অনেক দিন আগের কথা। হরিপুর রাজ্যের রাজা ছিল কেতাব আফতাব। তাঁর রাজ্যের শাসন নিয়ম ছিল অন্য রাজ্যের থেকে অনেকটা ভিন্ন। সেই রাজ্যের প্রজারা থাকতো রাজপ্রাসাদে আর রাজা ও রানি থাকতো ছোট্ট কুঁড়েঘরে। এই রাজ্যের কে রাজা আর কে প্রজা সেটা অন্য রাজ্যের মানুষ বুঝতেই পারতো না।
-রাজা ও প্রজাদের সাথে মাঠে-ঘাটে কাজ করতো। প্রজারা বারণ করলে রাজা কেতাব আফতাব বলে, ‘কাজ করলে কেউ ছোট্ট হয় না।’ বরং কাজ করলে শরীর ও মন সুস্থ থাকে। রাজার এমন মিষ্টি আচরণে সবাই মুগ্ধ হতো। হরিপুর রাজ্যের প্রজাগণ রাজা কেতাব আফতাবকে খুব শ্রদ্ধা করতো।
Ñ হরিপুর রাজ্যের আরেকটা প্রথা প্রচলিত ছিল সেটা হলো এই রাজ্যের রানি ধারা এই রাজ্যের কর্মধারা চলতো। রানি যা বলতো সেটা অনুযায়ী রাজা ও প্রজারা কাজ করতো। হরিপুর রাজ্যের প্রতি বছর একটা সাঁতারের আয়োজন করা হতো।
সেই সাঁতারে যে প্রথম স্থান অর্জন করতো তাকে সবাই একবছরের জন্য এই রাজ্যের রাজার আসন দেওয়া হতো। এবং যে নারী ভোর সকালে সবার আগে রাজার মাথায় রাজ মুকুটসহ দেখবে সেও এই রাজ্যের একবছরের জন্য রানি হয়ে যাবে।
Ñ এমন প্রথা দেখে অন্য রাজ্যের রাজা ও প্রজারা বিস্মিত হয়ে যেতো। সবাই বলতো আজব রাজার আজব দেশ। এই আজব রাজ্যের আজব প্রথা জীবনে কখনো কেউ শোনেনি। তবে এটা ভেবে সবাই খুশি হতো যে এই রাজ্যের রাজা আর প্রজার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। প্রতি বছর কেউনা কেউ রাজা হওয়ার সুযোগ পেতো।
Ñ একদিন হঠাৎ করে এই রাজ্যে অশান্তির ছায়া নেমে আসলো। এক দুষ্টু রাক্ষস মানুষের বেশে এসে এই সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে এই রাজ্যের রাজা হয়ে গেল। কিন্তু সে রাজা হয়ে সব শাসনমালা নিজের মতো করে সাজালো। রাজ্যের প্রজাদের ওপর খুব অত্যাচার করতো। এজন্যই কেউ ভয়ে কিছু বলার সাহস দেখাতো না। রাজ্যের লোকজন বাধ্য হয়ে এই রাক্ষসের দাস হয়ে রাক্ষসের কথা মতো কাজ করতো। যেহেতু রাক্ষস এখন রাজ্যের রাজা।
Ñ রাক্ষস রাজা হওয়ার বেশ কিছু দিন পর থেকে আবার মানুষের মতো মাংস পোলাও খেতে লাগলো। যতদিন যায় ততই রাক্ষস মানুষের সাথে ওঠাবসা করতে শুরু করলো। একসময় রাক্ষসের রাক্ষসী ভাব ধীরে ধীরে বিলোপ হয়ে যেতে লাগলো, এটা সবাই লক্ষ্য করল। এক সময় রাক্ষস সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতে লাগলো। প্রজাদের খোঁজ খবরও নিতো। অনাহারীর মুখেও খাবার তুলে দিতো।
Ñ রাক্ষস মনে মনে ভাবতে লাগলো আমি তো রাক্ষস তাহলে আমি মানুষের প্রতি এতো উদারতা কেন দেখাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সে ক্লান্ত।
রাক্ষসকে এখন সবাই মনে প্রাণে রাজা মেনে নিতে লাগলো। রাজা কেতাব আফতাবও রাক্ষসের এমন পরিবর্তন দেখে সে নিজে খুশি হয়ে রাজমুকুট পরিয়ে রাক্ষসকে রাজা স্বীকৃতি দিলো।
Ñ একদিন রাক্ষসের খোঁজে তার সঙ্গী উদ্ভর রাক্ষস এলো। সে দেখে তার সঙ্গী কর্কট রাক্ষস মানুষের সাথে চলাফেরা করছে। উদ্ভর রাক্ষস ডেকে কর্কট রাক্ষসকে বলে কী রে কোন আজব দেশে আসলাম। যেখানে রাক্ষসের সামনে মানুষ আসতে ভয় পায় সেখানে তোকে একটুও ভয় পায় না ব্যাপার কী?
Ñ কর্কট রাক্ষস উদ্ভর রাক্ষস দেখে বলে কী রে এখানেও চলে এলি? সে বলে আমি আসতে চাইনি তোর মা আমাকে তোর খোঁজে পাঠিয়েছে। কর্কট রাক্ষস বলে, ‘এসে ভালোই করেছিস আয় আমার রাজ্যে! উদ্ভর রাক্ষস বলে, ‘তোর রাজ্য মানে? তোর রাজ্য তো মোগল রাজ্যে।’ কর্কট বলে, ‘এটাও আমার রাজ্য। উদ্ভর বলে কিভাবে কী হয়েছে বলো তো কর্কট?’
Ñ কর্কট রাক্ষস তার বন্ধু উদ্ভর রাক্ষসের কাছে সব খুলে বলল। কর্কট রাক্ষস বলে দেখনা বন্ধু আমি জানি কেমন পাল্টে গিয়েছি। আমি মানুষদের ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারি না। উদ্ভর রাক্ষস বলে, ‘এই পরিবর্তনের কারণ তুই মানুষের সাথে থাকতে থাকতে মানুষের প্রভাব তোর ওপর পড়েছে তাই তুই বদলে গিয়েছিস। কথায় আছে না-
সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস,
অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।
তুই মানুষের ভালো সঙ্গ পেয়ে ভালো হয়ে গেছিস। তাই সবার উচিত ভালো সঙ্গ বা ভালো বন্ধু বেছে নেয়া।
তোর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে। তাহলে তোর যদি মনে হয় এখানে থাকলে অনেক ভালো থাকবি তাহলে তুই এখানেই থাক।
