সকালের ঝলমল রোদ আর বাগানের ফুটে থাকা ফুলগুলো যেনো হৃদয় ছুঁয়ে নেয় আসলাম সাহেবের। বাড়ির সামনে বেশ বড়োসড়ো একটি ফুলের বাগান। এই ফুলের বাগান করাতে আসলাম সাহেবের স্ত্রীই বেশ বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছেন। অবসর সময়গুলোতে দু’জন মিলে বাগানের দেখাশোনা করেন। নিজেদের হাতে লাগানো ফুল গাছের ফুল দেখতে যেনো বেশ আনন্দ লাগে দু’জনের। মাঝে মাঝে তাদের একটি মাত্র মেয়ে সুহেলিকে নিয়ে বিকেলে বাগানের দোলনায় বসে আলাপচারিতা সময় কাটায়। কখনও কখনও ঘুরে ঘুরে ফুল দেখায় মেয়েকে। মেয়ের বয়স সাত বছর। এবার প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। বেশ চঞ্চল। বিকাল হলেই নিজে নিজে বাগানে ঘুরে ঘুরে প্রজাপতি আর ফড়িং দেখে। মেয়ের নাম সুহেলি হলেও বাবা-মা আদর করে মেয়েকে খুকি নামেই বেশি ডাকে। একদিন বিকালবেলা মা-বাবা খুকিকে নিয়ে বাগানে ঘুরতে বের হলেন। আসলাম সাহেব আর তাঁর স্ত্রী দোলনায় বসে আলাপ করছেন আর এদিকে খুকি বাগানে ঘুরছে আর প্রজাপ্রতি দেখছে। হঠাৎ খুকির চোখে পড়ে একটি বড় প্রজাপতি বাগানে খুব আনন্দে উড়ছে আর ফুলে ফুলে বসছে। খুকি প্রজাপতিটি দেখে খুশি হয়। প্রজাপতিটি ছিল অন্যান্য প্রজাপতি থেকে একেবারেই আলাদা। প্রজাপতির গায়ে ছিল শত বাহারি রঙ আর কারুকাজ। খুকি ভাবল, এটি মনে হয় প্রজাপতিদের রানী। তাই এত সাজুগুজো করে উড়ে বেরাচ্ছে। খুকি প্রজাপতির পেছনে ছুটতে লাগলো। আর মনের আনন্দে খেলতে লাগলো।
খুকিদের বাড়ির পাশেই ছিল তনিদের বাড়ি। তনি হচ্ছে খুকির সহপাঠী। তনিদের বাড়িতেও একটি ফুলের বাগান আছে। যা আসলাম সাহেবের বাগান করা দেখেই তনির বাবা বাগানটি করে। শুক্রবার দিন বিকালবেলা খুকি বাগানে বের হয়ে দেখল বড় রানী প্রজাপতিটি নেই। খুকির বেশ মন খারাপ হয়ে গেলো। সে দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা আজ না আমার বড় প্রজাপতিটি বাগানে নেই। সে কোথায় গেলো মা? বলো না। মা বলল, আসবে অপেক্ষা করো। প্রজাপতি তো যেখানে ফুল পায় সেখানেই উড়ে। হয়তো অন্য কোথাও গিয়েছে। চলে আসবে আবার। যাও বাগানে গিয়ে দেখো আসছে কি না? খুকি বাগানে গিয়ে দেখে এখনো আসেনি। আরো মন খারাপ করে চুপ করে দোলনায় বসে থাকে। প্রজাপতিটির জন্য কান্না করতে থাকে। মা কান্নার আওয়াজ শুনে বাগানে এসে দেখে খুকি কাঁদছে। মা চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, তুমি অপেক্ষা করো, দ্যাখবে চলে আসবে। খুকি মাথা উঁকিয়ে এদিক সেদিক দেখতে থাকে। হঠাৎ চোখে পড়ে একটি বড় গোলাপ ফুলের পাশে উড়াউড়ি করছে। এই দৃশ্য দেখে খুকি যারপর নাই খুশি হলো। কাছে গিয়ে মন ভরে দেখতে লাগলো প্রজাপতিটিকে। খুকি প্রজাপতিকে প্রশ্ন করল, কোথায় ছিলে তুমি? তোমাকে খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান হয়ে গেছি। জানো, তোমাকে না দেখলে আমার ভালো লাগে না। তুমি এই বাগানে সব সময় থাকবে। তুমি কোথাও যাবে না। তুমি শুধু আমাদের বাগানে উড়বে আর সব ফুলের মধু খাবে। প্রজাপতি বলল, ছোট্ট বন্ধু- আমি যেখানে ফুল পাই সেখানেই উড়ে বেড়াই। ফুল আমাকে কাছে টানে। তাই যেখানেই ফুল দেখি সেখানেই উড়ে যাই। তোমাদের পাশের বাড়ির তনিদের বাগানে ছিলাম এতক্ষণ। তোমাদের মতো তাদের বাগানের ফুলগুলোও খুব মিষ্টি। তাই সেখানে উড়তে গিয়ে দেরি হলো। খুকি প্রজাপতির কথা শুনে বলল, না তুমি শুধু আমাদের বাগানে উড়বে অন্য কোথাও যাবে না। তোমাকে না দেখলে আমার ভালো লাগে না। খুকির কথা শুনে প্রজাপতি নাচতে থাকে আর বলতে থাকে ঠিক আছে খুকি প্রতিদিন বিকেলে আমি তোমার সাথে দেখা করে যাবো। তবে সব বাগানেই যে আমাকে যেতে হয়। এ নিয়ে মন খারাপ করো না। খুকি এ কথা শুনে খুব খুশি হয়। সে দিন থেকে প্রজাপতিটি প্রতিদিন বিকেলে খুকিদের বাগানে উড়তে আসে। আর খুকি বিকেল হলেই প্রজাপতির জন্য অপেক্ষা করে। খুকি আর প্রজাপতির মধ্যে নানান কথাবার্তা হয়। বন্ধুত্ব গড়ে উঠে দু’জনের। প্রজাপতির সাথে সময় কাটানোর বিষয় নিয়ে রাতে মায়ের সাথে বেশ গল্পও হয় খুকির। মা খুকির কথাশুনে আর মুগ্ধ হয়। ভাবে মেয়েটির বেশ কল্পনা শক্তি আছে। বড় হলে সে ভালো গল্পকারও হতে পারে। এভাবেই প্রতিদিন খুকির বৈকালিক সময় কাটে প্রজাপতির সাথে ঘুরে ঘুরে আর ফুলেদের সাথে আড্ডা দিয়ে।
