ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকার। গলা পর্যন্ত চাদর জড়িয়ে মা বসে আছেন। মায়ের মুখ ঢাকা। আবছা অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। অথচ তিনি যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন সেটা আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি। মা এমন করে কখনো কাঁদেন না। তিনি খুব শক্ত ধরনের মেয়ে। কায়দা করে কান্না লুকাতে পারেন। একদিন কী হয়েছে, বসার ঘরে সবাই গোল হয়ে বসে গুরু আলাপ করছে। মা, মাঝপথে মন খারাপের মতো করে কেঁদে উঠলেন। অবশ্যি কেউ বুঝতে পারেনি। বাবা শুধু মাথায় হাত দিয়ে বললেন, কাঁদে না! কাঁদে না! মা চুপ করে গেলেন।
কিন্তু আজ কী জন্য যে মা কাঁদছেন সেটা আমি জানি না। তার চোখের কোল বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে। যেন শ্রাবণের একটানা বর্ষণ শুরু হয়েছে মার চোখে। আমি বললাম, ‘মা! অমন করে কেঁদো না তো! দেখো না বাড়িতে কত মানুষজন গিজগিজ করছে।’
মা আরো করুণ স্বরে কেঁদে আমাকে জাপটে ধরলেন।
‘খুকি! দেখ, তোর বাবা খাটিয়ায় কী সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে।’
আমি অবাক হয়ে বাবাকে দেখলাম। বাবা চমৎকার একটা সাদা জামা পরেছে। দাড়িগুলো পরিপাটি করে সাজানো, গোঁফে কেয়ারি। গা থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ আসছে। অথচ এ গন্ধটা বাবার শরীরে আগে ছিল না। পৃথিবীর সব মেয়েরই হয়তো বাবার শরীরের একটা চেনা জানা গন্ধ আছে। যেটা আমি সচরাচর বাবার বুকে শ্বাস নিয়ে অনুভব করি। কিন্তু এ গন্ধটা আমার কাছে খুব অপরিচিত মনে হলো। মরা কান্নার মতো মায়া ধরানো এক ধরনের ভটকা গন্ধ।
আমি মাকে বললাম, ‘মা! বাবার যে ঘুমুতে কষ্ট হচ্ছে! শব্দ করে ঘুমায় বলে তুমি বাবার নাকে তুলো দিয়েছ তাই না?’
মা কিছু বললেন না। শুধু কাঁদতে থাকলেন। একটানা অসহ্য শব্দ। আমার ভালো লাগে না। নিজের মাঝে খুব অস্বস্তি অনুভব করি।
বাহিরে অনেক মানুষের কোলাহল। দিনের এক চিলতে রোদ যেন পোষা বেড়ালের মতো বাবার খাটিয়ার পাশে পড়ে আছে। আমার খুব খারাপ লাগল। এলার্জির মতো কি একটা যেন আছে বাবার শরীরে, সেজন্য তিনি কখনো গায়ে রোদ মাখতে পারতেন না। আমার মনে হলো আমি ওড়নাটা নিয়ে বাবার উপর মেলে ধরি। কিন্তু মা আমাকে বারবার জাপটে আঁচলে চোখ মুছলেন।
‘খুকি! দেখ, তোর বাবা সবার কাঁধে কাঁধে চড়ে বেড়াচ্ছে! কী সুন্দর তাই না!’ মা পাগলের মতো করে বললেন।
আমার মন খারাপ হলো। বাবা আমাকে কাঁধে না নিয়ে সবার কাঁধে কাঁধে চড়ে বেড়াচ্ছে, সেজন্য আমি মুখ গোমড়ার মতো করলাম।
আমি বললাম, ‘মা! বাবা এত অভিমানী কেন?’
‘কই অভিমানী?’
‘ওই যে সবার কাঁধে চড়ে লা ইলাহা ইল্লাহু পড়তে পড়তে চলে যাচ্ছে। আমাদেরকে তো নিলেন না?’
‘আমরাও একদিন যাবো রে খুকি! মন্টু, তুই, সবাই মিলে আমরা একদিন যাবো।’
‘মন্টুকে না নিলে হয় না মা! ও যে ভারি দুষ্ট।’
‘বাবা রাগ করবে না বুঝি? মন্টুকে দেখতে চাবে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে ওকেও নিয়ে যাবো।’
‘ভারি মজা হবে তাই না মা?’
‘হ্যাঁ, অনেক মজা হবে।’
‘আচ্ছা মা আমরা কোথায় যাবো?’
‘কেন, তোর বাবার কাছে।’
‘বাবা কোথায় গেছে?’ আমি চোখে কৌতূহল ফুটিয়ে প্রশ্ন করলাম।
মা আবার গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলেন। মানুষের এক প্রকার কান্না আছে, যা দেখলে নিজের মাঝেও কষ্ট অনুভূত হয়, সে ধরনের কান্না। আমি মায়ের চোখের জল মুছে দিলাম।
মা বললেন, ‘তারাদের দেশে রে খুকি! তারাদের দেশে।’
আমি আনন্দে অবাক হলাম। স্কুলের বইতে সাত ভাই চম্পা নামে তারাদের কত যে গল্প পড়েছি, সেখানে আমার বাবা থাকে। ভাবতেও আমার বড় আশ্চর্য লাগে। অথচ আমার স্কুল সহপাঠী বন্ধুরা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না, আমার কথা শুনে তারা মুখ নিচু করে থাকে। মনে করে আমি কিছু বুঝতে পারি না। ভারি অহঙ্কারী তারা।
মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ির সামনে চাঁদের অপূর্ব আলো হয়। নরম তুলতুলে আলোয় উঠানে নানারকম নকশা কাটে। দিগন্ত ছোঁয়া আকাশে তারাদের ঝিলিমিলি মেলা বসে। আমি চারদিকে স্বপ্নের মতো তাকিয়ে থাকি। বড় ভালো লাগে আমার। ভাবী, একদিন চলে যাবো তারাদের দেশে। তারপর বাবার বুকে সেঁটে থেকে আমি নির্ণয় করব ওই গন্ধটা কিসের! মরার! না বেঁচে থাকার! কিন্তু মায়ের ওই অবিরাম কাঁদাটা আমাকে এক প্রগাঢ় বেদনায় আচ্ছন্ন করে নেয়। আমি তাকে আর বুঝাতে পারি না। হ