আল্লাহ তায়ালা এ পৃথিবীকে সাজিয়েছেন তাঁর অসংখ্য সৃষ্টি দ্বারা। এসব সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি হলো মানুষ। এ মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন সেরাদের সেরা অসংখ্য নবী-রাসূল। তাঁরা আল্লাহ তায়ালা কর্র্তৃক মনোনীত। তাঁদের জীবন-ব্যবস্থা ওহি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাঁদের শিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। আর তাঁরা হলেন উম্মতের শিক্ষক। তাঁদের জীবনচরিত উম্মতের জন্য হিদায়াতের আলোকবর্তিকা। এ হিসেবে সাইয়্যেদুল মুরসালিন, রাহমাতুল্লিল আলামিন, খাতামুন নাবিয়্যিন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনচরিত উম্মতের জন্য অনুকরণীয় মডেল। কেননা, পবিত্র কুরআন ও ইসলাম তাঁর জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর জীবনচরিত জানা ব্যতীত কুরআন ও ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়।
আগমন : আরবদের কাছে একটি স্মরণীয় বছর হলো আমুলফিল তথা হস্তির বছর। তারা বলত আমুলফিলের দু’বছর আগে অমুকের জন্ম হয়েছিল, অমুকের বিয়ে হয়েছিল, আমুলফিলের ১০ বছর পর অমুক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। আমুলফিল হলো ওই বছর যে বছর বাদশাহ আবরাহা হস্তিবাহিনী নিয়ে আল্লাহর ঘর ধ্বংস করতে এসেছিল। যার বর্ণনা রয়েছে সূরা ফিলে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আপনি কি দেখেননি যে, আপনার রব হস্তি অধিপতিদের কিরূপ (পরিণতি) করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেননি? আর তিনি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পক্ষীকুল। যারা তাদের উপর প্রস্তর কঙ্কর নিক্ষেপ করেছে। অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দিয়েছেন’ (সূরা ফিল : ১-৫)। এ ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ৪০ দিন পর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার বিশ্বনবী সা: পৃথিবীতে আগমন করেন।
নাম : মহানবী সা: মুহাম্মদ ও আহমদ এ দুই নামে সর্বাধিক পরিচিত। দুনিয়াবাসী রাসূল সা:কে চিনে মুহাম্মদ নামে, যে নাম রেখেছেন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব। কুরআন মাজিদে মুহাম্মদ সা: এ নামটি শুধুু চেনার জন্য চার জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতে, সূরা আহজাবের ৪০ নং আয়াতে, সূরা মুহাম্মদের ২ নং আয়াতে এবং সূরা আল ফাতাহের ২৯ নং আয়াতে। আর পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থে তিনি আহমদ হিসেবে পরিচিত, যা উল্লেখ করা হয়েছে সূরা আসসফের ৬ নং আয়াতে। মুহাম্মদ অর্থ প্রশংসিত, আর আহমদ অর্থ প্রশংসাকারী। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছদ্মনামেও ডেকেছেন। যেমনÑ হে কম্বল আচ্ছাদিত! (সূরা মুদ্দাচ্ছির-১), হে বস্ত্রাবৃত! (সূরা মুযযাম্মিল-১) ইত্যাদি।
শিশুকাল : মহানবী সা:-এর জন্মের কয়েক মাস আগে তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন এবং জন্মের ছয় বছর পর মা আমিনা ইন্তেকাল করেন। অতঃপর তিনি হয়ে যান পিতা-মাতাহীন একজন অসহায় শিশু। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে রাসূল! আল্লাহ তায়ালা কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি আপনাকে আশ্রয় দান করেছেন। তিনি কি আপনাকে পথহারা পাননি? অতঃপর সৎ পথের সন্ধান দিয়েছেন। তিনি কি আপনাকে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি অভাবমুক্ত করেছেন’ (সূরা আদ দুহা : ৬-৮)।
পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবে তাঁর স্বীকৃতি : পূর্ববর্তী সব আসমানি কিতাবে শেষ নবীর স্বীকৃতি রয়েছে। সব নবী-রাসূল তাদের উম্মতকে শেষ নবীর আগমন বার্তা দিয়েছেন এবং তাঁর গুণ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা উম্মি রাসূলের আনুগত্য করছে তারা (ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা) তাঁর বর্ণনা নিজেদের কাছে (বিদ্যমান তাওরাত ও ইঞ্জিলে) লিখিত পাচ্ছে’ (সূরা আরাফ-১৫৭)। আমাদের নবীর আগে প্রেরিত হয়েছেন হজরত ঈসা আ:। তিনি তাঁর উম্মতকে শেষ নবীর আগমন বার্তা দিয়েছেন। স্মরণ করো, যখন মরিয়ম তনয় ঈসা আ: বলল, ‘হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদেরকে এমন একজন রাসূলের সুসংবাদ দিচ্ছি যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম মুহাম্মদ (সূরা আসসাফ-৬)।
রিসালাতের স্বীকৃতি : আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজিদের অসংখ্য আয়াতে মহানবী সা:-এর রিসালাতের স্বীকৃতি দান করেছেন। যেমনÑ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সত্যসহ সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনরূপে প্রেরণ করেছি এবং আপনি জাহান্নামবাসী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবেন না’ (সূরা আল বাকারা-১১৯)। আরো ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে মানবমণ্ডলীর জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করেছি; আর (এ ব্যাপারে) আল্লাহর সাক্ষীই যথেষ্ট’ (সূরা নিসা-৭৯)। অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘এভাবে আমি আপনাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির প্রতি, যার আগে বহু জাতি গত হয়েছে, তাদের কাছে আবৃত্তি করার জন্য, যা আমি আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি; তবুও তারা দয়াময়কে (আল্লাহকে) অস্বীকার করে’ (সূরা আর-রাদ-৩০)। আরো ইরশাদ করেন, ‘আমি তো আপনাকে শুধু সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি’ (সূরা বনি ইসরাইল-১০৫)। আরো ইরশাদ করেন, ‘হে নবী! আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী হিসেবে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে’ (সূরা আল-আহজাব-৪৫)। আরো বলেন, ‘আমি তো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’ (সূরা সাবা-২৮)। আরো ইরশাদ করেন, ‘আপনি অবশ্যই রাসূলদের অন্তর্র্ভুক্ত’ (সূরা ইয়াসিন-৩)।
প্রস্থান : সব নবী-রাসূল দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ হিসেবে আমাদের প্রিয় নবীর বিদায়ের ঘোষণা ও কুরআন মাজিদে আগাম দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর মুহাম্মদ একজন রাসূল বৈ তো নয়। তাঁর আগেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা পশ্চাৎপসরণ করবে’ (সূরা আল ইমরান-১৪৪)? আরো ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও (তোমাদের শত্রু-মিত্র সবার) মৃত্যু হবে’ (সূরা আল জুমার-৩০)। আরো ইরশাদ করেন, ‘আপনার আগেও কোনো মানুষকে আমি চিরস্থায়ী করিনি’ (সূরা আম্বিয়া-৩৪)। মহানবী সা: একাদশ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার চাশতের সময় ৬৩ বছর বয়সে এ ধরা থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।
আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের জন্ম ও ওফাতের তারিখ একই দিন নির্ধারণ করেছেন। যাতে উম্মত তার জন্ম দিবসকে আনন্দ-উল্লাসের দিবস হিসেবে নির্ধারণ করতে না পারে। হ