দুপুর বেলা। শফি স্কুল থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। একটা মোটরসাইকেল তাকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়। মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর সবার আগে মাকে মনে পড়ে। সেই ছোটবেলায় মা তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই থেকে সে বাবার কাছে থাকে। বাবা তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। কখনো বুঝতে দেয় না যে তার মা নেই। অথচ যখনই সে কোনো বিপদে পড়ে তখনই তার সবার আগে মাকে মনে পড়ে।
সকালবেলা। কেবিনের অপর বেডে ঘুমোচ্ছেন বাবা। রাত জেগে ক্লান্ত তিনি। সে মাকে ফোন করে বলে, ‘মা আমি এক্সিডেন্ট করেছি। তুমি কি একটু হাসপাতালে আসতে পারবে? আসতে পারবে না, না? আমি তোমার কেউ না?
সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার কান্নার শব্দ শুনে বাবা জেগে ওঠেন। তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কাঁদিস না বাবা? আমি তো আছি। আমি তোকে খুব ভালোবাসি। তুই আমার সাত রাজার ধন।’
নার্স অবাক হয়ে বলল, ‘ওর মা ওকে ভালোবাসে না স্যার। ছেলের এত বড় বিপদের কথা শুনেও আসতে পারবেন না? এ কেমন মা স্যার? অথচ আমার সামান্য কিছু হলে আমার মা সারারাত জেগে বসে থাকেন। খুব ছোটবেলায় বাবা মারা যান। শুধু আমার কথা ভেবে মা আর।’
‘জানো ওর মাও ওকে খুব ভালোবাসত?’ বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।
‘ভালোবাসতো? তার মানে এখন আর ভালোবাসে না? বড় অদ্ভুত মা স্যার?’ নার্সের চোখে মুখে বিস্ময়।
শফি বাম হাতের তালুতে ডান হাত দিয়ে ঘুষি মারে। মুখ টিপে হাসে। বাবা হাই তুলতে তুলতে বললেন, ‘হুঁ খুব অদ্ভুত মা বটে। আমাকে ব্যাংকে যেতে হবে। আচ্ছা এখন কয়টা বাজে?’
নার্স বাম হাতের কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে বলল, ‘৭টা বেজে পাঁচ মিনিট।’
ঠিক আছে, এখন তুমি যাও। প্রয়োজন হলে তোমাকে ডেকে নেবো।’
নার্স কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যায় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফিরে আসে, ‘স্যার একটা প্রশ্ন করব?’
‘হ্যাঁ করো’। বাবা জানালার পর্দা সরাতেই ঘরে আলো ঢোকে। বাইরে তাতানো রোদ উঠেছে।
‘মানে স্যার ওর মা এখন আর ওকে ভালোবাসে না কেন? উনি কী তাহলে আপনাদের ছেড়ে চলে গেছেন? নার্স ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পায়চারি করে।
‘হুঁ ’। বাবা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়েন এবং মোছের তলায় মুচকি হাসেন।
‘কি সাঙ্ঘাতিক! কিন্তু... ।’
বাবা গলা খাকারি দিয়ে বললেন, ‘আসলে কী হয়েছে নার্স। ওর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন ও আমি আর ওর মা মানে আমরা তিনজন মিলে বান্দরবান বেড়াতে গিয়েছিলাম। টানা ১৫ দিন বেড়ালাম। সেবার প্রচুর মজা করেছিলাম। কে জানত...।’ বাবার গলা ভারী হয়ে আসে।
‘ও তারপর।’ নার্সকে খুব কৌতূহলী মনে হলো। সে একটা টুল টেনে বসে।
‘ফেরার পথে ঝড় বৃষ্টির কবলে পড়লাম। পাহাড়টি আঁকাবাঁকা ধরে খুব সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করছিলাম। ওর মা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। হঠাৎ একটা গাছের সাথে ধাক্কা লেগে গাড়ি উল্টে যায়। আশ্চর্য হলেও সত্যি, আমার আর ওর কোনো ক্ষতি হলো না। কিন্তু ওর মা স্পটেই মারা যায়।’ বাবা কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যান। তার চোখে জল।
‘বুঝতে পারছি। সরি শফি সরি।’ নার্সও কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যায় ।’
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কল্পনায় মাকে দেখে। কোনো এক পার্কে মার হাত ধরে হাঁটছে। মা তাকে বেলুন কিনে দেন। হঠাৎ হাত ফসকে বেলুনের সুতো বেরিয়ে যায়। বেলুন আকাশে ওড়ে। এ রকম কল্পনা প্রায় করে সে। হ