বন্ধ দু’চোখের তারায় স্থির; মক্কার ধুধু মরুর সৌন্দর্য, হেরা পর্বতের রূপ-ঐশ্বর্য এবং হৃদয়জুড়ে আঁকা বদর প্রান্তের বালুকণা স্পর্শ করে ছুটে চলা হাবিবে রাসূল এর সাকার নামের সেই ধূসর বর্ণের ঘোড়ার বিমুগ্ধ চিত্র। হৃদয়ের গহীনে যেন চোখের খুব কাছে এই তোÑ সেই খেজুর বৃক্ষময় বুলন্দ শহর মদিনা, যেখানে হাবিবে রাসূলের আগমনকে ‘তলাআল বাদরু’ সুরের মূর্ছনায় স্বাগতম জানানো হয়েছিল। স্বাগত সে মিছিলে সাকিয়ে কাউসার রাসূলুল্লাহ সা:-এর শান্ত উপস্থিতি কিংবা খন্দকের যুদ্ধে তীব্র খিদের যাতনায় পেটে পাথর বাঁধার সেই দৃশ্য শুধু সে হৃদয়েই অনুভূত হয়, যে হৃদয়ের প্রতিটি কোণা রাব্বুল আলামিন নবীজীর ভালোবাসার আবরণে পূর্ণ করে দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেÑ এ ভালোবাসা জন্মানোর প্রধান মাধ্যম সিরাতুন নবী। আরবি ভাষার বিখ্যাত অভিধান ‘মিসবাহুল লুগাত’-এ সিরাত শব্দের অর্থ উল্লেখ করা হয়েছেÑ কর্ম-নৈপুণ্যগতি, পথ, পদ্ধতি, ধারা, আকার ইত্যাদি অর্থে।
মহানবী সা:-এর মূল সিরাত হলো, তার বিশাল হাদিসভাণ্ডার। তবে প্রাথমিক যুগের মনীষীদের মতে রাসূল সা:-এর সরাসরি অংশগ্রহণ করা যুদ্ধসমূহ এবং রাসূল কর্তৃক প্রেরিত যুদ্ধাভিযানসমূহের সমষ্টিকে সিরাত বলে। বরং তাদের মতে সিরাত হলোÑ সিরাত, আদব, তাফসির, আকাইদ ইত্যাদি আটটি বিদ্যার সমষ্টির নাম। সে হিসেবে সিরাত ইলমে হাদিসের একটি অংশ। তবে এখনকার সময়ের পণ্ডিত মনীষীরা সিরাত বলতে মহানবী সা:-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিতকে বুঝিয়েছেন।
সিরাত চর্চায় প্রথম পর্যায় : ইসলামের পঞ্চম খলিফা হিসেবে খ্যাত হজরত ওমর ইবনে আবদুুল আজিজের পরামর্শক্রমে রাসূল সা:-এর ওফাতের ৮৫ বছর পর ইমাম শিহাব আল জুুহরি (জন্ম ৫১ হিজরি. মৃত্যু ১২৪ হিজরি) সিরাত চর্চা শুরু করেন। তিনি যে সংক্ষিপ্ত জীবনীটি রচনা করেন সেটিই সিরাত বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ, যা বহুকাল আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিহাব জুুহরির প্রিয় ছাত্র মুসা ইবনে উকমা (মৃত্যু ১৪১ হিজরি) দ্বিতীয় সিরাত গ্রন্থটি রচনা করেন কিন্তু এ গ্রন্থটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর শিহাব জুুহরির আরো কয়েকজন ছাত্রÑ ইবন ইসহাক, ওমর ইবন রাশেদ, আবদুর রহমান ইবন আবদুল আজিজ, ইবন সালেহ প্রমুখও সিরাত গ্রন্থ রচনা করেন। প্রথম সিরাতকার হিসেবে বর্তমান বিশ্বে যে নামটি সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন ইবন ইসহাক (জন্ম ৮৫ হিজরি, মৃত্যু-১৫১ হিজরি) রাসূল সা:-এর ওফাতের মাত্র ৭৪ বছর পর মদিনায় জন্মগ্রহণকারী ইবন ইসহাকের রচিত ‘সিরাতু রাসূলুল্লাহ’ সিরাত-বিষয়ক সর্বাধিক প্রাচীনতম এবং পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য গ্রন্থ। এরপর ইবন হিশাম তার পূর্বসূরি ইবন ইসহাক রচিত ‘সিরাতু রাসূলুল্লাহ’ নামক গ্রন্থটির সংশোধিত, পরিমার্জিত রূপ দিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে ‘সিরাতে নবুবিয়্যা’ নামে প্রকাশ করেন যা সিরাতে ইবন হিশাম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। আজ পর্যন্ত এ গ্রন্থটি প্রামাণ্য সিরাত গ্রন্থ হিসেবে সর্বাধিক সমাদৃত। প্রকৃতপক্ষে সিরাত অধ্যয়ন এমন এক পথ, যে পথ পাঠককে পৌঁছে দেবে রাসূল সা:-এর সার্বিক জীবনের স্বর্ণদীপ্ত সময়ে।
হাবিবে রাসূল সা:-এর প্রতি ভালোবাসা স্থাপন করা ঈমানের অংশ, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে রাসূল! আপনি) বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’ (সূরা আল-ইমরান-৩১)।
আলোর উৎস হোক হেরার জ্যোতি : অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছেÑ আজ অসংখ্য মুসলিম তরুণ-তরুণী হলুদ লেখকদের জীর্ণ লেখায় বুঁদ হয়ে অধুনাকালের ‘মডেল’ তারকাদের কিম্ভূতকিমাকার লাইফ স্টাইল ফলো করে চলেছে। অথচ এ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাদের কাছে হেরার জ্যোতিতে ভাস্বর দীপ্তিময় রহমতপূর্ণ জীবনের সন্ধান পৌঁছে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দাও যখন তিনি তোমাদেরকে ওই পয়গামের প্রতি আহ্বান করেন, যা তোমাদের মাঝে জীবন সঞ্চার করবে’ (সূরা আনফাল-২৪)। সব শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্যই সিরাতের পাতায় পথনির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি’ (সূরা আম্বিয়া-১০৭)।
পবিত্র মেঘমালা সিরাতুন নববী : সিরাতে নবীই সেই পবিত্র মেঘমালা যা হৃদয়ের বিরান ভূমিকে সজীব করে তুলে, সিরাতের অলিগলিই সব আত্মিক-ব্যাধি থেকে আরোগ্য দান করে এবং দ্বিধা-সংশয় দূর করে দেয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলোÑ
হাফেজ ইবনুল ইমাদ হাম্বলি তার ইতিহাস গ্রন্থে ‘শাযারাতুয যাহাব’ ইমামুদ্দিন ওয়াসেতির জীবনীতে লেখেনÑ ‘তিনি কালাম শাস্ত্রবিদ ফকিহদের মাঝে বেড়ে উঠেছিলেন, এ জন্য তার মাঝে ছিল যুক্তি ও দর্শনের মেজাজÑ কিন্তু একসময় তিনি অনুভব করলেন, তার অন্তরে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই এবং ইয়াকিনের নূর নেই, হৃদয়জুড়ে শুধু সংশয় আর অস্থিরতা। তিনি কালাম শাস্ত্রবিদদের পথ ছেড়ে সুফিয়ায়ে কেরামের দ্বারস্থ হলেন, কিন্তু সুফিদের রঙ-ঢঙ দেখে আরো বিগড়ে গেলেন। অবশেষে তিনি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ:-এর শরণাপন্ন হয়ে মনের অস্থিরতা খুলে বললেন ইবনে তাইমিয়া রহ: তাকে ওসিয়ত করলেনÑ সব কিছু ছেড়ে সিরাতে নববীর অধ্যয়নে মনোযোগ দাও, সিরাতে নববীই সব আত্মিক-ব্যাধির উপশম, সিরাতে নববীই ঈমান ও ইয়াকিনের চিরন্তন উৎস। শাইখ ইমামুদ্দিন ওয়াসেতি সিরাত অধ্যয়নে ডুবে গেলেন। হৃদয়জুড়ে যে শূন্যতা, অস্থিরতা ও সংশয় বিরাজ করছিল তা আমূলে দূর হয়ে গেল। (শাযারাতুয যাহাব)
সুবহান আল্লাহ, সিরাত অধ্যয়নে পাঠকের হৃদয়ে একীভূত হয়Ñ হাসি, আনন্দ, উৎকণ্ঠার ত্রিমুখী অনুভূতি, তখন পাঠকের হৃদয়জুড়ে এক জান্নাতি প্রশান্তি রব্বে কারিম নাজিল করে দেন। সিরাত অধ্যয়নের ধারাবাহিকতা যখন পাঠককে নবীজীর ওফাতে পৌঁছে দেয় তখন দু’চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে, হৃদয় হয় বিদগ্ধ মরুপ্রান্তর। তবুও বারবার এ অধ্যায়েই চোখ বুলিয়ে হৃদয় যন্ত্রণায় জ্বলতে চায়Ñ গলতে চায়, সিরাতের মাঝেই যে পুঞ্জীভূত সব তৃপ্তি পরিতৃপ্তি।
সাহাবি ও তাবে তাবেয়িদের সিরাত গ্রন্থপঞ্জি : হাবিবে রাসূল সা:-এর জীবন সহজ সরল ও খোলামেলা স্পষ্ট। এতটাই স্পষ্ট যে, পাঠক রাসূল সা:-এর পূর্ণ ব্যক্তিত্বের বর্ণনা পড়লে অবাক হতে বাধ্য; সিরাত গবেষকরা রাসূলুল্লাহ-এর দৈহিক, আত্মিক ও দিন-রাতের কর্মের সব কিছুর বিবরণ এমনভাবে দিয়েছেন যার কোনো অপূর্ণতা নেই। হজরত আনাস রা: বলেন, আমি নবীজীর চুল ও দাড়িতে গুনে গুনে ১৪টি চুল পেয়েছিÑ ‘মুখতাসারুশ শামায়েল’।
রাসূল সা:-এর সিরাত চর্চার ক্ষেত্রে যে সমস্ত সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে তাবেয়িরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন (অবশ্য এসব কাজ ছিল বিচ্ছিন্ন, অগোছালো) তাঁরা হলেনÑ ১. উরওয়া ইবনে যুবায়ের। (জন্ম. ২৩ হি.-মৃ. ৯৪ হি.); ২. আবান ইবন উসমান (জন্ম : ২০ হি. মৃ-১০৫ হি.), ৩. ওয়াহাব ইবনে মুনাববাহ (মৃ. ১১০ হি.), ৪.আসিম ইবনে ওমর। (মৃ. ১২১ হি.), ৫.সুরাহ বিন ইবন সাদ। (মৃ. ১২৩ হি.), ৬. আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর। (মৃ. ১৩০ হি.), ৭. মুসা ইবনে উকব। (মৃ. ১৪১ হি.), ৮. হিশাম ইবন উরওয়া। (মৃ. ১৪৬ হি.), ৯. ইবন শিহাব জুহরি। (জন্ম. ৫১ হি.-মৃ. ১২৪ হি.), ১০. আবু আব্দুল্লাহ মাহমুদ ইবনে ইসহাক। (জ. ৮৫ হি.-মৃত-১৫১ হি.) ও ১১. ইমাম শাবি প্রমুখ।
রাহমানুর রাহিম রাসূল সা:-এর ভেতর-বাহির স্বচ্ছ ও পবিত্র করেছেন। সিরাতের সবচেয়ে হৃদয়কাড়া দিক হলোÑ ‘সমগ্র সিরাতই প্রীতির দিকে আহ্বান করে’। মূল কথা হচ্ছেÑ নবীজীর জীবনী এতটাই সংরক্ষিত যে, তাঁর পাকা চুল-দাড়ি এবং সেই কেশগুলোর অবস্থানও অতি যতেœ সিরাত গবেষকদের গ্রন্থিভুক্ত হয়েছে। সিরাতের পাতায় পাতায় তাঁর প্রতিটি কথা, নড়াচড়া, জনতায় ও নির্জনতায় একেকটি ভাব ও ভাষার নমুনা, চলাফেরা, জীবন যাপন, পোশাক পরিচ্ছেদ, খাবার গ্রহণ ও চেহারা-সুরত ইত্যাদি সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সিরাতের পাতায় পাতায় এখনো বিদ্যমান রয়েছে; সিরাত সঙ্কলকরা অত্যন্ত আমানতদারিতার সাথে তা সংরক্ষণ করেছেন এবং আজো সিরাত সঙ্কলন, চর্চা ও অধ্যয়ন অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি ও তাঁর বার্তাবাহক উম্মি নবীর প্রতি যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীতে ঈমান আনে এবং তাঁর আনুগত্য করে, যাতে তোমরা সঠিক পথ পাও’ (সূরা আরাফ-১৫৮)।
নবীজীর পরশে : আরবের তপ্ত প্রান্তরে জাহেলিয়াতি অজ্ঞতা এবং অশান্তির চরমে লিপ্ত থাকা একটি জাতি হাবিবে রাসূল সা:-এর পরশে আমূলে পাল্টে যায় এবং জাহেলিয়াতি সেই জাতিই পরবর্তীতে রাসূল সা:-এর অনুসরণে-অনুকরণে হয়ে উঠে ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সভ্যতার নির্মাতা। ইসলামী এ সভ্যতার বিশাল বিশাল বিজয়ী কাফেলার ঈমান জাগানিয়া বিবরণ স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় উল্লেখ আছে। ঈমান পরিপূর্ণ হয়েছে কি না তা বোঝার অন্যতম মাপকাঠি হচ্ছে হাবিবে রাসূল সা:-এর প্রতি মোহাব্বত। সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবীজীকে ভালোবাসতেন নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশি, নবীজীর প্রতি সাহাবায়ে কেরামদের ভালোবাসার নজির যেমন ছিলÑ
১. হজরত আবুবকর রা: মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় জিজ্ঞেস করলেন, হে আয়েশা! নবীজী কোন দিন ইন্তেকাল করেছিলেন? হজরত আয়েশা রা: জানালেন, ‘সোমবার’। আবুবকর রা: বললেন, আজ কী বার? জবাব এলোÑ সোমবার। তিনি বললেন, হায় যদি আমার মৃত্যু রাতের আগেই হতো’ (বুখারি)!
২. হজরত ওমর রা: নবীজীকে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তবে নিজের জানের চেয়ে বেশি নয়। নবীজী বললেন, ‘ওহু! তাহলে তো এখনো (ঈমান পরিপূর্ণ) হয়নি। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যতক্ষণ না আমি তোমার জানের চেয়েও বেশি প্রিয় না হবো ততক্ষণ তোমার ঈমান পূর্ণ হবে না।’
কিছুক্ষণ পর হজরত ওমর রা: বললেন, আল্লাহর শপথ! এখন আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও বেশি প্রিয় হয়ে গেছেন। নবীজী বললেন, ‘হ্যাঁ,ওমর! এখন তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে’ (বুখারি)।
৩. বদর যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সা: যুদ্ধে সারি সোজা করছেন। তাঁর হাতে একটি তীর ছিল। হজরত সাওয়াদ রা: (ইচ্ছাকৃতভাবে) সারির একটু সামনে দাঁড়িয়ে যান। বিশ্বনবী তার সামনে এসে তাকে তীর দিয়ে মৃদু খোঁচা দেন; আর বলেন, সারি সোজা করে দাঁড়াও।
এবার হজরত সাওয়াদ রা: নবীজী সা:কে বলেন, আপনি আমাকে তীর দিয়ে খোঁচা দিয়ে কষ্ট দিয়েছেন, আমি প্রতিশোধ নিতে চাই। নবীজী সাওয়াদের হাতে তীর দিলেন আর নিজের পেট থেকে কাপড় সরালেন এবং সাওয়াদকে প্রতিশোধ নিতে বললেন। এ সুযোগে সাওয়াদ রা: নবীজীকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু খেতে শুরু করলেন।
নবীজী বললেন, সাওয়াদ! এমনটি করলে কেন? তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! সামনে যুদ্ধ। বাঁচব কি না মরব জানি না। মৃত্যুর আগে আপনার শরীরের একটু স্পর্শ পাওয়ার জন্যই এমনটি করেছি’ (সিরাতে ইবনে হিশাম)।
এই ছিল নবীয়ে রহমত সা:-এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসার হাজার উদাহরণের মাঝে মাত্র তিনটি ঘটনার কিঞ্চিৎ বর্ণনা, সিরাতের পাতায় পাতায় এসব ভালোবাসা পাঠকের চোখ শীতল করবে। রাসূল সা:-এর সিরাত চর্চা ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই অব্যাহত গতিতে চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। তাঁর সম্পর্কে কেউ কোনো ভুল ব্যাখ্যা, অপব্যাখ্যা, সত্যের অপলাপ করতে পারবে না। মুসলিম সিরাত চর্চাকারীরা এ সুযোগ তাদের দেবেন না, বরং মহানবী সা:-এর সিরাত সম্পর্কে লাখো গ্রন্থ মুসলিম লেখকরা অত্যন্ত যতেœর সাথে তথ্যপূর্ণভাবে রচনা করেছেন এবং করছেন। আদর্শহীন কোনো জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে সমাদৃত হতে পারে না, মানব সমাজের সব ক্ষেত্রে গৌরবময় উত্তরণের পথই হলো নবুয়াতি আদর্শ। রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘কারো কাছে সৎপথ স্পষ্ট হওয়ার পরও যদি সে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে ফিরিয়ে দেবো এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব, আর তা কত মন্দ আবাস’ (সূরা নিসা-১১৫)।
মুমিনের হৃদয়ে প্রিয় নবীজীর প্রতি ভালোবাসার স্ফুলিঙ্গ আজো বিদ্যমান, যে কারণে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রতি কথা বা কাজে কেউ কটাক্ষ করলে; সাথে সাথে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে মুমিনের বক্ষ। যদিও স্বীকার করতে হবেÑ আমাদের প্রজন্মের মাঝে এ ভালোবাসার সঙ্কট দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে আত্মপরিচয়ের তীব্র সঙ্কট। সর্বোপরি এ সঙ্কট মোকাবেলায় সিরাতে মুহাম্মদ সা: ছাড়া বিকল্প পথ নেই, আর এ পথে আমাদের প্রিয়জনদের শামিলের দায়িত্ব আমাদেরই। মনে রাখতে হবে, সিরাতের ইতিহাস মুসলিমদের অস্তিত্ব, অস্তিত্বের পরিচয় জানা ছাড়া এই চলমান ফেতনার স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে যাবে আর এ টিকে না থাকার মানে নিজের ক্ষতির সাথে সমগ্র উম্মাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেÑ কুরআনুল কারিমের অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য সিরাত পাঠের বিকল্প নেই। আমাদের সমাজকে আঁধারের অতল গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে সিরাত বিমুখতা, এ অবস্থার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সিরাত চর্চায় মুমিনদের হৃদয়ে তীব্র ব্যাকুলতা জাগিয়ে দিন এবং এ পথে সবার প্রচেষ্টা ও ভালোবাসাকে কবুল করে নিন। আমীন। হ