিন্তার উপাদান ও অলিগলি সবই বদলে যায়। এ কারণে কখনো সে শতবর্ষ এগিয়ে যায় বোধের ভূমিতে, আবার কখনো পিছিয়ে যায় হাজারও বছর। যুদ্ধের ধ্বংস, আঘাত এবং চাপিয়ে দেয়া অনিকেত জীবন মুছে ফেলে মানুষের চিন্তার ভূমি; কখনো হারিয়ে যায় কয়েকটি প্রজন্ম।
সব শেষে মানবাধিকার : ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গড়িয়ে আসা লড়াই ও মুক্তিযুদ্ধের পুরোটাই এক অর্থে মানবাধিকার অর্জনের সংগ্রাম যার রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংস্কৃতিক সত্তা চর্চার অধিকার, ধর্মপালনের অধিকার, মত পোষণ ও প্রকাশের অধিকার। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান আগাগোড়াই এর বিরোধী ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধে ঘটে এর হিংগ্রতম প্রকাশ। পুরো নয় মাস ধরে অত্যšত প্রকটভাবে মানবাধিকার পদদলিত করা হয়। আর্চার ব্লাডের ভাষায়, যুদ্ধের সময় তারা চালিয়েছিল ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শ লালনের জন্য আওয়ামী লীগ-সমর্থক ও কমিউনিস্টদের এবং ধর্মবিশ্বাসের কারণে হিন্দুদের ওপর। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে দেশে মানবাধিকারের আকিঞ্চন আকাক্সক্ষা এখনো আকাক্সক্ষা ও দাবির পর্যায়ে রয়ে গিয়েছে বলে মনে হবে। মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সর্বোপরি মুক্তির স্পৃহা যা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় জনমনে সংহতি নির্মাণ করেছিল, যে গুণাবলি দেশের জন্য শীর্ষ ত্যাগে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তার অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় স্বাধীনতার পরপর। এর একটি বড় কারণ হলো যুদ্ধের সময়টায় যে জনগণ অর্থবিত্তের সঙ্গে সম্পর্কহীন ও শেকড়বিহীন অবস্থায় মনোজাগতিক ভূমিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিল, স্বাধীনতার পরপর তারা ভৌগোলিক ভূমি ও অর্থবিত্তকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়। এতে যে মঙ্গলময় চিন্তা ও আকাক্সক্ষা আপন আত্মার ক্ষুদ্র বলয়কে ছিন্ন করে ব্যক্তিকে সর্বজনীন আবর্তে নিয়ে গিয়েছিল তা স্বাধীনতার পরপর যেমন ছিন্নপত্রের মতো ভেসে যায়, তেমনি বাস্তবতার চাপে স্বার্থান্ধ চিন্তার আবর্তে ব্যক্তির শুদ্ধ অবস্থান ও মূল্যবোধ গভীর অতলে হারিয়ে যায়। যে প্রেম ও মানবতা নানামুখী ভেদজ্ঞানকে নিম্নপর্যায়ে এনে বেদনার বাঁধন মাঝে মানবসত্তাকে সমুজ্জ্বল করেছিল, সেই প্রত্যক্ষ বেদনা নি¤œস্তরে নেমে আসায় বহিরাগত শত্রু অলক্ষ্য ছায়ামানুষ হয়ে ওঠে আর আপন মানুষগুলোই স্বার্থের টানাপোড়েনে নতুন শত্রু হয়ে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে যে নষ্ট চিন্তা, মৌলবাদী দর্শন এবং পশ্চাৎপদ চিন্তা অন্তরে ধারণ করে শত্রুপক্ষ বাঙালি নিধনে মত্ত হয়েছিল, গণহত্যার মতো নিকৃষ্ট কাজে ব্যাপৃত হয়েছিল, সেই দর্শন ও ঘাতকের বাণীকেই অনেকে আপন করে নেয়। যে নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় ঘাতক নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছিল, যে পৈশাচিক বিকারগ্রস্ত চিন্তাকে আপন করে নিয়ে বাঙালি নিধন কর্মকে সহজ করে নিয়েছিল, ওই কর্ম ও চিন্তাকে জনগণের একটি অংশ মনোজগতে আপন করে নিয়ে নিজ অস্তিত্ব ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নেয়।