কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। আমাদের বিদ্রোহী কবি। আমাদের স্বপ্ন বড় করে তোলার কবি। তিনি দরদি হৃদয়ে শিশুদেরকে উপলব্ধি করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি চির শিশু, চির কিশোর’। তার মধ্যে একটা শিশুসুলভ সারল্য ছিল। মন ছিল শিশুর প্রতি আশ্চর্য সংবেদনশীল। অতি সহজে শিশুদের সাথে একাত্ম হতে পেরেছেন। শিশুর স্বপ্ন, সাধ, আশা-আকাক্সক্ষার স্বপ্ন বুনতেন। কীর্তি-কলাপ, খেলাধুলা, ঠাট্টা-তামাশা ইত্যাদিতেও দারুণ মজার লেখা উপহার দিতেন।
শিশুর জগৎ মাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। শিশুর সব জিজ্ঞাসা, মান-অভিমান, আদর-আবদার মার কাছেই। মার কাছেও শিশু যেন চির রহস্যময়। যেমন- শিশু অবাক বিস্ময়ে মাকে প্রশ্ন করেÑ
‘মাগো! আমায় বলতে পারিস/কোথায় ছিলাম আমি /কোন না জানা দেশ থেকে তোর/কোলে এলাম নামি?/মাও শিশুকে ভালোবেসে উত্তর দেয়Ñ /তুই যে আমার, এই তো সেদিন/আমার বুকে ছিলি!
হ্যাঁ, তিনিই নজরুল। কী সুন্দর সাবলীলভাবে মা ও শিশুর কথোপকথন করেছেন। সেই সাথে মধুর ও আন্তরিক সম্পর্কের উজ্জ্বল রঙ ফুটিয়ে তুলেছেন। এতেই ক্ষান্ত হননি! শিশুকে জাগিয়ে তোলার কৌশলও জানতেন তিনি। লিখেছেনÑ
ভোর হলো দোর খোলো খুকুমনি ওঠরে
ঐ ডাকে জুঁই শাখে ফুলখুকী ছোটরে
শুধু কী জাগানো! ভেতর থেকে জাগ্রত হয়ে কল্পনা করার দিগন্তও উন্মোচন করেছেন! দুচোখেও জাগিয়েছেন স্বপ্ন। তাই শিশু কল্পনার আকাশে উড়ে যেতে চায় সূর্যি মামার আগে! তার শিশুসুলভ ভাষায়Ñ
আমি হবো সকাল বেলার পাখী/সবার আগে কুসুমবাগে/উঠবো আমি ডাকি।
শিশু এভাবে স্বপ্ন আর কল্পনা করতে করতে আবিষ্কার করে নিজের জগৎ। সে জগতে গিয়ে আর ঘরে থাকতে চায় না। এমন চিত্র তুলে ধরেছেন আমাদের প্রিয় কবি নজরুল। তাই তো শিশু সমস্ত জগতকে হাতের মুঠোয় পেতে সাহস পায়! সে কথাটা বলেছেন এভাবেÑ
থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে/দেখবো এবার জগতটাকে/
কেমন করে ঘুরছে মানুষ/যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে...
এ ছাড়া শিশুকে দুরন্তপনা ও চাঞ্চল্য করে গড়ে তুলতেও তার জুড়ি নেই। এই শিশুসুলভ চাঞ্চল্য স্বভাবে লিখেন ‘লিচু চোর’। এটি লিখেছেন কুমিল্লায় থাকাবস্থায়! সেখানের দৌলতপুর গ্রামের আলী আকবর খান ছিলেন কলকাতার স্কুল পাঠ্যবইয়ের প্রকাশক। নজরুলের সাথে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। আকবর আলী নজরুলকে সেসময় শিশুদের ছড়া-কবিতা লিখে শোনাতেন। কিন্তু সেসব কিছুই হতো না বলে নজরুল নিজেই শিশুদের নিয়ে লেখার জন্য ভাবতে শুরু করেন। এ সময়ই তিনি লিখলেন শিশুদের জনপ্রিয় মন মাতানো কবিতা ‘লিচু চোর’। বস্তুত ‘লিচু চোরের’ মতো অভিনয় উপযোগী কবিতা বাংলা শিশুসাহিত্যে খুবই বিরল। এ কবিতার আবৃত্তি শুনে পাঠক বা দর্শক এক অনাবিল হাস্যরসে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। কবিতাটি নাটকীয় গুণে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। একটু বলার লোভও সামলাতে পারছি নাÑ
বাবুদের তাল-পুকুরে/হাবুদের ডাল-কুকুরে/সে কি বাস করলে তাড়া,/বলি থাম একটু দাঁড়া।/পুকুরের ঐ কাছে না/লিচুর এক গাছ আছে না...
কুমিল্লøা কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পরিবারের সাথেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই পরিবারের ছেলে-মেয়ে দুলি, বাচ্চি, জটি, লক্ষ্মী, বাচ্চু, রাখলু এদের সাথে নজরুল একেবারে শিশুর মতোই। এ সময় ‘ছোট খুকি’, ‘কাঠবিড়ালী, ‘মা খোকার গল্প বলা’, ‘খোকার বুদ্ধি’ প্রভৃতি বিখ্যাত ছড়া কবিতা লিখেন। ঝিঙে ফুলের কিছু কবিতা নজরুলের দৌলতপুর কান্দিরপাড়ের জীবনেই লেখা। এ ছাড়া ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি ঘুম দিয়ে যেয়ো/বাটা ভরা পান দেবো গাল ভরে খেয়ো/ঘুম আয় রে, দুষ্ট খোকা ছুঁয়ে যা,/চোখের পাতা লজ্জাবতী লতার মতো নুয়ে যা,/ ঘুম আয়রে, ঘুম আয় ঘুম তার ব্যাপক জনপ্রিয় শিশুতোষ কবিতা। শুধু ছড়া বা নাট্যধর্মী কবিতা রচনা করেননি, নাটিকাও রচনা করেছেন। যেমনÑ পুতুলের বিয়ে। শিশুদের জন্য এ নাটিকাটি খুব উপভোগ্য।
নজরুলের আট বছর বয়সে বাবা মারা যান। তখনই ভীষণ বিপদে পড়ে যান নজরুল। তিনি নিজেই ইমামতি শুরু করেন। পরে মক্তবে শিক্ষকতা, তাতেও সংসারে কষ্ট! যোগ দিলেন লেটুর যাত্রাগানে। করেছেন আসানসোলের কয়লাখনি হোটেলে কাজ। তাতেও নজরুলের সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। জমি-জায়গা কিছুই ছিল না তাদের। এসব দুঃখ পাওয়া ছোটবেলায় তার নাম রাখা হয়েছিল দুখুমিয়া। এই দুখুমিয়া কিন্তু বড় হয়ে আর দুখি থাকেননি। কবি হয়ে জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করলেন। তিনিই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এই মাসের ২৪ মে তার ১২২তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ।
১৯৭৬ সালের (১৩৮৩-এর ১২ ভাদ্র) ঢাকার পিজি হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার কবরস্থান রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে। আর হ্যাঁ, মসজিদের পাশে থাকার জন্য তিনি একটি দোয়া করেছেন। সেটাই যেন কবুল হয়েছে। সেই দোয়াটা এখনো সঙ্গীত প্রিয়দের সেরা গান। আর সেটি হলোÑ
মসজিদেরই পাশে আমায় / কবর দিও ভাই... হ