দিন দুনিয়ার মালিক মহান আল্লাহ গাফুরুর-রাহিমকে উপেক্ষা করার সাধ্য কার আছে? তিনি বরং পাপ ও ধ্বংসের পথ থেকে কোরাইশকুল এবং পৃথিবীর আবিল-অজ্ঞ জাতিগুলোকে রক্ষার জন্য আরব দেশে এক মহামানবের আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করলেন। তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি কিতাবে একদা তিনি এক মহানবী পাঠানোর কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন সেই নবীই হবেন পৃথিবীর শেষ নবী। অকস্মাৎ সেই মহানবী কোরাইশদের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করলেন। আর তিনিই হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:, মানবজাতির প্রতি আল্লাহর অসীম করুণাধারা। এই মক্কা নগরীতেই কোরাইশদের বিখ্যাত হাশেমীয় বংশের কোরাইশ দলপতি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহর স্ত্রী আমিনার ঘরে হজরত মুহাম্মদ সা: জন্মগ্রহণ করেন।
মুহাম্মদ সা:-এর জন্মের আগেই তার পিতা আব্দুল্লাহ সিরিয়া থেকে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে ফেরার সময় অসুস্থ হয়ে মদিনায় মারা যান। মদিনা ছিল আব্দুল্লাহর শ্বশুরবাড়ি। তার মৃত্যুর সময় আমিনা ছিলেন গর্ভবতী। আবদুল্লাহর মৃত্যুতে আবদুল মুত্তালিবের পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। কিন্তু কিছু দিন পরে যখন আব্দুল্লাহর স্ত্রী বিবি আমিনা ঘর আলো করে পুত্রসন্তান প্রসব করলেন তখন আব্দুল মুত্তালিব এমন খুশি হলেন যে শিশুটিকে আমিনার কোল থেকে নিজের বাহুতে তুলে নিয়ে সোজা আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবার দরজায় এসে ঘোষণা করলেন, তার নাতির নাম তিনি রেখেছেন মুহাম্মদ সা:। মুহাম্মদ অর্থ হলো প্রশংসিত। কোরাইশরা তাদের দলপতির খুশি দেখে সবাই খুশি হলো।
তখনকার দিনে মক্কার সমভ্রান্ত পরিবারগুলোতে একটা নিয়ম ছিল। তারা তাদের নবজাত শিশুদের লালন-পালনের জন্য শহরের অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া থেকে মরুভূমির খোলামেলা আলো বাতাসের মধ্যে পাঠিয়ে দিত। সেখানে নানা গোত্রের বেদুইন পরিবারগুলোর বাস ছিল। তারা খোলা মাঠে উট, দুম্বা চরিয়ে জীবন ধারণ করত এবং বছরের একটা সময় দল বেঁধে মক্কায় আসত শিশু পালনকারিণী মায়েদের নিয়ে। শিশু পালনকারিণী মায়েরা কোরাইশ ধনীদের নবজাতক শিশু পালনের জন্য প্রতিযোগিতা করত।
বিবি আমিনা তার পুত্রের জন্য বনু সাদ নামের বেদুইন গোত্রের এক মহিলাকে পেলেন। মহিলার নাম ধাত্রীমাতা হালিমা। হালিমা ধনী কোরাইশদের শিশু সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় হঠাৎ হাশেমীয় বংশের এক গরিব পিতৃহীন শিশুর কথা শুনে আমিনার দরজায় হাজির হন। বিবি আমিনা হালিমার কোলে তার বুকের ধন মুহাম্মদ সা:কে তুলে দেন। মুহাম্মদ সা:কে কোলে নিয়েই হালিমা শিশুটির চেহারায়, শরীরে কয়েকটি শুভ লক্ষণ দেখতে পেয়ে খুশি হলেন। ধাত্রীমাতা হালিমা তার মরুভূমির তাঁবুতে ফিরে এলেন। আশ্চর্য, শিশুটি হালিমার পরিবারে ঢোকা মাত্র হতদরিদ্র পরিবারটির মাঝে নানা দিক দিয়ে সচ্ছলতাও প্রবেশ করল। ধাত্রীমাতা হালিমার শীর্ণ শরীর সুস্বাস্থ্যের দীপ্তিতে ভরে গেল। সংসারের আয় বাড়তে লাগল। যেন করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছায় এক অলৌকিক স্বচ্ছন্দের আবহাওয়ায় ফুলে উঠল হালিমার তাঁবু।
মোট চার বছর মুহাম্মদ সা: ধাত্রীমাতা হালিমার গোত্রে বড় হয়েছিলেন। তিন বছর বয়সেই তিনি বনু সাদের চারণভূমিতে ছাগল পালের রাখালদের পিছু পিছু ছাগল চরাতে যেতে লাগলেন। বনু সাদের বেদুইনরা বিশুদ্ধ আরবিতে কথা বলত। মুহাম্মদ সা: বনু সাদের কথ্য আরবি শিখলেন। পরবর্তীকালে তাঁর সুললিত আরবি উচ্চারণের জন্য তিনি বনু সাদের শুদ্ধ আরবি উচ্চারণের প্রশংসা করেছেন।
মুহাম্মদ সা: পাঁচ বছরে পা দিলে হালিমা তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে এলেন। তার দাদা আবদুল মুত্তালিব মুহাম্মদ সা: লাবণ্যময় চেহারা আর সুন্দর স্বাস্থ্য দেখে খুশিতে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি ধাত্রী হালিমাকে তার সাধ্যমতো পারিশ্রমিক ও পুরস্কার দিয়ে বিদায় করলেন।
দুই. মরুভূমি থেকে মুহাম্মদ সা: মায়ের কাছে ফিরে এসে এক নতুন জীবনে প্রবেশ করলেন। এতদিন তিনি যে পরিবেশে ছিলেন সেখানে ছিল মরুভূমির খোলামেলা প্রান্তর। সে তুলনায় মক্কায় পরিবেশের সেই উদারতা ছিল না। উটের গলার ঘণ্টায় মুখর এই শহরে মুহাম্মদ সা: প্রাচীন নগর জীবনে কোরাইশ ঐতিহ্যের মধ্যে মানুষ হতে লাগলেন। মক্কা নগরীর দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যেও মুহাম্মদ সা: অনেক কিছু দেখলেন আর শিখলেন। দেখলেন ধনী কোরাইশদের কাফেলাগুলো কিভাবে বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে সিরিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। দেখলেন দরিদ্র কোরাইশদের কষ্ট। পানি ও খাবারের জন্য তাদের শীতে-গ্রীষ্মে প্রাণপাত খাটুনি। আর দেখলেন ক্রীতদাসদের। এদের মধ্যে কালো নিগ্রোরাও আছে। আছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। এই তো সামন্তবাদী নগরজীবন, যা দাসপ্রথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মুহাম্মদ সা: মক্কায় দাদা আবদুল মুত্তালিবের গোত্রীয় প্রতিপত্তির ছায়ায় আশ্রয় পেলেন। কাবাগৃহের আঙিনায় সেখানে আবদুল মুত্তালিব তার ছেলে ও নাতিদের নিয়ে বসতেন সেখানে মুহাম্মদ সা:কেও তিনি তার ফরাশের ওপর বসাতে লাগলেন। যাতে পরে কেউ এই অনাথ বালককে তার গোত্রীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে না পারে। মুহাম্মদ সা: কৈশোরের এই সুখস্মৃতির দিনগুলোকে বেদনায় কালো করে হঠাৎ মাতা আমিনা ইন্তেকাল করেন। তিনি মুহাম্মদ সা:কে সাথে নিয়ে তার বাপের কবর দেখতে মদিনায় গিয়েছিলেন। ফেরার পথে বিবি আমিনা অসুস্থ হয়ে মারা যান। মুহাম্মদ সা: মক্কায় ফিরে এসে দাদা আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে পালিত হতে থাকেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় আবদুল মুত্তালিবও কিছুদিন পরেই ইন্তেকাল করলে মুহাম্মদ সা: সব দিক দিয়েই একজন এতিম কিশোরে পরিণত হন। এখন মুহাম্মদ সা:-এর ভার কে নেবে?
চাচাদের মধ্যে সবচেয়ে গরিব ছিলেন যে চাচা তিনিই এগিয়ে এলেন মুহাম্মদ সা:কে আশ্রয় ও সান্ত্বনা দিতে। এই সুহৃদয় চাচার নাম ছিল আবু তালিব। আবু তালিব ছাড়াও মুহাম্মদ সা:-এর আরো কয়েকজন চাচা ছিলেন। তারা কেউ এতিম মুহাম্মদ সা:কে আশ্রয় দিতে এগিয়ে এলেন না। এই আবু তালিবের ঘরেই মুহাম্মদ সা: মায়া-মমতার মধ্যে যৌবনে পদার্পণ করলেন। পশুপালন ও সিরিয়ার বাণিজ্য কাফেলায় চাচার সাথে সাথে থেকে মুহাম্মদ সা: কোরাইশদের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ জীবিকা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হলেন। একটি পশুচারণ, অন্যটি সিরিয়ার পথে সওদাগরি কাফেলায় থেকে কেনাবেচার অভিজ্ঞতা। শেষ পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতাই দরিদ্র যুবক মুহাম্মদ সা:-এর ভাগ্য ফিরিয়ে দেয়।
এ সময় আরব দেশে দস্যু তস্করের খুবই দৌরাত্ম্য ছিল। দুষ্কৃতকারী ও সমাজবিরোধীরা পথচারীদের ওপর ছিনতাই এবং রাহাজানি চালাত। নারীদের সম্ভ্রম লুটে নিত। এসব দেখে যুবক মুহাম্মদ সা: ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সমাজসেবামূলক যুবসংগঠন গড়ে তোলেন। এদের কাজ ছিল অসহায় দুস্থ নর-নারীর পাশে দাঁড়ানো ও তাদের সাহায্য করা। আর হজযাত্রীদের সাধ্যমতো সেবা করা।
তিন. সে সময় মক্কা নগরীতে খাদিজা নামে এক ধনী বিধবা বাস করতেন। তিনিও ছিলেন এক ব্যবসায়ী। তাঁর ছিল অনেক উট, বিত্ত-বেশাত আর দাস-দাসী। তিনিও সওদাগরী ব্যবসা করতেন। তার লোকজন কাফেলা সাজিয়ে নগর থেকে নগরে কেনাবেচা করত। এসব কাজে খাদিজার একজন বিশ্বাসী কর্মচারীর তখন খুবই দরকার ছিল। তিনি মক্কার যুবকদের মধ্যে একজন সৎ ও কর্মঠ যুবক তালাশ করছিলেন। এ সময় তিনি কারো কাছে মুহাম্মদ সা:-এর সততা ও সত্যবাদিতার কথা জেনে আবু তালিবকে খবর দেন। আবু তালিব খাদিজার সিরিয়াগামী কাফেলায় মুহাম্মদ সা:কে যেতে দিতে সম্মত হলে মুহাম্মদ সা: খাদিজার কাফেলা নিয়ে মরুভূমিতে বেরিয়ে পড়েন। সিরিয়ার দিকে যেতে যেতে মুহাম্মদ সা: পথের সব বাণিজ্যকেন্দ্রে বেচাকেনা শুরু করেন। তার নরম ব্যবহার ও সত্যবাদিতার জন্য মক্কার লোকেরা মুহাম্মদ সা:কে আগেই ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ বিশ্বাসী বলে ডাকত। এবার সিরিয়ার বাজার কেন্দ্রগুলোতে তার ব্যবসায়িক সততার গুণে খাদিজার পণ্যসম্ভার লাভজনক দামে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। মুহাম্মদ সা:-মক্কার জন্য দরকারি জিনিসপত্র কিনে বিপুল লাভসহ মক্কায় ফিরে আসেন। খাদিজা মুহাম্মদ সা:-এর যোগ্যতা, সততা ও ভদ্রতায় অতিশয় মুগ্ধ হয়ে যান। মুহাম্মদ সা:কে খাদিজার খুব ভালো লাগে।
তিনি এক সখীর মাধ্যমে মুহাম্মদ সা:কে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। মুহাম্মদ সা: বিষয়টি তার চাচা আবু তালিবের কাছে উত্থাপন করতে বললে খাদিজার আত্মীয়গণ আবু তালিবের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। আবু তালিবও খুশি হয়ে বিয়েতে সম্মতি দেন। দুইজনের এক শুভদিনে বিয়ে হয়ে গেলে মুহাম্মদ সা: দুঃখ-দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সুখের সংসারে প্রবেশ করেন। প্রিয়তমা পতœী ও সন্তানদের নিয়ে এভাবেই মুহাম্মদ সা: চল্লিশটি বছর কেটে যায়। চল্লিশ বছর বয়সের মাথায় হঠাৎ মুহাম্মদ সা:-এর জীবনযাপনের ধারাটাই অকস্মাৎ পাল্টে যায়। যে দায়িত্ব পালন করতে আল্লাহ তাকে পৃথিবীর মরুময় এক প্রান্তরে পাঠিয়েছিলেন, শুরু হয় এরই বিদ্যুৎচমক।
তিনি আল্লাহর দ্বীন, ইসলামকে তাঁর নবুয়তের ২৩ বছর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিজয়ী করেন। ইসলামের ঝাণ্ডা প্রথম আরব উপদ্বীপে উড্ডীন হয়। একইভাবে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল আমাদের প্রিয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: ইসলামকে বিজয়ী করে পৃথিবীর বুকে এক শান্তির ধর্মরাজ্য স্থাপন করেন। মহানবী সা:-এর ওপর আল্লাহর অব্যাহত করুণা বর্ষিত হোক। আমীন! হ