রাহি ও রিয়া দুই ভাইবোন। তাদের ফ্লাটটি ১০তলা অ্যাপার্টমেন্টের আটতলায়। আজ ছুটির দিন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর রাহি ও রিয়াকে বারবার ঘুমাতে বললেন তাদের মা। কিন্তু কিছুতেই ঘুমাচ্ছে না দু’জনের কেউ। অতঃপর কখন যেন ক্লান্ত দেহে অবসাদ নেমে এলো তার। ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। বাবা আজ বাসায়। কিশোর ছেলেমেয়ের মনের অবস্থা তিনি খুব দরদ দিয়ে বুঝতে পারেন। তিনি ঘুমাননি একটি কথা ভেবে। ছেলেমেয়ের চোখে ঘুম নেই। বাইরে যাওয়ার জন্য ওদের মন কেমন ছটফট করছে। ইতোমধ্যে রাহি বাবার কাছে ছুটে এলো।
বাবা শুনছ? রাস্তায় পাখিওয়ালা ডাকছে।
ছেলের মুখপানে চেয়ে বাবা বললেন...
তো! কি করব এখন?
আমাকে একটা ময়না পাখি কিনে দেবে?
তোমার মা তোমাকে আস্ত রাখবে না। আমাকেও বকা দেবে।
দাওনা বাবা একটা পাখি কিনে। আমার খুব শখ একটা ময়না পোষার। পাশে দাঁড়িয়ে রিয়া। এটা তারও মনের কথা।
আসলে ময়না পাখি পোষার শখ রাহির বাবারও ছিল। কিন্তু তার মা তাকে লেখাপড়ার বাইরে কিছুই করতে দেয়নি। তার মায়ের একটা ধারণা ছিল ভালো রেজাল্ট ও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে লেখাপড়া ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না। আর মায়ের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস কোনোদিন হয়নি রাহির বাবার। মনের শখ মনেই রয়ে গেছে। এ জন্য হয়তো আজ প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হতে পেরেছেন তিনি। কিন্তু কিশোর বয়সের সেই শখ অধরাই রয়ে গেল।
বাবা কিছু বলার আগেই রাহি বারান্দায় গিয়ে ডাকতে শুরু করল।
পাখিওয়ালা! এই পাখিওয়ালা!
আটতলা থেকে লিফটে নামতে আজ বড্ড সময় নিচ্ছে বলে মনে হলো তার।
ছেলেমেয়ের শখের কাছে আজ বাবার কঠোরতা ও অর্থ হার মানল।
ঘুম থেকে জেগে উঠে মা দেখলেন বারান্দায় খাঁচায় ঝুলছে ময়না পাখি। তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠার আগেই রাহি ও রিয়া দুই ভাইবোন একসাথে বলে উঠল আমাদের বকবে না। বাবা কিনেছে। তার পর কিছুটা ঝড় উঠলেও তেমন লণ্ডভণ্ড হয়নি। কারণ ঘরের চার সদস্যের তিনজনই চুপ।
শুরু হলো ময়না পাখির যতœ। সে কি আর থামে?
রাহির বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন কলা নিয়ে আসেন। ময়না পাখির সব চেয়ে প্রিয় খাবার কলা। ভাত, পাউরুটি পাকা ফল ময়না পাখি খেতে খুব ভালোবাসে।
তবে মা ও এখন শান্তিতে আছেন। ছেলেটা এখন আর রোদে ক্রিকেট খেলতে যায় না। ফর্সা ছেলেটা ক্রিকেট খেলে খেলে কেমন কালো হয়ে গেছে। রিয়াও এখন আর মাকে আগের মতো বিরক্ত করে না। মায়েরও একটা অস্ত্র হাতে এলো। লেখাপড়ায় কোনো গাফিলতি করতে পারে না ছেলেমেয়েরা।
দেখতে দেখতে ময়না পাখিটা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। এখন আর খাঁচা থেকে বের হওয়ার জন্য আগের মতো ছটফট করে না। রাহির মা লক্ষ করলেন, ইদানীং ময়না পাখিটা একেবারে চুপচাপ থাকে। ঠাণ্ডা মাথায় কি যেন ভাবে। একেবারে চুপ। ময়নাটা যদি মরে যায়? সেই ভয়ে মা খাঁচার দরজাটা খুলে দিলেন। অমনি ময়না পাখিটা দ্রুত করে উড়ে চলে গেল। শুরু হলো দুই ভাইবোনের কান্নাকাটি। সে কি আর দেখার মতো? ছেলেমেয়ের বাড়াবাড়ি দেখে মা রেগে বললেন...
তোমরা কি জানো? বনের মুক্ত পাখি খাঁচায় বন্দী করে পুষতে হয় না। পাখির কাজ আকাশে ওড়া। ওকে খাঁচায় বন্দী করে রাখার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে? এ জন্য বন্যপ্রাণী আইনে তোমরা অপরাধী। আর কোনোদিক পাখি খাঁচায় বন্দী করার কথা মনে আনবে না। তোমাদের যদি ছোট্ট একটা ঘরে বন্দী করে রাখি থাকতে পারবে? কতদিন থাকতে পারবে?
আর কোনো কথা বলার সাহস হলো না রাহি ও রিয়ার। তিন দিন গোপনে নীরবে কেঁদেছে দু’ভাইবোন।
সেদিন সন্ধ্যায় শোনা গেল রাহি পড়তে বসো। রিয়া পড়তে বসো। যথারীতি মায়ের ভয়ে পড়তে বসল তারা। বাবার বাসায় ফিরতে ৭টা বাজে। বাবা বাসায় এলে শোনা গেল...
বাবা আসছে বাবা আসছে। দুই ভাইবোন তো অবাক! কে বলল এই কথা? দৌড়ে মায়ের কাছে গেল মা তুমি কিছু শুনেছ?
হ্যাঁ, শুনলাম তো? তোরা বললি বাবা আসছে।
আমরা বলিনি মা!
তবে কে কথা বলছে?
কিন্তু ময়না তো নেই!
সবাই দৌড়ে বারান্দায় গেল। অবাক কাণ্ড! আরামে খাঁচায় দুলছে ময়না পাখি।
হ্যাঁ, আসলেই ময়নাটা ফিরে এসেছে। মা তার নাম দিলেন সোনার ময়না পাখি।
অবশেষে সবাই জেনে গেলো রাহিদের ময়না পাখি ফিরে এসেছে এবং কথা বলছে। এখন সে সব কথা বলতে পারে।
সে এখন বলছে
সোনার ময়না পাখি। বাবা এসেছে। রাহি পড়তে বসো। রিয়া পড়তে বসো।
মাঝে মধ্যে হেসে ওঠে হা- হা- হা-।
রাহিদের ঘরে এখন আনন্দের বন্যা। ময়না পাখিটা আর কখনো এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায়নি। পরিবারের সদস্য হয়ে বাস করতে লাগল রাহি ও রিয়ার সাথে।
রাহির বাবা মাঝে মধ্যে ময়নার সাথে কথা বলেন। আর ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন ওর আচরণ। সে খুব আনন্দি হয়েÑ মনে মনে বলেন সত্যি ময়না পাখির অনেক গুণ।